নির্বাচনের আগে তরুণ ভোটারদের নিয়ে চাপে ইতালির প্রধানমন্ত্রী মেলোনি

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২৬, ১৪: ৩৭
রাজধানী রোমে ‘নো-মেলোনি ডে’ সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছেন তরুণ বিক্ষোভকারীরা। ১৪ নভেম্বর ২০২৫। (ইনসেটে) জর্জিয়া মেলোনি। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকারের প্রতি তরুণ ভোটারদের সমর্থন ক্রমেই কমছে। দেশটির জনমত জরিপে উঠে এসেছে এমন চিত্র। আগামী বছর অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনের আগে এই প্রবণতা মেলোনির জন্য বড় ধরনের সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রয়টার্সের খবরে বলা হয়, ২০২২ সালে ক্ষমতায় আসার পর তরুণদের জন্য অর্থনৈতিক সুযোগ বাড়াতে মেলোনি সরকার তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এর পরিবর্তে সরকার আইনশৃঙ্খলা জোরদারে একের পর এক কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে, যার প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে তরুণদের ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি পড়েছে।

ফলে ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সী ভোটারদের মধ্যে সরকারের প্রতি অনাগ্রহ তৈরি হয়েছে। ২০২৭ সালের জাতীয় নির্বাচনে এই ভোটাররা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেন। আগামী নির্বাচন মেলোনির ডানপন্থি জোট ও মধ্য-বামপন্থি বিরোধী জোটের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের দিকে এগোচ্ছে।

জনমত জরিপ সংস্থা ইউট্রেন্ডের প্রধান লোরেঞ্জো প্রেগলিয়াসকো রয়টার্সকে বলেন, ‘তরুণ ভোটাররা স্পষ্টভাবেই মধ্য-বামপন্থিদের দিকে ঝুঁকছেন।’

মেলোনির জোটে রয়েছে তার দল ব্রাদার্স অব ইতালি (এফডিআই), মাত্তেও সালভিনির লিগ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানির তুলনামূলক মধ্যপন্থি দল ফোরজা ইতালিয়া। প্রেগলিয়াসকো জানান, ৩৫ বছরের কম বয়সী ভোটারদের মধ্যে এখন এই জোটের সমর্থন ৩০ শতাংশেরও কম।

রোমে ‘নো-মেলোনি ডে’ সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সামরিক হেলমেট পরা একটি ব্যানার প্রদর্শন করছেন তরুণ বিক্ষোভকারীরা। ১৪ নভেম্বর ২০২৫। ফাইল ছবি: রয়টার্স
রোমে ‘নো-মেলোনি ডে’ সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সামরিক হেলমেট পরা একটি ব্যানার প্রদর্শন করছেন তরুণ বিক্ষোভকারীরা। ১৪ নভেম্বর ২০২৫। ফাইল ছবি: রয়টার্স

অন্যদিকে একই বয়সী ভোটারদের মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশের সমর্থন রয়েছে বিরোধী জোটের প্রতি। এই জোটে রয়েছে প্রধান দল ডেমোক্রেটিক পার্টি (পিডি), ৫-স্টার মুভমেন্ট এবং লেফট-গ্রিন অ্যালায়েন্স (এভিএস)।

২০২৩ সালে মেলোনির জনপ্রিয়তা যখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে ছিল, তখন ইউট্রেন্ডের জরিপে দেখা যায়, তরুণদের মধ্যে শুধু তার দল এফডিআইয়ের যে পরিমাণ সমর্থন ছিল, এখন পুরো ক্ষমতাসীন জোটের সমর্থনও প্রায় ততটাই।

ইউরোপের অন্যান্য দেশের মতো ইতালির তরুণ ভোটারদের মধ্যেও নারী-পুরুষের ভোটের ব্যবধান দেখা যাচ্ছে। গত বছর মিলানের বোক্কোনি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা যায়, পুরুষরা ডানপন্থিদের দিকে বেশি ঝুঁকছেন, আর নারীদের সমর্থন বেশি বামপন্থিদের প্রতি। গবেষণাটি করা হয়েছিল জনমত জরিপ সংস্থা এসডব্লিউজির তথ্যের ভিত্তিতে।

দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য দেখা গেছে মেলোনির এফডিআইয়ের সমর্থনে। ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী পুরুষদের মধ্যে দলটির সমর্থন ১৫ শতাংশ, যেখানে নারীদের মধ্যে তা মাত্র ৪ দশমিক ২ শতাংশ। অন্যদিকে ৩০ বছরের কম বয়সী নারীদের ১৮ শতাংশ ৫-স্টার মুভমেন্টকে সমর্থন করেন। পুরুষদের মধ্যে দলটির সমর্থন মাত্র ৫ দশমিক ১ শতাংশ।

তরুণদের সুযোগ বাড়াতে সংস্কারের ঘাটতি

রোমের লুইস বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক লোরেঞ্জো দে সিও বলেন, তরুণদের মধ্যে সরকারের প্রতি বিরূপ মনোভাবের প্রধান কারণ অর্থনৈতিক নীতিতে সরকারের নিষ্ক্রিয়তা। তিনি বলেন, ‘মেলোনি কোনো উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সংস্কার করেননি।’

অধ্যাপক লোরেঞ্জো আরও বলেন, ‘বর্তমান ব্যবস্থায় যারা সুবিধা পান, তাদের জন্য এটি ঠিক আছে। কিন্তু যারা এই ব্যবস্থায় সবচেয়ে কম সুরক্ষিত, তাদের জন্য এটি খুবই খারাপ। আর সেই মানুষদের মধ্যে তরুণরাই বেশি।’

এই প্রতিবেদন নিয়ে রয়টার্সের করা প্রশ্নের জবাব দেয়নি মেলোনির কার্যালয়।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের কর্মসংস্থানের হার ২১ দেশের ইউরোজোনের মধ্যে ইতালিতেই সবচেয়ে কম। একই সঙ্গে জোটের প্রায় সব অংশীদার দেশের তুলনায় শিক্ষা খাতে ইতালির বিনিয়োগও কম।

ইতালির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জার্মানিতে একজন তরুণ স্নাতক গড়ে একজন ইতালীয় সমবয়সী স্নাতকের তুলনায় ৮০ শতাংশ বেশি আয় করেন। এ ছাড়া প্রতি বছর কয়েক হাজার তরুণ ইতালীয় উন্নত ভবিষ্যতের আশায় দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যান।

ইউট্রেন্ডের তথ্য বলছে, ৩৫ বছরের কম বয়সী ভোটারদের মধ্যে সরকারের প্রতি সমর্থনের হার মাত্র ২৫ শতাংশ। পুরো জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই হার ৩৫ শতাংশ।

নিজের রাজনৈতিক আদর্শের শিবিরেও তরুণ ভোটারদের নিয়ে মেলোনি প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়ছেন। সাবেক সেনা কর্মকর্তা রবার্তো ভান্নাচ্চি ফেব্রুয়ারিতে গঠন করেছেন কট্টর ডানপন্থি বিরোধী দল ন্যাশনাল ফিউচার। দলটি এরই মধ্যে প্রায় ৭ শতাংশ সমর্থন পাচ্ছে।

জরিপগুলোতে দেখা গেছে, দলটির সবচেয়ে বেশি সমর্থন মধ্যবয়সী পুরুষদের মধ্যে। তবে অভিবাসনবিরোধী শহুরে তরুণদের মধ্যেও ভান্নাচ্চির উল্লেখযোগ্য সমর্থন রয়েছে। নিজ নিজ দেশে হাজার হাজার অভিবাসীকে ফেরত পাঠানোর প্রতিশ্রুতির কারণে এসব তরুণ তার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন।

প্রেগলিয়াসকো বলেন, ‘ক্ষমতাসীন দলগুলোর তুলনায় তরুণ ভোটারদের মধ্যে ভান্নাচ্চির সমর্থন নিশ্চিতভাবেই বেশি ভালো অবস্থায় রয়েছে।’

আইনশৃঙ্খলায় কঠোর পদক্ষেপ

সরকারের নিরাপত্তাবিষয়ক পদক্ষেপের প্রভাব বন্দি থেকে শুরু করে অভিবাসী— বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের ওপর পড়েছে। তবে এসব পদক্ষেপের কেন্দ্রবিন্দুতে অনেক সময়ই তরুণদের দেখা গেছে।

মেলোনি ক্ষমতায় আসার পর প্রথম আইনগত ডিক্রির মাধ্যমে রেভ পার্টির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এরপর সরকার ‘লাইট’ বা অপেক্ষাকৃত হালকা ধরনের গাঁজার উৎপাদন, রাস্তায় বিক্ষোভ, অবৈধভাবে ভবন দখল করে বসবাস এবং কিশোর অপরাধের বিরুদ্ধে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়।

গত বছরের নভেম্বরে ‘নো মেলোনি ডে’ নামে দেশব্যাপী এক শিক্ষার্থী বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। এতে হাজারো মানুষ নিরাপত্তাবিষয়ক ডিক্রি, শিক্ষা খাতে ব্যয় কমানো এবং গাজায় ইসরায়েলের প্রতি মেলোনির সমর্থনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেন।

সরকারের সর্বশেষ পদক্ষেপগুলোর একটি হলো গত মাসে অপ্রাপ্তবয়স্কদের অপরাধের ক্ষেত্রে দায়বদ্ধতার নিয়ম পরিবর্তনের জন্য একটি বিল উপস্থাপন করা।

নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, ১৪ থেকে ১৭ বছর বয়সী কেউ অপরাধ করলে তাকে পুরোপুরি দায়ী হিসেবে বিবেচনা করা হবে, যতক্ষণ না বিপরীত কিছু প্রমাণিত হয়। বর্তমানে কোনো কিশোর তার কাজের পরিণতি বুঝতে সক্ষম ছিল— এটি বিচারককে প্রমাণ করতে হয়। নতুন প্রস্তাবে সেই নিয়ম বদলে যাবে।

