ফের হামলা, হরমুজে জাহাজ চলাচলে সহায়তা বন্ধ জাতিসংঘের

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ২৬ জুন ২০২৬, ১২: ১৮
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধের অবসান এখনো ঘটেনি। ছবি: রয়টার্স
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধের অবসান এখনো ঘটেনি। ছবি: রয়টার্স

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আগেই হরমুজ প্রণালিতে ফের বাণিজ্যিক একটি জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের ওই অঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।

হামলার পর নিরাপত্তা পরিস্থিতি পুনর্মূল্যায়নের জন্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে সহায়তার কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও)। এর ফলে যুদ্ধবিরতি কতটা টেকসই হবে এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে স্বাভাবিক নৌচলাচল কত দ্রুত ফিরবে, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার ওমান উপকূলের কাছে একটি কার্গো জাহাজ ক্ষেপণাস্ত্রের মতো দেখতে একটি বস্তুর আঘাতে আক্রান্ত হওয়ার খবর দেয় যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও। পরে চারটি সূত্র জাহাজটিকে সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী এভার লাভলি হিসেবে শনাক্ত করে।

একটি নিরাপত্তা সূত্রের দাবি, জাহাজটিতে সম্ভবত ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। রয়টার্সকে যুক্তরাষ্ট্রের দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হামলাটি ইরান চালিয়েছে। তবে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি ওয়াশিংটন।

অন্যদিকে ইরানের নবগঠিত পারস্য উপসাগর প্রণালি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা নির্ধারিত রুটের বাইরে চলাচলকারী কোনো জাহাজের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেবে না। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, অনুমোদিত পথ ব্যবহার না করলে তার পরিণতির দায় জাহাজের মালিক, পরিচালনাকারী ও ক্যাপ্টেনের।

এ ঘটনার পরপরই আইএমও জানায়, হরমুজ প্রণালি থেকে আটকে পড়া জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হচ্ছে। সংস্থার মহাসচিব আর্সেনিও ডোমিঙ্গেজ এক বিবৃতিতে বলেন, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এখনো কার্যকর আছে কি না, তা পুনরায় যাচাই করতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। হামলার শিকার জাহাজটি আইএমওর উদ্ধার কর্মসূচির অংশ ছিল না বলে জানান তিনি।

ইরান যুদ্ধ শুরুর পর কয়েক মাস ধরে প্রণালিতে আটকে থাকা শত শত জাহাজ ও হাজারও নাবিককে সরিয়ে নিতে মঙ্গলবার সহায়তা কর্মসূচি চালু করেছিল আইএমও। এতে ইরান ও ওমানের জলসীমা ব্যবহার করে দুটি নির্ধারিত রুটে যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে স্বেচ্ছাভিত্তিকভাবে জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।

হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারেও তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে। বৈশ্বিক মানদণ্ড অপরিশোধিত তেল তথা ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ২ শতাংশ বেড়ে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, এ ঘটনা উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগতে পারে— এমন আশঙ্কা আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের দৈনিক অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। ফলে এই নৌপথে যেকোনো অস্থিরতা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকলে তা বৈশ্বিকভাবেই জ্বালানি সংকট তৈরি করে।

এদিকে উপসাগরীয় সফর শেষে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা দেয় বা হুমকি তৈরি করে, তাহলে সেটি বড় ধরনের সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে।

তবে ইরানও তাদের অবস্থানে অনড় রয়েছে। দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, কেবল ইরান নির্ধারিত রুট ব্যবহার করলেই নিরাপদে চলাচল সম্ভব হবে এবং নির্দেশনা অমান্যকারী জাহাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান অ্যামব্রের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার পানামার পতাকাবাহী দুটি জাহাজকেও গতিপথ পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছে বিপ্লবী গার্ড।

এই উত্তেজনার মধ্যেও কিছু ইতিবাচক ইঙ্গিত মিলছে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট বুধবার বলেছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থার কাছাকাছি পৌঁছাতে শুরু করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় অন্তত দুই কোটি ব্যারেল তেল এই নৌপথ অতিক্রম করেছে। দক্ষিণ কোরিয়াও জানিয়েছে, তাদের আরও আটটি জাহাজ নিরাপদে প্রণালি ত্যাগ করেছে।

তবু হামলার সবশেষ ঘটনা স্পষ্ট করে দিয়েছে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রশাসন নিয়ে দুপক্ষের মতপার্থক্য এখনো কাটেনি। আর সেই অনিশ্চয়তাই বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে রয়ে গেছে।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement