গাজার শাসনকার্যে থাকছে না হামাস, প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
সংঘাতের কারণে লাখ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে, আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে শরণার্থী শিবিরে। গাজার একটি আশ্রয়শিবিরের ছবি। রয়টার্স ফাইল ছবি
সংঘাতের কারণে লাখ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে, আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে শরণার্থী শিবিরে। গাজার একটি আশ্রয়শিবিরের ছবি। রয়টার্স ফাইল ছবি

প্রায় দুই দশক ধরে গাজা উপত্যকার বেসামরিক প্রশাসনের দায়িত্ব পালন করে আসা নিজেদের সরকারি কাঠামো বিলুপ্ত করার ঘোষণা দিয়েছে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস। এতে উপত্যকাটির বেসামরিক প্রশাসনের দায়িত্ব প্রস্তাবিত টেকনোক্র্যাট কমিটির হাতে তুলে দেওয়ার পথ আরও সুগম হলো।

সোমবার (৬ জুলাই) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম মিন্টের খবরে বলা হয়, গাজার গভর্নমেন্টাল ইমার্জেন্সি কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের কার্যক্রম সমাপ্ত করার ঘোষণা দিয়েছে। কমিটির নেতৃত্ব পদত্যাগ করেছে এবং ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা (এনসিএজি)-এর কাছে প্রশাসনিক দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে হস্তান্তর করতে প্রস্তুত রয়েছে।

২০০৬ সালের ফিলিস্তিনি আইনসভা নির্বাচনে জয়লাভের পর ২০০৭ সালে প্রতিদ্বন্দ্বী ফিলিস্তিনি সংগঠন ফাতাহর কাছ থেকে গাজার নিয়ন্ত্রণ নেয় হামাস। এরপর থেকে প্রায় ২০ বছর ধরে গাজা উপত্যকার বেসামরিক প্রশাসন পরিচালনা করে আসছিল সংগঠনটি।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত হামাসের রাজনৈতিক অবস্থানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে এবং এতে গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হতে পারে।

গভর্নমেন্টাল ইমার্জেন্সি কমিটির ভাষ্য অনুযায়ী, গাজার ফিলিস্তিনিদের ‘সর্বোচ্চ স্বার্থ’ বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর পেছনে তারা চলমান যুদ্ধ, অবরোধ, পুনর্গঠন কার্যক্রমে বিলম্ব এবং গাজা থেকে ইসরায়েলের সেনা প্রত্যাহারে অস্বীকৃতির বিষয়গুলো উল্লেখ করেছে।

এদিকে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ফ্রান্স ২৪-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় দুই দশক ধরে গাজা শাসনকারী প্রশাসনিক কাঠামো বিলুপ্ত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে হামাস। এর ফলে একটি ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট কমিটি বেসামরিক প্রশাসনের দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারবে।

গত বছরের অক্টোবরে হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকেই হামাস বারবার জানিয়ে আসছে, তারা গাজার দৈনন্দিন প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে প্রস্তুত। তবে সংগঠনটির নিরস্ত্রীকরণের প্রশ্নটি এখনো অমীমাংসিত রয়েছে।

হামাস সরকারের গণমাধ্যম দপ্তরের প্রধান ইসমাইল আল-থাওয়াবতা বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘সরকারের জরুরি কমিটির প্রধান মোহাম্মদ আল-ফাররা আনুষ্ঠানিকভাবে তার পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রশাসনিক ও সরকারি দায়িত্ব ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজার কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সহজ করতে তিনি জরুরি কমিটি বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্তও নিয়েছেন।’

২০২৫ সালের অক্টোবরে হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে মধ্যস্থতা করার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে বোর্ড অব পিস গঠন করেছিলেন, সেই বোর্ডের উদ্যোগেই এনসিএজি গঠিত হয়।

হামাসের মুখপাত্র হাজেম কাসেমকে উদ্ধৃত করে এএফপি জানিয়েছে, ‘হামাস একটি নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে। দখলদার বাহিনী যাতে তাদের আগ্রাসন ও গণবিধ্বংসী যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার কোনো অজুহাত না পায়, সে জন্য গাজা উপত্যকার দায়িত্বে আর হামাস থাকবে না।’

তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করছি, দ্রুত ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা গাজায় প্রবেশ করবে। কমিটির সফলতা নিশ্চিত করতে হামাস তাদের কাছে সরকারি দায়িত্ব হস্তান্তর করতে প্রস্তুত রয়েছে।’

যুদ্ধ, অবরোধ ও পুনর্গঠনে বিলম্বের কথা উল্লেখ

এক বিবৃতিতে গভর্নমেন্টাল ইমার্জেন্সি কমিটি জানিয়েছে, গাজার ফিলিস্তিনিদের ‘সর্বোচ্চ স্বার্থ’ বিবেচনায় তারা তাদের প্রশাসনিক কর্তৃত্ব ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘চলমান যুদ্ধ, অবরোধ, পুনর্গঠন কার্যক্রমে বিলম্ব এবং গাজা থেকে ইসরায়েলের সেনা প্রত্যাহারে অস্বীকৃতি’— এসব কারণেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

কমিটি আরও জানিয়েছে, প্রশাসনিক দায়িত্ব হস্তান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে দ্রুত ন্যাশনাল কমিটিকে গাজায় প্রবেশের ব্যবস্থা করা হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।’ একই সঙ্গে মধ্যস্থতাকারীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, ‘ন্যাশনাল কমিটিকে যেন দ্রুত দায়িত্ব পালনের সুযোগ করে দেওয়া হয়। এতে আমাদের জনগণের দৃঢ়তা আরও শক্তিশালী হবে এবং তাদের ক্ষত নিরাময়ে সহায়তা করবে।’

হামাসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০০৭ সালে ফাতাহর কাছ থেকে গাজার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে যে প্রশাসনিক কাঠামো অঞ্চলটি পরিচালনা করে আসছিল, সেটি ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংগঠনটি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে হামাসের এক কর্মকর্তা এএফপিকে বলেন, ‘গাজা সরকারের কমিটি বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য একজন ব্যক্তিকে কমিটির কাজ তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হবে, যতক্ষণ না ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করছে।’

এই ঘোষণা সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের পর গাজার সরাসরি বেসামরিক প্রশাসন থেকে সরে দাঁড়াতে হামাসের প্রস্তুতির সবচেয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিতগুলোর একটি বলে মনে করা হচ্ছে।

প্রশাসনিক দায়িত্ব নেবে ন্যাশনাল কমিটি

হামাসের প্রশাসনিক কমিটি বিলুপ্ত হওয়ার ফলে ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা আলি শা’আতের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণের পথ উন্মুক্ত হয়েছে।

ফ্রান্স ২৪-এর উদ্ধৃত আরেক হামাস কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি কায়রোতে অনুষ্ঠিত আলোচনায় অন্য ফিলিস্তিনি সংগঠনগুলোকে এই সিদ্ধান্ত সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘বিভিন্ন ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাসের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। তারা এটিকে ন্যাশনাল কমিটিকে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের সুযোগ করে দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছে।’

এদিকে গাজায় হামাসের গণমাধ্যম দপ্তর জানিয়েছে, সোমবার পরে তারা ‘একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলন’ করবে। তবে এ বিষয়ে আর কোনো বিস্তারিত জানানো হয়নি।

গত অক্টোবরে হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকেই হামাস বারবার জানিয়েছে, তারা গাজার দৈনন্দিন প্রশাসনিক দায়িত্ব ছেড়ে দিতে প্রস্তুত।

তবে বৃহত্তর রাজনৈতিক সমাধানের পথে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি এখনো রয়ে গেছে। হামাস বেসামরিক প্রশাসনের দায়িত্ব হস্তান্তরে প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিলেও সংগঠনটির নিরস্ত্রীকরণের প্রশ্ন এখনো গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিয়ে চলমান আলোচনার অন্যতম প্রধান বিতর্কিত বিষয়।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement