ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রি বন্ধে চাপ দিতে পারেন জিনপিং

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং চলতি সপ্তাহে ওয়াশিংটন সফরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে তাইওয়ানের কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রি বন্ধের বিষয়ে চাপ দিতে পারেন। এ ক্ষেত্রে ১৯৮২ সালে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি যৌথ বিবৃতির কথা তুলে ধরতে পারেন তিনি।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত কয়েকটি সূত্রের বরাত দিয়ে মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ তথ্য জানিয়েছে। সূত্রগুলো বলছে, ওয়াশিংটন সফরের সময় শি যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল আর্কাইভসেও এ বিষয়টি তুলতে পারেন।
চীন নিয়মিতই তাইওয়ান ইস্যুকে তাদের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বিষয় হিসেবে তুলে ধরে। বেইজিং তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে মনে করে। তাইওয়ানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রি বন্ধের দাবিও চীন বারবার জানিয়ে আসছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের আইনে গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত তাইওয়ানকে আত্মরক্ষার সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় উপকরণ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যদিও তাইওয়ানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। তবে তাইওয়ান বেইজিংয়ের সার্বভৌমত্বের দাবি প্রত্যাখ্যান করে।
চলতি সপ্তাহে ট্রাম্পের সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকে অংশ নিতে শির ওয়াশিংটন সফরের আগে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে হওয়া আলোচনা সম্পর্কে অবগত তিনটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, বেইজিং সম্ভবত দুই দেশের মধ্যে ১৯৮২ সালে স্বাক্ষরিত তিনটি ‘যৌথ ইশতেহারের’ তৃতীয়টির নিজস্ব ব্যাখ্যা তুলে ধরবে।
ওই যৌথ বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র বলেছিল, তারা তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রি ধীরে ধীরে কমানোর পরিকল্পনা করছে এবং তাইপের কাছে দীর্ঘমেয়াদে অস্ত্র বিক্রির লক্ষ্য তাদের নেই।
তবে এর সঙ্গে দেওয়া একটি স্মারকে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান বলেছিলেন, তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রি কমানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করবে তাইওয়ানের সঙ্গে বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের বিষয়ে চীনের অব্যাহত অঙ্গীকারের ওপর।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত পাঁচ বছরে তাইওয়ানের চারপাশে চীন তার সামরিক তৎপরতা ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে। এর মধ্যে জীবন্ত ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়ে সামরিক মহড়াও রয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই চীনের সশস্ত্র বাহিনী তাইওয়ানের আশপাশে কার্যক্রম চালায়।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল রয়টার্স। তবে তারা কোনো জবাব দেয়নি।
চীনের সরকারি সংবাদপত্র পিপলস ডেইলি মঙ্গলবার এক প্রতিবেদনে বলেছে, তাইওয়ান ইস্যু সঠিকভাবে সামলানো না হলে তা চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতির’ দিকে ঠেলে দিতে পারে।
শি বুধবার ওয়াশিংটনে পৌঁছাবেন। বৃহস্পতিবার ট্রাম্পের সঙ্গে তার আনুষ্ঠানিক বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। আর শুক্রবার তিনি ন্যাশনাল আর্কাইভস পরিদর্শনে যাবেন।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেছেন, নতুন অস্ত্র বিক্রির প্যাকেজের বিষয়ে ট্রাম্প খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানিয়েছেন।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে ইতিহাসের অন্য যেকোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের তুলনায় তাইওয়ানের কাছে বেশি অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিয়েছিলেন। আর দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরেই তিনি তাইওয়ানের জন্য যত অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিয়েছেন, তা প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের চার বছরের পুরো মেয়াদে অনুমোদিত অস্ত্র বিক্রির চেয়েও বেশি।
তাইওয়ানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনার অগ্রগতি তারা ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘শক্তিশালী যোগাযোগ’ বজায় রাখছে তারা।
অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের দাবি
বিষয়টির সংবেদনশীলতার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা সূত্রগুলো জানিয়েছে, তাইওয়ানের অর্ডার করা অস্ত্রের সরবরাহও বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে চীন।
সূত্রগুলোর একটি বলেছে, শি ট্রাম্পকে বোঝানোর চেষ্টা করতে পারেন যে তাইওয়ানই উসকানিদাতা এবং চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের অস্থিতিশীলতার একমাত্র উৎস। একই সঙ্গে তাইওয়ানই বর্তমান পরিস্থিতি বা ‘স্থিতাবস্থা’ পরিবর্তন করছে— এমন বক্তব্যও দিতে পারেন তিনি।
সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, এর বিনিময়ে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে সহায়তার প্রস্তাব দিচ্ছে চীন।
যুক্তরাষ্ট্র ‘এক চীন নীতি’ অনুসরণ করে। এর আওতায় ওয়াশিংটন আনুষ্ঠানিকভাবে তাইওয়ানের সার্বভৌমত্বের বিষয়ে কোনো অবস্থান নেয় না। একই সঙ্গে তাইওয়ান চীনের অংশ— বেইজিংয়ের এই অবস্থানকে স্বীকৃতি না দিয়ে শুধু স্বীকার করে।
ট্রাম্প প্রশাসন গত ডিসেম্বরে তাইওয়ানের জন্য ১১ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির একটি প্যাকেজ অনুমোদন করে। এটিই এখন পর্যন্ত তাইওয়ানের জন্য সবচেয়ে বড় মার্কিন অস্ত্র বিক্রির প্যাকেজ। তবে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের আরেকটি প্যাকেজ কয়েক মাস ধরে আটকে আছে।
মে মাসে বেইজিংয়ে শির সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি ওই অস্ত্র বিক্রির প্যাকেজটি স্থগিত রেখেছেন। তিনি এটিকে ‘খুব ভালো দর-কষাকষির হাতিয়ার’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
তাইওয়ান নিয়ে ‘বক্তৃতা’ দিতে পারেন শি
১৯৮২ সালেই তাইওয়ানের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ‘সিক্স অ্যাস্যুরেন্সেস’ বা ছয়টি আশ্বাস জারি করেছিল। তবে সেগুলো ২০২০ সালের আগে প্রকাশ করা হয়নি। এসব আশ্বাসের আওতায় তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধের কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করেনি যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে এ ধরনের অস্ত্র বিক্রির আগে বেইজিংয়ের সঙ্গে পরামর্শ করার বিষয়েও কোনো সম্মতি দেওয়া হয়নি।
এদিকে, ট্রাম্প-শি বৈঠকের আগে তাইওয়ানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছেন যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতারা।
পূর্ব এশিয়া বিষয়ক সিনেটের পররাষ্ট্র সম্পর্কবিষয়ক উপকমিটির রিপাবলিকান চেয়ারম্যান সিনেটর পিট রিকেটস গত সপ্তাহে হাডসন ইনস্টিটিউটের এক অনুষ্ঠানে বলেন, তাইওয়ান ইস্যুতে ট্রাম্পের দৃঢ় অবস্থান নেওয়া উচিত এবং তাইওয়ান বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি— এটি স্পষ্ট করা উচিত।
তিনি বলেন, ‘তাদের আবারও জানিয়ে যেতে হবে যে তারা শক্তি প্রয়োগ করে তাইওয়ান দখল করতে পারবে না। এ বিষয়ে আমরা আমাদের অবস্থান পরিবর্তন করছি না। আমরা তাইওয়ানকে সমর্থন অব্যাহত রাখছি।’
শুক্রবার ট্রাম্পকে দেওয়া এক চিঠিতে চীনের বিষয়ে প্রতিনিধি পরিষদের সিলেক্ট কমিটির রিপাবলিকান চেয়ারম্যান জন মুলেনার তাইওয়ান ও এশিয়ার যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, তাইওয়ানের কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রি ও নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে চীনের আপত্তি ‘সরাসরি প্রত্যাখ্যান’ করা উচিত।
শনিবার তাইপেতে একটি প্রতিরক্ষা ফোরামে বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসনের উপ-জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ম্যাট পটিংগার বলেন, চলতি সপ্তাহের বৈঠকে তাইওয়ান ইস্যুতে কোনো ‘সুনির্দিষ্ট’ অগ্রগতি হবে বলে তিনি মনে করেন না।
তিনি বলেন, ‘আমি বাজি ধরতে পারি, শি জিনপিং দীর্ঘ সময় ধরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে তাইওয়ান নিয়ে বক্তৃতা দেবেন। আগের বৈঠকগুলোতে তিনি যেমন করেছেন, অন্য প্রেসিডেন্টদের সঙ্গেও যেমন করেছেন।’




















