ইসলামাবাদ টকস— প্রথম পর্বের বৈঠক শেষে লিখিত শর্ত বিনিময়

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
শনিবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রথম পর্বের আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আলোচনার ভেন্যু ছিল হোটেল সেরেনা। ছবি: সিনহুয়া

রাজধানী ইসলামাবাদে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বহুল প্রতীক্ষিত আলোচনার প্রথম পর্ব শেষ হয়েছে। ‘ইসলামাবাদ টকস’ নামে এ আলোচনায় দুপক্ষের মধ্যে ঘণ্টাব্যাপী মুখোমুখি বৈঠকের পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষজ্ঞ দল লিখিত প্রস্তাব ও নথি বিনিময় করেছে।

এর আগে ইরান সরকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানায়, ‘বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে’ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আলোচনায় অর্থনৈতিক, সামরিক, আইনি ও পারমাণবিক— এই চারটি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন।

তেহরান আরও জানায়, ইসলামাবাদের সেরেনা হোটেলে এখনো আলোচনা চলছে এবং কারিগরি বিষয়গুলো চূড়ান্ত করতে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

কাতারের গণমাধ্যম আল জাজিরা, ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি ও পাকিস্তানের গণমাধ্যম ডন ও ইরানের তাসনিম নিউজের খবরে বলা হয়েছে, শনিবার (১১ এপ্রিল) পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের সেরেনা হোটেলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম দিনের আলোচনা শেষে ইরানের বার্তায় আশা করা হচ্ছে, আলোচনা রোববারও (১২ এপ্রিল) অব্যাহত থাকবে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া সংঘাত মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। যুদ্ধের শুরুতেই ইরান বৈশ্বিক জ্বালানি তেল পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌ রুট হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় এ যুদ্ধের ধাক্কা লাগে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও।

৪০ দিন পর গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা ও তাতে ইরানের সায়ে যুদ্ধে বিরতি পড়েছে। অস্থায়ী সে যুদ্ধবিরতিকে স্থায়ী রূপ দিতে এবং ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি স্থায়ী সমাধান আনার লক্ষ্যেই পাকিস্তান আয়োজন করেছে আলোচনা।

এ আলোচনায় ইরানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে রয়েছেন দেশটির জাতীয় সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিসহ শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা রয়েছেন এ প্রতিনিধি দলে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। তার সঙ্গে রয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জামাতা জ্যারেড কুশনার। শেষোক্ত দুজন এবারের যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে আগে ওমানের মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনায় নেতৃত্বে দিয়েছেন।

প্রথম দিনে ইসলামাবাদে দুপক্ষের মধ্যে আলোচনা চলাকালে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্টে বলেন, ইরানের প্রতিনিধি দল জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় ‘সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ’ থাকবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, তারা ‘সাহসিকতার সঙ্গে’ আলোচনা করবে এবং ফল যাই হোক, সরকার জনগণের পাশে থাকবে।

শেহবাজের সঙ্গে দুপক্ষের পৃথক বৈঠক

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের মধ্যে মুখোমুখি আলোচনার আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ দুপক্ষের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন।

ইরানি প্রতিনিধি দলের প্রধান ও দেশটির জাতীয় সংসদের স্পিকার বাঘের গালিবাফকে স্বাগত জানান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। ছবি: পিএমও পাকিস্তান
ইরানি প্রতিনিধি দলের প্রধান ও দেশটির জাতীয় সংসদের স্পিকার বাঘের গালিবাফকে স্বাগত জানান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। ছবি: পিএমও পাকিস্তান

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ইসলামাবাদ টকসে ইরানের অংশগ্রহণকে স্বাগত জানান শেহবাজ শরিফ। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে ইতিবাচক ফলাফল অর্জনে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তার আন্তরিক ভূমিকা অব্যাহত রাখবে বলে প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।

বৈঠকে পাকিস্তানের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার, প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসিম মুনির এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন রাজা নকভি।

মার্কিন প্রতিনিধি দলের প্রধান ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সকে স্বাগত জানান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। ছবি: পিএমও পাকিস্তান
মার্কিন প্রতিনিধি দলের প্রধান ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সকে স্বাগত জানান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। ছবি: পিএমও পাকিস্তান

এরপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের সঙ্গেও পৃথক বৈঠক করেন শেহবাজ শরিফ। তার কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানায়, দুপক্ষের গঠনমূলক আলোচনায় অংশগ্রহণের প্রতিশ্রুতিকে স্বাগত জানিয়ে শেহবাজ শরিফ আশা প্রকাশ করেন, এ আলোচনা অঞ্চলে টেকসই শান্তির পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে পাকিস্তান উভয় পক্ষকে সহায়তা করে অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অগ্রগতি সাধনে ভূমিকা রাখতে আগ্রহী।

ইসলামাবাদে প্রতিনিধি দলের আগমন

এর আগে লেবাননে ইসরায়েলি হামলা নিয়ে শেষ মুহূর্তের জটিলতা কাটার পর শনিবার ভোরে ইসলামাবাদে পৌঁছায় ইরানি প্রতিনিধি দল। তেহরান শর্ত দিয়েছিল— লেবাননে হামলা বন্ধ না হলে তারা আলোচনায় বসবে না।

ইরানি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, ইরানের প্রতিনিধি দলে স্পিকার গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি ছাড়াও রয়েছেন সুপ্রিম ন্যাশনাল ডিফেন্স কাউন্সিলের সচিব আলি আকবর আহমাদিয়ান ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদুলনাসের হিম্মাতি।

মার্কিন প্রতিনিধি দল পাকিস্তানে পৌঁছায় ইরানি প্রতিনিধি দলের পরে। শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার কিছু পর নূর খান এয়ারবেজে পৌঁছান মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। তাকে স্বাগত জানান ইসহাক দার, মহসিন নকভি ও অসিম মুনির।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় বিরোধ যেসব বিষয় নিয়ে

৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি ও এরপর পাকিস্তানে দুপক্ষের আলোচনার সূচি ঘোষণার পরপরই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বেশ কয়েকটি বিষয় নিয়ে বড় ধরনের মতপার্থক্য দেখা দেয়। ইরান জানায়, লেবাননে যুদ্ধবিরতি ও বিদেশে জব্দ থাকা প্রায় ৭০০ কোটি ডলারের সম্পদ মুক্তির নিশ্চয়তা না পেলে তারা আলোচনায় অংশ নেবে না।

তেহরান বলছে, যুদ্ধবিরতি সব ফ্রন্টে কার্যকর হতে হবে, যার মধ্যে হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইসরায়েলের সংঘাতও রয়েছে। তবে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরপরই লেবাননে হামলা চালায় ইসরায়েল, যা অব্যাহত থাকে পরের দিনগুলোতেও। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল জানায়, লেবানন এ যুদ্ধবিরতির অন্তর্ভুক্ত নয়।

ইরানের সঙ্গে এ নিয়ে বিরোধের কারণে আলোচনা নিয়েই অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। ইসলামাবাদে যখন আলোচনার জন্য দুপক্ষের প্রতিনিধি দল উপস্থিত, তখনো লেবাননে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। শেষ পর্যন্ত অবশ্য এ ইস্যুটি জিইয়ে রেখেই আলোচনায় অংশ নিয়েছে দুপক্ষ। তবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমাধানে পৌঁছাতে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে রয়ে গেছে আরও কিছু ইস্যু।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধতা, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ন্ত্রণ ও পারমাণবিক উপাদান সরিয়ে নেওয়ার দাবি তুলতে পারে। অন্যদিকে ইরান চায় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বেসামরিক ব্যবহারের জন্য পারমাণবিক অধিকার স্বীকৃতি, হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও জব্দ সম্পদে প্রবেশাধিকার।

এ ছাড়া আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং কে আগে ছাড় দেবে— এসব ইস্যুও বড় বাধা হিসেবে রয়েছে।

সতর্ক প্রত্যাশা

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রায় পাঁচ দশক ধরে বিরোধ যেভাবে নানা ইস্যুতে বিস্তৃত হয়েছে, তাতে স্বল্প সময়ের আলোচনায় বড় অগ্রগতি আসা কঠিন। তারপরও ইসলামাবাদের এ আলোচনা ভবিষ্যৎ আলোচনার পথ তৈরি করতে পারে বা অন্তত তাৎক্ষণিক উত্তেজনা কমাতে কিছু সীমিত সমঝোতার পথ উন্মুক্ত করতে পারে।

ইরান যুদ্ধ যেভাবে জ্বালানি সংকট প্রকট করে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলেছে, তাতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এমন কোনো সাময়িক সমঝোতাকেও স্বাগত জানাতে মুখিয়ে রয়েছে গোটা বিশ্ব।

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

ইরানের শর্তে ইঙ্গিত— জটিল হতে যাচ্ছে আলোচনা

পল অ্যাডামস বলছেন, গত এক বছরে আলোচনার চালাকালে দুবার হামলার শিকার হওয়ার কারণে ইরান এখন নিশ্চয়তা চায়, যেন ভবিষ্যতে আবার এমন হামলা না হয়। তবে বাস্তবতা হলো— কেউই খুব একটা বিশ্বাস করে না যে এসব বড় বড় সমস্যার সমাধান ইসলামাবাদে বসে হয়ে যাবে।

১০ ঘণ্টা আগে

শেহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন জে ডি ভ্যান্স: হোয়াইট হাউজ

মার্কিন প্রতিনিধিদলের হয়ে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে মূল বৈঠকে বসার আগে জে ডি ভ্যান্স পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় অংশ নিলেন। বৈঠকে ভ্যান্সের সঙ্গে আরও ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার।

১০ ঘণ্টা আগে

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করল ইরানি প্রতিনিধিদল

বৈঠকে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও উপস্থিত ছিলেন। তবে বৈঠকের বিস্তারিত সম্পর্কে এখনো কিছু জানানো হয়নি।

১০ ঘণ্টা আগে

যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ‘পূর্ণ অবিশ্বাস’ নিয়ে আলোচনায় বসছে ইরান: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ‘পূর্ণ অবিশ্বাস’ নিয়ে ইরান আলোচনায় বসছে বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়েডফুলের সঙ্গে আলাপকালে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ মন্তব্য করেন।

১১ ঘণ্টা আগে