পুতিনের ইউক্রেন যুদ্ধ ‘শেষের ইঙ্গিতে’র নেপথ্যে কী?

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
রোববার রাশিয়ার বিশ্বযুদ্ধে বিজয় দিবস উদ্‌যাপনের অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: রয়টার্স

ইউক্রেনের সঙ্গে রাশিয়ার যুদ্ধ শেষের দিকে এগোচ্ছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। পাশাপাশি এ যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার জন্য পশ্চিমাদের দায়ী করে তিনি এ-ও বলেছেন, কিয়েভকে সামরিক সহায়তা দিয়ে পশ্চিমারা সংঘাতকে টিকিয়ে রেখেছে। তবে সংঘাতের অবসান ঘটাতে মস্কো অথবা নিরপেক্ষ কোনো ভেন্যুতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে সরাসরি বৈঠকে বসতে প্রস্তুত রয়েছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।

আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, রোববার (১০ মে) মস্কোতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে রাশিয়ার বিজয়বার্ষিকীর এক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে পুতিন এ কথা বলেন। চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলমান এই যুদ্ধে এই প্রথম ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের কথা বললেন।

পুতিনের যখন সংঘাত অবসানের কথা বলছেন, ঠিক তখন রাশিয়া ও ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে তিন দিনের যুদ্ধবিরতিতে রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবন্দি বিনিময় নিয়েও আলোচনা চলছে। তবে এর মধ্যেই দুপক্ষের পালটাপালটি হামলাও অব্যাহত রয়েছে। রোববার ইউক্রেনের কর্মকর্তারা জানান, রাশিয়ার হামলায় তাদের অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় প্রায় দেড় শ সম্মুখযুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে বলেও জানিয়েছেন তারা।

যুদ্ধে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে বিস্তৃত পরিসরে শান্তি আলোচনার প্রক্রিয়ায়ও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়। তবে এ যুদ্ধে ইউক্রেনের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, প্রবল চাপের মুখে পড়েছে রাশিয়ার অর্থনীতিও। ফলে দুপক্ষের ওপরই যুদ্ধ শেষ করার চাপ বাড়ছে।

এ পরিস্থিতিতে রোববার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পুতিন বলেন, ‘আমার মনে হয়, বিষয়টি শেষের দিকে এগোচ্ছে।’ তবে দুপক্ষের মধ্যে চুক্তির শর্তাবলি চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ার পরই তিনি এ বৈঠকে বসতে চান, যেন ওই বৈঠক যুদ্ধের অবসানের ঘোষণার আনুষ্ঠানিকতায় রূপ নেয়। তিনি বলেন, ‘এটি হওয়া উচিত চূড়ান্ত ধাপ, আলোচনার প্রক্রিয়া নয়।’

এর আগে ২০২৫ সালের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দুপক্ষকে নিয়ে আলোচনায় বসার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ওই সময় পুতিন ও জেলেনস্কির সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন ট্রাম্প। কিন্তু ক্রেমলিন প্রত্যাখ্যান করায় ত্রিপাক্ষিক বৈঠক আর সম্ভব হয়নি।

কেবল ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধের স্থায়ী অবসান নয়, ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কও নতুন করে ঝালাই করতে আগ্রহী রুশ প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, ইউরোপের সঙ্গে নতুন নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে আলোচনা করতেও তিনি প্রস্তুত। এ ক্ষেত্রে তিনি বসতে চান জার্মানির সাবেক চ্যান্সেলর গেরহার্ড শ্রোয়েডার, যার সঙ্গে পুতিনের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে জার্মানিতে অভিযোগ রয়েছে দীর্ঘদিন ধরেই।

ইউরোপের সঙ্গে নিরাপত্তা চুক্তিকে রাশিয়া বিশেষভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে। কারণ রাশিয়া মনে করে, পশ্চিমা দেশগুলো ন্যাটোর সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাশিয়াকে ঘিরে ফেলতে চেয়েছে। ইউক্রেনও তাদের সে পরিকল্পনার অংশ ছিল। সে কারণেই ইউক্রেনের বিরুদ্ধে এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়াতে বাধ্য হয়েছে রাশিয়া।

পুতিন বলেন, তারাই রাশিয়ার সঙ্গে সংঘাত বাড়াতে শুরু করেছিল, যা এখনো চলছে। পশ্চিমা দেশগুলো মাসের পর মাস অপেক্ষা করেছে, যেন রাশিয়া পরাজয়ের মুখে পড়ে এবং রাষ্ট্র হিসেবে ভেঙে পড়ে। কিন্তু তা ঘটেনি। এরপর তারা সেই একই মানসিকতায় আটকে গেছে, এখন আর সেখান থেকে বের হতে পারছে না।

পুতিন নিজ মুখে যুদ্ধের অবসানে আগ্রহের কথা জানালেও সে বক্তব্যকে সত্যি সত্যি যুদ্ধের অবসানের ইঙ্গিত হিসেবে দেখতে নারাজ ব্রিটিশ থিংক ট্যাংক চ্যাথাম হাউজের গবেষক কিয়ার জাইলস। আল জাজিরাকে তিনি বলেন, পুতিনের এ বক্তব্যকে সরাসরি যুদ্ধের সমাপ্তির সংকেত হিসেবে না দেখে বৈশ্বিক ‘আশা ও আশাবাদে’র প্রতিফলন হিসেবে দেখা উচিত। পুতিনের বক্তব্যকে এমনভাবে নেওয়া ঠিক হবে না যে যুদ্ধ সত্যিই শেষ হতে যাচ্ছে।

জাইলস বলেন, সবচেয়ে ভালো যে সম্ভাবনাটি আমরা কল্পনা করতে পারি, তা হলো— পুতিন হয়তো এখন বুঝতে শুরু করেছেন যে রাশিয়া বাস্তবে যুদ্ধ জিতছে না। সে কারণে তিনি হয়তো আগের তুলনায় যুদ্ধ সাময়িকভাবে স্থগিত করতে বেশি আগ্রহী হতে পারেন। কারণ, আগে তিনি ট্রাম্পের সব শান্তি উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তখন তার বিশ্বাস ছিল, যুদ্ধ চালিয়ে গেলে যুদ্ধবিরতির চেয়ে রাশিয়া বেশি লাভবান হবে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধই সবচেয়ে বড় প্রাণঘাতী সংঘাত। এ যুদ্ধে দুপক্ষের কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। পূর্ব ইউক্রেনের বিশাল এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাসহ যুদ্ধের খরচ বহন করতে গিয়ে রাশিয়াকেও অর্থনৈতিক দিক থেকে তীব্র চাপের মুখে পড়তে হয়েছে।

এমন অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ফের রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে সমঝোতার উদ্যোগ নিয়েছে। গত শুক্রবার ট্রাম্প প্রকাশ্যে সর্বশেষ দুই দেশের মধ্যে তিন দিনের যুদ্ধবিরতিকে সমর্থন দিয়ে বলেন, এটি যুদ্ধ সমাপ্তির সূচনা হতে পারে।

পুতিন ও ট্রাম্পের এমন আশাবাদের মধ্যেও রাশিয়া-ইউক্রেনের মধ্যে সমঝোতা নিয়ে বিশ্লেষক জাইলসের সতর্ক প্রতিক্রিয়া অস্বাভাবিক নয়। কারণ এখনো দুপক্ষের মধ্যে কিছু বিষয় নিয়ে ন্যূনতম সমঝোতার কোনো লক্ষ্মণ দৃশ্যমান নয়।

রাশিয়া এখনো পুরো ডনবাস অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে চায়। ইউক্রেনের ন্যাটো সদস্যপদেরও তীব্র বিরোধী তারা। অন্যদিকে কিয়েভ তাদের কোনো ভূখণ্ডই ছাড়তে রাজি নয়। একই সঙ্গে তারা যেকোনো চুক্তির অংশ হিসেবে নিরাপত্তা গ্যারান্টিও দাবি করছে।

এসব ইস্যু নিয়ে এর আগে নানা প্রক্রিয়ায় আলোচনা হলেও তাতে দুপক্ষের কেউই ছাড় দিতে রাজি হয়নি। ফলে জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে পুতিনের যুদ্ধ শেষের ইঙ্গিত কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

চীন সফরে যাচ্ছেন ট্রাম্প, জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে ইরান-তাইওয়ান-বাণিজ্যসহ যা কিছু আলোচনায়

মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ট্রাম্প বেইজিং পৌঁছাবেন বুধবার (১২ মে)। পরের দুই দিন বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার জিনপিংয়ের সঙ্গে তার বৈঠকের কথা রয়েছে। ২০১৭ সালের পর এটিই হবে ট্রাম্পের প্রথম চীন সফর।

১১ ঘণ্টা আগে

ইরানের জবাব ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’, প্রত্যাখ্যান ট্রাম্পের

মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন অবস্থানে প্রায় ১০ সপ্তাহ ধরে চলা এই সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল চালু না-ও হতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি ল্র বাজারে, বেড়ে গেছে তেলের দাম।

১৬ ঘণ্টা আগে

হান্টাভাইরাস সংক্রমণ, ডাচ প্রমোদতরি থেকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে যাত্রীদের

স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যাত্রীদের জাতীয়তা অনুযায়ী আলাদা দলে ভাগ করে তীরে নেওয়া হচ্ছে। এরপর বাসে করে তাদের স্থানীয় বিমানবন্দরে নেওয়া হবে। সেখান থেকে চার্টার বিমানে করে পাঠানো নিজ নিজ দেশে।

১ দিন আগে

যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবের জবাব দিল ইরান

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ইরনা লিখেছে, ‘প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, আলোচনার এই পর্যায়ের মূল লক্ষ্য হবে এই অঞ্চলের যুদ্ধ বন্ধ করা।’

১ দিন আগে