
ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট পার্টির নেতারা। এ অভিযানকে ‘অবৈধ’ ও ‘অসাংবিধানিক’ বলে অভিহিত করেছেন তারা। কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, ট্রাম্পের এ পদক্ষেপ মার্কিন জনগণের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে।
শনিবার (৩ জানুয়ারি) ভোরে সরাসরি ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ভেনেজুয়েলায় অভিযান চালায় মার্কিন সামরিক বাহিনী। এ সময় নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়, রাখা হয় কুখ্যাত ব্রুকলিন কারাগারে। ট্রাম্প ঘোষণা দেন, এখন থেকে ভেনেজুয়েলাকে পরিচালনা করবে যুক্তরাষ্ট্র।
এ অভিযান নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে লাতিন আমেরিকার দেশগুলো। ইউরোপের দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া সে তুলনায় ছিল কিছুটা মৃদু। তবে খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই বিভিন্ন স্থানে মার্কিন আগ্রাসনবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে রাজপথে নেমে এসে ট্রাম্পের এমন নজিরবিহীন আগ্রাসনের তীব্র বিরোধিতা করেছেন সাধারণ মানুষ।
রোববার দিনভর মার্কিন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নেতারাও এ নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। বিশেষ করে ভিন দেশে সামরিক অভিযানের আগে কংগ্রেসকে অবহিত করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও ট্রাম্প তা না করায় তাদের ক্ষোভ আরও বেড়েছে।

শীর্ষ ডেমোক্র্যাট নেতারা বলছেন, কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার এ পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান লঙ্ঘন করেছে। ট্রাম্পের এ কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকেও দুর্বল করবে। জাতিসংঘের মহাসচিবসহ আন্তর্জাতিক মহলও এরই মধ্যে অভিযোগ তুলেছে, এই অভিযানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘ সনদের মৌলিক নীতি লঙ্ঘন করেছে।
গত মাসে ভেনেজুয়েলা পরিস্থিতি নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর দেওয়া একটি ব্রিফিংয়ের কথা উল্লেখ করে কানেকটিকাটের ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মারফি বলেন, ‘ওরা সরাসরি আমাদের মুখের ওপর মিথ্যা বলেছে। সেখানে বলা হয়েছিল এটি সরকার পরিবর্তনের বিষয় নয়, বরং একটি মাদকবিরোধী অভিযান। কিন্তু বাস্তবে সেটি যে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল, তা এখন স্পষ্ট।’
সিএনএনের স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন অনুষ্ঠানে মারফি ভেনেজুয়েলার ওই সামরিক অভিযানে শনিবার ভোরের পদক্ষেপকে ‘চরমভাবে অবৈধ’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘এই প্রশাসনকে বিশ্বাস করার কোনো উপায় নেই।’
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী যুদ্ধ ঘোষণা করার ক্ষমতা একমাত্র কংগ্রেসের। ১৯৭৩ সালের ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজ্যুলেশন’ অনুযায়ী, যেকোনো সামরিক অভিযানের জন্য প্রেসিডেন্টকে কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হয়। অথচ ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান ও মাদুরোকে আটক করার অভিযানের ক্ষেত্রে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত তথাকথিত ‘গ্যাং অব এইট’কেও জানানো হয়নি।
‘গ্যাং অব এইট’ মূলত কংগ্রেসের উভয় কক্ষে মার্কিন শীর্ষ দুই রাজনৈতিক দল থেকে দুজন করে প্রতিনিধি নিয়ে গঠিত, যাদের নির্বাহী বিভাগ থেকেই সবসময় গোপনীয় বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্য অবহিত করা হয়। এর একজন সদস্য হাউজ ইন্টেলিজেন্স কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য জিম হাইমস বলেন, ‘আমি এখনো কোনো ফোনকল পাইনি। আমি গ্যাং অব এইটের সদস্য, অথচ প্রশাসনের কেউ এখনো যোগাযোগ করেনি।’
মাদুরোর স্বৈরশাসন ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন নিয়ে ডেমোক্র্যাটরাও সোচ্চার। তবে তারা জোর দিয়ে বলেছেন, একতরফাভাবে ভেনেজুয়েলায় সামরিক হস্তক্ষেপ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। হাইমস এই অভিযানকে ‘সাম্রাজ্যবাদী অভিযান’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘এটি প্রশাসনের চরম আইনহীনতার আরেকটি উদাহরণ। এর মাধ্যমে ট্রাম্প বিপর্যয়ের পথ তৈরি করছেন এবং কংগ্রেসকে একেবারেই গুরুত্বহীন করে তুলছেন।’

ট্রাম্প ও তার ঘনিষ্ঠ মহল কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে এই অভিযান চালানোর যৌক্তিকতা তুলে ধরতে গিয়ে বলছে, এটি কোনো সামরিক হামলা নয়, বরং আইন প্রয়োগ ও মাদকবিরোধী একটি অভিযান। তবে যৌক্তিকভাবেই শীর্ষ ডেমোক্র্যাট নেতারা এ ব্যাখ্যাকে গ্রহণ করছেন না। তারা এ ব্যাখ্যাতে ‘ভণ্ডামি বলে অভিহিত করেছেন।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দাবি করেছেন, ভেনেজুয়েলার অভিযানটি যুদ্ধ নয়। তবে এর বিরোধিতা করে হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফ্রিজ এনবিসির এক মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানে বলেন, ‘এটি সরাসরি একটি যুদ্ধ। ডেলটা ফোর্স, সেনাবাহিনী, হাজার হাজার সৈন্য এবং অন্তত ১৫০টি সামরিক বিমান এতে অংশ নিয়েছে। এটি যুদ্ধ ছাড়া আর কিছুই নয়।’
কংগ্রেসকে উপেক্ষা করার ফলে আগামী সপ্তাহে মার্কিন সিনেটে একটি দ্বিদলীয় ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজ্যুলেশন’ নিয়ে ভোটের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। এ প্রস্তাবের উদ্দেশ্য— কংগ্রেসের স্পষ্ট অনুমোদন ছাড়া ভেনেজুয়েলায় ভবিষ্যতে আর কোনো সামরিক অভিযান চালাতে দেওয়া হবে না। প্রস্তাবটি সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাস হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ রিপাবলিকান সিনেটর র্যান্ড পলও এতে সমর্থনের কথা জানিয়েছেন।
সিনেটে ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার এ প্রস্তাবের অন্যতম উদ্যোক্তা। এবিসি নিউজের দিস উইক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘যদি এটি দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাস হয়, তাহলে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া প্রেসিডেন্ট ভেনেজুয়েলায় আর কিছুই করতে পারবেন না।’
শনিবারের অভিযান ও ট্রাম্পের ‘ভেনেজুয়েলা আপাতত যুক্তরাষ্ট্র চালাবে’— এই বক্তব্যকে শুমার ভয়াবহ পরিণতির ইঙ্গিত হিসেবে দেখেন। তিনি বলেন, ‘ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, এভাবে সরকার পরিবর্তন ও রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা করলে শেষ পর্যন্ত মার্কিন জনগণকে রক্ত ও অর্থ— দুটিরই উচ্চ মূল্য দিতে হয়।’
ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে শুমার বলেন, ২০২৪ সালের নির্বাচনি প্রচারে ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি ‘অন্তহীন যুদ্ধ বন্ধ’ করবেন। ট্রাম্প বারবার বলেছিলেন, আর কোনো অন্তহীন যুদ্ধ নয়। অথচ এখন আমরা কোনো আলোচনা বা বাধা ছাড়াই সরাসরি আরেকটি যুদ্ধে ঢুকে পড়ছি।

সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্রিস মারফি ট্রাম্পের সেই মন্তব্যের কথাও উল্লেখ করেন, যেখানে বলা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেবে। মারফির মতে, এতে মাদুরোকে সরানোর প্রকৃত উদ্দেশ্য স্পষ্ট—ট্রাম্প ও তার ঘনিষ্ঠদের আর্থিক লাভ।
মারফি বলেন, ভেনেজুয়েলা আসলে তার (ডোনাল্ড ট্রাম্প) বন্ধুদের জন্য অর্থ উপার্জনের বিষয়। ওয়াল স্ট্রিট ও তেল শিল্প সেখানে বিপুল অর্থ উপার্জন করতে পারে। আবারও দেখা যাচ্ছে, এই প্রেসিডেন্টের পররাষ্ট্রনীতি— ভেনেজুয়েলায় আগ্রাসন ও মাদুরোকে অপসারণ— মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য নয়, বরং তার নিজস্ব গোষ্ঠীকে অঢেল সম্পদশালী করার জন্য।
এদিকে শিকাগো, ডালাস, নিউইয়র্ক, ফিলাডেলফিয়া, পিটসবার্গ, সানফ্রান্সিসকো, সিয়াটলসহ যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় প্রায় সব শহরেই ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ করেছেন মার্কিন নাগরিকরা। তারা স্পষ্ট ভাষায় বলছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের তথাকথিত এ অভিযানের পক্ষে তারা নেই।
শিকাগোতে গণমাধ্যম এবিসির স্থানীয় একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে শিকাগো কমিটি এগেইনস্ট ওয়ার অ্যান্ড রেসিজমের অ্যান্ডি থায়ের বলেন, ইরাকের সাদ্দাম হোসেন, আফগানিস্তানে তালেবান কিংবা পানামা, লিবিয়া বা আরও অনেক নামের কথা বলা যায়। যখনই এসব দেশ বা এদের মতো অন্য কোনো দেশে যুক্তরাষ্ট্র হামলা করেছে, তখন কিন্তু সেখানকার সাধারণ মানুষজনকেই ব্যাপক দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।
কংগ্রেসকে এড়িয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি ভেনেজুয়েলায় অভিযান চালিয়ে সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন— এমন কথা সাধারণ মানুষরাও বলেছেন বিভিন্ন শহরের বিক্ষোভ থেকে। তারা বলছেন, এর মাধ্যমে ট্রাম্প বেপরোয়া হয়ে উঠছেন, যা ভবিষ্যতে আরও অনেক যুদ্ধের জন্ম দিতে পারে।
সিয়াটলে ‘অ্যানসার’ (অ্যাক্ট নাউ টু স্টপ ওয়ার অ্যান্ড এন্ড রেসিজম) নামে একটি গ্রুপ ভেনেজুয়েলায় অভিযানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ কর্মসূচি আয়োজন করে। সেখানে ‘নো ব্লাড ফর অয়েল’, ‘স্টপ বোম্বিং ভেনেজুয়েলা নাউ’সহ নানা ধরনের ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড নিয়ে হাজির হয়েছিলেন বিক্ষোভকারীরা। তারা জানান, অন্যান্য শহরেও তাদের আয়োজনে বিক্ষোভ কর্মসূচি চলছে।

অ্যানসার গ্রুপের একজন আয়োজক টেলর ইয়ং বলেন, আমাদের সরকার আমাদেরই করের টাকা ব্যবহার করে ভিন্ন একটি দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর হামলা করেছে। আমরা সেই দেশের নাগরিকদের প্রতি সংহতি জানাতে হাজির হয়েছি। আমরা সরাসরি হামলা বন্ধ করতে পারছি না। কিন্তু অন্তত আমরা সিয়াটলসহ অন্যান্য শহরে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট ভাষায় বলতে পারি, আমরা এসব হতে দিতে পারি না।
যুদ্ধবিরোধী সংগঠন কোড পিংকের সংগঠক অলিভিয়া ডিনুকি ফিলাডেলফিয়ার স্থানীয় একটি রেডিওতে বলেন, আমরা যুদ্ধ বাঁধাচ্ছি। আমরা গোলমাল তৈরি করছি। একই সঙ্গে আবার প্রতিবেশীদের অপহরণ করেও নিয়ে আসছি। যে জায়গাটি আমরা অস্থিতিশীল করে তুলছি, সেখানেই আবার তাদের ফিরিয়ে দিয়ে আসছি। এর অবসান ঘটানো প্রয়োজন।
নিকোলাস মাদুরোকে স্বৈরশাসক হিসেবে অভিহিত করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প এখন হামলা চালালেও যুক্তরাষ্ট্রের এর আগের প্রেসিডেন্টরাও মাদুরোকে নিয়ে একই ধরনের মনোভাব পোষণ করতেন। তবে মাদুরোকে রাখা হয়েছে যে ব্রুকলিন কারাগারে, সেই কারাগারের সামনেও তার মুক্তি চেয়ে বিক্ষোভ হয়েছে। সেখানে বিক্ষোভকারীরা ‘মাদুরোকে মুক্তি দাও’ স্লোগান দেন, মাদুরোর মুক্তি চেয়ে প্ল্যাকার্ডও প্রদর্শন করা হয়।
সূত্র: গার্ডিয়ান, এনবিসিসি, সিএনএন, বিবিসি

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট পার্টির নেতারা। এ অভিযানকে ‘অবৈধ’ ও ‘অসাংবিধানিক’ বলে অভিহিত করেছেন তারা। কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, ট্রাম্পের এ পদক্ষেপ মার্কিন জনগণের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে।
শনিবার (৩ জানুয়ারি) ভোরে সরাসরি ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ভেনেজুয়েলায় অভিযান চালায় মার্কিন সামরিক বাহিনী। এ সময় নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়, রাখা হয় কুখ্যাত ব্রুকলিন কারাগারে। ট্রাম্প ঘোষণা দেন, এখন থেকে ভেনেজুয়েলাকে পরিচালনা করবে যুক্তরাষ্ট্র।
এ অভিযান নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে লাতিন আমেরিকার দেশগুলো। ইউরোপের দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া সে তুলনায় ছিল কিছুটা মৃদু। তবে খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই বিভিন্ন স্থানে মার্কিন আগ্রাসনবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে রাজপথে নেমে এসে ট্রাম্পের এমন নজিরবিহীন আগ্রাসনের তীব্র বিরোধিতা করেছেন সাধারণ মানুষ।
রোববার দিনভর মার্কিন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নেতারাও এ নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। বিশেষ করে ভিন দেশে সামরিক অভিযানের আগে কংগ্রেসকে অবহিত করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও ট্রাম্প তা না করায় তাদের ক্ষোভ আরও বেড়েছে।

শীর্ষ ডেমোক্র্যাট নেতারা বলছেন, কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার এ পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান লঙ্ঘন করেছে। ট্রাম্পের এ কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকেও দুর্বল করবে। জাতিসংঘের মহাসচিবসহ আন্তর্জাতিক মহলও এরই মধ্যে অভিযোগ তুলেছে, এই অভিযানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘ সনদের মৌলিক নীতি লঙ্ঘন করেছে।
গত মাসে ভেনেজুয়েলা পরিস্থিতি নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর দেওয়া একটি ব্রিফিংয়ের কথা উল্লেখ করে কানেকটিকাটের ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মারফি বলেন, ‘ওরা সরাসরি আমাদের মুখের ওপর মিথ্যা বলেছে। সেখানে বলা হয়েছিল এটি সরকার পরিবর্তনের বিষয় নয়, বরং একটি মাদকবিরোধী অভিযান। কিন্তু বাস্তবে সেটি যে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল, তা এখন স্পষ্ট।’
সিএনএনের স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন অনুষ্ঠানে মারফি ভেনেজুয়েলার ওই সামরিক অভিযানে শনিবার ভোরের পদক্ষেপকে ‘চরমভাবে অবৈধ’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘এই প্রশাসনকে বিশ্বাস করার কোনো উপায় নেই।’
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী যুদ্ধ ঘোষণা করার ক্ষমতা একমাত্র কংগ্রেসের। ১৯৭৩ সালের ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজ্যুলেশন’ অনুযায়ী, যেকোনো সামরিক অভিযানের জন্য প্রেসিডেন্টকে কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হয়। অথচ ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান ও মাদুরোকে আটক করার অভিযানের ক্ষেত্রে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত তথাকথিত ‘গ্যাং অব এইট’কেও জানানো হয়নি।
‘গ্যাং অব এইট’ মূলত কংগ্রেসের উভয় কক্ষে মার্কিন শীর্ষ দুই রাজনৈতিক দল থেকে দুজন করে প্রতিনিধি নিয়ে গঠিত, যাদের নির্বাহী বিভাগ থেকেই সবসময় গোপনীয় বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্য অবহিত করা হয়। এর একজন সদস্য হাউজ ইন্টেলিজেন্স কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য জিম হাইমস বলেন, ‘আমি এখনো কোনো ফোনকল পাইনি। আমি গ্যাং অব এইটের সদস্য, অথচ প্রশাসনের কেউ এখনো যোগাযোগ করেনি।’
মাদুরোর স্বৈরশাসন ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন নিয়ে ডেমোক্র্যাটরাও সোচ্চার। তবে তারা জোর দিয়ে বলেছেন, একতরফাভাবে ভেনেজুয়েলায় সামরিক হস্তক্ষেপ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। হাইমস এই অভিযানকে ‘সাম্রাজ্যবাদী অভিযান’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘এটি প্রশাসনের চরম আইনহীনতার আরেকটি উদাহরণ। এর মাধ্যমে ট্রাম্প বিপর্যয়ের পথ তৈরি করছেন এবং কংগ্রেসকে একেবারেই গুরুত্বহীন করে তুলছেন।’

ট্রাম্প ও তার ঘনিষ্ঠ মহল কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে এই অভিযান চালানোর যৌক্তিকতা তুলে ধরতে গিয়ে বলছে, এটি কোনো সামরিক হামলা নয়, বরং আইন প্রয়োগ ও মাদকবিরোধী একটি অভিযান। তবে যৌক্তিকভাবেই শীর্ষ ডেমোক্র্যাট নেতারা এ ব্যাখ্যাকে গ্রহণ করছেন না। তারা এ ব্যাখ্যাতে ‘ভণ্ডামি বলে অভিহিত করেছেন।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দাবি করেছেন, ভেনেজুয়েলার অভিযানটি যুদ্ধ নয়। তবে এর বিরোধিতা করে হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফ্রিজ এনবিসির এক মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানে বলেন, ‘এটি সরাসরি একটি যুদ্ধ। ডেলটা ফোর্স, সেনাবাহিনী, হাজার হাজার সৈন্য এবং অন্তত ১৫০টি সামরিক বিমান এতে অংশ নিয়েছে। এটি যুদ্ধ ছাড়া আর কিছুই নয়।’
কংগ্রেসকে উপেক্ষা করার ফলে আগামী সপ্তাহে মার্কিন সিনেটে একটি দ্বিদলীয় ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজ্যুলেশন’ নিয়ে ভোটের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। এ প্রস্তাবের উদ্দেশ্য— কংগ্রেসের স্পষ্ট অনুমোদন ছাড়া ভেনেজুয়েলায় ভবিষ্যতে আর কোনো সামরিক অভিযান চালাতে দেওয়া হবে না। প্রস্তাবটি সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাস হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ রিপাবলিকান সিনেটর র্যান্ড পলও এতে সমর্থনের কথা জানিয়েছেন।
সিনেটে ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার এ প্রস্তাবের অন্যতম উদ্যোক্তা। এবিসি নিউজের দিস উইক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘যদি এটি দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাস হয়, তাহলে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া প্রেসিডেন্ট ভেনেজুয়েলায় আর কিছুই করতে পারবেন না।’
শনিবারের অভিযান ও ট্রাম্পের ‘ভেনেজুয়েলা আপাতত যুক্তরাষ্ট্র চালাবে’— এই বক্তব্যকে শুমার ভয়াবহ পরিণতির ইঙ্গিত হিসেবে দেখেন। তিনি বলেন, ‘ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, এভাবে সরকার পরিবর্তন ও রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা করলে শেষ পর্যন্ত মার্কিন জনগণকে রক্ত ও অর্থ— দুটিরই উচ্চ মূল্য দিতে হয়।’
ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে শুমার বলেন, ২০২৪ সালের নির্বাচনি প্রচারে ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি ‘অন্তহীন যুদ্ধ বন্ধ’ করবেন। ট্রাম্প বারবার বলেছিলেন, আর কোনো অন্তহীন যুদ্ধ নয়। অথচ এখন আমরা কোনো আলোচনা বা বাধা ছাড়াই সরাসরি আরেকটি যুদ্ধে ঢুকে পড়ছি।

সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্রিস মারফি ট্রাম্পের সেই মন্তব্যের কথাও উল্লেখ করেন, যেখানে বলা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেবে। মারফির মতে, এতে মাদুরোকে সরানোর প্রকৃত উদ্দেশ্য স্পষ্ট—ট্রাম্প ও তার ঘনিষ্ঠদের আর্থিক লাভ।
মারফি বলেন, ভেনেজুয়েলা আসলে তার (ডোনাল্ড ট্রাম্প) বন্ধুদের জন্য অর্থ উপার্জনের বিষয়। ওয়াল স্ট্রিট ও তেল শিল্প সেখানে বিপুল অর্থ উপার্জন করতে পারে। আবারও দেখা যাচ্ছে, এই প্রেসিডেন্টের পররাষ্ট্রনীতি— ভেনেজুয়েলায় আগ্রাসন ও মাদুরোকে অপসারণ— মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য নয়, বরং তার নিজস্ব গোষ্ঠীকে অঢেল সম্পদশালী করার জন্য।
এদিকে শিকাগো, ডালাস, নিউইয়র্ক, ফিলাডেলফিয়া, পিটসবার্গ, সানফ্রান্সিসকো, সিয়াটলসহ যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় প্রায় সব শহরেই ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ করেছেন মার্কিন নাগরিকরা। তারা স্পষ্ট ভাষায় বলছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের তথাকথিত এ অভিযানের পক্ষে তারা নেই।
শিকাগোতে গণমাধ্যম এবিসির স্থানীয় একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে শিকাগো কমিটি এগেইনস্ট ওয়ার অ্যান্ড রেসিজমের অ্যান্ডি থায়ের বলেন, ইরাকের সাদ্দাম হোসেন, আফগানিস্তানে তালেবান কিংবা পানামা, লিবিয়া বা আরও অনেক নামের কথা বলা যায়। যখনই এসব দেশ বা এদের মতো অন্য কোনো দেশে যুক্তরাষ্ট্র হামলা করেছে, তখন কিন্তু সেখানকার সাধারণ মানুষজনকেই ব্যাপক দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।
কংগ্রেসকে এড়িয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি ভেনেজুয়েলায় অভিযান চালিয়ে সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন— এমন কথা সাধারণ মানুষরাও বলেছেন বিভিন্ন শহরের বিক্ষোভ থেকে। তারা বলছেন, এর মাধ্যমে ট্রাম্প বেপরোয়া হয়ে উঠছেন, যা ভবিষ্যতে আরও অনেক যুদ্ধের জন্ম দিতে পারে।
সিয়াটলে ‘অ্যানসার’ (অ্যাক্ট নাউ টু স্টপ ওয়ার অ্যান্ড এন্ড রেসিজম) নামে একটি গ্রুপ ভেনেজুয়েলায় অভিযানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ কর্মসূচি আয়োজন করে। সেখানে ‘নো ব্লাড ফর অয়েল’, ‘স্টপ বোম্বিং ভেনেজুয়েলা নাউ’সহ নানা ধরনের ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড নিয়ে হাজির হয়েছিলেন বিক্ষোভকারীরা। তারা জানান, অন্যান্য শহরেও তাদের আয়োজনে বিক্ষোভ কর্মসূচি চলছে।

অ্যানসার গ্রুপের একজন আয়োজক টেলর ইয়ং বলেন, আমাদের সরকার আমাদেরই করের টাকা ব্যবহার করে ভিন্ন একটি দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর হামলা করেছে। আমরা সেই দেশের নাগরিকদের প্রতি সংহতি জানাতে হাজির হয়েছি। আমরা সরাসরি হামলা বন্ধ করতে পারছি না। কিন্তু অন্তত আমরা সিয়াটলসহ অন্যান্য শহরে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট ভাষায় বলতে পারি, আমরা এসব হতে দিতে পারি না।
যুদ্ধবিরোধী সংগঠন কোড পিংকের সংগঠক অলিভিয়া ডিনুকি ফিলাডেলফিয়ার স্থানীয় একটি রেডিওতে বলেন, আমরা যুদ্ধ বাঁধাচ্ছি। আমরা গোলমাল তৈরি করছি। একই সঙ্গে আবার প্রতিবেশীদের অপহরণ করেও নিয়ে আসছি। যে জায়গাটি আমরা অস্থিতিশীল করে তুলছি, সেখানেই আবার তাদের ফিরিয়ে দিয়ে আসছি। এর অবসান ঘটানো প্রয়োজন।
নিকোলাস মাদুরোকে স্বৈরশাসক হিসেবে অভিহিত করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প এখন হামলা চালালেও যুক্তরাষ্ট্রের এর আগের প্রেসিডেন্টরাও মাদুরোকে নিয়ে একই ধরনের মনোভাব পোষণ করতেন। তবে মাদুরোকে রাখা হয়েছে যে ব্রুকলিন কারাগারে, সেই কারাগারের সামনেও তার মুক্তি চেয়ে বিক্ষোভ হয়েছে। সেখানে বিক্ষোভকারীরা ‘মাদুরোকে মুক্তি দাও’ স্লোগান দেন, মাদুরোর মুক্তি চেয়ে প্ল্যাকার্ডও প্রদর্শন করা হয়।
সূত্র: গার্ডিয়ান, এনবিসিসি, সিএনএন, বিবিসি

মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দেশটির অন্যতম প্রভাবশালী নেতা মাহাথির মোহাম্মদ ঘরের মধ্যে পড়ে গেছেন। এ ঘটনায় মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
১৩ ঘণ্টা আগে
জাপান টাইমসের খবরে বলা হয়, স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ১৮ মিনিটে প্রথমে ৬ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পটি হয়। কিছুক্ষণ পরই ৫ দশমিক ১ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে আক্রান্ত অঞ্চল। এরপর বেশ কয়েকবার ছোট ছোট আফটারশক হয়।
১৪ ঘণ্টা আগে
ফক্স নিউজের উপস্থাপক শন হ্যানিটিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মাচাদো বলেন, ‘আমি যত দ্রুতসম্ভব ভেনেজুয়েলায় ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা করছি।’ বক্তব্য দিলেও নিজের অবস্থান ফক্স টিভিকে জানাননি মাচাদো।
১৪ ঘণ্টা আগে
ভেনেজুয়েলার পার্লামেন্টের অধিবেশনে শপথ গ্রহণের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্রের হেফাজত থেকে মাদুরোর মুক্তির দাবি তোলা হয়। শপথের পর রদ্রিগেজ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানে স্বামী-স্ত্রী নিকোলাস মাদুরো ও সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করার ঘটনাকে তিনি ‘অপহরণ’ হিসেবে দেখছেন।
১৪ ঘণ্টা আগে