জাতিসংঘ অধিবেশনে হরমুজ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার ইঙ্গিত ইরানের

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
নিউইয়র্কের উদ্দেশে তেহরানের মেহরাবাদ বিমানবন্দর ছাড়ার আগে কথা বলছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ তুলে নিলে কয়েক দিনের মধ্যেই উপসাগরীয় দেশগুলোর জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার কথা বিবেচনা করতে পারে ইরান। ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে এ কথা জানিয়েছেন। জাতিসংঘের এবারের সমাবেশকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা নতুন করে শুরুর ‘সোনালি সুযোগ’ হিসেবেও বর্ণনা করেছেন তিনি।

নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের। গত ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করার পর এই প্রথম তারা একই অনুষ্ঠানে থাকবেন।

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) রয়টার্সের খবরে বলা হয়, ইরানের ওই কর্মকর্তা বলেন, আলোচনা আবার শুরুর জন্য ইরানের প্রতিনিধি দলের পূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে। তবে ট্রাম্প ও পেজেশকিয়ানের মধ্যে সরাসরি কোনো বৈঠকের পরিকল্পনা নেই।

গত জুলাইয়ের পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আর কোনো মুখোমুখি বৈঠক হয়েছে বলে জানা যায়নি। ওই সময় যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তিতে পৌঁছেছিল দুই দেশ। ট্রাম্প ও পেজেশকিয়ান চুক্তিতে সই করার কয়েক সপ্তাহ পরই সেটি ভেস্তে যায়।

ইরানের ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রকে ঘোষণা দিতে হবে যে তারা কূটনৈতিকভাবে এই সমস্যার সমাধান করতে চায়। বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানাতে হবে। এরপর আলোচনা কীভাবে এগোবে, সে বিষয়ে একটি সময়সূচিতে একমত হতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিতে ফিরে আসার সোনালি সুযোগ রয়েছে।’ তার ভাষ্য, গত ১৬ সেপ্টেম্বর মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের কাছে ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এনবিসির ‘টুডে’ অনুষ্ঠানে বলেছেন, সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ইরানের সঙ্গে কথা বলতে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত। তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে যদি এর মাধ্যমে ইতিবাচক কিছু অর্জনের সম্ভাবনা থাকে এবং শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব হয়, তাহলে আলোচনায় বসতে যুক্তরাষ্ট্র আগ্রহী।’

যুদ্ধের প্রভাব বাড়ায় ঝুঁকিতে সৌদি আরব

রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার উপসাগরীয় ছয় আরব দেশের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে ট্রাম্পের। দেশগুলো হলো বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, ওমান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।

উপসাগরীয় দেশগুলো হরমুজ প্রণালিতে আবার জাহাজ চলাচল শুরু করতে চায়। তবে তাদের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়েও তারা সতর্ক।

ওমান ছাড়া সব দেশেই যুক্তরাষ্ট্রের বড় সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর এসব ঘাঁটি বারবার ইরানের হামলার লক্ষ্য হয়েছে। এতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কয়েক দশকের পুরোনো নিরাপত্তা অংশীদারত্বও চাপে পড়েছে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় অর্থনীতি সৌদি আরবও চলতি মাসে আরও গভীরভাবে এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। ইরানের মিত্র হুতি যোদ্ধারা ইয়েমেনে অগ্রসর হয়ে সৌদি-সমর্থিত সরকারের বাহিনীকে পিছু হটতে বাধ্য করেছে। একই সঙ্গে তারা লোহিত সাগর দিয়ে সৌদি আরবের তেল রপ্তানির পথও হুমকির মুখে ফেলেছে।

রয়টার্সকে কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, মঙ্গলবার সৌদি আরব তার ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের কার্যক্রম আবার শুরু করেছে। এতে তেলের বাজারে কিছুটা স্বস্তি দেখা গেছে। লোহিত সাগরের বন্দর ইয়ানবু থেকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কম পরিমাণে হলেও তেল রপ্তানি আবার শুরু করতে পারে দেশটি।

হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধের কারণে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে তা এড়িয়ে তেল রপ্তানির জন্য সৌদি আরবের প্রধান বিকল্প পথ এই পাইপলাইন। গত ১০ সেপ্টেম্বর হামলার পর এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। হামলার জন্য ইরানের মিত্র ইরাকি গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করেছিল রিয়াদ।

ইয়েমেনে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীকে পিছু হটিয়ে হুতিরা বাব আল-মান্দেব প্রণালি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যেও এগোচ্ছে। লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত এই প্রণালির পাশাপাশি তারা সৌদি আরবের ওপরও সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।

গত বছর দুই মাস ধরে হুতিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের পক্ষ থেকে হুতিদের বিরুদ্ধে আবারও যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে অংশ নেওয়ার জন্য বারবার আহ্বান জানানো হলেও এখন পর্যন্ত তা প্রত্যাখ্যান করেছে ওয়াশিংটন।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোববার শেষ মুহূর্তে হুতিদের ওপর মার্কিন হামলার পরিকল্পনা বাতিল করেন ট্রাম্প। এর আগে মার্কিন সেনারা যুদ্ধবিমানগুলোতে বোমা তোলার কাজ শুরু করে দিয়েছিল।

কাতারের প্রস্তাব আলোচনার টেবিলে

উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতাদের সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠকে কাতারের একটি প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে। আঞ্চলিক কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, ইরান ও আরব উপসাগরীয় দেশগুলোকে একটি অভিন্ন নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় আনার জন্য এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

রোববার নিউইয়র্কে কাতার ইকোনমিক ফোরামে দেওয়া বক্তব্যে কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল-থানি বলেন, এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা করতে হলে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে হবে। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরশীলতাও বাড়াতে হবে।

শেখ মোহাম্মদ বলেন, ‘বারবার উত্তেজনা ও পাল্টা প্রতিশোধের চক্রের মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। এমন কোনো ব্যবস্থাও গ্রহণযোগ্য নয়, যেখানে কোনো একটি দেশকে স্থায়ীভাবে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রাখা হয়।’

এ বিষয়ে রয়টার্সকে ওই অঞ্চলের আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, কাতারের প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছে ইরান।

এদিকে ইয়েমেনে হুতি যোদ্ধারা কাহবুব পর্বতমালার কৌশলগত উচ্চভূমি দখলের চেষ্টা চালাচ্ছে। এর মাধ্যমে তারা লোহিত সাগরের উপকূলকে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা অবশিষ্ট এলাকাগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চায়।

কাহবুব এলাকা ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির দিকে নজরদারির সুবিধা দেয়। এটি দখলে নিতে পারলে হুতিরা ওই দুই এলাকার ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে পারে। দুর্গম ভূপ্রকৃতির কারণে উপকূলীয় সমতলের তুলনায় ড্রোন ও বিমান হামলা থেকে হুতি যোদ্ধাদের লুকিয়ে থাকাও এখানে সহজ।

চলতি মাসে এই লড়াইয়ের কারণে এরই মধ্যে ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা মঙ্গলবার জানিয়েছে, আরও কয়েক হাজার মানুষকে তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে হতে পারে।

Ad
Ad
ad
ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

নেপালে আকস্মিক বন্যা: মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়াতে পারে

নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় মৃতের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজারে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন দেশটির অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলে। তার মতে, এবারের বন্যায় প্রাণহানি ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।

৭ ঘণ্টা আগে

জাতিসংঘে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন ট্রাম্প, আলোচনায় ইরান-ইউক্রেন যুদ্ধ

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) দিনের শুরুতেই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে উপস্থিত প্রতিনিধিদের উদ্দেশে ভাষণ দেবেন ট্রাম্প। এরপর দ্বিপক্ষীয় ও দলীয় বৈঠক মিলিয়ে অন্তত ১১ জন বিশ্বনেতার সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হওয়ার কথা রয়েছে।

৮ ঘণ্টা আগে

ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রি বন্ধে চাপ দিতে পারেন জিনপিং

চীন নিয়মিতই তাইওয়ান ইস্যুকে তাদের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বিষয় হিসেবে তুলে ধরে। বেইজিং তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে মনে করে। তাইওয়ানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রি বন্ধের দাবিও চীন বারবার জানিয়ে আসছে।

১১ ঘণ্টা আগে

সৌদি আরবকে ‘প্রতিরক্ষামূলক’ সামরিক সহায়তা দেবে যুক্তরাজ্য

যুক্তরাজ্যের কর্মকর্তারা বলছেন, সৌদি সরকার যেন আগামীতে ওই ধরনের হামলা প্রতিহত করতে পারে, সেজন্য তারা সৌদি বিমান বাহিনীর যুদ্ধবিমানগুলোকে আকাশপথে জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে সহায়তা করবেন।

১১ ঘণ্টা আগে
Advertisement