ফের হরমুজ ঘিরে তীব্র সংঘাত, তেহরান বলছে ‘কূটনীতি অর্থহীন’

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের লারাক দ্বীপসংলগ্ন জলসীমায় নোঙর করা একটি জাহাজ। ছবি: সংগৃহীত

হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত আবারও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ইরানের বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি রয়েছে— এমন কয়েকটি দেশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে তেহরান। এতে গত মাসে হওয়া অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার ভবিষ্যৎ নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। এ পরিস্থিতির মধ্যেই ইরান ঘোষণা দিয়েছে, ওয়াশিংটনের সর্বশেষ হামলা গত কয়েক মাস ধরে উত্তেজনা কমানো ও শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চালানো সব ধরনের কূটনৈতিক উদ্যোগকে ‘অর্থহীন’ করে দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, রোববার রাত ৯টা (জিএমটি) থেকে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু হয়। তাদের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে বেসামরিক নাবিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানোর ইরানি সক্ষমতা আরও দুর্বল করতেই এই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

সেন্টকমের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশেই এ হামলা চালানো হয়েছে, যাতে ইরানি বাহিনীকে তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহির আওতায় আনা যায়।

সপ্তাহান্তের এই হামলার বিষয়ে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা তাদের ভালোভাবেই আঘাত করছি।’

এর কিছুক্ষণের মধ্যেই পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানায় ইরান। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে— এমন কয়েকটি দেশকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়।

জর্ডানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরানের ছোড়া চারটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। অন্যদিকে কুয়েতের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, সোমবার তারা ‘শত্রুভাবাপন্ন আকাশীয় লক্ষ্যবস্তু’ প্রতিহত করেছে, যখন উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছিল।

যুদ্ধবিরতি আরও অনিশ্চিত, কূটনীতিতে আস্থা হারাচ্ছে তেহরান

সাম্প্রতিক এই হামলা-পাল্টা হামলা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও বিস্তৃত ও তীব্র বলে জানিয়েছে সেন্টকম। তাদের দাবি, শুধু শনিবার রাতেই প্রায় ১৪০টি পৃথক হামলা চালানো হয়েছে।

এই সংঘাত গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া অন্তর্বর্তী সমঝোতার ভবিষ্যৎকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। যদিও সেন্টকম জানিয়েছে, উত্তেজনার মধ্যেও কিছু বাণিজ্যিক জাহাজ এখনো হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে চলাচল করছে।

রোববার ইরানের হামলা কাতার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। যুদ্ধবিরতি আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা কাতার এপ্রিলের পর এই প্রথম হামলার মুখে পড়ল।

অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সফলভাবে প্রতিহত করেছে। মে মাসের শুরু থেকে দেশটি আর কোনো হামলার মুখে পড়েনি।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির তীরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী সিরিক ও বন্দর আব্বাসে এবং সামরিক স্থাপনা-সমৃদ্ধ কেশম দ্বীপের আশপাশে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘এই হামলা পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা কমানো এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য গত কয়েক মাস ধরে নেওয়া সব উদ্যোগকে অর্থহীন করে দিয়েছে।’

তাদের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত ও জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ইরান যে ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করছিল, তাতে প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ করে যুক্তরাষ্ট্রই ওই জলপথে আবার অনিরাপত্তা সৃষ্টি করেছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌপরিবহনে বিঘ্ন ঘটিয়েছে।

এদিকে শনিবার ওমানের রাজধানী মাসকাটে ইরান ও ওমানের মধ্যে অনুষ্ঠিত আলোচনাও কোনো ফল ছাড়াই শেষ হয়েছে। হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা ও জাহাজ চলাচলের নতুন কাঠামো নিয়ে আলোচনা হলেও, ইরানের দাবি—যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য ও গোপন চাপের কারণেই কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

গত সপ্তাহেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতিকে কার্যত শেষ বলে মনে করেন। তবে একই সঙ্গে আলোচনার পথ খোলা রাখার কথাও জানান তিনি।

অন্যদিকে ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘একতরফা চুক্তির যুগ শেষ। আমরা আগেই বলেছিলাম— প্রতিশ্রুতি রাখুন, না হলে মূল্য দিতে হবে। বাস্তবতা এখন দরজায় কড়া নাড়ছে।’

হরমুজ নিয়ন্ত্রণ ঘিরে সংঘাতের কেন্দ্রে অর্থনীতি

বর্তমান সংকটের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি।

গত মাসের অন্তর্বর্তী সমঝোতার মূল উদ্দেশ্য ছিল হরমুজ প্রণালিকে পুরোপুরি উন্মুক্ত করা এবং অতিরিক্ত ৬০ দিনের আলোচনার মাধ্যমে স্থায়ী যুদ্ধবিরতির পথ তৈরি করা। কিন্তু নতুন সংঘাত সেই প্রক্রিয়াকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই এর প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। জ্বালানির দাম বেড়েছে, বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির চাপও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের মূল্যবৃদ্ধি নভেম্বরে কংগ্রেস নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল ইস্যু হয়ে উঠেছে।

সোমবার টোকিওতে লেনদেন শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম ৩ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৪ ডলারের ওপরে উঠে যায়।

ইরান দীর্ঘদিন ধরেই হরমুজ প্রণালিতে স্থায়ী ফি বা টোল ব্যবস্থা চালুর পক্ষে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে যেত। তেহরান ইতোমধ্যে জাহাজগুলোকে তাদের অনুমতি ছাড়া চলাচল না করারও সতর্কবার্তা দিয়েছে।

সম্প্রতি গঠিত ইরানের পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি রোববার জানিয়েছে, অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অবৈধ সামরিক তৎপরতার’ কারণে বর্তমানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে চলাচল সম্ভব নয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে প্রয়োজনীয় অনুমতিপত্র দেওয়া হবে বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র মঙ্গলবার ইরানের অপরিশোধিত তেল বিক্রির অনুমোদন বাতিল করার পর জানায়, আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে তাদের বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, ইরান আগ্রাসন, হয়রানি, হুমকি এবং একতরফা পদক্ষেপের মাধ্যমে পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করছে।

মার্কিন নৌবাহিনীর নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট মেরিটাইম ইনফরমেশন সেন্টার ও নতুন নিরাপত্তা নির্দেশনা জারি করেছে। সংস্থাটি বলেছে, নিরাপত্তা ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি হলেও ওমান উপকূলের কাছ দিয়ে বিস্তৃত দক্ষিণাঞ্চলীয় বিকল্প নৌপথ ব্যবহার করে উভয় দিকেই জাহাজ চলাচল এখনো সম্ভব।

এদিকে সেন্টকম দাবি করেছে, গত তিন রাতের অভিযানে তারা ইরানের ৩০০টিরও বেশি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।

অন্যদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, এর জবাবে তারা জর্ডান, কুয়েত, ওমান ও কাতারের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। তবে এসব দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সর্বশেষ এই হামলা-পাল্টা হামলা স্পষ্ট করে দিয়েছে, অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতির পরও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত থামেনি। বরং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মুখোমুখি অবস্থান আরও তীব্র হচ্ছে। পরিস্থিতির এই অবনতি শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তাই নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্যও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশ আজ

রোববার (১২ জুলাই) দেশটির আমিরে দেওয়ান এক বিবৃতিতে তার মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে।

১ দিন আগে

ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের রাতভর হামলা, যুদ্ধবিরতি বাতিল করলেন ট্রাম্প

চলতি উত্তেজনার সূত্রপাত ঘটে যখন হরমুজ প্রণালিতে সাইপ্রাসের পতাকাবাহী ‘এম/ভি জিএফএস গ্যালাক্সি’ নামের একটি কন্টেইনার জাহাজে হামলা চালায় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। ওই হামলায় জাহাজটির ইঞ্জিন রুম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং একজন বেসামরিক নাবিক নিখোঁজ হন। মূলত এই ঘটনার প্রতিশোধ

১ দিন আগে

মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

আইআরজিসি জানিয়েছে, জর্ডানের প্রিন্স হাসান বিমানঘাঁটিতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইবিতে প্রচারিত এক বিবৃতিতে দাবি করা হয়, দেশটির মহাকাশ বাহিনীর নিখুঁত হামলায় ঘাঁটিটির একটি ‘কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল

১ দিন আগে

কানাডার টরন্টোয় বন্দুক হামলা: নিহত ২, আহত ৫

সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানিয়েছে, হামলার সময় ঘটনাস্থলের কাছেই একটি জনপ্রিয় 'সালসা উৎসব' চলছিল। গুলির শব্দে উৎসবমুখর এলাকায় মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষ প্রাণভয়ে ছোটাছুটি শুরু করে। ঘটনার পর পরই হামলাকারী পালিয়ে যায়। তাকে গ্রেপ্তার করতে বিশাল অভিযান চালাচ্ছে স্থানীয় পুলিশ।

১ দিন আগে