সিআইএর স্থাপনায় ইরানি হামলা— রাশিয়ার ভূমিকা খতিয়ে দেখছে যুক্তরাষ্ট্র

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২৬, ১৪: ৫০
২০২৫ সালে ইরানের সেনাবাহিনীর যুদ্ধ সক্ষমতায় নতুন ড্রোন যুক্ত করার অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ধরনের ইরানি ড্রোন প্রদর্শিত হচ্ছে। ফাইল ছবি: রয়টার্স
২০২৫ সালে ইরানের সেনাবাহিনীর যুদ্ধ সক্ষমতায় নতুন ড্রোন যুক্ত করার অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ধরনের ইরানি ড্রোন প্রদর্শিত হচ্ছে। ফাইল ছবি: রয়টার্স

উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির (সিআইএ) বিভিন্ন স্থাপনায় ইরানের ড্রোন হামলার ঘটনায় রাশিয়ার সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষকেরা খতিয়ে দেখছেন, হামলায় ইরানকে লক্ষ্য নির্ধারণসংক্রান্ত তথ্য কিংবা উন্নত ড্রোন প্রযুক্তি দিয়ে রাশিয়া কোনো ধরনের সহায়তা করেছিল কি না।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত চারটি সূত্রের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে এ তথ্য জানানো হয়। মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত স্পর্শকাতর বিষয় হওয়ায় সূত্রগুলো নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাক্ষাৎকার দিয়েছে।

সূত্রগুলো জানায়, সিআইএর স্থাপনাগুলোতে হামলায় রাশিয়ার সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি। তবে হামলার কার্যকারিতা, নিখুঁত লক্ষ্যভেদ এবং ইরানকে রাশিয়ার দীর্ঘদিনের প্রযুক্তিগত সহায়তার বিষয়গুলো তদন্তকারীদের বিশেষ নজরে রয়েছে।

এর আগে রয়টার্সসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছিল এবং মার্কিন কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছিলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলার ক্ষেত্রে ইরানকে লক্ষ্য নির্ধারণসহ অন্যান্য সহায়তা দিয়েছে রাশিয়া। তবে সিআইএর স্থাপনাগুলোতে হামলার পেছনে রাশিয়ার সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তদন্তের বিষয়টি এবারই প্রথম প্রকাশ্যে এলো।

রয়টার্স ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চে অন্তত দুটি সিআইএ স্থাপনায় হামলা হয়। এর একটি ছিল সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে মার্কিন দূতাবাসের ভেতরে অবস্থিত সিআইএর স্টেশন। অন্যটি ছিল পূর্ব ইরাকে অবস্থিত একটি পৃথক স্থাপনা। কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, আরও কিছু সিআইএ স্থাপনাও হামলার শিকার হয়েছিল। তবে সেগুলোর বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।

গোয়েন্দা নথিতে রাশিয়ার সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত

পশ্চিমা একটি গোয়েন্দা সংস্থার অভ্যন্তরীণ এক স্মারকে বলা হয়েছে, আঞ্চলিক সিআইএ স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে রাশিয়া সম্ভবত ভূমিকা রেখেছে। নথিটি দেখেছেন— এমন একজন আঞ্চলিক কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন। তবে নথিটির প্রকৃত প্রণেতার পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তিনি কথা বলেন।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বিষয়ে অবহিত উপসাগরীয় অঞ্চলের দুই পশ্চিমা কর্মকর্তা জানান, বিশ্লেষকদের ধারণা, সৌদিতে হামলায় রাশিয়ার প্রযুক্তিতে উন্নত করা ইরানের শাহেদ ড্রোনের দুটি সংস্করণ ব্যবহার করা হয়েছিল।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি ড্রোন দূতাবাসের বাইরের অংশের একটি দুর্বল স্থানে ছিদ্র তৈরি করে এবং দ্বিতীয়টি সেই ছিদ্র দিয়ে ভেতরে ঢুকে বিস্ফোরিত হয়। এ ঘটনায় কেউ নিহত বা আহত হয়নি।

রাশিয়া ও ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে মস্কোর সহায়তা নতুন কিছু নয়। তবে সিআইএর মতো স্পর্শকাতর স্থাপনাকে নির্দিষ্টভাবে লক্ষ্যবস্তু করতে সহায়তা দিয়ে থাকলে, তা যুক্তরাষ্ট্রের কার্যক্রম ব্যাহত করতে রাশিয়া আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে প্রস্তুত— এমন ইঙ্গিত বহন করে। বিশেষ করে যখন ওয়াশিংটন ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটানোর চেষ্টা করছে।

গত সপ্তাহান্তে জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিমানঘাঁটিতে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সেনা ব্যারাকে আঘাত হেনে দুই মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পর রাশিয়া ইরানকে লক্ষ্য নির্ধারণসংক্রান্ত তথ্য দিচ্ছে— এমন আশঙ্কা আরও জোরালো হয়েছে।

এ বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে হোয়াইট হাউজ বিষয়টি সিআইএর কাছে পাঠায়। তবে সিআইএ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। জাতিসংঘে ইরানের মিশন, রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সৌদি সরকারও রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি।

গোপন স্থাপনা

আঞ্চলিক ওই দুই পশ্চিমা কর্মকর্তা জানান, ইরানের শাহেদ ড্রোনের লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর সক্ষমতা বাড়াতে দেশটিকে সহায়তা করেছে রাশিয়া। তাদের ধারণা, রিয়াদের হামলায় এই উন্নত সংস্করণের ড্রোনই ব্যবহার করা হয়েছিল।

পৃথক আরেকটি সূত্র জানায়, রাশিয়া ইরানের শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের নিখুঁততা বাড়াতে কোমেতা-এম (Kometa-M) নামে একটি স্যাটেলাইট ন্যাভিগেশন ব্যবস্থা সরবরাহ করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ইরানের নিজস্ব ব্যবস্থার তুলনায় অনেক বেশি নির্ভুল এবং সহজে জ্যাম করা যায় না।

গত মার্চে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল প্রথম জানায়, রাশিয়া ইরানকে কোমেতা-এম ব্যবস্থা দিয়েছে। তবে ক্রেমলিন সেই প্রতিবেদনকে ‘ভুয়া খবর’ বলে উড়িয়ে দেয়।

বিদেশে সিআইএর কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বিভিন্ন দেশে মার্কিন দূতাবাসে সংস্থাটির প্রধান কার্যালয় বা ‘স্টেশন’ থাকে। এ ছাড়া সংস্থাটি বিভিন্ন নিরাপদ ঘাঁটি, লজিস্টিকস কেন্দ্র এবং নজরদারিসহ অন্যান্য অভিযানের জন্যও আলাদা স্থাপনা পরিচালনা করে। এসব স্থাপনার অবস্থান অত্যন্ত গোপন রাখা হয়।

ইরানের ড্রোন হামলায় ঠিক কতটি সিআইএ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বা সেগুলো কোথায় অবস্থিত— তা জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন সূত্রগুলো। একজন বলেন, আক্রান্ত স্থাপনার সংখ্যা ‘একটির বেশি, তবে এক ডজনের কম।’ আরেকজন জানান, একাধিক স্থাপনায় হামলা হয়েছে।

লক্ষ্যবস্তুর তথ্য রাশিয়ার দেওয়া?

সূত্রগুলো জানিয়েছে, রিয়াদের মার্কিন দূতাবাসে হামলার ক্ষেত্রে ইরান রাশিয়ার দেওয়া লক্ষ্য নির্ধারণ-সংক্রান্ত তথ্য ব্যবহার করেছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছেন মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষকরা। তবে এ বিষয়ে এখনো সংশয় রয়েছে।

কয়েকটি সূত্রের মতে, ইরানের লক্ষ্য হয়তো পুরো মার্কিন দূতাবাসই ছিল এবং ঘটনাক্রমে সিআইএর স্টেশনটি আঘাতের শিকার হয়েছে। সূত্রগুলোর ভাষ্য, কিছু বিশ্লেষকের ধারণা— রাশিয়া ছাড়া খুব কম দেশই এমন সংবেদনশীল লক্ষ্য নির্ধারণসংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং তা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের সক্ষমতা ও আগ্রহ রাখে।

সিআইএর সাবেক স্টেশন প্রধান ও আন্ডারকভার অপারেশন কর্মকর্তা ড্যানিয়েল হফম্যান বলেন, কৌশলগত অংশীদারত্বের কারণে তেহরানকে সিআইএর স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু করতে মস্কো সহায়তা করলে তা বিস্ময়কর হবে না। তার ভাষায়, ‘তারা নিজেদের প্রভাব বলয়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমিয়ে আনা, এমনকি পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়ার অভিন্ন স্বার্থ ভাগাভাগি করে।’

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement
সিআইএর স্থাপনায় ইরানি হামলা— রাশিয়ার ভূমিকা খতিয়ে দেখছে যুক্তরাষ্ট্র