সপ্তাহ পেরিয়ে ইরান যুদ্ধ, সামরিক-রাজনৈতিক ঝুঁকির মুখে ট্রাম্প

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
ইরান যুদ্ধ নিয়ে সামরিক-রাজনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রতীকী ছবি

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধের এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। এর মধ্যে হামলার শিকার হয়ে মারা গেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। স্থল, নৌ ও আকাশপথে বড় বড় হামলায় ইরানকে কোনঠাসা করার প্রায় সব চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েল। তবে ‘কাঙ্ক্ষিত’ ফলাফল এখনো আসেনি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে।

এখন পর্যন্ত এসব হামলায় মাথানত করেনি ইরান। দেশটির প্রেসিডেন্টসহ নেতৃত্বস্থানীয় সবাই স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, ইরান কারও কাছে আত্মসমর্পণ করবে না। উলটো ইসরায়েলে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইরান। শুধু তাই নয়, মধ্যপ্রাচ্যে যেসব দেশে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে, তাদের কাউকেই হামলা ছেড়ে ছাড় দেয়নি।

চলমান পরিস্থিতিতে গোটা মধ্যপ্রাচ্যই রীতিমতো জ্বলছে যুদ্ধের আগুনে। ইরান যুদ্ধ ক্রমেই রূপ নিতে শুরু করেছে আঞ্চলিক সংঘাতে। এর সঙ্গে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ বৈশ্বিক জ্বালানি খাতকেও অস্থিরতার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

সার্বিক চিত্র বলছে, এক সপ্তাহ পেরিয়ে গিয়ে ইরান যুদ্ধের সূত্র ধরে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে উঠেছে। ফলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও একের পর এক নতুন ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ অবস্থায় শেষ পর্যন্ত ইরানে সামরিক সাফল্য অর্জন করা গেলেও তাকে স্পষ্ট কোনো ভূরাজনৈতিক বিজয়ে রূপ দেওয়া ট্রাম্পের জন্য সহজ হবে না।

শুধু তাই নয়, বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও গভীরভাবে সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে হতে পারে, যার অনেক পরিণতি শেষ পর্যন্ত হয়তো আর ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না।

যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা

হোয়াইট হাউজে প্রথম মেয়াদের মতো দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসেও ট্রাম্প সাধারণত দ্রুত ও সীমিত সামরিক অভিযানের কৌশল অনুসরণ করেছেন। উদাহরণ হিসেবে বিশ্লেষকেরা উল্লেখ করছেন গত ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলায় আচমকা সামরিক অভিযান ও জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় এককালীন হামলার ঘটনা দুটিকে।

ইরানের সঙ্গে সেবারের সংঘাতটি ১২ দিন স্থায়ী হয়েছিল। কিন্তু ইরানে এবার যে যুদ্ধ চলছে, তার চিত্র আগের দুটি ঘটনা থেকে অনেকটাই ভিন্ন। এ যুদ্ধে এখন পযন্ত পরিণতির কোনো আভাস নেই। বরং এ যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়ে পড়ার সব ধরনের লক্ষ্মণই প্রকাশিত।

ওয়াশিংটনের জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গবেষক লরা ব্লুমেনফেল্ড বলেন, ‘ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এতে ট্রাম্প শুধু আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাই নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের সম্ভাবনাকেও ঝুঁকিতে ফেলছেন।’

কেন এই যুদ্ধ?

এবারের নির্বাচনি প্রচারের সময় থেকেই ট্রাম্প বলে আসছিলেন, তিনি যুদ্ধ চান না, শান্তি চান। বরং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতিই তিনি দিয়ে এসেছেন ভোটের প্রচারের পুরোটা সময়। ভোটে জিতে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরও তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে ‘অর্থহীন সামরিক হস্তক্ষেপ’ থেকে দূরে রাখবেন।

কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, ট্রাম্প তার দেওয়া কথা ধরে রাখতে পারেননি। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, ইরানের বিরুদ্ধে তিনি এমন এক যুদ্ধ চালাচ্ছেন যার নির্দিষ্ট পরিণতি বা কৌশলগত লক্ষ্য পুরোপুরি পরিষ্কারই নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র উদ্দেশ্য সম্পর্কে ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের বক্তব্য বারবার পরিবর্তিত হয়েছে। অথচ ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর এটিই যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান। এমন একটি কর্মকাণ্ডের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য স্পষ্ট না থাকা নানামুখী প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র আনা কেলি অবশ্য এমন সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি দাবি করেন, ইরান যুদ্ধ থেকে ট্রাম্পের লক্ষ্য স্পষ্ট—

  • ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও উৎপাদন সক্ষমতা ধ্বংস করা;
  • ইরানের নৌ বাহিনীকে অকার্যকর করে দেওয়া;
  • আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র দেওয়ার সক্ষমতা বন্ধ করা; এবং
  • ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না দেওয়া।

আনা কেলির এমন দাবির সঙ্গে আবার একমত নন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এবং মার্কিন সেনাদের হতাহতের সংখ্যা বাড়লে এর রাজনৈতিক প্রভাবও বাড়তে পারে। তখন ট্রাম্প এ যুদ্ধ নিয়ে কী বলবেন, তা নিয়ে সংশয় জানিয়েছেন তারা।

‘মহান আমেরিকা’র সমর্থন এখনো টিকে আছে

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এর আগের এক জরিপে উঠে এসেছে, ইরান যুদ্ধকে সমর্থন দেওয়া মার্কিন নাগরিকের সংখ্যা এক-চতুর্থাংশেরও কম। এমনকি ট্রাম্পের অনেক সমর্থকও বিদেশে এমন সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করছেন। তবে ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ স্লোগানে যারা গভীরভাবে বিশ্বাসী, তাদের বড় অংশ এখনো ইরান ইস্যুতে তার পাশে রয়েছেন।

রিপাবলিকান কৌশলবিদ ব্রায়ান ডার্লিং বলেন, আমেরিকান জনগণ ইরাক ও আফগানিস্তানের ভুলের পুনরাবৃত্তি চায় না। ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ সমর্থকরা এখন দুই ভাগে বিভক্ত— এক দল নতুন যুদ্ধ না করার প্রতিশ্রুতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে, অন্য দল ট্রাম্পের বিচারবুদ্ধির ওপর আস্থা রাখছে।

‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ নীতিতে বিশ্বাসীদেরও কিছু অংশের যুদ্ধের বিরোধিতা থেকে ট্রাম্পকে বার্তা নিতে বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এই সমর্থনে ফাটল ধরলে তা নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।

ইরানের শাসনব্যবস্থায় ‘হস্তক্ষেপ’ নিয়েও দ্বিধাবিভক্তি

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে ‘নিকৃষ্টতম ব্যক্তি’ অভিহিত করে ইরানবাসীকে তার শাসন থেকে ‘মুক্তি’ দেওয়ার কথা ট্রাম্প বারবারই বলেছেন। ইরানে হামলার পেছনে তাই দেশটির শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনও ট্রাম্পের বড় লক্ষ্য, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সন্দেহ নেই।

কিন্তু অন্য এক দেশের শাসনব্যস্থা পরিবর্তনে ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের এমন ‘হস্তক্ষেপ’ বিশ্লেষকদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এ নিয়ে দ্বিধাবিভক্তি দেখা গেছে মার্কিনিদের মধ্যেও। অনেক মার্কিনিই খোলাখুলি জানিয়েছেন, অন্য দেশের শাসনব্যবস্থায় এ ধরনের হস্তক্ষেপ গণতন্ত্রের মৌলিক চেতনার পরিপন্থি।

সংঘাতের শুরুদেই ট্রাম্প ইরানের শাসনব্যবস্থা উৎখাতের সম্ভাবনার কথা বলেন এবং অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ উসকে দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। পরে আবার তিনি সে অবস্থান থেকে কিছুটা সরে যান।

সে অবস্থানও ধরে রাখেননি ট্রাম্প। রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরানের পরবর্তী নেতা নির্বাচনে তিনি ভূমিকা রাখতে পারেন। একই সঙ্গে তিনি ইরানি কুর্দি বিদ্রোহীদের হামলা চালানোর আহ্বান জানান। পরদিন আবার সামাজিক মাধ্যমে ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ দাবি করেন।

যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ছে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানকে ধরাশায়ী করতে একের পর এক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, ইরানও তখন প্রত্যাঘাতে পিছিয়ে নেই। প্রথম দিনের মতো মাত্রায় না হলেও ইসরায়েলে হামলা চালিয়েই যাচ্ছে ইরান। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশে মার্কিন ঘাঁটিয়ে রয়েছে, তার সবগুলোতেই হামলা অব্যাহত রেখেছে।

আল জাজিরার সবশেষ খবর বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের ৯টি দেশে এখন পর্যন্ত হামলা চালিয়েছে ইরান। অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমেই যুদ্ধের বিস্তৃতি ঘটানোর চেষ্টায় রয়েছে দেশটি। এর লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর চাপ বাড়ানো।

এ পরিস্থিতিতে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহও ইরানকে সমর্থন দিয়ে নতুন করে ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু করেছে। তাদের জবাব দিতে ইসরায়েল হামলা চালাচ্ছে লেবাননে। যে কেউ ইরানকে সমর্থন দিলে তাদেরও হামলার শিকার হতে হবে বলে হুমকি দিয়ে রেখেছে ইসরায়েলি বাহিনী।

যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত ও বিস্তৃত হচ্ছে, এতে হতাহতের সংখ্যাও বাড়ছে। এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ছয়জন সেনা নিহত হয়েছেন। তবে ট্রাম্প হতাহতের সম্ভাবনাকে খুব বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন না। টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘হতে পারে… যেমন বলেছি, কিছু মানুষ মারা যাবে।’

সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জনাথন পানিকফ অবশ্য হতাহতের সংখ্যাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। এ সংখ্যা যুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণ করবে বলেও মনে করেন। পানিকফ বলেন, ‘মার্কিন হতাহতের সংখ্যা বাড়লে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার চাপ তৈরি হবে। আর ইরান ঠিক সেটিই চায়।’

ভেনেজুয়েলার অভিজ্ঞতা কি ভুল?

গত জানুয়ারিতে এক বিশেষ অভিযানে মার্কিন বিশেষ বাহিনী ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রে। এতে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান ছাড়াই দেশটির তেল সম্পদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়।

অনেক বিশ্লেষকের ধারণা, ট্রাম্প হয়তো ভেবেছিলেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ায় ইরানে সামরিক অভিযান দ্রুতই শেষ হবে, যেমনটি হয়েছিল ভেনেজুয়েলায়। কিন্তু বাস্তবে প্রতিপক্ষ হিসেবে ইরান অনেক বেশি শক্তিশালী।

আলি খামেনি নিহত হওয়ার পরও ইরান পালটা জবাব দিতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করেনি। বরং আলি খামেনির মৃত্যু তাদের নিজেদের কর্মকাণ্ডে কোনো প্রভাবই ফেলেনি বলেই প্রতিনিয়ত প্রমাণ দিয়ে যাচ্ছে তারা। শুধু তাই নয়, ইরানের সম্ভাব্য নতুন নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী আরও কট্টর অবস্থান নিতে পারে বলেও ইঙ্গিত মিলেছে।

এর সঙ্গেই দেখা দিয়েছে আরেকটি উদ্বেগ— যদি শেষ পর্যন্ত ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা ভেঙেই পড়ে, তাহলে দেশটি চরম বিশৃঙ্খলার দিকে ধাবিত হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্প ইরানের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন চাইলেও চূড়ান্ত বিশৃঙ্খল ইরান পুরো মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলে দিতে পারে।

হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উদ্বেগ সারা বিশ্বেই

ইরান যুদ্ধে উভয় পক্ষের সামরিক সক্ষমতা আর ক্ষয়ক্ষতির বাইরে সবচেয়ে বেশি যেটি আলোচনায় উঠে এসেছে তা হলো হরমুজ প্রণালি। ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার প্রশস্ত এই নৌ রুট বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবহন করে থাকে। মধ্যপ্রাচ্যের বেশির ভাগ দেশের তেল রপ্তানির বড় একটি অংশ এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইরান এই নৌ পথটি বন্ধ করে দিয়েছে। হুমকি দিয়ে রাখা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোনো জাহাজ চলতে পারবে না। এর জের ধরে এরই মধ্যে এশিয়া ও ইউরোপের তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজ চলাচল দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ থাকলে তা নিশ্চিতভাবেই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গুরুতর প্রভাব ফেলতে সক্ষম হবে।

যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি নিয়ে অবশ্য এখনো প্রকাশ্যে উদ্বেগ দেখাননি ট্রাম্প। তবে তার প্রশাসন তেল সরবরাহে যুদ্ধের প্রভাব কমানোর উপায় ঠিকই খুঁজছে।

ওয়াশিংটনের আটলান্টিক কাউন্সিলের বিশ্লেষক জোশ লিপস্কি বলেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য একটি বড় চাপের জায়গা, যা সম্ভবত আগে পুরোপুরি অনুমানের মধ্যে ছিল না।’

লিপস্কির ধারণা যে অমূলক নয়, তার প্রমাণ মিলছে অন্যদের বক্তব্যেও। সাবেক এক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরানের ওপর হামলার আগে তেলের বাজার বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পর্যাপ্ত পরামর্শ করা হয়নি। সে হিসাবে ইরান যুদ্ধের সূত্র ধরে হরমুজ প্রণালি ট্রাম্পের জন্য অর্থনৈতিক চাপও বয়ে এনেছে, যা হয়তো ট্রাম্পের ধারণার মধ্যে ছিল না।

যুদ্ধ চলবে কতদিন?

আট দিন পেরিয়ে যাওয়ার পর ইরান যুদ্ধ নিয়ে এখন বড় প্রশ্ন— এ যুদ্ধ কতদিন চলবে! ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় অস্বস্তি হলো— এই প্রশ্নের কোনো উত্তর আপাতত কারও কাছে নেই এবং তা কেউ ধারণাও করতে পারছে না। এই অনিশ্চয়তা ট্রাম্পের জন্য চাপ হয়ে আসতে পারে।

ট্রাম্প অবশ্য এসব নিয়ে খুব বেশি উদ্বেগ দেখাচ্ছেন না। তিনি বলেছেন, অভিযান চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ কিংবা ‘যতদিন প্রয়োজন’ ততদিন চলতে পারে। এমনকি ‘অন্ততকাল’ ধরে এ যুদ্ধ চালিয়ে নিতে হলে তার জন্যও প্রস্তুত রয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

সাবেক মার্কিন সেনা কর্মকর্তা বেন হজেস এমন ‘অনন্তকাল’ নীতির নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘সামরিক কৌশলের দিক থেকে মার্কিন বাহিনী দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছে। কিন্তু রাজনৈতিক, কৌশলগত ও কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি পুরোপুরি ভেবে দেখা হয়েছে বলে মনে হয় না।’

উপসাগরীয় মিত্রদের ওপর নির্ভরতা

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর ভূমিকা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এসব দেশে দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে বড় বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিও রয়েছে এসব দেশের। তবে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর এসব দেশের অবস্থানও নড়তে শুরু করেছে। কারণ সবগুলো দেশ লক্ষ্য করেই হামলা অব্যাহত রেখেছে ইরান। ফলে এই যুদ্ধের প্রত্যক্ষ আঘাত তাদেরই বহন করতে হচ্ছে।

যুদ্ধের শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি এসব দেশের সমর্থন ছিল, ছিল ইরানের প্রতি বিরোধিতাও। তবুও উপসাগরীয় সব দেশ এখন এই যুদ্ধকে সমর্থন করছে বলা যায় না।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের ধনকুবের খালাফ আল হাবতুর যেমন বৃহস্পতিবার ট্রাম্পকে লেখা এক খোলা চিঠিতে প্রশ্ন তুলেছেন— ‘আমাদের অঞ্চলকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে?’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর আগে ২০০৩ সালের যুদ্ধে ইরাক সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়লেও তা ওই অঞ্চলকে শান্ত করতে পারেনি। ২০১১ সালে লিবিয়ায় সংঘাতও দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে। সিরিয়ার যুদ্ধের কথা বলাই বাহুল্য, যা বহুপাক্ষিক ও বহুমাত্রিক রাজনৈতিক-সামরিক জটিলতা তৈরি করেছে।

এ অবস্থায় ইরান যুদ্ধ প্রসঙ্গেও ওয়াশিংটনের মূল্য বিবেচ্য এটাই হওয়া উচিত— ইরানকে অস্থিতিশীল করে তুললে তা দীর্ঘ মেয়াদে মধ্যপ্রাচ্য ও বিস্তৃত পরিসরে গোটা বিশ্বকেই আরও বিপজ্জনক করে তুলবে কি না। সাম্প্রতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেসব ঝুঁকি-হুমকি দূর করতে ট্রাম্প এই যুদ্ধে জড়িয়েছেন, অস্থিতিশীল ইরান সেসব ঝুঁকি আর হুমকিকেই বহু গুণে বাড়িয়ে দিতে পারে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি, রয়টার্স, আল জাজিরা, এএফপি

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

ইরানি নৌবাহিনীর ৪২টি জাহাজ ধ্বংস করেছে যুক্তরাষ্ট্র, দাবি ট্রাম্পের

শুক্রবার ইরানের পরিস্থিতি নিয়ে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, আমেরিকা ইরানে ‘খুব ভালো’ করছে- ‘এটা অসাধারণ হয়েছে’।

১৩ ঘণ্টা আগে

ইরানকে আজ ‘খুব কঠিনভাবে আঘাত করা হবে’: ট্রাম্প

প্রসঙ্গত, ইরান তার আশপাশের যেসব দেশে হামলা চালিয়ে সেগুলোর কাছে আজ দুঃখপ্রকাশ করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। কোনো দেশ থেকে ‘প্রথমে হামলা না হলে’ আক্রমণ করা হবে না বলেও আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

১৬ ঘণ্টা আগে

দুবাই বিমানবন্দরে ফ্লাইট ওঠা-নামা শুরু

পোস্টে উল্লেখ করা হয়েছে, "দুবাই কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে যে একটি হামলা প্রতিহত করার সময় কিছু ধ্বংসাবশেষ পড়ে সৃষ্ট একটি ছোটখাটো ঘটনা সফলভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি"।

১৬ ঘণ্টা আগে

ট্রাম্পের আহ্বান প্রত্যাখ্যান, ‘আত্মসমর্পণ করবে না’ ইরান

ইরান-ইসরায়েলের সংঘাতের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে গোটা বিশ্বে। এমন পরিস্থিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের’ দাবির পর ইরান কখনোই আত্মসমর্পণ করবে না বলে জানান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।

১৬ ঘণ্টা আগে