ইরান যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে হাড্ডাহাড্ডি নির্বাচনি লড়াইয়ে থাকা রিপাবলিকানরা

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় সিনেট নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে থাকা দুই রিপাবলিকান প্রার্থী। যুদ্ধের কারণে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে ভোটারদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে থাকায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে নিজেদের দূরত্ব বজায় রাখার প্রয়োজন বোধ করছেন আরও কয়েকজন প্রার্থী। সর্বশেষ এই দুই প্রার্থীর অবস্থান সেই প্রবণতারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আইওয়ার সিনেট আসনে ডেমোক্র্যাট জশ তুরেকের বিরুদ্ধে লড়ছেন রিপাবলিকান প্রতিনিধি অ্যাশলি হিনসন। আর মিশিগানে ডেমোক্র্যাট ড. আবদুল এল-সায়েদের প্রতিদ্বন্দ্বী মাইক রজার্স। গত সোমবার দুজনই ট্রাম্পের অবস্থান থেকে নিজেদের সরিয়ে নেন এবং তেহরানে হামলার বিষয়ে প্রেসিডেন্টের অবস্থান সমর্থন করছেন না বলে জানান।
হিনসনের অবস্থান পরিবর্তন বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এক সপ্তাহেরও কম সময় আগে তিনি এমন একটি প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছিলেন, যেখানে ট্রাম্পকে ইরানে সামরিক অভিযান বন্ধ করা অথবা এ ধরনের অভিযানের জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল।
তবে সোমবার ওই প্রস্তাবের পক্ষে থাকা সাত রিপাবলিকান আইনপ্রণেতার সঙ্গে তিনিও যোগ দেন। হিনসনের আইওয়ার দুই সহকর্মী জ্যাক নান ও মারিয়্যানেট মিলার-মিকসও ওই পদক্ষেপের পক্ষে ভোট দেন।
ইরান যুদ্ধের কারণে ফেব্রুয়ারি থেকে জ্বালানির দাম উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এতে বিশেষ করে গ্রামীণ ও রক্ষণশীল অঙ্গরাজ্যগুলোতে হতাশা বাড়ছে। এসব অঞ্চলে ট্রাক চলাচল ও কৃষিকাজে ডিজেলের ওপর ব্যাপক নির্ভরতা রয়েছে। এএএ-এর তথ্য অনুযায়ী, রোববার ডিজেলের দাম প্রতি গ্যালন ৬.৫০ ডলারে পৌঁছায়।
দুই প্রার্থীর সাম্প্রতিক মন্তব্য রিপাবলিকানদের মধ্যে বাড়তে থাকা উদ্বেগেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইরান সংঘাতের রাজনৈতিক প্রভাব আগামী কংগ্রেস নির্বাচনে ক্ষমতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে দলটির জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে— এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ডেমোক্র্যাটরা অবশ্য হিনসন ও রজার্সের এই অবস্থানকে কাজে লাগাচ্ছেন। তাদের বক্তব্য, দুই প্রার্থীই এত দিন ট্রাম্পকে সমর্থন করেছেন, আর এখন জ্বালানির দাম কমানোর প্রস্তাব দিয়ে ডেমোক্র্যাটদের বক্তব্যই তুলে ধরছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে হিনসন বলেন, তিনি গ্যাসের ওপর কর স্থগিত করা, ডিজেল রপ্তানি বন্ধে বিরতি এবং যুদ্ধের ‘সফল ও তাৎক্ষণিক সমাপ্তি’ সমর্থন করেন। একটি মুদি দোকানে দাঁড়িয়ে দেওয়া ভিডিওতে রজার্সও বলেন, ‘যখন এটি ঘটে, তখন জ্বালানির খরচ দ্রুত বাড়বে। যখন এটি ঘটে, তখন জ্বালানির খরচ আকাশচুম্বী হবে।’
দুই প্রার্থীর বক্তব্য সরাসরি ট্রাম্পের অবস্থানের বিপরীতে দাঁড়িয়েছে। জ্বালানির দাম বাড়ার আশঙ্কাকে ট্রাম্প অবশ্য খারিজ করেছেন।
এএএ-এর তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহের তুলনায় নিয়মিত গ্যাসোলিনের জাতীয় গড় দাম ২০ সেন্ট বেড়ে প্রতি গ্যালন ৪.৪৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত সপ্তাহে নর্থ ক্যারোলিনায় দেওয়া এক বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধের কারণে বাড়তে থাকা খরচ ‘পরিশোধের জন্য খুবই ব্যয়বহুল’ হয়ে উঠেছে। তবে তিনি কয়েক মাস ধরে বলে আসছেন, যুদ্ধ শিগগিরই শেষ হবে এবং এর ফলে জ্বালানির দামও কমে আসবে।
সিনেট প্রার্থীদের দূরত্ব তৈরির চেষ্টা
ভোটারদের মধ্যেও ইরান সংঘাত নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। গত সপ্তাহে প্রকাশিত দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ও সিয়েনা ইউনিভার্সিটির এক জরিপে দেখা গেছে, তিন-চতুর্থাংশের বেশি স্বতন্ত্র ভোটার বলেছেন, যুদ্ধ পরিচালনায় ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে তারা অসন্তুষ্ট। অর্থনীতি, অভিবাসন ও জীবনযাত্রার ব্যয়ও তাদের অসন্তুষ্টির অন্যতম কারণ।
জ্বালানির দাম কমাতে রিপাবলিকান দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারাও বিভিন্ন প্রস্তাব দিচ্ছেন। এর মধ্যে ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করার বিষয়টিও রয়েছে। আইওয়ার সিনেটর চার্লস গ্রাসলি সপ্তাহান্তে ট্রাম্পকে ডিজেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার আহ্বান জানান। সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা ও দক্ষিণ ডাকোটার সিনেটর জন থুনে গত সপ্তাহে বলেন, তিনি এ ধরনের পদক্ষেপের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে প্রস্তুত। আরেক রিপাবলিকান, ওহাইওর গভর্নর পদপ্রার্থী বিবেক রামাস্বামী সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, তিনি গ্যাস কর স্থগিতকরণকে সমর্থন করেছেন।
রিপাবলিকান প্রার্থীদের কেউ কেউ অন্যান্য বিষয়েও প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে নিজেদের দূরত্ব তৈরি করার চেষ্টা করছেন। গত মাসে রজার্স বলেছিলেন, তিনি তথ্যকেন্দ্র নির্মাণে এক বছরের স্থগিতাদেশকে সমর্থন করেন। যদিও ট্রাম্প কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পের পক্ষে জোরালো সমর্থন জানিয়েছেন।
হিনসনও ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের কাছ থেকে একইভাবে দূরত্ব বজায় রাখছেন। চলতি মাসে ডালাসে প্রেসিডেন্টের মধ্যবর্তী মেয়াদের সম্মেলনে তিনি উপস্থিত হননি। শুক্রবার আইওয়ার কাউন্সিল ব্লাফসে ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের সঙ্গে নির্ধারিত একটি সমাবেশেও অংশ নেননি। তাঁর প্রচারশিবির অবশ্য এর কারণ হিসেবে আগে থেকে নির্ধারিত কর্মসূচির কথা জানিয়েছে।
মঙ্গলবার উটাহর রিপাবলিকান সিনেটর জন কার্টিস সিনেটের বিচারবিষয়ক কমিটিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রের বিরুদ্ধে তদন্তের আহ্বান জানান। আর্থিক সুবিধা পাওয়ার জন্য তিনি নিজের পারিবারিক সম্পর্ক ব্যবহার করেছেন কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানান কার্টিস। সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ছেলে হান্টার বাইডেনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের তদন্তের দাবি জানিয়েছিলেন তিনি।
সোমবার ডেমোক্র্যাটরা রিপাবলিকান প্রার্থীদের এই অবস্থানের সমালোচনা করেন। এল-সায়েদ রজার্সকে অন্য বিষয়ে অসৎ বলে আখ্যায়িত করেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘মাইক, আগামী সপ্তাহে বাতাস কোন দিকে বইছে তা আমরা দেখব।’
আইওয়ার ডেমোক্র্যাট সিনেট প্রার্থী জশ তুরেক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হিনসনকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনি শেষ পর্যন্ত গত সপ্তাহে আমি যে প্রস্তাবগুলো দিয়েছিলাম, সেগুলো অনুসরণ করছেন— ইরান যুদ্ধের বাড়তে থাকা খরচ মোকাবিলার জন্য।’
গত সপ্তাহের ভোটসহ হিনসন ইরানে ট্রাম্পের যুদ্ধক্ষমতা সীমিত করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে ছয়বার ভোট দিয়েছেন। ওই তিনটি প্রস্তাব প্রতিনিধি পরিষদে পাস হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র একটি প্রস্তাব কংগ্রেসের উভয় কক্ষে পাস হয়েছে।
তবে এসব প্রস্তাব বাধ্যতামূলক নয়। এখন পর্যন্ত এগুলো ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনার পদ্ধতিতে কোনো প্রভাব ফেলেছে বলে মনে হয়নি।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে

















