কারাবন্দি রাশেদ খান মেননের ৮৩ বছরে পদার্পণ

মোস্তফা আলমগীর রতন
রাশেদ খান মেনন। ফাইল ছবি

আজ ১৮ মে ৮৩ বছরে পদার্পণ করলেন ষাটের দশকের তুখোড় ছাত্র নেতা কারাবন্দি রাশেদ খান মেনন। ১৯৬৩-৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি, ৬৫-৬৭ সালে সাবেক পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি এবং বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি সবার প্রিয় মেনন ভাইকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা।

মেনন ১৯৬২ সালে নিরাপত্তা আইনে প্রথম কারাবন্দি হওয়ার পর ৬৯ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময় ও বিভিন্ন মেয়াদে নিরাপত্তা আইন, দেশরক্ষা আইন ও বিভিন্ন মামলায় কারাবরণ করেন। ’৬৭-’৬৯ সালে জেলে থাকাকালে তিনি বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে আসেন এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় ক্যান্টনমেন্টে নেওয়ার আগ পর্যন্ত জেলের বাইরে তার যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করেন।

১৯৭০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পল্টন ময়দানের জনসভায় ‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা’ কায়েমের দাবি করায় ইয়াহিয়ার সামরিক সরকার মেননের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন এবং তার অনুপস্থিতিতেই সামরিক আদালতে তাকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও সম্পত্তির ৬০ শতাংশ বাজেয়াপ্তের দণ্ডাদেশ দেন। এ অবস্থায় রাশেদ খান মেনন আত্মগোপনে কৃষকদের সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের কাজে আত্মনিয়োগ করেন।

২৫ মার্চ পল্টনের শেষ জনসভায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও পাকিস্তানের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

২৫ মার্চের কালরাতে গণহত্যার পর মেনন ঢাকার অদূরে নরসিংদী শিবপুরকে কেন্দ্র করে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনের কাজ শুরু করেন। পরে প্রবাসে মওলানা ভাসানীকে প্রধান করে জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম সমন্বয় কমিটি গঠন করে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে আত্মনিয়োগ করেন।

১৯৮২ সালে জেনারেল এরশাদ সামরিক শাসন জারি করলে রাশেদ খান মেনন সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে অন্যতম ভূমিকা পালন করেন। ১৫ ও সাত দলের যুগপৎ আন্দোলন পরিচালনায় ভূমিকার জন্য সামরিক শাসনামলে বিভিন্ন সময় তাকে আত্মগোপনে যেতে হয়েছে।

পাঁচ দল হিসেবে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে ঐক্য পুনর্স্থাপনে রাশেদ খান মেনন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং পাঁচ দল, সাত দল ও আট দলের ঐতিহাসিক তিন জোটের ঘোষণার ভিত্তিতে ’৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরশাসকের পতন হয়। এতেও তিনি অন্যতম ভূমিকা রাখেন।

১৯৯২ সালের ১৭ আগস্ট নিজ পার্টি কার্যালয়ের সামনে হত্যাচেষ্টা করা হয় মেননকে। প্রথমে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল ও পরে লন্ডনে কিংস কলেজে দুবার অস্ত্রোপচার হলে তিনি মৃত্যুমুখ থেকে ফিরে আসেন।

রাশেদ খান মেনন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার জাতীয় সংগ্রামেও বিশেষ ভূমিকা রাখেন। দেশব্যাপী বাংলা ভাইসহ জঙ্গিবাদী শক্তি, বোমাবাজি, উদীচী হত্যাকাণ্ড, পল্টন হত্যাকাণ্ড, রমনা বটমূলে বোমা হামলা, সাম্প্রদায়িক তাণ্ডব শুরু করলে তিনি অন্যদের নিয়ে প্রতিরোধ সংগঠিত করেন। ১১ দল ও পরে আওয়ামী লীগ, জাসদ, ন্যাপসহ ১৪ দলের আন্দোলন গড়ে তোলেন। ১৪ দলের ৩১ দফা নির্বাচনি সংস্কার ও ২৩ দফার ন্যূনতম কর্মসূচি প্রণয়নে তিনি মুখ্য ভূমিকা রাখেন।

রাশেদ খান মেনন ১৯৭৯ সালে বরিশালের বাবুগঞ্জ ও গৌরনদী থেকে এবং ১৯৯১ সালে বাবুগঞ্জ-উজিরপুর থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচনে তিনি ১৪ দলের প্রার্থী হিসেবে ঢাকা-৮ নির্বাচনি এলাকা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওই সময় তিনি সংসদে কার্যউপদেষ্টা কমিটির সদস্য, শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন। এ ছাড়া সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটিরও সদস্য নির্বাচিত হন।

২০১২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর মহাজোট সরকারের পক্ষ থেকে রাশেদ খান মেননকে মন্ত্রিত্বের প্রস্তাব দেওয়া হলেও তিনি পার্টির সিদ্ধান্তে তা গ্রহণ করেননি। ২০১৩ সালের ১৮ নভেম্বর তিনি সর্বদলীয় সরকারের ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী নিযুক্ত হন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সংসদে নির্বাচনে তিনি ঢাকা-৮ আসন থেকে পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং মহাজোট সরকারের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