বন্দিদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন অ্যান্টিগোনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে কিশোর অপরাধীদের জন্য শাস্তি আরও কঠোর করার পর দেশটিতে কিশোর বন্দিদের সংখ্যা ৫০ শতাংশ বেড়েছে।

তবে একদিকে কিশোরদের অপরাধের জন্য পুরোপুরি দায়ী করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে সরকারের আরেক পদক্ষেপের আওতায় স্কুলে তাদের যৌনশিক্ষা দেওয়ার জন্য অভিভাবকের লিখিত অনুমতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

মেলোনির সমর্থিত গণভোটে তরুণদের ভোটে ধাক্কা

তরুণদের মধ্যে মেলোনির জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার বিষয়টি অনেক সময় ভোটারদের অনাগ্রহের কারণে আড়ালে থেকেছে। ইতালিতে ৩৫ বছরের কম বয়সীদের ভোট দেওয়ার হার সাধারণত কম। সরকারের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করতে ভোট দিয়ে বিরোধিতা করার বদলে তারা অনেক সময় ভোট না দেওয়াকেই বেছে নেন।

তবে মার্চে বিচারব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে অনুষ্ঠিত এক গণভোটে হঠাৎ এই প্রবণতার পরিবর্তন দেখা যায়। ওই সংস্কারের পক্ষে মেলোনি জোরালোভাবে অবস্থান নিয়েছিলেন।

গণভোটে ৩৫ বছরের কম বয়সী ভোটারদের প্রায় ৬৭ শতাংশ ভোট দেন। তাদের মধ্যে ৬০ শতাংশ সংস্কারের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। অন্যদিকে সব বয়সী ভোটারের মধ্যে ভোট দেওয়ার হার ছিল ৫৯ শতাংশ, যাদের ৫৪ শতাংশ প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেন।

তরুণ ভোটারদের নিয়ে উদ্বেগ বুঝতে পেরে গুরুত্বপূর্ণ ওই গণভোটের কয়েক দিন আগে মেলোনি জনপ্রিয় এক র‍্যাপারের উপস্থাপনায় একটি অনানুষ্ঠানিক পডকাস্টে অংশ নেন। তরুণ ভোটারদের কাছে পৌঁছাতেই তিনি ওই উদ্যোগ নেন।

অধ্যাপক লোরেঞ্জো দে সিও বলেন, ‘গণভোট দেখিয়েছে, তরুণরা যদি ব্যাপকভাবে ভোট দেন, তাহলে তারা কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারেন। পরবর্তী নির্বাচনে তারা নির্ণায়ক হয়ে উঠতে পারেন।’

Ad
Ad
ad
ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিচুক্তি নিয়ে কোনো অগ্রগতি নেই: ইরান

বুধবার (১২ আগস্ট) রয়টার্সের খবরে বলা হয়, ইরানি ওই কর্মকর্তার মন্তব্য সংকটের দ্রুত সমাধানের সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর মধ্যে মঙ্গলবার ওই অঞ্চলে জাহাজ চলাচলে পৃথক হামলার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে। এতে তেলের দামও বেড়েছে।

২১ ঘণ্টা আগে

লোহিত সাগরে জাহাজে হুতিদের হামলা, ৩ পাকিস্তানিসহ নিহত ৬

লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলায় একটি পণ্যবাহী জাহাজের চার নাবিক নিহত হয়েছেন। পরে উদ্ধারকাজে গিয়ে হুতিবিরোধী দুই ইয়েমেনি উদ্ধারকর্মীও নিহত হন। সব মিলিয়ে এ ঘটনায় ৩ পাকিস্তানিসহ ছয়জন নিহত এবং অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন।

১ দিন আগে

ইরানের পরমাণু স্থাপনায় 'রেকি' করার দাবি সাবেক মোসাদ প্রধানের

সম্মেলনে ইয়োসি কোহেন বলেন, "স্থাপনাটি সম্পর্কে বিস্তারিত ও নিখুঁত তথ্য পাওয়ার লক্ষ্যেই আমরা ফোরদো পারমাণবিক স্থাপনাটিতে বারবার পরিদর্শন চালিয়েছি।" তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত কোহেন ঠিক কখন এসব সফর হয়েছিল বা গোয়েন্দারা কীভাবে সেখানে প্রবেশ করেছিল, সে বিষয়ে

১ দিন আগে

মাঝ আকাশে ৩০০ ফুট পতন: ভারতীয় সেই পাইলটের শরীরে গাঁজা শনাক্ত

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ফার্স্ট অফিসারের পরীক্ষার ফল নেগেটিভ এলেও ক্যাপ্টেন দুটি পরীক্ষাতেই অকৃতকার্য হন। বিশেষ করে দ্বিতীয় পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া যায়, তিনি গাঁজা সেবন করেছিলেন। তবে তিনি কখন বা কোথায় গাঁজা সেবন করেছিলেন, সে বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি।

১ দিন আগে