গার্ডিয়ানের অনুসন্ধান

ভুল নয়, ‘হাফলা’ নীতির কারণেই ইসরায়েলি হামলায় প্রাণ হারান ৭ ত্রাণকর্মী

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০: ৫০
(ওপরের সারির বাঁ থেকে) ব্রিটিশ নাগরিক জেমস হেন্ডারসন, জেমস কিরবি ও জন চ্যাপম্যান। (নিচের সারির বাঁ থেকে) ড্যামিয়ান সোবোল, জোমি ফ্র্যাঙ্ককম, জ্যাকব ফ্লিকিঙ্গার ও সাইফেদ্দিন আবুতাহা। ছবি: সংগৃহীত

গাজায় ত্রাণ বিতরণ শেষে ফেরার পথে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছিলেন ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের (ডব্লিউসিকে) তিনটি গাড়িতে থাকা সাত ত্রাণকর্মী। এ ঘটনায় এতদিন পর্যন্ত দায় চাপানো হয়েছিল কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তার ভুল সিদ্ধান্তের ওপর। কিন্তু ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক অনুসন্ধান বলছে, ঘটনাটি শুধু কয়েকজন কর্মকর্তার বিচ্ছিন্ন ভুল ছিল না। এর পেছনে ছিল ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে ব্যবহৃত একটি বিতর্কিত লক্ষ্য নির্ধারণ পদ্ধতি— ‘ইনক্রিমিনেশন’ বা ‘হাফলা’।

এই পদ্ধতিতে কোনো ব্যক্তিকে সরাসরি হামাসের সদস্য হিসেবে শনাক্ত করার পাশাপাশি তার সঙ্গে কথাবার্তা বলা, কাছাকাছি থাকা কিংবা কোনোভাবে সংশ্লিষ্টতার ভিত্তিতেও তাকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ তৈরি হয়। গার্ডিয়ানের সঙ্গে আলাপে কয়েকজন ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গাজায় এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের হাতে ব্যাপক বিবেচনাধিকার রয়েছে।

২০২৪ সালের ১ এপ্রিলের সেই হামলায় নিহত হন তিন ব্রিটিশ নাগরিক জেমস কিরবি, জেমস হেন্ডারসন ও জন চ্যাপম্যান; অস্ট্রেলিয়ার জোমি ফ্র্যাঙ্ককম; পোল্যান্ডের ডামিয়ান সোবোল; ফিলিস্তিনি সাইফেদ্দিন আবুতাহা; এবং দ্বৈত মার্কিন-কানাডীয় নাগরিক জ্যাকব ফ্লিকিঙ্গার। ডব্লিউসিকে জানিয়েছে, হামলার সময় তাদের কর্মীরা নিরস্ত্র ছিলেন এবং তাদের গাড়িগুলো স্পষ্টভাবে সংগঠনের চিহ্ন বহন করছিল।

ত্রাণ বহর থেকে ‘টার্গেট’

ঘটনার দিন ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেন গাজায় সমুদ্রপথে পৌঁছানো বিপুল পরিমাণ খাদ্য সহায়তা একটি গুদামে নিয়ে যায়। সংস্থাটির দাবি, তাদের চলাচলের রুট ও সময়সূচি ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষকে আগেই জানানো হয়েছিল এবং পুরো যাত্রাটিই সমন্বয়ের আওতায় ছিল।

গুদাম থেকে বের হওয়ার পর তিনটি গাড়িতে থাকা কর্মীরা ফেরার পথে ছিলেন। তখন তারা ইসরায়েলি সেনাদের কাছাকাছি ছিলেন না এবং কোনো তাৎক্ষণিক সামরিক হুমকিও তৈরি করেননি।

কিন্তু এর আগে ত্রাণ বহরের সঙ্গে থাকা কিছু সশস্ত্র ব্যক্তিকে ইসরায়েলি সেনারা হামাসের সদস্য বলে ধরে নেয়। পরে জানা যায়, ওই ব্যক্তিরা ত্রাণ বহরকে লুটপাট থেকে রক্ষার জন্য নিয়োজিত স্থানীয় নিরাপত্তাকর্মী ছিলেন।

গাজায় ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের ত্রাণ বহরে ইসরায়েলি বিমান হামলার পরের দৃশ্য। ওই হামলায় সাতজন নিহত হলেও সামরিক কৌঁসুলিরা এ ঘটনায় ফৌজদারি অভিযোগ আনার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। ছবি: সংগৃহীত
গাজায় ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের ত্রাণ বহরে ইসরায়েলি বিমান হামলার পরের দৃশ্য। ওই হামলায় সাতজন নিহত হলেও সামরিক কৌঁসুলিরা এ ঘটনায় ফৌজদারি অভিযোগ আনার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। ছবি: সংগৃহীত

এই ভুল ধারণাটিই পরবর্তী সিদ্ধান্তগুলোর ভিত্তি হয়ে ওঠে। গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, হামলার নির্দেশ দেওয়া রিজার্ভ কর্নেল নোচি মেন্ডেল ওই সশস্ত্র ব্যক্তিদের সঙ্গে ডব্লিউসিকে কর্মীদের সাময়িক যোগাযোগকেও তাদের বিরুদ্ধে সন্দেহের কারণ হিসেবে বিবেচনা করেন।

মেন্ডেলের ভাষায়, তারা হামাসের সদস্যদের সঙ্গে ‘মিশে গিয়েছিল’। এই ‘মিশে যাওয়া’ বলতে তিনি বোঝান— কাছাকাছি থাকা, কথা বলা, একসঙ্গে থাকা কিংবা এ ধরনের যোগাযোগ।

সশস্ত্র ব্যক্তিদের উপস্থিতির কারণে পুরো বহরই লক্ষ্যবস্তু হয়ে গিয়েছিল কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে মেন্ডেল বলেন, ‘নিশ্চিতভাবেই।’ তার যুক্তি ছিল, নিহত ত্রাণকর্মীরা ‘নির্দোষ ছিলেন না’, কারণ তারা হামাসের সঙ্গে ‘সংযুক্ত’ ছিলেন।

‘হাফলা’ কী?

গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখানেই। ‘হাফলা’ শব্দটির অর্থ ইনক্রিমিনেশন বা কোনো ব্যক্তিকে অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীতে এই পদ্ধতি ব্যবহার করে মাঠপর্যায়ের কমান্ডাররা কাউকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে শনাক্ত করতে পারেন।

তদন্তে উঠে এসেছে, কোনো এলাকায় এই পদ্ধতি কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, সে বিষয়ে নির্দেশনা অনেক সময় লিখিত আদেশের পরিবর্তে কমান্ডারদের মৌখিক ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে নিচের পর্যায়ে পৌঁছায়।

ফলে একই ধরনের পরিস্থিতিতে বিভিন্ন কর্মকর্তা ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। আবার কোনো ব্যক্তিকে একবার ‘টার্গেট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হলে তার সঙ্গে থাকা বা তার কাছাকাছি থাকা অন্য ব্যক্তিরাও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যেতে পারেন।

গাজা ডিভিশনের যুদ্ধ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা রিজার্ভ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ওরেন সলোমন গার্ডিয়ানকে যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, সেটি এই ব্যবস্থার ভয়াবহ শঙ্কাই তুলে ধরে।

তার ভাষ্য, কোনো গাড়িকে আগে থেকেই হামাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে ‘ইনক্রিমিনেট’ করা হলে সেখান থেকে কোনো ব্যক্তি বের হয়ে অন্য গাড়িতে উঠলেও সেই গাড়িও লক্ষ্যবস্তু হয়ে যেতে পারে। তার ভাষায়, ওই ব্যক্তির সঙ্গে থাকা অন্যরাও মারা যেতে পারেন এবং সেটি ‘ইনক্রিমিনেশন’ নীতির আওতায় সমস্যা হিসেবে দেখা হয় না।

প্রথম হামলার পর কেন থামেনি ড্রোন?

ডব্লিউসিকে বহরে হামলা একবারে হয়নি। তিনটি গাড়িকে লক্ষ্য করে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর প্রাথমিক তদন্তে বলা হয়েছিল, সেনারা গাড়ির ভেতরে হামাসের সদস্য থাকার ভুল ধারণা থেকে হামলা চালিয়েছিল। আইডিএফ পরে স্বীকার করে যে ঘটনাটিতে গুরুতর ভুল হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে প্রশ্ন উঠেছে— প্রথম হামলার পর যখন গাড়ি থেকে মানুষ বের হয়ে আসে এবং তাদের হাতে কোনো অস্ত্র দেখা যায়নি, তখন পরবর্তী দুটি হামলা কেন চালানো হলো?

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর প্রাথমিক তদন্তে যুক্ত একজন কর্মকর্তা এ বিষয়ে মেন্ডেলের সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথম হামলাটি ভুল শনাক্তকরণের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করা গেলেও পরবর্তী হামলাগুলোর ক্ষেত্রে সেই যুক্তি আর খাটে না। কারণ, প্রথম হামলার পর গাড়ি থেকে বের হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে কাউকে অস্ত্রধারী দেখা যায়নি। ফলে তাদের পরিচয় নিশ্চিত না করে পরবর্তী হামলা চালানো সামরিক নির্দেশনার বিরোধী হওয়ার কথা।

কিন্তু আরেক ইসরায়েলি কর্মকর্তা গার্ডিয়ানকে বলেন, বাস্তবে পরিস্থিতিটি এমন ছিল যে অধিকাংশ সামরিক কর্মকর্তা একই সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন।

তার হিসাব— যোগ্য কর্মকর্তাদের ৯০ শতাংশ এমন পরিস্থিতিতে প্রথম বোমা ফেলতেন; দ্বিতীয় হামলার ক্ষেত্রে ৯০ শতাংশ এবং তৃতীয় হামলার ক্ষেত্রেও ৮০ শতাংশ কর্মকর্তা হামলা চালানোর সম্ভাবনা ছিল।

অর্থাৎ, সমস্যাটি কেবল একজন কর্মকর্তার ভুল সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ ছিল না— এমনটাই ইঙ্গিত করছে এই বক্তব্য।

‘বিদেশিরা মারা গেছে— এটাই শুধু পার্থক্য’

নোচি মেন্ডেলকে গার্ডিয়ান প্রশ্ন করে, গাজায় এর আগেও হামাসের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে বলে সন্দেহ করা ত্রাণ বহরকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছিল কি না।

মেন্ডেল জানান, তার ইউনিট এ ধরনের বেশ কয়েকটি হামলার জন্য সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে প্রশংসা পেয়েছিল। তাদের বলা হয়েছিল, তারা হামাসের ত্রাণ নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা ঠেকাতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।

তার মতে, ডব্লিউসিকে ঘটনার সঙ্গে আগের ঘটনাগুলোর মূল পার্থক্য ছিল— এবার বিদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এটাই পুরো পার্থক্য। মৌলিক কোনো পার্থক্য নয়।’

২০২৪ সালের মে মাসে ব্রিস্টলে ৪৭ বছর বয়সী জেমস কিরবির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া। ছবি: সংগৃহীত
২০২৪ সালের মে মাসে ব্রিস্টলে ৪৭ বছর বয়সী জেমস কিরবির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া। ছবি: সংগৃহীত

এই বক্তব্যই গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। কারণ এতে প্রশ্ন উঠছে— যদি একই ধরনের পরিস্থিতিতে স্থানীয় ফিলিস্তিনি নাগরিক নিহত হওয়া সামরিক বাহিনীর কাছে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পেয়ে থাকে, তাহলে ডব্লিউসিকে কর্মীদের মৃত্যু কি কেবল বিদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার কারণে বেশি আলোচিত হয়েছে?

কেন ত্রাণ বহরকে হামাসের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল?

এর পেছনে ছিল গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর আরেকটি সামরিক লক্ষ্য—হামাসের বেসামরিক প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ধ্বংস করা।

গার্ডিয়ানের সঙ্গে কথা বলা কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি সেনাদের মধ্যে ব্যাপকভাবে এমন ধারণা তৈরি হয়েছিল যে হামাস গাজার অধিকাংশ ত্রাণ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করছে বা ত্রাণবহর দখলে নিচ্ছে।

ফলে ত্রাণের আশপাশে কোনো সশস্ত্র ব্যক্তিকে দেখা গেলে সেটিকে হামাসের ত্রাণ দখলের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়।

কিন্তু পরে পাওয়া তথ্য-উপাত্তে এই ধারণার পক্ষে শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

বাস্তব পরিস্থিতি ছিল আরও জটিল। ইসরায়েলি অবরোধ ও যুদ্ধের কারণে গাজায় ব্যাপক খাদ্যসংকট চলছিল। ত্রাণবহরগুলোতে হামলা বা লুটপাটের ঘটনায় মরিয়া সাধারণ মানুষ, অপরাধী চক্র এবং হামাসের সশস্ত্র সদস্য— বিভিন্ন পক্ষই জড়িত ছিল।

অর্থাৎ, প্রতিটি সশস্ত্র ব্যক্তিকে হামাসের সদস্য হিসেবে ধরে নেওয়া বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।

‘হামাসের শাসন ভাঙা’ মিশনের প্রভাব

মেন্ডেল নিজেই গার্ডিয়ানকে বলেন, গাজায় সেনাবাহিনীর অন্যতম মিশন ছিল হামাসের শাসনক্ষমতা ধ্বংস করা।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, হামাস-নিয়ন্ত্রিত ত্রাণ বিতরণকে বাধাগ্রস্ত করাও সেই মিশনের অংশ ছিল। ফলে কোনো ত্রাণবহর হামাসের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে বলে মনে হলে সেটিকে সামরিক লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে।

এই জায়গাতেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি হয়— একটি ত্রাণ সংস্থা যদি স্থানীয় নিরাপত্তার জন্য সশস্ত্র প্রহরী ব্যবহার করে, তাহলে সেই নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে সংস্থাটির কর্মীদের যোগাযোগ কি পুরো ত্রাণবহরকে সামরিক লক্ষ্য বানিয়ে ফেলতে পারে?

গার্ডিয়ানের তদন্তে উঠে আসা কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বাস্তবে এমন আশঙ্কা ছিল।

ইসরায়েলের সরকারি ব্যাখ্যা কী?

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী অবশ্য গার্ডিয়ানের এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নয়।

আইডিএফ বলেছে, ডব্লিউসিকে কর্মীদের লক্ষ্য করে হামলা চালানোর কোনো ইচ্ছা ছিল না। সেনারা ভুল করে গাড়িগুলোতে হামাসের সামরিক সদস্য রয়েছে বলে ধরে নিয়েছিল। এরপর ওই ভুলের সঙ্গে গুরুতর প্রক্রিয়াগত ব্যর্থতা যুক্ত হয়।

ইসরায়েলি সামরিক তদন্তে বলা হয়, ঘটনার জন্য দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের ভুল ও আদেশ-প্রক্রিয়া অনুসরণে ব্যর্থতা থাকলেও ফৌজদারি তদন্ত শুরুর মতো অপরাধের যৌক্তিক সন্দেহ পাওয়া যায়নি। ফলে সামরিক কৌঁসুলী ফৌজদারি কার্যক্রম না চালানোর সিদ্ধান্ত নেন।

আইডিএফ আরও বলেছে, শুধু কোনো সশস্ত্র ব্যক্তির কাছে থাকা, তার সঙ্গে যোগাযোগ করা কিংবা তার সঙ্গে একই পথে চলার কারণে কেউ বৈধ সামরিক লক্ষ্য হয়ে যায় না। মানবিক বহরকে লুটপাট থেকে রক্ষার জন্য নিয়োজিত নিরাপত্তাকর্মীরা অস্ত্র বহন করলেও শুধু সে কারণে তারা বৈধ লক্ষ্য হয়ে যান না।

ডব্লিউসিকে: ‘এটি সত্যকে বিকৃত করছে’

ইসরায়েলি সামরিক কৌঁসুলির সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ করেছে ডব্লিউসিকে। সংস্থাটি বলেছে, হামলার সময় তাদের কর্মীরা নিরস্ত্র ছিলেন এবং কারও জন্য কোনো হুমকি তৈরি করছিলেন না। তাদের গাড়িগুলো স্পষ্টভাবে ডব্লিউসিকের চিহ্ন বহন করছিল এবং ইসরায়েলি বাহিনী তাদের গতিবিধি, পরিচয় ও মানবিক মিশন সম্পর্কে আগে থেকেই জানত।

ডব্লিউসিকের অভিযোগ, ইসরায়েলি তদন্ত বিভিন্ন সময়ের ঘটনা একসঙ্গে মিশিয়ে এমন একটি বর্ণনা তৈরি করেছে, যা মূল ঘটনার দায়কে অন্যদিকে সরিয়ে দেয়।

সংস্থাটি আবারও স্বাধীন ও তৃতীয় পক্ষের তদন্তের দাবি জানিয়েছে।

২০২৪ সালের প্রথম দিকেই ডব্লিউসিকে স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছিল। তখন সংস্থাটি বলেছিল, তিনটি গাড়িই ডব্লিউসিকের চিহ্ন বহন করছিল, সবগুলোতেই বেসামরিক কর্মী ছিলেন এবং ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাদের চলাচলের সমন্বয় করা হয়েছিল।

তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র, এক মাইলের ব্যবধান

ঘটনাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো হামলার ধারাবাহিকতা।

ডব্লিউসিকের তিনটি গাড়িকে প্রায় এক মাইলের ব্যবধানে একাধিকবার আঘাত করা হয়। প্রথম হামলার পরও বেঁচে থাকা ব্যক্তিদের উদ্ধারের সুযোগ তৈরি হয়নি; পরবর্তী হামলায় বহরের অন্য গাড়িগুলোও ধ্বংস হয়।

ডব্লিউসিকের তথ্য অনুযায়ী, সংগঠনটির গাড়িগুলোতে থাকা কর্মীরা ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে সমন্বিত একটি এলাকায় চলাচল করছিলেন। তাদের বহর ডের আল-বালাহর একটি গুদাম থেকে খাদ্য সহায়তা নামিয়ে ফেরার সময় আক্রান্ত হয়। ওই অভিযানে ১০০ টনের বেশি মানবিক খাদ্য সহায়তা গাজায় পৌঁছেছিল।

মেন্ডেলকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ হিসেবে দেখানোর প্রশ্ন

নোচি মেন্ডেল গাজা যুদ্ধে এত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে বিরল একজন, যিনি তার কর্মকাণ্ডের কারণে বরখাস্ত হয়েছেন। ফলে ইসরায়েলি সামরিক কমান্ডের কিছু ব্রিফিংয়ে তাকে ‘বিচ্ছিন্ন’ বা ‘নিয়মভঙ্গকারী’ কর্মকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

তার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। মেন্ডেল একজন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী এবং ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে গাজায় মানবিক সহায়তার প্রবাহ সীমিত করার আহ্বান জানানো একটি চিঠিতে তার সই ছিল বলে প্রতিবেদন রয়েছে।

কিন্তু গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানের মূল প্রশ্ন হলো— মেন্ডেল যদি সত্যিই একজন ব্যতিক্রমী কর্মকর্তা হয়ে থাকেন, তাহলে একই পরিস্থিতিতে ৯০ শতাংশ কর্মকর্তা প্রথম হামলা চালাতেন বলে তার এক সহকর্মী কেন মনে করেন?

এখানেই ‘ব্যক্তিগত ভুল’ এবং ‘সিস্টেমের সমস্যা’র মধ্যে পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

গাজায় বেসামরিক মৃত্যুর বৃহত্তর প্রশ্ন

গার্ডিয়ান বলছে, ডব্লিউসিকে কর্মীদের হত্যার ঘটনাটি গাজায় বেসামরিক মৃত্যুর একটি বৃহত্তর চিত্রের অংশ হতে পারে।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ তথ্য অনুযায়ী, গাজা যুদ্ধে নিহতদের তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি বেসামরিক বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে বড় ধরনের ‘কল্যাটেরাল ড্যামেজ’ বা অনিচ্ছাকৃত বেসামরিক প্রাণহানি মেনে নেওয়া, বড় এলাকাকে পরিবর্তনশীল ‘ফ্রি-ফায়ার জোন’ হিসেবে বিবেচনা করা এবং ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবর্তন ঠেকাতে আবাসিক এলাকা ধ্বংস করার মতো কৌশলও ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

এই সবকিছুর সঙ্গে ‘ইনক্রিমিনেশন’ নীতির যোগসূত্রই গার্ডিয়ানের তদন্তের কেন্দ্রবিন্দু।

অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তিকে সরাসরি হামাসের যোদ্ধা হিসেবে শনাক্ত করার বদলে তার আচরণ, অবস্থান, যোগাযোগ বা আশপাশের ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হলে বেসামরিক মানুষও সামরিক লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় ঢুকে যেতে পারেন।

ডব্লিউসিকের সাত কর্মীর ক্ষেত্রে ঠিক এমনটাই ঘটেছিল কি না— গার্ডিয়ানের অনুসন্ধান সেই প্রশ্নের জোরালো ভিত্তি তুলে ধরেছে।

‘আবার হলেও একই কাজ করব’

সবচেয়ে বিতর্কিত বক্তব্যটি এসেছে হামলার নির্দেশদাতা নোচি মেন্ডেলের কাছ থেকে। তিনি বলেছেন, একই পরিস্থিতি আবার তার সামনে এলে তিনি একই সিদ্ধান্ত নেবেন।

মেন্ডেলের ভাষায়, তিনি হামাসকে পরাজিত করতে গিয়েছিলেন এবং ঘটনাটিকে তিনি একটি ‘বোকামিপূর্ণ পার্শ্বঘটনা’ হিসেবে দেখেন। এমনকি সাতজন ত্রাণকর্মীর মৃত্যুকেও তিনি ‘গুরুতর ঘটনা নয়’ বলে মন্তব্য করেছেন।

এই বক্তব্যই হয়তো পুরো ঘটনার সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সামনে আনে। যদি ডব্লিউসিকে কর্মীদের মৃত্যু কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ভুল হয়, তাহলে একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা কেন বলেন— একই ঘটনা আবার ঘটলেও তিনি একই কাজ করবেন?

আর যদি মেন্ডেলের সিদ্ধান্ত সত্যিই ইসরায়েলি বাহিনীর প্রচলিত ‘ইনক্রিমিনেশন’ পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্নটি আর সাতজন ত্রাণকর্মীর মৃত্যুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।

প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়— গাজায় কতজন বেসামরিক মানুষ এমন একটি ব্যবস্থার শিকার হয়েছেন, যেখানে কারও সঙ্গে কারও যোগাযোগ, একই জায়গায় থাকা কিংবা কোনো সশস্ত্র ব্যক্তির কাছাকাছি থাকার কারণেই তাকে ‘অপরাধী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে?

আর সেখানেই ডব্লিউসিকের সাত কর্মীর মৃত্যু একটি বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনার বদলে গাজা যুদ্ধে বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার পদ্ধতি নিয়ে আরও বড় বিতর্কের অংশ হয়ে ওঠে।

Ad
Ad
ad
ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

কলকাতায় হোটেল সংকট, বিপাকে চিকিৎসা নিতে যাওয়া বাংলাদেশিরা

চিকিৎসার জন্য কলকাতায় গিয়ে এবার নতুন সংকটে পড়েছেন বাংলাদেশি রোগী ও তাদের স্বজনেরা। একের পর এক হোটেল ও গেস্টহাউস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শহরটিতে কম খরচে থাকার জায়গা খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। কোথাও আশ্রয় না পেয়ে লাগেজ নিয়ে রাস্তার পাশে, ফুটপাতে এমনকি খোলা আকাশের নিচেও রাত কাটাতে হচ্ছে অনেককে।

১৩ ঘণ্টা আগে

শান্তি প্রস্তাব নিয়ে মস্কো ও কিয়েভে যাচ্ছেন ট্রাম্পের ২ দূত

রুশ বার্তা সংস্থা তাস জানিয়েছে, ৫ ও ৬ সেপ্টেম্বর প্রতিনিধি দলটি মস্কো ও কিইভ সফর করবে। সফরের শুরুতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করবেন তারা। পরে কিইভে গিয়ে ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে আলোচনায় বসবেন।

১৪ ঘণ্টা আগে

পুতিনকে সাময়িক যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব জেলেনস্কির

দীর্ঘ সাড়ে চার বছরের যুদ্ধ অবসানে সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির রূপরেখা তৈরি করতে ট্রাম্পের দুই বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফ শনিবার মস্কো এবং রবিবার কিয়েভ সফর করছেন। ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিশ্চিত করেছেন যে তাদের পৌঁছানো এবং আলোচনা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতেই এই সাময়িক উদ্যো

১৫ ঘণ্টা আগে

বলিভিয়ায় সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ: নিহত ১০, আহত অর্ধশতাধিক

প্রতিরক্ষামন্ত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, আহতদের মধ্যে ৫২ জন সাধারণ নাগরিক এবং ৬ জন সামরিক বাহিনীর সদস্য। তবে ভিয়াচার স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, নিহতের সংখ্যা ১৫ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। বিস্ফোরণের পরপরই ঘটনাস্থলে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং সামরিক ঘাঁটি থেকে ঘন কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়।

১৬ ঘণ্টা আগে
Advertisement