১৯৬১ সালের তুলনায় ৬ গুণ বেশি মুরগির মাংস খাচ্ছে মানুষ

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ০৬ জুন ২০২৬, ০১: ২৯
১৯৬১ সালে মাথাপিছু মুরগির মাংসের সরবরাহ ছিল ৩ কেজিরও কম, যা ২০২২ সালে বেড়ে প্রায় ১৭ কেজিতে পৌঁছেছে। ফাইল ছবি

বর্তমান প্রজন্মের একজন মানুষ তার দাদা-দাদিদের প্রজন্মের তুলনায় গড়ে প্রায় ছয় গুণ বেশি মুরগির মাংস এবং দ্বিগুণ পরিমাণ শুকরের মাংস খাচ্ছেন। জাতিসংঘের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এই তথ্য জানিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৬০ বছরে বিশ্বব্যাপী মাংসের সরবরাহ চার গুণ বেড়েছে এবং এই বৃদ্ধির ধারা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) উপাত্ত অনুযায়ী, ১৯৬১ সালে বিশ্বব্যাপী মাথাপিছু মুরগির মাংসের সরবরাহ ছিল ৩ কেজির নিচে, যা ২০২২ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ১৭ কেজিতে। একই সময়ে শুকরের মাংসের সরবরাহ দ্বিগুণ হয়ে মাথাপিছু ১৫ কেজিতে পৌঁছেছে। অন্যদিকে, গরুর মাংসের সরবরাহ মাথাপিছু ৯ কেজিতে অপরিবর্তিত রয়েছে।

৫ দশকের ব্যবধানে বিভিন্ন ধরনের মাংস উৎপাদনের চিত্র। তথ্যসূত্র: জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রতিবেদন। গ্রাফিক্স: রাজনীতি ডটকম
৫ দশকের ব্যবধানে বিভিন্ন ধরনের মাংস উৎপাদনের চিত্র। তথ্যসূত্র: জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রতিবেদন। গ্রাফিক্স: রাজনীতি ডটকম

বিশ্ব অর্থনীতিতে পরিবেশ দূষণের পেছনে দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত হলো কৃষি। মাংসের সরবরাহ ও চাহিদার নিয়ামকগুলোর ওপর বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনার পর এফএও পূর্বাভাস দিয়েছে যে, আগামী এক দশকে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য দায়ী গ্যাস নির্গমনের পরিমাণ আরও ৭.৬% বাড়বে। আর এই বৃদ্ধির প্রায় ৮০ শতাংশেরই উৎস গবাদিপশু পালন খাত।

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ১৯৬১ সালে বিশ্বব্যাপী মাথাপিছু মাংসের গড় সরবরাহ যেখানে ছিল ২৫ কেজি, ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭ কেজিতে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, উৎপাদিত মাংস ও দুধের প্রায় ১৪ শতাংশই উৎপাদন প্রক্রিয়া চলাকালে অথবা সুপারমার্কেট ও রেস্তোরাঁয় পৌঁছানোর পর অপচয় হয়।

উন্নত দেশের চিকিৎসক ও জলবায়ু বিজ্ঞানীরা যেখানে মাংস খাওয়ার পরিমাণ কমানোর পরামর্শ দিচ্ছেন, সেখানে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকা এই দেশগুলোতে মানুষের আয়ের তুলনায় প্রাণিজ খাদ্যের দাম অনেক বেশি।

উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে সুপারমার্কেট ও রেস্তোরাঁয় পৌঁছানোর পর পর্যন্ত মোট মাংস ও দুধের প্রায় ১৪ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায় বা অপচয় হয়। ফাইল ছবি: সংগৃহীত
উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে সুপারমার্কেট ও রেস্তোরাঁয় পৌঁছানোর পর পর্যন্ত মোট মাংস ও দুধের প্রায় ১৪ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায় বা অপচয় হয়। ফাইল ছবি: সংগৃহীত

এফএওর গবাদিপশু উন্নয়ন কর্মকর্তা এবং এই প্রতিবেদনের সহলেখক দানিয়েলা বাত্তাগ্লিয়া বলেন, ‘আঞ্চলিক বণ্টন এবং মাংস প্রাপ্তির সুযোগ এখনো অত্যন্ত বৈষম্যমূলক। উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে মাংসের ব্যবহার যেমন অনেক বেশি এবং স্থিতিশীল, তেমনি নিম্ন আয়ের দেশগুলোর মানুষ এখনো অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে পর্যাপ্ত প্রাণিজ খাদ্য কিনতে পারছে না।’

জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আন্তঃসরকারি প্যানেল (আইপিসিসি) জানিয়েছে, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানোর জন্য সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি হলো মাংসনির্ভর খাদ্যভ্যাস থেকে উদ্ভিজ্জ বা শাকসবজিপ্রধান খাদ্যভ্যাসে অভ্যস্ত হওয়া। মাংস ও দুগ্ধ শিল্পখাত এবং বাইরের গবেষকদের দ্বারা পর্যালোচিত এই এফএও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ধনী দেশগুলো প্রাণিজ পণ্যের ‘অতিরিক্ত ব্যবহার’ বাড়াচ্ছে। তবে প্রতিবেদনে তাদেরকে মাংস খাওয়া কমানোর কোনো সরাসরি সুপারিশ করা হয়নি।

স্টকহোম এনভায়রনমেন্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ক্লিও ভারকুইজল (যিনি এই প্রতিবেদন তৈরির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না) বলেন, ‘এই প্রতিবেদনটি সমস্যাটিকে খুব স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে ঠিকই, কিন্তু মূল সমাধানে এসে থমকে গেছে।’

এর আগেও জলবায়ু বিষয়ক কর্মপরিকল্পনায় মাংসের ব্যবহার কমানোর বিষয়টি ‘রহস্যজনকভাবে’ বাদ দেওয়া, গবাদিপশুর নিঃসরণ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে মাংস কমানোর পরিবেশগত সুবিধাকে খাটো করে দেখানো এবং বৈজ্ঞানিক সমালোচনাগুলোকে এড়িয়ে যাওয়ার কারণে এফএও বিজ্ঞানীদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিল। এক গবেষক একে ‘দেয়ালে মাথা ঠোকার’ মতো পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করেছেন।

অবশ্য গবাদিপশু কীভাবে খাদ্য নিরাপত্তা, টেকসই খাদ্য ব্যবস্থা এবং পুষ্টির চাহিদা পূরণে অবদান রাখছে, তা বিশদভাবে মূল্যায়ন করার জন্যই এই সর্বশেষ প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। এফএও জানিয়েছে, পরিবেশগত টেকসইতার বিষয়টি আরও বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করে চলতি বছরের শেষের দিকে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।

ভারকুইজল মনে করেন, মূল সমস্যাটি নীতিমালার উদ্দেশ্য নিয়ে। তিনি বলেন, ‘প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে নীতিপ্রণেতাদের এটি বোঝাতে যে, পুষ্টিকর খাবার হিসেবে প্রাণিজ খাদ্যের ইতিবাচক অবদান কীভাবে বাড়ানো যায়। খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য এই দৃষ্টিভঙ্গি ঠিক হতে পারে, কিন্তু ধনী দেশগুলোর জন্য এটি একেবারেই ভুল প্রেক্ষাপট। কারণ সেখানে স্বাস্থ্য ও পরিবেশের স্বার্থেই মাংসের ব্যবহার কমানো জরুরি।’

নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির খাদ্য ব্যবস্থাবিষয়ক গবেষক ম্যাথিউ হায়েকও এই প্রতিবেদনের সমালোচনা করে বলেন, ধনী দেশগুলোতে অতিরিক্ত মাংস ব্যবহারের প্রভাব এবং তা কমানোর জলবায়ুগত সুবিধাকে এখানে ‘কৌশলে এড়িয়ে যাওয়া’ হয়েছে। এর আগের এফএও প্রতিবেদনে নিজের গবেষণার সূত্র ব্যবহার করা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন তিনি।

হায়েক আরও বলেন, ‘এফএওর প্রতিবেদনে পরিবেশগত সমস্যাগুলোকে কেবল গ্রাহকদের দৃষ্টিভঙ্গি বা ভবিষ্যতের গবেষণার বিষয় হিসেবে দেখিয়েছেন। এই উপস্থাপনা সেই বিশাল বৈজ্ঞানিক প্রমাণকে আড়াল করে, যা স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে অতিরিক্ত মাংস খাওয়ার ফলে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে এবং স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।’

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন সৃষ্টিকারী গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের ১২ থেকে ২০ শতাংশের জন্য দায়ী এবং জীববৈচিত্র্য হ্রাসের অন্যতম প্রধান কারণ প্রাণিসম্পদভিত্তিক কৃষি। ফাইল ছবি: সংগৃহীত
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন সৃষ্টিকারী গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের ১২ থেকে ২০ শতাংশের জন্য দায়ী এবং জীববৈচিত্র্য হ্রাসের অন্যতম প্রধান কারণ প্রাণিসম্পদভিত্তিক কৃষি। ফাইল ছবি: সংগৃহীত

শিল্প বিপ্লবের পর থেকে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো এবং প্রকৃতি ধ্বংসের কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা ইতোমধ্যে প্রায় ১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। গবাদিপশু পালন খাত একাই বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য দায়ী গ্যাস নির্গমনের ১২ থেকে ২০ শতাংশের জন্য দায়ী এবং এটি জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের অন্যতম প্রধান কারণ।

তবে সমালোচনার জবাবে বাত্তাগ্লিয়া বলেন, এফএওর কাজ সম্পূর্ণ তথ্য-প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে করা হয় এবং ভিন্ন ভিন্ন বিজ্ঞানীদের মতামত ভিন্ন হতেই পারে। নীতিপ্রণেতাদের প্রতি তাদের বার্তা হলো— গবাদিপশু পালন বন্ধ করা নয়, বরং মাংস উৎপাদনের ফলে সৃষ্ট ক্ষতিকর দিক যেমন রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট হওয়া (অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স) এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কীভাবে কমানো যায়, সেদিকে নজর দেওয়া।

তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমাদের কাছে নির্গমন উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর মতো প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং জ্ঞান রয়েছে। এটি আসলে একটি ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়। প্রাণিজ খাদ্য এখনো পুষ্টির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত নেতিবাচক প্রভাব কমিয়ে ইতিবাচক দিকগুলোকে সর্বোচ্চ কাজে লাগানো।’

রাজনীতি/আইআর

Ad
Ad
ad
ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

জার্মানির স্যাক্সনি-আনহাল্টে এএফডির ঐতিহাসিক জয়, মের্ৎসের দলে ধাক্কা

চূড়ান্ত ফলে ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পেয়ে রাজ্য পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রথম হয়েছে এএফডি। বিপরীতে মের্ৎসের সিডিইউ পেয়েছে মাত্র ১৭ দশমিক ২ শতাংশ ভোট। এ ভোটকে সিডিইউয়ের জন্যও বড় ধাক্কা মনে করা হচ্ছে।

১২ ঘণ্টা আগে

মালয়েশিয়ায় পাসপোর্ট-ভিসাহীনদেরও আইনিভাবে দেশে ফেরার সুযোগ

তরিকুল ইসলাম বলেন, অনিয়মিত বা নথিবিহীন বিদেশি অভিবাসীদের জন্য বর্তমানে ‘মাইগ্র্যান্ট রিপেট্রিয়েশন প্রোগ্রাম ২’ (বিআরএম২.০) নামে মালয়েশিয়ার সরকারের মাইগ্রেশন বিভাগের একটি বিশেষ কর্মসূচি চালু রয়েছে। এই কর্মসূচির আওতায় মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত অনিয়মিত বা নথিবিহীন বিদেশি নাগরিক বা কর্মীরা আইনসম্মতভা

১৩ ঘণ্টা আগে

পুতিন-জেলেনস্কির মাঝে ফের ট্রাম্প প্রশাসন, মিলবে কি যুদ্ধবিরতি?

মার্কিন এই কূটনৈতিক তৎপরতা সত্ত্বেও মস্কো এখনো যুদ্ধের মূল কারণ হিসেবে যে বিষয়গুলো তুলে ধরে আসছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে বড় কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। রাশিয়া ইউক্রেনের দখল করা ভূখণ্ড নিয়ে নিজেদের দাবি, ইউক্রেনের সামরিক ও কৌশলগত অবস্থান এবং দেশটির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কঠোর অব

১৪ ঘণ্টা আগে

দিল্লিতে পিজি ভবন ধসে নিহত ৩, ধ্বংসস্তূপে বহু শিক্ষার্থী আটকে থাকার শঙ্কা

পুলিশ জানিয়েছে, ভবনটি প্রায় ৪০ থেকে ৫০ বছরের পুরোনো ছিল। এতে একটি বেজমেন্টের ওপর পাঁচটি তলা ছিল এবং সেটি পিজি আবাসন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। ভবনের বেজমেন্টে সংস্কার ও খননকাজ চলছিল। ধারণা করা হচ্ছে, সেই কাজের সময় ভবনের একটি স্তম্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পুরো কাঠামোটি ধসে পড়ে। তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্তের

১ দিন আগে
Advertisement