ইসরায়েলের সঙ্গে নতুন চুক্তিতে কি থেমে যাবে যুদ্ধাপরাধের বিচার?

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আশুরা উপলক্ষ্যে লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে শোকানুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন শিয়া মুসল্লিরা। তাদের সামনে টাঙানো ব্যানারে দেখা যাচ্ছে হিজবুল্লাহর প্রধান নাইম কাশেম ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির ছবি। ছবি: রয়টার্স

ইসরায়েলের সঙ্গে লেবাননের সদ্য সই হওয়া ১৪ দফার কাঠামোগত চুক্তি (ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট) দেশটিতে চলমান সংঘাত প্রশমনের আশা তৈরি করলেও, এর একটি ধারা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকারকর্মীরা।

তাদের আশঙ্কা, চুক্তির বর্তমান ভাষা বহাল থাকলে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের বিচার চাওয়ার পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এমনকি ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে (আইসিসি) লেবাননের ওপর বিচারিক এখতিয়ার দেওয়ার সুযোগও সংকুচিত হতে পারে।

গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, গত শুক্রবার ওয়াশিংটনে লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে সই হওয়া এই চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল দুই দেশের মধ্যে সংঘাতের অবসানের পথ তৈরি করা। বিশেষ করে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে দীর্ঘদিনের সংঘর্ষ বন্ধে এটি একটি কাঠামো নির্ধারণ করেছে।

তবে চুক্তির ১৩ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, উভয় দেশ ‘সদিচ্ছাপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বা আইনি ফোরামে একে অন্যের বিরুদ্ধে কোনো শত্রুতাপূর্ণ বা নেতিবাচক পদক্ষেপ নেবে না।’

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধারার ভাষা অত্যন্ত বিস্তৃত ও অস্পষ্ট। ফলে ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবরের পর লেবাননে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের শিকার ব্যক্তিরা আন্তর্জাতিক কিংবা জাতীয় আদালতে ন্যায়বিচার চাইতে গেলে সেটিকে ‘নেতিবাচক পদক্ষেপ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে।

লেবাননে আইসিসির এখতিয়ার দেওয়ার একটি খসড়া আইন তৈরিতে যুক্ত ছিলেন দেশটির মানবাধিকার মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা ফারুক আল-মোঘরাবি। তিনি বলেন, এই চুক্তি কার্যকর হলে আইসিসিকে এখতিয়ার দেওয়ার সব সম্ভাবনাই শেষ হয়ে যাবে। শুধু তাই নয়, জাতিসংঘের কোনো স্বাধীন অনুসন্ধান কমিশন গঠনের উদ্যোগও কার্যত থেমে যেতে পারে।

তার মতে, এটি শুধু আন্তর্জাতিক বিচার নয়, দেশের ভেতরে যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ সংগ্রহ ও তদন্তের প্রচেষ্টাকেও দুর্বল করে দেবে।

একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন লেবাননের মানবাধিকারভিত্তিক সংগঠন লিগ্যাল এজেন্ডার প্রধান নিজার স্যাগিয়ে। তার ভাষায়, সরকার এই চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধকে কার্যত স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিচ্ছে এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দায়িত্ব থেকেও সরে আসছে।

এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও লেবাননের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়নি।

কেন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে আইসিসি?

লেবানন এখনো আইসিসির সদস্যরাষ্ট্র নয়। ফলে আদালত স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেশটিতে সংঘটিত অপরাধের তদন্ত করতে পারে না। তবে লেবানন চাইলে বিশেষ ঘোষণার মাধ্যমে সীমিত পরিসরে আইসিসিকে বিচারিক এখতিয়ার দিতে পারে। দীর্ঘদিন ধরেই মানবাধিকার সংগঠনগুলো সেই দাবি জানিয়ে আসছে।

বিশেষ করে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ তদন্তে আইসিসির ভূমিকার পক্ষে তারা সোচ্চার।

এরই মধ্যে আইসিসি গাজায় সংঘটিত কথিত যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে।

এর জেরে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র আইসিসির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র আদালতের কয়েকজন বিচারকের ওপর নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করে।

বিশ্লেষকদের মতে, এ প্রেক্ষাপটে লেবাননের নতুন চুক্তি আইসিসির মাধ্যমে ভবিষ্যতে কোনো বিচারিক উদ্যোগ নেওয়ার পথ আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

২০২৩ সালে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের দিকে রকেট হামলা শুরু করলে দুই পক্ষের সংঘাত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে দুই দফা বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালায়।

লেবাননের তথ্য অনুযায়ী, এসব হামলায় ৮ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে সাংবাদিক, জরুরি সেবাকর্মী, নারী ও শিশুর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। বহু গ্রাম ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, এই অভিযানে বেসামরিক নাগরিক, সাংবাদিক ও চিকিৎসা কর্মীদের লক্ষ্যবস্তু করা, ব্যাপক জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি এবং বেসামরিক স্থাপনায় হামলার মতো একাধিক কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের পর্যায়ে পড়তে পারে।

এদিকে লেবাননের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনও নতুন চুক্তি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। এক বিবৃতিতে সংস্থাটি বলেছে, কোনো আন্তর্জাতিক বা দ্বিপাক্ষিক চুক্তিই যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ কিংবা নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার চাওয়ার অধিকার কেড়ে নিতে পারে না।

তাদের ভাষায়, যুদ্ধাপরাধের বিচার চাওয়া কোনো রাজনৈতিক অবস্থান নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত একটি মৌলিক অধিকার।

কমিশন আরও বলেছে, চুক্তিতে ‘শত্রুতাপূর্ণ বা নেতিবাচক পদক্ষেপ’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। এই অস্পষ্টতাই ভবিষ্যতে বিচারিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

এদিকে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর সম্প্রতি লেবাননে সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ তদন্তে একটি তথ্য-অনুসন্ধান মিশন পাঠিয়েছে। তবে নতুন চুক্তির পর সেই তদন্ত কার্যক্রম ভবিষ্যতে কোনো বাধার মুখে পড়বে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়।

অন্যদিকে হিজবুল্লাহর মহাসচিব নাইম কাশেম এরই মধ্যে ওয়াশিংটনে সই হওয়া এই চুক্তিকে ‘অপমানজনক’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। সংগঠনটি বরাবরই লেবানন সরকারকে ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে আসছে।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এই চুক্তি হয়তো সীমান্তে সংঘাত কমানোর একটি কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু যদি সেই শান্তির বিনিময়ে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে তা ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচারের পথ আরও কঠিন করে তুলবে। ফলে লেবাননের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য বজায় রাখা হবে।

Ad
Ad
ad
ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

ইউক্রেন যুদ্ধে ৫ লক্ষাধিক রুশ সেনার প্রাণহানি— দাবি ব্রিটিশ প্রতিরক্ষাপ্রধানের

নাইটনের ভাষ্য, বিপুল সেনা মোতায়েন করেও রুশ বাহিনী ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জন করতে পারছে না। পশ্চিমা কর্মকর্তা ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, চলতি বছরে রুশ বাহিনীর অগ্রযাত্রার গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

৯ ঘণ্টা আগে

ব্রিকস সম্মেলনের আগে দিল্লিতে পুতিন-মোদি বৈঠক

ব্রিকস সম্মেলন সামনে রেখেই তিন দিনের সফরে ভারত গেছেন ভ্লাদিমির পুতিন। তার নয়াদিল্লি সফর ভারতের জন্য একই সঙ্গে কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। কয়েক দশক ধরে রাশিয়া ভারতের অন্যতম ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক অংশীদার। ভারতের সামরিক সরঞ্জামের বড় একটি অংশ ঐতিহাসিকভাবে রাশিয়া থেকে এসেছ

১০ ঘণ্টা আগে

৯/১১ হামলার ২৫ বছর: প্রযুক্তির ওপর অতিভরসাই কি নতুন দুর্বলতা?

তবে দুই দশকের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতায় বিশ্লেষকরা বলছেন, আপাতদৃষ্টিতে এসব কাঠামো শক্তিশালী ও সুরক্ষিত মনে হলেও এর মধ্যে থেকে গেছে গুরুতর দুর্বলতা। সেই দুর্বলতাই নতুন ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

১০ ঘণ্টা আগে

যুদ্ধ-দ্বন্দ্বের বিশ্বে নয়াদিল্লিতে ব্রিকসের ঐক্যের পরীক্ষা

সদস্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে স্বার্থের বৈচিত্র্যও। ফলে ব্রিকসকে এখন একই সঙ্গে একটি অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্ল্যাটফর্ম, বৈশ্বিক দক্ষিণের রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর এবং পশ্চিমানির্ভর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে নিজেদের ভূমিকা নির্ধারণ করতে হচ্ছে।

১৫ ঘণ্টা আগে
Advertisement