ইসরায়েলে ভোট শুরু, রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে নেতানিয়াহু

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১৩: ৫৬
জাতীয় নির্বাচনের দিন ইসরায়েলের রামাত গানে প্রধানমন্ত্রী ও লিকুদ পার্টির নেতা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং সাবেক সেনাপ্রধান ও ইয়াশার পার্টির নেতা গাদি আইজেনকটের ছবিসংবলিত একটি নির্বাচনি বিলবোর্ড। এতে লেখা রয়েছে, ‘পরিবর্তন ঝুঁকির মুখে’। ২৭ অক্টোবর ২০২৬। ছবি: রয়টার্স
জাতীয় নির্বাচনের দিন ইসরায়েলের রামাত গানে প্রধানমন্ত্রী ও লিকুদ পার্টির নেতা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং সাবেক সেনাপ্রধান ও ইয়াশার পার্টির নেতা গাদি আইজেনকটের ছবিসংবলিত একটি নির্বাচনি বিলবোর্ড। এতে লেখা রয়েছে, ‘পরিবর্তন ঝুঁকির মুখে’। ২৭ অক্টোবর ২০২৬। ছবি: রয়টার্স

ইসরায়েলে পার্লামেন্ট নির্বাচনে রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে নেমেছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে চালানো হামলা, গাজা ও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতার প্রেক্ষাপটে ভোটাররা তার নেতৃত্বের মূল্যায়ন করছেন।

প্রায় ১৯ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা নেতানিয়াহু ইসরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের প্রধানমন্ত্রী। নানা সংকটের মধ্যেও রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকার নজির রয়েছে তার। দেশটিতে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রভাব বেড়েছে। এ ছাড়া ইসরায়েলের বিভক্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সরকার গঠনের ক্ষেত্রে নেতানিয়াহু সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারেন।

মতামত জরিপে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ও ডানপন্থি মিত্রদের সঙ্গে গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন প্রতিদ্বন্দ্বী জোটের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আইজেনকট ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর সাবেক প্রধান। নিরাপত্তার প্রশ্নে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত এই নেতার প্রতি ডানপন্থি ও মধ্যপন্থি— দুই শিবিরের ভোটারদের সমর্থন রয়েছে।

জাতীয় নির্বাচন উপলক্ষ্যে ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলের শহর উম্ম আল-ফাহমে ভোটকেন্দ্র প্রস্তুত করছেন কর্মীরা। ২৭ অক্টোবর ২০২৬। ছবি: রয়টার্স
জাতীয় নির্বাচন উপলক্ষ্যে ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলের শহর উম্ম আল-ফাহমে ভোটকেন্দ্র প্রস্তুত করছেন কর্মীরা। ২৭ অক্টোবর ২০২৬। ছবি: রয়টার্স

স্থানীয় সময় মঙ্গলবার সকাল সাতটায় ভোট গ্রহণ শুরু হয়। ভোটকেন্দ্রগুলো খোলা থাকবে রাত ১০টা পর্যন্ত। নির্বাচনি প্রচারে নেতানিয়াহু যুদ্ধকালীন নেতৃত্ব এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়েছেন। ট্রাম্পও নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে যোগ দিয়েছে।

রোববার নেতানিয়াহু বলেন, ইরানের হুমকি ‘শেষ পর্যন্ত’ দূর করতে ট্রাম্প আবারও পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। তবে নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকলেই কেবল তা সম্ভব হবে বলে দাবি করেন তিনি।

অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ‘ভয় ছড়ানো, মিথ্যা ও হুমকির প্রচারণার ওপর নির্ভর করার’ অভিযোগ তুলেছেন আইজেনকট। তিনি বলেন, জনগণের নির্বাচিত যেকোনো নেতার সঙ্গে ট্রাম্প ‘পূর্ণ সহযোগিতার’ ভিত্তিতে কাজ করবেন বলে তিনি আত্মবিশ্বাসী।

সরকার গঠনের জন্য নেতানিয়াহুকে আবারও কট্টর ডানপন্থি নেতা ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মত্রিচের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে। ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে পশ্চিমা কয়েকটি দেশ তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তবে জনমত জরিপে বেন-গভিরের দল ইহুদি শক্তির সমর্থন বাড়তে দেখা যাচ্ছে।

জেরুজালেমের একটি ভোটকেন্দ্রে ভোট দিচ্ছেন এক ইসরায়েলি নাগরিক। ২৭ অক্টোবর ২০২৬। ছবি: রয়টার্স
জেরুজালেমের একটি ভোটকেন্দ্রে ভোট দিচ্ছেন এক ইসরায়েলি নাগরিক। ২৭ অক্টোবর ২০২৬। ছবি: রয়টার্স

নেতানিয়াহু কিংবা আইজেনকট— কারও জন্যই ক্ষমতায় যাওয়ার পথ নিশ্চিত নয়। ১২০ আসনের পার্লামেন্টে সরকার গঠনের মতো জোট তৈরি করতে না পারলে আগামী বছর আরেকটি নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন নেতানিয়াহু।

ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ভোট দেওয়ার যোগ্য নাগরিকের সংখ্যা ৭৩ লাখ। তাদের মধ্যে প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার ভোটার এবারই প্রথম ভোট দিচ্ছেন।

৭ অক্টোবরের হামলার জবাবদিহি

১৯৪৮ সালে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর সবচেয়ে অস্থির সময়গুলোর একটি পার করছে দেশটি। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে চালানো হামলা, এরপর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং নেতানিয়াহুর ডানপন্থি সরকারের নীতি নিয়ে অভ্যন্তরীণ বিভাজন— সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচন বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

নেতানিয়াহুর অনেক বিরোধীর কাছে নির্বাচনের অন্যতম প্রধান বিষয় হলো ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তাব্যর্থতার জবাবদিহি। ওই দিনটি ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী দিন।

নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির নির্বাচনি প্রচারের বিলবোর্ডের ওপর থেকে তোলা দৃশ্য। বিলবোর্ডে নেতানিয়াহু ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছবি এবং হিব্রু ভাষায় লেখা, ‘জয়ের একটিই সুযোগ আমাদের!’ ২৬ অক্টোবর ২০২৬, তেল আবিব। ছবি: রয়টার্স
নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির নির্বাচনি প্রচারের বিলবোর্ডের ওপর থেকে তোলা দৃশ্য। বিলবোর্ডে নেতানিয়াহু ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছবি এবং হিব্রু ভাষায় লেখা, ‘জয়ের একটিই সুযোগ আমাদের!’ ২৬ অক্টোবর ২০২৬, তেল আবিব। ছবি: রয়টার্স

আইজেনকটের সমর্থক ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মী মালি হাজাজ বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একটি জাতীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা। কারণ, এর মধ্য দিয়েই আমরা ক্ষত সারিয়ে ওঠার পথ খুঁজে পাব।’

লিসা টরটর বলেন, তিনি আশা করেন নেতানিয়াহু ক্ষমতা ছাড়বেন এবং নতুন সরকার গঠিত হবে। সেই সরকার ইহুদি জনগোষ্ঠী, ইসরায়েল এবং বিশ্ব জুড়ে ইহুদিদের ভাবমূর্তির যে ক্ষতি নেতানিয়াহু করেছেন, তা কিছুটা হলেও মেরামত করতে পারবে বলে আশা তার।

তবে ১৮ বছর বয়সী লিকুদ সমর্থক নোফ গাবে ৭ অক্টোবরের হামলার জন্য নেতানিয়াহুকে দায়ী করার ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার মতে, ‘ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্য নেতানিয়াহুই সঠিক ব্যক্তি।’ গাবে বলেন, ‘নেতানিয়াহু সবচেয়ে ভালোভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন।’

যুদ্ধকালীন ভূমিকার হিসাব

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন যোদ্ধাদের হামলায় ইসরায়েলে ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন এবং আরও ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। এর পর গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। ওই অভিযানে গাজার বড় একটি অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ইসরায়েলের হামলায় ৭৪ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন।

লেবাননে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর ওপরও বড় ধরনের আঘাত হানে ইসরায়েল। পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি হামলায় জড়ায় দেশটি। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ১২ দিনব্যাপী বিমান হামলা চালানো হয়। চলতি বছর ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে যুদ্ধে জড়ায়।

আইজেনকট বলেছেন, ইসরায়েলের পরবর্তী সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ইরান সামরিক কাজে ব্যবহারের উপযোগী পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করতে না পারে। এ লক্ষ্য অর্জনে সামরিক শক্তি প্রয়োগের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে কূটনৈতিক সমাধানের পথও খোলা রাখতে হবে।

জোট গঠনের হিসাব-নিকাশ

ইসরায়েলের প্রায় সব ইহুদিপ্রধান রাজনৈতিক দলের মতো আইজেনকটও দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের বিরোধী। কয়েক দশক ধরে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় এ প্রস্তাবই ছিল অন্যতম ভিত্তি।

তবে ইসরায়েলের দখল করা পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার সমালোচনা করেছেন আইজেনকট। ২০২৩ সালের পর থেকে এ ধরনের সহিংসতা বেড়েছে, যা পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কেও টানাপোড়েন তৈরি করেছে। নেতানিয়াহুর জোটের কট্টর ডানপন্থি দুই শরিক বেন-গভির ও স্মত্রিচেরও বিরোধিতা করেন তিনি।

লিকুদ পার্টির শক্ত ঘাঁটিগুলোর কয়েকটিতে নেতানিয়াহুর ওপর আস্থা হারানো ভোটাররা বাড়ি বাড়ি গিয়ে অন্যদের তার বিরুদ্ধে ভোট দিতে উৎসাহিত করছেন। দীর্ঘদিন ধরে চলা দুর্নীতির মামলায় নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, যদিও তিনি তা অস্বীকার করেন। এ মামলাও কিছু ভোটারের সমর্থন হারানোর কারণ হয়েছে।

ইসরায়েলের আরব সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ভোটারদের উপস্থিতি বেশি হলে জোট গঠনের জটিল হিসাব-নিকাশে আইজেনকট সুবিধা পেতে পারেন। এই জনগোষ্ঠীর সদস্যরা ইসরায়েলের নাগরিক হলেও তাদের বংশপরিচয় ফিলিস্তিনি।

মূল্যবোধের মিল নেই— এমন যুক্তি দেখিয়ে আইজেনকট আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করেছেন। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে আরব দলগুলো তার নেতৃত্বাধীন সংখ্যালঘু সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন দিতে পারে।

ইসরায়েলের শালোম হার্টম্যান ইনস্টিটিউটের রাজনৈতিক বিশ্লেষক আমোৎস আসা-এল বলেন, ‘আমার ধারণা, যেকোনো পক্ষই সামান্য ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। কোনো পক্ষই বিপুল ব্যবধানে জিতবে না।’

বার্তা সংস্থা রয়টার্স অবলম্বনে

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad