অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভে ডোভার বন্দর অবরুদ্ধ, রাস্তায় নামল মুখোশধারীরা

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১: ৩৫
শনিবার ডোভারে সড়ক অবরোধ করে রাখা বালাক্লাভা পরা বিক্ষোভকারীরা। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাজ্যের কেন্টে ডোভার বন্দরের সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে মুখোশধারী অভিবাসনবিরোধী একদল বিক্ষোভকারী। কালো পোশাক ও বালাক্লাভা পরে কয়েক ডজন মানুষ বন্দরমুখী সড়কে অবস্থান নিলে উভয় দিকের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে বন্দর এলাকায় কয়েক মাইল জুড়ে যানজট তৈরি হয় এবং ফেরি যাত্রীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।

গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়, শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) সকালে ডোভার বন্দর কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে ‘জনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তবে ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।

ডানপন্থি ও অভিবাসনবিরোধী গোষ্ঠী প্যাট্রিয়ট প্ল্যাটফর্ম এ বিক্ষোভের নেপথ্যে ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। ডানপন্থি কর্মী টমি রবিনসনও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিক্ষোভের ভিডিও শেয়ার করে অন্যদের সেখানে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।

ডোভারে সড়কে থেকে বন্দরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন মুখোশধারী ব্যক্তিরা। ছবি: সংগৃহীত
ডোভারে সড়কে থেকে বন্দরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন মুখোশধারী ব্যক্তিরা। ছবি: সংগৃহীত

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবিতে দেখা যায়, কালো পোশাক ও মুখোশ পরা বিপুলসংখ্যক মানুষ দলবদ্ধভাবে ডোভার বন্দরের দিকে হাঁটছেন। পরে তারা এ২০ সড়কে হাত ধরে মানবপ্রাচীর তৈরি করে যান চলাচল বন্ধ করে দেন।

বিক্ষোভকারীদের ‘স্টপ দ্য বোটস’ ও ‘ইংল্যান্ড টিল আই ডাই’ স্লোগান দিতে শোনা যায়। ছবিতে দেখা যায়, অবরোধের কারণে পণ্যবাহী ট্রাকগুলো সড়কে আটকে রয়েছে এবং আশপাশে পুলিশের গাড়ি অবস্থান করছে।

বিক্ষোভে ঠিক কতজন অংশ নিয়েছিলেন, তা পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি। একজন প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করেন, তিনি ৩০০ বা তারও বেশি মানুষকে সেখানে দেখেছেন। অন্যদিকে প্রেস অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, সেখানে কয়েক ডজন মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

বিক্ষোভের কারণে ডোভার বন্দরে ঢোকা ও বের হওয়ার এ২০ সড়কের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ন্যাশনাল হাইওয়েজের হিসাবে, এতে যানজট প্রায় চার মাইল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে এবং যাত্রীদের সর্বোচ্চ ৩০ মিনিট পর্যন্ত বিলম্বের মুখে পড়তে হয়।

স্থানীয়ভাবে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত হয়। ডোভার ওয়াটারফ্রন্ট পার্করানও বাতিল করা হয়। আয়োজকেরা জানান, বিক্ষোভের কারণে নির্ধারিত পথটি নিরাপদ ছিল না অথবা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল।

বন্দরে রাতের শিফটে কাজ করা কর্মীদের কেউ কেউ অবরোধের কারণে বের হতে পারছিলেন না বলেও স্থানীয় কাউন্সিলররা জানিয়েছেন। তবে দুপুরের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হয়। ডোভার বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, বিক্ষোভকারীরা সরে গেছেন এবং বন্দরের প্রবেশ ও বের হওয়ার সড়কগুলোতে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে।

বিক্ষোভের সঙ্গে প্যাট্রিয়ট প্ল্যাটফর্মের সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে। সংগঠনটি নিজেদের ‘নিজেদের মাতৃভূমির প্রতি প্রবল ভালোবাসা’সম্পন্ন একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তুলে ধরে।

ড্যানি টমো নামে পরিচিত সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ড্যানি থমাস শনিবার সকালে ডোভার থেকে লাইভ ভিডিও প্রকাশ করেন। এর আগে ২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক ভিডিওতে তিনি অনুসারীদের জানান, সরকারের কাছে একটি বার্তা পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। তিনি বলেন, খুব শিগগিরই এমন একটি বার্তা দেওয়া হবে, যাতে সরকার বুঝতে পারে তারা ‘লড়াই ছাড়া পিছিয়ে যাবে না।’

তার বক্তব্যে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন অংশে বড় ধরনের সংগঠিত আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বানও ছিল।

এদিকে ব্রিটিশ ডানপন্থি কর্মী টমি রবিনসন নামে পরিচিত স্টিফেন ইয়াক্সলি-লেনন বিক্ষোভের একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুনরায় পোস্ট করেন। তিনি একটি লাইভস্ট্রিমের দিকে অনুসারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, যেখানে দর্শকদের প্যাট্রিয়ট প্ল্যাটফর্মের দিকে নির্দেশ করা হচ্ছিল।

অন্য একটি পোস্টে রবিনসন বিক্ষোভকারীদের সমর্থনে আরও মানুষকে ডোভারে যাওয়ার আহ্বান জানান। তিনি দাবি করেন, ডোভারের বিভিন্ন স্থানে একযোগে বন্দর বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও জায়গায় এমন কর্মসূচি হতে পারে।

স্থানীয় রাজনীতিকদের প্রতিক্রিয়া

ডোভার অ্যান্ড ডিলের লেবার এমপি মাইক ট্যাপ বিক্ষোভকারীদের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বন্দর এলাকায় বিশৃঙ্খলা ও স্থানীয় পার্করান বাতিলের কথা উল্লেখ করে বলেন, ডোভারকে অচল করতে আসা লোকজনের কারণে তিনি বিরক্ত। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে আসার ঘটনা ৪০ শতাংশ কমেছে এবং সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করছে।

ডোভার জেলা পরিষদের কনজারভেটিভ গ্রুপের নেতা ক্রিস ভিনসনও ঘটনাটিকে ‘অবৈধ অভিবাসনবিরোধী’ বিক্ষোভ বলে মনে করছেন। তবে তার উদ্বেগ ছিল বিক্ষোভকারীদের পোশাক ও আচরণ নিয়ে।

ভিনসন বলেন, কালো সামরিক ধাঁচের পোশাক ও বালাক্লাভা পরা লোকজন গাড়ির পথ আটকে দিলে তা স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মধ্যে ভীতি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে পুলিশ আগে থেকে ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত না থাকায় স্থানীয় মানুষকে সতর্ক করার সুযোগও ছিল না।

স্থানীয় রিফর্ম ইউকে কাউন্সিলর পল কিংও বাসিন্দাদের বন্দর এলাকা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেন। তিনি জানান, তাকে বলা হয়েছে এটি ‘স্টপ দ্য বোটস’ বিক্ষোভ।

সরকারের কড়া প্রতিক্রিয়া

যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার অধিকার গণতন্ত্রের মৌলিক অংশ। তবে ডোভারে যে ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে এবং এর কারণে যাত্রীদের চলাচলে যে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে, সরকার তার নিন্দা করছে।

হোম অফিসের এক মুখপাত্র বলেন, বিক্ষোভের কারণে যারা ভোগান্তিতে পড়েছেন, তাদের হতাশা সরকার বুঝতে পারছে। একই সঙ্গে পুলিশ ও পরিবহন সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করে যাত্রী ও স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।

বিকেলের দিকে বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রবেশপথ আবার স্বাভাবিক হয়েছে এবং যান চলাচল অবাধে চলছে।

ফেরি যাত্রীদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা

বিক্ষোভের কারণে নির্ধারিত সময়ে বন্দরে পৌঁছাতে না পারা যাত্রীদের পরবর্তী ফেরিতে তুলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ফেরি অপারেটররা। ডিএফডিএস জানায়, বন্দরে প্রবেশের পথে যানজট সম্পর্কে তারা অবগত এবং যাত্রীরা বন্দরে পৌঁছানোর পর পরবর্তী যাত্রায় তাদের স্থান দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।

পিঅ্যান্ডও ফেরি জানিয়েছে, তাদের নির্ধারিত ফেরিগুলো চলাচল অব্যাহত ছিল। তবে যানজটের কারণে কেউ নির্ধারিত ফেরি মিস করলে তাকে পরবর্তী ফেরিতে নেওয়া হবে।

অভিবাসন ইস্যুতে নতুন উত্তেজনা

ডোভার যুক্তরাজ্যে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে ছোট নৌকায় প্রবেশকারী অভিবাসনপ্রত্যাশীদের অন্যতম প্রধান প্রবেশপথ। ফলে দেশটির অভিবাসননীতি ও ‘ছোট নৌকা’ সংকট নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কে শহরটি দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ। এই বিক্ষোভ সেই বিতর্ককে আবারও রাস্তায় নিয়ে এসেছে।

তবে এবারের ঘটনায় রাজনৈতিক বার্তার পাশাপাশি জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার প্রশ্নটিও সামনে এসেছে। মুখোশধারী বিক্ষোভকারীদের হঠাৎ করে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরমুখী সড়ক অবরোধ এবং কয়েক ঘণ্টার জন্য যাতায়াত ব্যাহত করার ঘটনায় স্থানীয় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

দিনের শেষ দিকে বন্দর স্বাভাবিক হলেও ঘটনাটি ব্রিটেনে অভিবাসনবিরোধী আন্দোলনের ক্রমবর্ধমান সংগঠিত রূপ এবং ডানপন্থি গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

Ad
Ad
ad
ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

কলকাতায় হোটেল সংকট, বিপাকে চিকিৎসা নিতে যাওয়া বাংলাদেশিরা

চিকিৎসার জন্য কলকাতায় গিয়ে এবার নতুন সংকটে পড়েছেন বাংলাদেশি রোগী ও তাদের স্বজনেরা। একের পর এক হোটেল ও গেস্টহাউস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শহরটিতে কম খরচে থাকার জায়গা খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। কোথাও আশ্রয় না পেয়ে লাগেজ নিয়ে রাস্তার পাশে, ফুটপাতে এমনকি খোলা আকাশের নিচেও রাত কাটাতে হচ্ছে অনেককে।

৮ ঘণ্টা আগে

শান্তি প্রস্তাব নিয়ে মস্কো ও কিয়েভে যাচ্ছেন ট্রাম্পের ২ দূত

রুশ বার্তা সংস্থা তাস জানিয়েছে, ৫ ও ৬ সেপ্টেম্বর প্রতিনিধি দলটি মস্কো ও কিইভ সফর করবে। সফরের শুরুতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করবেন তারা। পরে কিইভে গিয়ে ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে আলোচনায় বসবেন।

৮ ঘণ্টা আগে

পুতিনকে সাময়িক যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব জেলেনস্কির

দীর্ঘ সাড়ে চার বছরের যুদ্ধ অবসানে সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির রূপরেখা তৈরি করতে ট্রাম্পের দুই বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফ শনিবার মস্কো এবং রবিবার কিয়েভ সফর করছেন। ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিশ্চিত করেছেন যে তাদের পৌঁছানো এবং আলোচনা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতেই এই সাময়িক উদ্যো

১০ ঘণ্টা আগে

বলিভিয়ায় সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ: নিহত ১০, আহত অর্ধশতাধিক

প্রতিরক্ষামন্ত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, আহতদের মধ্যে ৫২ জন সাধারণ নাগরিক এবং ৬ জন সামরিক বাহিনীর সদস্য। তবে ভিয়াচার স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, নিহতের সংখ্যা ১৫ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। বিস্ফোরণের পরপরই ঘটনাস্থলে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং সামরিক ঘাঁটি থেকে ঘন কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়।

১১ ঘণ্টা আগে
Advertisement