দুই দিনের সফরে বড় সাফল্য ছাড়াই বেইজিং ছাড়লেন ট্রাম্প

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ১৫ মে ২০২৬, ১৮: ৩২
চীন ছাড়ার আগে বেইজিং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

দুই দিন ধরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকলেও বাণিজ্যে বড় কোনো অগ্রগতি কিংবা ইরান যুদ্ধ বন্ধে বেইজিংয়ের কাছ থেকে দৃশ্যমান সহায়তা ছাড়াই শুক্রবার বেইজিং ছাড়লেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান কৌশলগত ও অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী চীনে ট্রাম্পের এ সফর ছিল ২০১৭ সালের পর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রথম সফর। আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে কমে যাওয়া জনপ্রিয়তা বাড়াতে এই সফর থেকে দৃশ্যমান সাফল্য অর্জনের লক্ষ্য ছিল তার।

শুক্রবার (১৩ মে) বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, ট্রাম্পের চীন সফর জুড়ে ছিল জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন— সেনাসদস্যদের কুচকাওয়াজ, গোপন উদ্যান পরিদর্শনসহ নানা আনুষ্ঠানিকতা। তবে পর্দার আড়ালে শি জিনপিং ট্রাম্পকে কড়া বার্তা দেন যে, চীনের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ইস্যু তাইওয়ান ভুলভাবে সামাল দিলে তা সংঘাতে রূপ নিতে পারে।

এ বিষয়ে রয়টার্সকে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান ট্রাম্প। পুরো সফরেই তিনি ‘অস্বাভাবিকভাবে’ সংযত ছিলেন এবং তাৎক্ষণিক মন্তব্যের বেশিরভাগই ছিল শির আন্তরিকতা ও নেতৃত্বের প্রশংসাকেন্দ্রিক।

শুক্রবার ঝংনানহাই কমপ্লেক্সে শেষ বৈঠকে ট্রাম্প শিকে বলেন, ‘এটি অসাধারণ একটি সফর ছিল। আমি মনে করি, এ থেকে অনেক ভালো কিছু এসেছে।’ পরে তারা লবস্টার বল ও কুং পাও স্ক্যালপ দিয়ে মধ্যাহ্নভোজ সারেন। ঝংনানহাই কমপ্লেক্স একসময় চীনের সম্রাটের উদ্যান ছিল এবং বর্তমানে চীনা নেতাদের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ট্রাম্প যেখানে বোয়িং উড়োজাহাজ বিক্রির মতো তাৎক্ষণিক বাণিজ্যিক সাফল্য খুঁজছিলেন— যা বিনিয়োগকারীদের খুব একটা প্রভাবিত করতে পারেনি—সে খানে শি দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক পুনর্গঠন এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে স্থিতিশীল বাণিজ্য সম্পর্ক বজায় রাখার চুক্তির কথা বলেন। এতে দুই নেতার অগ্রাধিকারের পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

শি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে ‘গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীলতা’ হিসেবে বর্ণনা করেন, যা সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ব্যবহৃত ‘কৌশলগত প্রতিযোগিতা’ শব্দবন্ধ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। বেইজিং দীর্ঘদিন ধরেই ওই ভাষার বিরোধিতা করে আসছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, এই নতুন ভাষ্য চীনের জন্য বড় কূটনৈতিক সাফল্য। কারণ প্রথমবারের মতো সম্পর্কের কাঠামো নির্ধারণে বেইজিংয়ের ভাষাই প্রাধান্য পেল, যেখানে বড় ধরনের বিরোধ বা ‘অগঠনমূলক’ আচরণ সম্পর্কের চেতনাবিরোধী হিসেবে বিবেচিত হবে।

বেইজিংয়ের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও কৌশল কেন্দ্রের পরিচালক দা ওয়েই বলেন, ‘এখন পর্যন্ত চীন বিকল্প কোনো কাঠামো দেয়নি— এখন দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি এতে সম্মত হয়, তাহলে সেটি অগ্রগতি।’

ইরান ইস্যুতে দৃশ্যমান সহায়তা নেই

শুক্রবার দুই নেতার চা বৈঠকের ঠিক আগে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে কড়া বিবৃতি দেয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এই সংঘাত, যা কখনোই হওয়া উচিত ছিল না, তা চালিয়ে যাওয়ার কোনো কারণ নেই।’ একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলা এই যুদ্ধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রচেষ্টাকে সমর্থনের কথাও জানায় বেইজিং।

ঝংনানহাইয়ে ট্রাম্প বলেন, তারা ইরান নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং উভয়ের অবস্থান ‘খুবই কাছাকাছি’। তবে এ বিষয়ে শি কোনো মন্তব্য করেননি।

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট চীনকে ইরানের ওপর প্রভাব খাটিয়ে সমঝোতায় আনতে আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় বেইজিং তেহরানের ওপর কঠোর চাপ প্রয়োগ বা সামরিক সহায়তা বন্ধ করবে— এমন সম্ভাবনা কম।

গতকাল বৃহস্পতিবারের বৈঠক নিয়ে হোয়াইট হাউজের সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে বলা হয়, দুই নেতা ইরানের উপকূলবর্তী হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়ে একমত হয়েছেন। যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমাতে মার্কিন তেল কেনার ব্যাপারেও চীনের আগ্রহের কথা উল্লেখ করা হয়।

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ প্যাট্রিসিয়া কিম বলেন, ‘উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ইরান প্রসঙ্গে নির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি চীন দেয়নি।’

হতাশ করল বোয়িং চুক্তি

সম্মেলনের সীমিত অর্জনের আরেকটি ইঙ্গিত হলো, ট্রাম্পের সফরসংক্রান্ত বিবৃতিতে অতীতের মার্কিন প্রেসিডেন্টদের মতো চীনের কাঠামোগত অর্থনৈতিক সংস্কারের বিষয়টি উল্লেখই করা হয়নি।

২০১৭ সালের সফরের বিপরীতে এবার ট্রাম্প ‘কাঠামোগত সংস্কার’, ‘বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শাসনব্যবস্থা’ কিংবা ‘আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা; নিয়ে শির সঙ্গে আলোচনা করেননি বলে বিবৃতিতে দেখা গেছে।

ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক চিম লি বলেন, ‘বাজারের দৃষ্টিতে এই সম্মেলন কৌশলগতভাবে আশ্বস্তকারী হলেও বাস্তব ফলাফলের দিক থেকে হতাশাজনক।’

মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কৃষিপণ্য বিক্রির বিষয়ে কিছু চুক্তি হয়েছে এবং ভবিষ্যৎ বাণিজ্য ব্যবস্থাপনার কাঠামো তৈরিতে অগ্রগতি হয়েছে। উভয় পক্ষ প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের অসংবেদনশীল পণ্য চিহ্নিত করবে বলেও আশা করা হচ্ছে।

তবে এসব চুক্তির বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। এ ছাড়া এনভিডিয়ার উন্নত এইচ-২০০ এআই চিপ চীনে বিক্রির ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতির ইঙ্গিতও পাওয়া যায়নি, যদিও প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং শেষ মুহূর্তে সফরে যোগ দিয়েছিলেন।

২০২৫ সালের এপ্রিলে ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের জবাবে চীন গুরুত্বপূর্ণ বিরল খনিজ রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করার পর থেকে যে সংকট তৈরি হয়েছে, সেটিরও কোনো আনুষ্ঠানিক সমাধান ছাড়াই চীন ত্যাগ করেন ট্রাম্প।

গত অক্টোবরে উভয় দেশ এক সমঝোতায় পৌঁছেছিল, যেখানে ওয়াশিংটন শুল্ক কমানোর বিনিময়ে চীন বিরল খনিজ সরবরাহ অব্যাহত রাখবে। কিন্তু বেইজিংয়ের নিয়ন্ত্রণের কারণে মার্কিন চিপ নির্মাতা ও মহাকাশ শিল্পে ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

ট্রাম্পের সফরসঙ্গী যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার শুক্রবার ব্লুমবার্গ টিভিকে বলেন, এ বছরের পর সমঝোতাটি বাড়ানো হবে কি না, সেটিও এখনও নির্ধারিত হয়নি।

ব্রুকিংসের কিম বলেন, এই সমঝোতার মেয়াদ বাড়ানোই হবে সম্মেলনের সফলতার ‘সবচেয়ে মৌলিক মানদণ্ড’।

অন্যদিকে, তাইওয়ান ইস্যু ভুলভাবে পরিচালনা করলে সংঘাত সৃষ্টি হতে পারে— শির এমন সতর্কবার্তা বন্ধুত্বপূর্ণ ও স্বস্তিদায়ক পরিবেশে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে একটি কঠোর বার্তা হিসেবে দেখা দিয়েছে।

চীনের উপকূল থেকে মাত্র ৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত গণতান্ত্রিকভাবে শাসিত দ্বীপ তাইওয়ান দীর্ঘদিন ধরেই ওয়াশিংটন-বেইজিং সম্পর্কের উত্তেজনার কেন্দ্র। দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ নিতে প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও নাকচ করেনি বেইজিং। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের আইনে তাইওয়ানকে আত্মরক্ষার সক্ষমতা অর্জনে সহায়তা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এনবিসি নিউজকে বলেন, ‘তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে আজও কোনো পরিবর্তন আসেনি।’ তাইওয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিন চিয়া-লুং এ সমর্থনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

আদানির বিরুদ্ধে জালিয়াতির মামলা তুলে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

ফৌজদারি অভিযোগ প্রত্যাহারের বিষয়ে রয়টার্স মন্তব্য জানতে চাইলে আদানি গ্রুপ তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। যদিও এর আগে প্রতিষ্ঠানটি তাদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করেছিল।

৪ ঘণ্টা আগে

চীন সফরে 'মুগ্ধ' ট্রাম্প, গোলাপের বীজ উপহার পাঠাবেন শি

পরে চায়ের ঘরের দিকে যাওয়ার সময়ও ট্রাম্পকে বলতে শোনা যায়, শি তাকে হোয়াইট হাউসের রোজ গার্ডেনের জন্য গোলাপ দেবেন।

৫ ঘণ্টা আগে

জিন ছাড়ানোর নামে ২১টি যৌন নিপীড়ন, লন্ডনে ভারতীয় ইমামের যাবজ্জীবন

দীর্ঘ তদন্ত শেষে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আদালত আব্দুল হালিম খানকে মোট ২১টি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে। এর মধ্যে রয়েছে নয়টি ধর্ষণ, চারটি যৌন নিপীড়ন, ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুর ওপর দুইবার যৌন আক্রমণ, ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুকে পাঁচবার ধর্ষণ এবং একটি পেনিট্রেশনের মাধ্যমে শারীরিক লাঞ্ছনা।

৫ ঘণ্টা আগে

৪ বছর পর পেট্রোল-ডিজেলের দাম বাড়ল ভারতে

ভারতের গণমাধ্যমগুলোর তথ্য বলছে, দিল্লিতে এখন প্রতি লিটার ডিজেলের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৯০ দশমিক ৬৭ রুপি, যা আগে ছিল ৮৭ দশমিক ৬৭ রুপি। অন্যদিকে প্রতি লিটার পেট্রোলের নতুন দাম ৯৭ দশমিক ৭৭ রুপি, যা আগে ছিল ৯৪ দশমিক ৭৭ রুপি। সে হিসাবে ডিজেলের দাম বেড়েছে ৩ দশমিক ৪২ শতাংশ, পেট্রোলের ৩ দশমিক ১৬ শতাংশ

৬ ঘণ্টা আগে