২০২৪ সালের জানুয়ারি নির্বাচনে তিনি ১৪ দলের প্রার্থী হিসেবে বরিশাল-২ (উজিরপুর-বানারীপাড়া) নির্বাচনি এলাকা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সব মিলিয়ে মোট ছয়বার তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচনে জয়লাভ করেন।

সবশেষে পার্লামেন্টে বাজেট বক্তৃতায় মেনন দুর্নীতি, লুটপাট, টাকা পাচারের বিরুদ্ধে তীব্রভাবে রুখে দাঁড়ান। চব্বিশের জুলাইয়ে ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলন সমর্থনের দাবি মেনে নিতে সরকারকে বলেন এবং ছাত্রদের ওপর নির্যাতনের নিন্দা করেন। ৫ আগস্ট ২০২৪ সরকার পরিবর্তিত হলে মিথ্যা মামলায় তাকে কারারুদ্ধ করা হয়। বর্তমানে প্রায় শতাধিক মামলায় কারাগারে আটক আছেন।

রাশেদ খান মেনন বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। তিনি ১৯৪৩ সালের ১৮ মে পিতার কর্মস্থল ফরিদপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তার গ্রামের বাড়ি বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার বাহেরচর ক্ষুদ্রকাঠি গ্রামে। বাবা স্পিকার বিচারপতি আব্দুল জব্বার খান। সুপ্রসিদ্ধ পারিবারিক ঐতিহ্যের অধিকারী রাশেদ খান মেননের ভাইবোনদের মধ্যে রয়েছেন মরহুম সাদেক খান, কিংবদন্তি কবি মরহুম আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ খান, প্রখ্যাত সাংবাদিক মরহুম এনায়েতুল্লাহ খান, বেগম সেলিমা রহমান, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক শহিদুল্লাহ খান বাদল। তার স্ত্রী লুৎফুন্নেসা খান সংসদ সদস্য, মেয়ে ড. সুবর্ণা খান ও ছেলে ব্যবসায়ী আনিক রাশেদ খান।

ষাটের দশকের সামরিক শাসনবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানসহ সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী ভূমিকা রাখার জন্য ঢাকা সিটি করপোরেশন ২০০৮ সালের ৮ অক্টোবর রাজধানীর মগবাজার চৌরাস্তা থেকে বাংলামোটর রোড পর্যন্ত সড়কের নাম রেখেছে ‘রাশেদ খান মেনন সড়ক’।

রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ছাড়াও গবেষণা, প্রবন্ধ-নিবন্ধ রচনা, বিশেষ করে জাতীয় দৈনিকগুলোতে নিয়মিত কলাম লিখতেন মেনন। তার এসব কলাম একত্রিত করে এ পর্যন্ত আটটি বই প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত হয়েছে রাশেদ খান মেননের আত্মজীবনী ‘এক জীবন: স্বাধীনতার সূর্যোদয়’ (প্রথম পর্ব)। আজকের শুভ দিনে দলের নেতাকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রত্যাশা— তিনি যেন সুস্থ থাকেন।

লেখক: আহ্বায়ক, কেন্দ্রীয় মিডিয়া বিভাগ, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি

ad
ad

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

হঠাৎ অসুস্থ মির্জা ফখরুল

বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান গণমাধ্যমকে বলেন, রথযাত্রার অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দিতে গিয়ে শেষ পর্যায়ে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন বিএনপি মহাসচিব। তিনি চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। সুস্থতার জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন।

১ দিন আগে

সাদিক কায়েম জামায়াতে যোগ দিয়ে ভিপি পদে থাকার নৈতিকতা হারিয়েছে: রাশেদ

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় নেতা সাদিক কায়েম সম্প্রতি ছাত্রশিবির ছেড়ে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতে যোগ দেওয়ায় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি পদে থাকার ‘নৈতিকতা হারিয়েছে’ বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি নেতা রাশেদ খাঁন।

২ দিন আগে

ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কমিটিতে রদবদল

নতুন এই রদবদলে কেন্দ্রীয় স্কুল কার্যক্রম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন ডা. জায়েদ আহমাদ। তিনি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ থেকে (২০১৮-২০১৯ সেশন) এমবিবিএস পাস করেছেন। এর আগে তিনি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের সভাপতি এবং মেডিকেল জোনের সেক্রেটারি ও সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার গ্রামের

২ দিন আগে

সরকারকে প্রমাণ দিতে হবে, তারা জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করে: নাহিদ

নাহিদ বলেন, সরকার বলেছিল, তারা জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু আজ আমরা দেখছি, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে নানা টালবাহানা করা হচ্ছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হবে কি না, তা নিয়েই সন্দেহ দেখা দিয়েছে। তাই সরকার যদি বলে তারা জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করে, তাহলে বিচার আর সংস্কার প্রক্রিয়াকে আন্ত

২ দিন আগে