ইরান যুদ্ধের মধ্যেই সৌদি আরবে যুদ্ধবিমানসহ ৮ হাজার সেনা পাঠাল পাকিস্তান

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ১৮ মে ২০২৬, ২০: ১৭
২০২৩ সালে করাচির কাছে উত্তর আরব সাগরে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান নৌবাহিনীর বহুজাতিক মহড়া ‘আমান-২৩’-এ পাকিস্তান বিমান বাহিনীর ‘জেএফ-১৭ থান্ডার’ যুদ্ধবিমানের মহড়া। ফাইল ছবি
২০২৩ সালে করাচির কাছে উত্তর আরব সাগরে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান নৌবাহিনীর বহুজাতিক মহড়া ‘আমান-২৩’-এ পাকিস্তান বিমান বাহিনীর ‘জেএফ-১৭ থান্ডার’ যুদ্ধবিমানের মহড়া। ফাইল ছবি

ইরান যুদ্ধ ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে সৌদি আরবে প্রায় ৮ হাজার সেনা, এক স্কোয়াড্রন ফাইটার জেট এবং একটি অত্যাধুনিক বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে ইসলামাবাদ। একটি দ্বিপাক্ষিক যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় রিয়াদের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা নাটকীয়ভাবে বাড়ানো হয়েছে। অথচ একই সঙ্গে ইরান যুদ্ধের প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবেও ভূমিকা পালন করছে দেশটি।

সোমবার (১৮ মে) বার্তা সংস্থা রয়টার্স তিনজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা এবং দুটি সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে এই সেনা মোতায়েনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। সূত্রগুলো এই সামরিক বহরকে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং ‘কমব্যাট-ক্যাপাবল’ বা সরাসরি যুদ্ধ পরিচালনায় সক্ষম বাহিনী হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যার মূল উদ্দেশ্য হলো সৌদি আরব নতুন করে কোনো হামলার শিকার হলে দেশটিকে সরাসরি সামরিক সুরক্ষা দেওয়া।

তবে এই ব্যাপক সেনা মোতায়েনের বিষয়ে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিংবা সৌদি আরবের সরকারি সংবাদমাধ্যম দপ্তরের পক্ষ থেকে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে কোনো আনুষ্ঠানিক সাড়া দেওয়া হয়নি।

গোপন প্রতিরক্ষা চুক্তি ও পারমাণবিক সুরক্ষাকবচ

গত বছর পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে এই দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্তাবলি অত্যন্ত গোপনীয় ও সংবেদনশীল হিসেবে রাখা হয়েছে। তবে উভয় দেশই প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে যে, এই চুক্তির মূল ভিত্তি হলো— দুই দেশের যেকোনো একটি আক্রান্ত হলে অন্য দেশ তার প্রতিরক্ষায় সরাসরি এগিয়ে আসবে। এর আগে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, এই চুক্তির মাধ্যমে কার্যত সৌদি আরবকে পাকিস্তানের ‘নিউক্লিয়ার আমব্রেলা’ বা পারমাণবিক সুরক্ষাকবচের আওতায় আনা হয়েছে।

রয়টার্সের হাতে আসা তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিল মাসের শুরুতেও পাকিস্তান তাদের এক পূর্ণ স্কোয়াড্রন যুদ্ধবিমান সৌদি আরবে পাঠিয়েছিল। ওই স্কোয়াড্রনে মূলত চীনের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি প্রায় ১৬টি ‘জেএফ-১৭’ (JF-17) ফাইটার জেট ছিল। দুজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা আরও নিশ্চিত করেছেন যে, ফাইটার জেটের পাশাপাশি পাকিস্তান ড্রোনের দুটি বিশেষ স্কোয়াড্রনও রিয়াদে পাঠিয়েছে।

সব মিলিয়ে পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, এই সামরিক বহরে প্রায় ৮ হাজার পাকিস্তানি সেনা রয়েছে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনে আরও সেনা পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আকাশসীমা সুরক্ষায় চীনের তৈরি ‘এইচকিউ-৯’ (HQ-9) বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও সৌদি আরবে স্থাপন করা হয়েছে। এই সমস্ত অত্যাধুনিক যুদ্ধাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তারাই পরিচালনা করছেন, যার সম্পূর্ণ অর্থায়ন করছে সৌদি আরব।

প্রয়োজনে ৮০ হাজার সেনা মোতায়েন

নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মধ্যে দুজন জানিয়েছেন, তারা দুই দেশের মধ্যকার সামরিক নথিপত্র এবং বার্তা আদান-প্রদানের বিবরণী দেখেছেন। তাদের মতে, চলমান ইরান সংঘাতের সময়ে মোতায়েন হওয়া এই নতুন পাকিস্তানি সামরিক ও বিমান বাহিনীর সদস্যরা প্রাথমিকভাবে সৌদি বাহিনীকে পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার দায়িত্ব পালন করবেন।

তবে তিন নিরাপত্তা কর্মকর্তা স্পষ্ট করেছেন যে, এই নতুন বাহিনী ছাড়াও পূর্ববর্তী বিভিন্ন চুক্তির আওতায় ইতোমধ্যে হাজার হাজার পাকিস্তানি সেনা সরাসরি যুদ্ধকালীন (Combat) ভূমিকায় সৌদি আরবে মোতায়েন রয়েছে।

পাকিস্তানের একটি সরকারি সূত্র, যিনি এই অত্যন্ত গোপনীয় প্রতিরক্ষা চুক্তির মূল খসড়া দেখেছেন, তিনি রয়টার্সকে জানান— এই চুক্তিতে প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ৮০ হাজার পর্যন্ত পাকিস্তানি সেনা সৌদি আরবে পাঠানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। এই বিপুল বাহিনী মূলত সৌদি সীমান্ত বাহিনীর সঙ্গে মিলে দেশটির সীমান্ত অঞ্চলগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করবে। এ ছাড়া চুক্তির অংশ হিসেবে পাকিস্তানি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের কথাও রয়েছে, তবে কোনো যুদ্ধজাহাজ ইতোমধ্যে সৌদি জলসীমায় পৌঁছেছে কি না তা রয়টার্স স্বতন্ত্রভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি।

সূত্রগুলো জোর দিয়ে বলেছেন, যেভাবে যুদ্ধবিমান, ড্রোন স্কোয়াড্রন, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং হাজার হাজার যুদ্ধসক্ষম সেনা পাঠানো হয়েছে, তাতে এটি স্পষ্ট যে পাকিস্তানের এই মিশনটি কেবল কোনো প্রতীকী বা সাধারণ পরামর্শক মিশন নয়, বরং এটি একটি পুরোদস্তুর সামরিক অবস্থান।

মধ্যস্থতাকারী বনাম কৌশলগত অংশীদার

এর আগে রয়টার্স এক প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছিল যে, সৌদি আরবের অত্যন্ত সংবেদনশীল জ্বালানি অবকাঠামোতে ইরানি হামলার পর এবং সেখানে একজন সৌদি নাগরিক নিহত হওয়ার পরপরই পাকিস্তান তড়িঘড়ি করে সৌদি আরবে ফাইটার জেট পাঠিয়েছিল। ওই হামলার পর আশঙ্কাই তৈরি হয়েছিল যে, সৌদি হয়ত ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের পালটা হামলা চালাবে, যা পুরো অঞ্চলের যুদ্ধকে আরও ভয়াবহ রূপ দিতে পারত।

তবে এই সেনা মোতায়েনের পরপরই দৃশ্যপটে এক নাটকীয় পরিবর্তন আসে। ইসলামাবাদ আচমকাই এই ইরান যুদ্ধের প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়। পাকিস্তানের অক্লান্ত কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি সফলভাবে সম্পন্ন হয়, যা গত ছয় সপ্তাহ ধরে কার্যকর রয়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার একমাত্র শান্তি আলোচনার আসরটিও বসেছিল ইসলামাবাদে। পরবর্তীতে আরও কয়েক দফা আলোচনার পরিকল্পনা থাকলেও দুই পক্ষের আপত্তির কারণে তা বাতিল হয়ে যায়।

এদিকে, রয়টার্স পরবর্তীতে আরও জানতে পারে যে, সৌদি আরবের ভেতরে হওয়া হামলার জবাবে রিয়াদও ইরানের ওপর বেশ কিছু অঘোষিত ও গোপন পালটা হামলা চালিয়েছিল।

ঐতিহাসিকভাবেই পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে দীর্ঘদিনের গভীর সামরিক সম্পর্ক রয়েছে। পাকিস্তান সবসময়ই সৌদি আরবকে সামরিক প্রশিক্ষণ এবং পরামর্শক সেবা দিয়ে আসছে। এর বিপরীতে, পাকিস্তানের তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের দিনগুলোতে রিয়াদ সবসময়ই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের আর্থিক সহায়তা নিয়ে ইসলামাবাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানের এই বিশাল সামরিক মোতায়েন সেই সম্পর্কেরই সবচেয়ে বড় এবং কৌশলগত বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement