
ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে টানা ৩৬ বছর দায়িত্ব পালন করা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা ও দাফনকে ঘিরে রাজধানী তেহরানে শুরু হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। তার শেষ বিদায়ে লাখো, এমনকি কোটি মানুষের সমাগম হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই আয়োজনকে শুধু একজন নেতার বিদায় নয়, বরং জাতীয় শক্তি, প্রতিরোধ এবং সামাজিক সংহতির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছে ইরান।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়, শুক্রবার (৩ জুলাই) ভোর থেকেই তেহরানের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের চেকপোস্ট, অস্থায়ী স্টল, ব্যানার, পোস্টার এবং সেনাবাহিনীর যানবাহন মোতায়েন করা হয়। রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে শোকাহত মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। অনেকের হাতে ছিল পতাকা ও কম্বল। তারা শহরের বিভিন্ন স্থানে তীর্থযাত্রীদের জন্য তৈরি করা বিশেষ আবাসনের দিকে যাচ্ছিলেন।
তেহরানের বিভিন্ন সড়ক জুড়ে টানানো হয়েছে লাল রঙের মুষ্টিবদ্ধ হাতের প্রতীকসংবলিত ব্যানার, যা শেষকৃত্যের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ব্যানারে লেখা রয়েছে— ‘আমাদের অবশ্যই উঠে দাঁড়াতে হবে।’ শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ইসলামিক বিপ্লব স্কয়ারে (এনঘেলব স্কয়ার) স্থাপন করা হয়েছে বিশাল একটি মুষ্টিবদ্ধ হাতের ভাস্কর্য।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে ইরান যুদ্ধে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের জন্য আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে আনা হয় খামেনির কফিন। কফিন ঘিরে আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। উপস্থিত অনেকেই সামনে যাওয়ার চেষ্টা করেন এবং নিজেদের স্কার্ফ কফিনে ছোঁয়ানোর জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের দিকে ছুড়ে দেন।
গত ৮ ফেব্রুয়ারির পর প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে আসেন দেশটির ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) প্রধান কমান্ডার জেনারেল আহমদ ভাহিদি। জানুয়ারিতে অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ দমনে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ৪০ দিনের যুদ্ধে ইরানের সামরিক টিকে থাকাকে কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরার যে কৌশল সরকার গ্রহণ করেছিল, তাতেও তিনি ভূমিকা রেখেছিলেন।
পরে খামেনির মরদেহ ইরানের সর্ববৃহৎ মসজিদ এবং ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় সমাবেশস্থল তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় নিয়ে যাওয়া হয়। একটি ভ্যান থেকে মরদেহ মানুষের মাথার ওপর দিয়ে বহন করে গ্রেট হলে নেওয়া হয়। সেখানে তিন দিন ধরে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য কফিন রাখা হবে।
এই বিশাল আয়োজনের মাধ্যমে বিশ্বের কাছে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রতিরোধের বার্তা পৌঁছে দিতে চায় ইরান। আয়োজকদের ধারণা, এতে প্রায় তিন কোটি মানুষ অংশ নিতে পারেন। ইরাকের রাজনৈতিক নেতাদের অনুরোধে খামেনির মরদেহ ইরাকের শিয়া অধ্যুষিত কারবালা ও নাজাফ শহরেও নেওয়া হবে।

শুক্রবার ইরানের রাজনৈতিক, বিচারিক ও সামরিক নেতৃত্ব একে একে খামেনির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান। এ সময় তার কফিন ঢেকে দেওয়া হয় ইমাম হুসাইন (রা.)-এর মাজারের পবিত্র পতাকা দিয়ে। আইআরজিসির জ্যেষ্ঠ কমান্ডার মোহসেন রেজায়ি প্রকাশ্যে কান্নায় ভেঙে পড়েন। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকেও অশ্রুসিক্ত হতে দেখা যায়।
অনুষ্ঠানের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্যগুলোর একটি ছিল খামেনির ১৪ মাস বয়সী নাতনির ছোট কফিন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিনেই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় খামেনি, পরিবারের আরও তিন সদস্য এবং ওই শিশুটিও নিহত হয়। যুদ্ধের ব্যক্তিগত মূল্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে, সেই বাস্তবতাই যেন সামনে নিয়ে আসে এই দৃশ্য।
পরে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদল গ্র্যান্ড মোসাল্লায় প্রবেশ করে। তবে উপস্থিত অতিথিদের তালিকা ইরানের আঞ্চলিক কূটনৈতিক অবস্থানও স্পষ্ট করে। ইরাক, পাকিস্তান, আর্মেনিয়া ও তাজিকিস্তানের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা অনুষ্ঠানে অংশ নেন। এ ছাড়া আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অন্তত ১২ জন পার্লামেন্ট স্পিকারও উপস্থিত ছিলেন। ছিলেন বাংলাদেশের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদও।
খামেনির শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানে কোনো পশ্চিমা দেশের নেতাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই অভিযোগ করেন, ইউরোপীয় দেশগুলো ইতিহাসের ‘ভুল পাশে’ দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার বিষয়ে তাদের অবস্থানকে তিনি ‘সত্যিই লজ্জাজনক’ বলে মন্তব্য করেন।

শেষকৃত্যের আয়োজকদের মতে, প্রকৃত পরীক্ষা হবে আগামী তিন দিনে। কারণ, সাধারণ মানুষকে শুধু একজন নেতার প্রতি নয়, ইসলামি বিপ্লবের প্রতিও শ্রদ্ধা জানাতে আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে অসমাপ্ত যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা, সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কা এবং বিপুল জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ— সব মিলিয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে কর্তৃপক্ষকে।
অতীতেও ইরানের শীর্ষ নেতাদের শেষকৃত্যে ব্যাপক বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেছে। ১৯৮৯ সালে দেশটির প্রথম সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির দাফনের সময় জনতার চাপে তার মরদেহ প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। অনেকেই তার কাফনের কাপড় ছিঁড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। একই ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা যায় ২০২০ সালে আইআরজিসির কমান্ডার কাসেম সোলেইমানির শেষকৃত্যেও।
ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং দাফন অনুষ্ঠানের প্রধান সমন্বয়কারী মোহাম্মদ রেজা আরেফ বলেন, আগামী বৃহস্পতিবার মাশহাদে খামেনির দাফনের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়া এই অনুষ্ঠান হবে ‘এই শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা’। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এটিই হবে ইরানে সবচেয়ে বড় জনসমাগম।

শুক্রবার দিনভর ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, এমনকি প্রতিশোধের বার্তা আরও জোরালোভাবে তুলে ধরেন। জেনারেল আহমদ ভাহিদি বলেন, ইরান কখনো আত্মসমর্পণ করবে না।
তিনি বলেন, ‘খামেনি আমাদের হৃদয় ও আত্মায় বেঁচে আছেন। আমাদের প্রিয় ইরান এবং সমগ্র ইসলামি জাতির জন্য তিনি চিরস্থায়ী। আমরা তাকে কখনো বিদায় বলব না।’
দেশটির বিচার বিভাগের প্রধান পশ্চিমা নেতাদের ইতিহাসের বই খুলে পড়ার আহ্বান জানান। অন্যদিকে কট্টরপন্থি কয়েকজন সংসদ সদস্য শোক নয়, বরং ‘রক্তের প্রতিশোধের’ কথা বলেন।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, ‘আমাদের উঠে দাঁড়াতে হবে এবং জাতির রক্তের আহ্বান বিশ্বকে জানাতে হবে। বিশ্ব যেন বুঝতে পারে, সম্মানিত ইরানি জাতি নিপীড়ন ও ঔদ্ধত্যের সামনে কখনো নীরব থাকবে না এবং তাদের ইমামের রক্তের প্রতিদান না নিয়ে থামবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইরান তার ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ একটি মুহূর্তের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। ভালোবাসা, আনুগত্য ও বিচ্ছেদের বেদনায় ভরা হৃদয় নিয়ে একটি জাতি আজ এক মহান মানুষকে বিদায় জানাতে এগিয়ে আসছে।’

তবে পুরো আয়োজনের মাঝেও বড় একটি অনুপস্থিতি নিয়ে জল্পনা চলছে। খামেনির ছেলে ও সম্ভাব্য উত্তরসূরি মোজতবা খামেনির ছবি বিভিন্ন পোস্টারে বাবার সঙ্গে পাশাপাশি থাকলেও তিনি শেষকৃত্যে উপস্থিত থাকবেন না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সময় সকাল ৮টার কিছু পরে তেহরানে সরকারি আবাসনে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন। ওই হামলাতেই খামেনি ও তার পরিবারের অনেক সদস্য নিহত হন।
মোজতবার আঘাত কতটা গুরুতর, তা এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তিনি এখন পর্যন্ত কেবল লিখিত বিবৃতি দিয়েছেন। একটি বিবৃতিতে তিনি যুদ্ধবিরতি আলোচনা থেকে নিজেকে দূরে রাখলেও আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার অনুমোদন দেন।
এ সপ্তাহে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ মোজতবাকে হত্যার হুমকি দিয়ে বলেন, তাকে হত্যা করার জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। এর জেরে ইরানের কট্টরপন্থিরা পারমাণবিক অস্ত্র ধারণের বিরুদ্ধে দেশটির দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ফতোয়া পুনর্বিবেচনার দাবি তুলেছেন।

রাজনৈতিক বিভিন্ন পক্ষ যখন মোজতবার সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করছে এবং একই সময়ে দেশে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, তখন তার জনসমক্ষে অনুপস্থিতি ইরানের গোপনীয় ও নমনীয় রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। তবে সংকটের মধ্যেও টিকে থাকা এবং নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা অতীতেও দেখিয়েছে ইরান। খামেনির বিদায়ী আয়োজনের মধ্য দিয়ে সেই বার্তাই পশ্চিমা বিশ্বের কাছে পৌঁছে দিতে চায় তেহরান।
সোমবার তেহরানের কেন্দ্রস্থলে প্রায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ শোকযাত্রার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ইমাম হুসাইন স্কয়ার থেকে শুরু হয়ে শোভাযাত্রা শেষ হবে আজাদি স্কয়ারে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের অন্যতম প্রতীক এই স্কয়ার। ওই বিপ্লবের ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠিত ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নেতৃত্বই পরে গ্রহণ করেন খামেনি।
আয়োজকদের ধারণা, শুধু খামেনির জীবনের প্রশংসা করে বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটে থাকা লাখো মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি উপেক্ষা করা হলে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। তাই শহরের বিভিন্ন স্থানে ‘ইরানের জন্য উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ’ স্লোগানসংবলিত পোস্টার টানানো হয়েছে।

দাফনের সময়টি ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররমের সঙ্গে মিলে গেছে। এ মাসে শিয়া মুসলিমরা মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইনের শাহাদাত স্মরণ করেন। অত্যাচারী বলে বিবেচিত উমাইয়া খলিফা ইয়াজিদের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন ইমাম হুসাইন। ইরানি কর্তৃপক্ষ খামেনির মৃত্যুকেও পশ্চিমা শক্তির বিরুদ্ধে একই ধরনের প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছে।
মৃত্যুর আগে ১৭ ফেব্রুয়ারির এক ভাষণে খামেনিও এই প্রতীকী দৃষ্টান্তের কথা উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমার মতো একজন কখনো ইয়াজিদের মতো কারও প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করবে না। ইরানের সংস্কৃতিতে গড়ে ওঠা একটি জাতি কখনো আমেরিকার মতো দুর্নীতিগ্রস্ত নেতৃত্বের কাছে মাথা নত করবে না।’

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে টানা ৩৬ বছর দায়িত্ব পালন করা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা ও দাফনকে ঘিরে রাজধানী তেহরানে শুরু হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। তার শেষ বিদায়ে লাখো, এমনকি কোটি মানুষের সমাগম হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই আয়োজনকে শুধু একজন নেতার বিদায় নয়, বরং জাতীয় শক্তি, প্রতিরোধ এবং সামাজিক সংহতির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছে ইরান।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়, শুক্রবার (৩ জুলাই) ভোর থেকেই তেহরানের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের চেকপোস্ট, অস্থায়ী স্টল, ব্যানার, পোস্টার এবং সেনাবাহিনীর যানবাহন মোতায়েন করা হয়। রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে শোকাহত মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। অনেকের হাতে ছিল পতাকা ও কম্বল। তারা শহরের বিভিন্ন স্থানে তীর্থযাত্রীদের জন্য তৈরি করা বিশেষ আবাসনের দিকে যাচ্ছিলেন।
তেহরানের বিভিন্ন সড়ক জুড়ে টানানো হয়েছে লাল রঙের মুষ্টিবদ্ধ হাতের প্রতীকসংবলিত ব্যানার, যা শেষকৃত্যের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ব্যানারে লেখা রয়েছে— ‘আমাদের অবশ্যই উঠে দাঁড়াতে হবে।’ শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ইসলামিক বিপ্লব স্কয়ারে (এনঘেলব স্কয়ার) স্থাপন করা হয়েছে বিশাল একটি মুষ্টিবদ্ধ হাতের ভাস্কর্য।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে ইরান যুদ্ধে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের জন্য আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে আনা হয় খামেনির কফিন। কফিন ঘিরে আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। উপস্থিত অনেকেই সামনে যাওয়ার চেষ্টা করেন এবং নিজেদের স্কার্ফ কফিনে ছোঁয়ানোর জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের দিকে ছুড়ে দেন।
গত ৮ ফেব্রুয়ারির পর প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে আসেন দেশটির ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) প্রধান কমান্ডার জেনারেল আহমদ ভাহিদি। জানুয়ারিতে অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ দমনে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ৪০ দিনের যুদ্ধে ইরানের সামরিক টিকে থাকাকে কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরার যে কৌশল সরকার গ্রহণ করেছিল, তাতেও তিনি ভূমিকা রেখেছিলেন।
পরে খামেনির মরদেহ ইরানের সর্ববৃহৎ মসজিদ এবং ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় সমাবেশস্থল তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় নিয়ে যাওয়া হয়। একটি ভ্যান থেকে মরদেহ মানুষের মাথার ওপর দিয়ে বহন করে গ্রেট হলে নেওয়া হয়। সেখানে তিন দিন ধরে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য কফিন রাখা হবে।
এই বিশাল আয়োজনের মাধ্যমে বিশ্বের কাছে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রতিরোধের বার্তা পৌঁছে দিতে চায় ইরান। আয়োজকদের ধারণা, এতে প্রায় তিন কোটি মানুষ অংশ নিতে পারেন। ইরাকের রাজনৈতিক নেতাদের অনুরোধে খামেনির মরদেহ ইরাকের শিয়া অধ্যুষিত কারবালা ও নাজাফ শহরেও নেওয়া হবে।

শুক্রবার ইরানের রাজনৈতিক, বিচারিক ও সামরিক নেতৃত্ব একে একে খামেনির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান। এ সময় তার কফিন ঢেকে দেওয়া হয় ইমাম হুসাইন (রা.)-এর মাজারের পবিত্র পতাকা দিয়ে। আইআরজিসির জ্যেষ্ঠ কমান্ডার মোহসেন রেজায়ি প্রকাশ্যে কান্নায় ভেঙে পড়েন। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকেও অশ্রুসিক্ত হতে দেখা যায়।
অনুষ্ঠানের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্যগুলোর একটি ছিল খামেনির ১৪ মাস বয়সী নাতনির ছোট কফিন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিনেই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় খামেনি, পরিবারের আরও তিন সদস্য এবং ওই শিশুটিও নিহত হয়। যুদ্ধের ব্যক্তিগত মূল্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে, সেই বাস্তবতাই যেন সামনে নিয়ে আসে এই দৃশ্য।
পরে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদল গ্র্যান্ড মোসাল্লায় প্রবেশ করে। তবে উপস্থিত অতিথিদের তালিকা ইরানের আঞ্চলিক কূটনৈতিক অবস্থানও স্পষ্ট করে। ইরাক, পাকিস্তান, আর্মেনিয়া ও তাজিকিস্তানের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা অনুষ্ঠানে অংশ নেন। এ ছাড়া আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অন্তত ১২ জন পার্লামেন্ট স্পিকারও উপস্থিত ছিলেন। ছিলেন বাংলাদেশের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদও।
খামেনির শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানে কোনো পশ্চিমা দেশের নেতাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই অভিযোগ করেন, ইউরোপীয় দেশগুলো ইতিহাসের ‘ভুল পাশে’ দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার বিষয়ে তাদের অবস্থানকে তিনি ‘সত্যিই লজ্জাজনক’ বলে মন্তব্য করেন।

শেষকৃত্যের আয়োজকদের মতে, প্রকৃত পরীক্ষা হবে আগামী তিন দিনে। কারণ, সাধারণ মানুষকে শুধু একজন নেতার প্রতি নয়, ইসলামি বিপ্লবের প্রতিও শ্রদ্ধা জানাতে আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে অসমাপ্ত যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা, সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কা এবং বিপুল জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ— সব মিলিয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে কর্তৃপক্ষকে।
অতীতেও ইরানের শীর্ষ নেতাদের শেষকৃত্যে ব্যাপক বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেছে। ১৯৮৯ সালে দেশটির প্রথম সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির দাফনের সময় জনতার চাপে তার মরদেহ প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। অনেকেই তার কাফনের কাপড় ছিঁড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। একই ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা যায় ২০২০ সালে আইআরজিসির কমান্ডার কাসেম সোলেইমানির শেষকৃত্যেও।
ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং দাফন অনুষ্ঠানের প্রধান সমন্বয়কারী মোহাম্মদ রেজা আরেফ বলেন, আগামী বৃহস্পতিবার মাশহাদে খামেনির দাফনের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়া এই অনুষ্ঠান হবে ‘এই শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা’। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এটিই হবে ইরানে সবচেয়ে বড় জনসমাগম।

শুক্রবার দিনভর ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, এমনকি প্রতিশোধের বার্তা আরও জোরালোভাবে তুলে ধরেন। জেনারেল আহমদ ভাহিদি বলেন, ইরান কখনো আত্মসমর্পণ করবে না।
তিনি বলেন, ‘খামেনি আমাদের হৃদয় ও আত্মায় বেঁচে আছেন। আমাদের প্রিয় ইরান এবং সমগ্র ইসলামি জাতির জন্য তিনি চিরস্থায়ী। আমরা তাকে কখনো বিদায় বলব না।’
দেশটির বিচার বিভাগের প্রধান পশ্চিমা নেতাদের ইতিহাসের বই খুলে পড়ার আহ্বান জানান। অন্যদিকে কট্টরপন্থি কয়েকজন সংসদ সদস্য শোক নয়, বরং ‘রক্তের প্রতিশোধের’ কথা বলেন।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, ‘আমাদের উঠে দাঁড়াতে হবে এবং জাতির রক্তের আহ্বান বিশ্বকে জানাতে হবে। বিশ্ব যেন বুঝতে পারে, সম্মানিত ইরানি জাতি নিপীড়ন ও ঔদ্ধত্যের সামনে কখনো নীরব থাকবে না এবং তাদের ইমামের রক্তের প্রতিদান না নিয়ে থামবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইরান তার ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ একটি মুহূর্তের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। ভালোবাসা, আনুগত্য ও বিচ্ছেদের বেদনায় ভরা হৃদয় নিয়ে একটি জাতি আজ এক মহান মানুষকে বিদায় জানাতে এগিয়ে আসছে।’

তবে পুরো আয়োজনের মাঝেও বড় একটি অনুপস্থিতি নিয়ে জল্পনা চলছে। খামেনির ছেলে ও সম্ভাব্য উত্তরসূরি মোজতবা খামেনির ছবি বিভিন্ন পোস্টারে বাবার সঙ্গে পাশাপাশি থাকলেও তিনি শেষকৃত্যে উপস্থিত থাকবেন না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সময় সকাল ৮টার কিছু পরে তেহরানে সরকারি আবাসনে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন। ওই হামলাতেই খামেনি ও তার পরিবারের অনেক সদস্য নিহত হন।
মোজতবার আঘাত কতটা গুরুতর, তা এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তিনি এখন পর্যন্ত কেবল লিখিত বিবৃতি দিয়েছেন। একটি বিবৃতিতে তিনি যুদ্ধবিরতি আলোচনা থেকে নিজেকে দূরে রাখলেও আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার অনুমোদন দেন।
এ সপ্তাহে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ মোজতবাকে হত্যার হুমকি দিয়ে বলেন, তাকে হত্যা করার জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। এর জেরে ইরানের কট্টরপন্থিরা পারমাণবিক অস্ত্র ধারণের বিরুদ্ধে দেশটির দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ফতোয়া পুনর্বিবেচনার দাবি তুলেছেন।

রাজনৈতিক বিভিন্ন পক্ষ যখন মোজতবার সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করছে এবং একই সময়ে দেশে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, তখন তার জনসমক্ষে অনুপস্থিতি ইরানের গোপনীয় ও নমনীয় রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। তবে সংকটের মধ্যেও টিকে থাকা এবং নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা অতীতেও দেখিয়েছে ইরান। খামেনির বিদায়ী আয়োজনের মধ্য দিয়ে সেই বার্তাই পশ্চিমা বিশ্বের কাছে পৌঁছে দিতে চায় তেহরান।
সোমবার তেহরানের কেন্দ্রস্থলে প্রায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ শোকযাত্রার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ইমাম হুসাইন স্কয়ার থেকে শুরু হয়ে শোভাযাত্রা শেষ হবে আজাদি স্কয়ারে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের অন্যতম প্রতীক এই স্কয়ার। ওই বিপ্লবের ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠিত ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নেতৃত্বই পরে গ্রহণ করেন খামেনি।
আয়োজকদের ধারণা, শুধু খামেনির জীবনের প্রশংসা করে বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটে থাকা লাখো মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি উপেক্ষা করা হলে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। তাই শহরের বিভিন্ন স্থানে ‘ইরানের জন্য উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ’ স্লোগানসংবলিত পোস্টার টানানো হয়েছে।

দাফনের সময়টি ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররমের সঙ্গে মিলে গেছে। এ মাসে শিয়া মুসলিমরা মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইনের শাহাদাত স্মরণ করেন। অত্যাচারী বলে বিবেচিত উমাইয়া খলিফা ইয়াজিদের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন ইমাম হুসাইন। ইরানি কর্তৃপক্ষ খামেনির মৃত্যুকেও পশ্চিমা শক্তির বিরুদ্ধে একই ধরনের প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছে।
মৃত্যুর আগে ১৭ ফেব্রুয়ারির এক ভাষণে খামেনিও এই প্রতীকী দৃষ্টান্তের কথা উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমার মতো একজন কখনো ইয়াজিদের মতো কারও প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করবে না। ইরানের সংস্কৃতিতে গড়ে ওঠা একটি জাতি কখনো আমেরিকার মতো দুর্নীতিগ্রস্ত নেতৃত্বের কাছে মাথা নত করবে না।’

হুংকার ছেড়ে মেজর জেনারেল আমির হাতামি বলেন, আমরা পূর্বের চেয়ে আরও দৃঢ় সংকল্পের সাথে ইরানি জাতির মূল শত্রু—আমেরিকা এবং অপরাধী জায়নবাদী গোষ্ঠীর উদ্দেশ্যে অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় ঘোষণা করছি যে আমাদের শহীদ নেতা খামেনির পবিত্র রক্তের প্রতিটি ফোঁটার প্রতিশোধ আমরা নেবই। এই কাপুরুষোচিত হামলার চড়া মূল্য তাদের
৭ ঘণ্টা আগে
দক্ষিণ ফ্রান্সের অদ বিভাগে ছড়িয়ে পড়া একটি বড় দাবানলে এখন পর্যন্ত প্রায় ৯০০ হেক্টর এলাকা পুড়ে গেছে। আগুনের ধোঁয়ায় আকাশ ঢেকে গেছে এবং আশপাশের বসতবাড়ি হুমকির মুখে পড়েছে।
৮ ঘণ্টা আগে
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, স্থানীয় সময় দুপুর ১টা ৪ মিনিটে এই ভূকম্পন অনুভূত হয়। ভূপৃষ্ঠ থেকে এর গভীরতা ছিল প্রায় ১০ কিলোমিটার। আর এর উৎপত্তিস্থল ছিল হিরারা শহর থেকে প্রায় ১৩৬ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে সাগরের তলদেশে।
৯ ঘণ্টা আগে
মেহের নিউজ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক ৪০ দিনব্যাপী যুদ্ধের প্রথম দিনেই মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলায় আয়াতুল্লাহ খামেনি নিহত হন। তাঁর দাফন প্রক্রিয়ায় যোগ দিতে ইতোমধ্যে রাশিয়া, চীন, পাকিস্তান, ভারত, জর্জিয়া ও কিউবাসহ বিশ্বের ৩০টিরও বেশি দেশের ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিরা ইরানে পৌঁছেছেন।
১০ ঘণ্টা আগে