
ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম

মাত্র ১৭ বছর বয়সী সৌরভ কুশওয়াহা। পরনের কাপড় ছাড়া সঙ্গে আর কিছুই নেননি তিনি। মধ্যভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের একটি প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে বড় ভাইয়ের হাত ধরে সারা রাত ট্রেনে জার্নি করে আজ শনিবার ভোরেই এসে পৌঁছান রাজধানী নয়াদিল্লিতে। এরপর দুই ভাই মিলে ফুটপাতে বসেই একটু জিরিয়ে নিচ্ছিলেন। তারা অপেক্ষা করছিলেন সুদূর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা অভিজিৎ দিপকের।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার খবরে বলা হয়, ১.৪ বিলিয়নের (১৪০ কোটি) দেশ ভারতে মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরই বয়স ২৫ বছরের নিচে। দেশটির এই বিশাল তরুণ সমাজের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে এক তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ তুষের আগুনের মতো ধিকিধিকি জ্বলছিল। প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং দেশের বৃহত্তম স্কুল বোর্ডগুলোর নানামুখী অনিয়ম-অসংগতির কারণে সেই ক্ষোভের আগুন এখন চরম রূপ নিয়েছে।
আর তরুণদের সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবার প্রকাশ পাওয়ার জন্য বেছে নিয়েছে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত এক রাজনৈতিক মঞ্চ— যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। কটূক্তি আর উপহাস থেকে জন্ম নেওয়া এই প্রতীকী দলই এখন কাঁপিয়ে দিচ্ছে দিল্লির রাজপথ।
ঘটনার সূত্রপাত গত মাসে, যখন ভারতের প্রধান বিচারপতি দেশের যুবসমাজকে পরোক্ষভাবে ‘তেলাপোকা’র সঙ্গে তুলনা করে মন্তব্য করেন। এই মন্তব্য দেশ জুড়ে তরুণদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। সেই সময় বোস্টন ইউনিভার্সিটির সদ্য গ্র্যাজুয়েট অভিজিৎ দিপক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) একটি কৌতুকপূর্ণ প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন: ‘যদি দেশের সব তেলাপোকা এক হয়ে যায়, তাহলে কেমন হবে?’
এই সামান্য রসিকতাই ভারতীয় ইন্টারনেট দুনিয়ায় তোলপাড় সৃষ্টি করে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ‘ভারতীয় জনতা পার্টি’র (বিজেপি) নামের আদলে জন্ম নেয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। দিপকের এই সাধারণ খোঁচাটি ইনস্টাগ্রামে এতটাই জনপ্রিয় হয় যে, অল্প সময়ের মধ্যেই এর অনুসারী সংখ্যা দাঁড়ায় ২২ মিলিয়নেরও (২ কোটি ২০ লাখ) বেশি। এই সংখ্যা ২০১৪ সাল থেকে ভারতের ক্ষমতায় থাকা নরেন্দ্র মোদির নিজস্ব দলের অনুসারী সংখ্যার চেয়েও প্রায় দ্বিগুণ!
তবে আজ শনিবার দিল্লির যন্তর মন্তরে মোদি সরকারের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে দিপক এবং তার সঙ্গে জড়ো হওয়া শত শত তরুণ যে বিক্ষোভ প্রদর্শন করলেন, তা আর কোনো তামাশা বা রসিকতার পর্যায়ে নেই। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া এক বিশাল জনসমুদ্রের উদ্দেশে দিপক বলেন, ‘মোদি সরকারের প্রতি আমাদের বার্তা একদম পরিষ্কার ও সহজ: শিক্ষামন্ত্রীকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে বলুন। অন্যথায় আমরা এখান থেকে এক চুলও নড়ব না।’
‘সব তেলাপোকা এক হও!’
মধ্যপ্রদেশ থেকে আসা স্কুলছাত্র সৌরভ কুশওয়াহাও এই আন্দোলনের অন্যতম শরিক। তিনি সম্প্রতি ভারতের সেন্ট্রাল বোর্ড অব সেকেন্ডারি এডুকেশন (সিবিএসই) থেকে দ্বাদশ শ্রেণীর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। কিন্তু খাতার ডিজিটাল মূল্যায়নসহ একাধিক গুরুতর অসংগতির কারণে পুরো পরীক্ষা প্রক্রিয়াটিই তীব্র বিতর্কের মুখে পড়েছে।
সৌরভ নিশ্চিত নন যে তিনি উচ্চশিক্ষার খরচ চালাতে পারবেন কি না, তবে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের চেয়েও তার বেশি ক্ষোভ সরকারের ওপর। তিনি বলেন, ‘যে জনগণ ভোট দিয়ে এই সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়েছে, তাদের প্রতি এই সরকার সম্পূর্ণ উদাসীন ও নিষ্ঠুর।’

মেডিকেল কলেজের ভর্তি পরীক্ষা (নিট) প্রশ্ন ফাঁসের কারণে বাতিল হওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় এই স্কুল বোর্ডের কেলেঙ্কারিটি সামনে আসে। হতাশ শিক্ষার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, ভারতে প্রতি বছরই এমন ঘটনা ঘটছে এবং এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক জবাবদিহিতা নেই।
অনলাইনে বিপুল সাড়া পাওয়ার পর, দিপকের নেতৃত্বাধীন ‘সিজেপি’ তরুণদের এই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে মাঠপর্যায়ের আন্দোলন গড়ে তোলে। দলের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ডাক দেওয়া হয়েছিল— দিল্লির ঐতিহ্যবাহী প্রতিবাদ স্থল যন্তর মন্তরে যেন ‘সব তেলাপোকা একযোগে সমবেত হয়’ এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করে।
বিক্ষোভের ভিড়ে দাঁড়িয়ে সৌরভ কুশওয়াহা বলেন, ‘প্রথমে আমি স্রেফ মজার ছলে ওদের ইনস্টাগ্রাম পেজটি ফলো করতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু এখন এখানে এসে মনে হচ্ছে, আমরা সত্যিই এই মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করতে পারব।’ যদি তেমন কিছু ঘটে, তবে নরেন্দ্র মোদির টানা ১২ বছরের শাসনকালে এটিই হবে আন্দলনের মুখে কোনো মন্ত্রীর প্রথম পদত্যাগের ঘটনা।
ভারতের জেন জি প্রজন্মের এই বিশাল তরুণ সমাজ— যারা বিশ্বে এই বয়সী জনসংখ্যার দিক থেকে বৃহত্তম— তারা তাদের সচেতন জীবনে কেবল নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকারের শাসনই দেখেছে। সমালোচকদের মতে, মোদি সরকার যেকোনো ভিন্নমতকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করছে এবং ২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিভিন্ন বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক সূচকে ভারতের অবস্থান ক্রমাগত তলিয়ে যাচ্ছে।
আমেরিকার শীত ছেড়ে দিল্লির তপ্ত রাজপথে
আমেরিকার কনকনে শীতের আবহাওয়া ছেড়ে দিল্লির তীব্র, দমবন্ধ করা গরমের মধ্যে এসে নেমেছেন দিপক। গায়ে একটি কালো জিপ-আপ হুডি, মাথার ক্যাপটি মুখের ওপর টানা। চারপাশে সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার উপচে পড়া ভিড় ঠেলে দিপক যখন মাইকের সামনে এসে দাঁড়ালেন, মুহূর্তেই পুরো জনতা স্লোগানে স্লোগানে কেঁপে উঠল। গরমে ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে তিনি একপর্যায়ে গায়ের হুডিটি খুলে ফেলেন।

বক্তৃতার শুরুতেই দিপক তার রুদ্ধশ্বাস ওভারনাইট ফ্লাইটের কথা স্মরণ করেন। তিনি জানান, দিল্লিতে নামার পর তিনি গ্রেপ্তার হতে পারেন— এমন শঙ্কায় তার পুরো পরিবার আতঙ্কিত ছিল। ‘কিন্তু এই ভয়টা শুধু আমার মায়ের একার নয়,’ দিপকের এই কথার সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের জনতা চিৎকার করে ওঠে— ‘ধিক্কার! ধিক্কার!’
দিপক যোগ করেন, ‘এই দেশের প্রতিটি মা আজ এই আতঙ্কে থাকেন যে, তার সন্তান যদি রাজনীতি নিয়ে কথা বলে, এই সরকারের বিরুদ্ধে মুখ খোলে, তবে তাকে হয়তো জেলে যেতে হবে।’
গত কয়েক বছরে মোদি সরকার বেশ কয়েকজন মানবাধিকার কর্মী ও ছাত্র নেতাকে কারারুদ্ধ করেছে। বিরোধী দল এবং সমালোচকদের স্পষ্ট অভিযোগ— দেশটি ক্রমশ একনায়কতন্ত্রের দিকে ধাবিত হচ্ছে। যদিও বিজেপি এবং মোদি সরকার এই অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে এবং তাদের দাবি—তারা দেশের আইন ও সংবিধান মেনেই সব পদক্ষেপ নিচ্ছে।
৩০ বছর বয়সী দিপক মাত্র দুই বছর আগে পাবলিক রিলেশনস (জনসংযোগ) বিষয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি পোস্ট যে তাকে এভাবে হঠাৎ একটি গণআন্দোলনের নেতায় পরিণত করবে, তা তিনি নিজেও ভাবেননি। গত মাসে আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দিপক বলেছিলেন, তার এই উদ্যোগের পেছনে তরুণদের যে অভাবনীয় সাড়া মিলেছে, তার জন্য তিনি এক ধরনের দায়বদ্ধতা অনুভব করছেন।
তীব্র গরমে ক্লান্ত দিপক একপর্যায়ে মাইকটি অন্যের হাতে দিয়ে দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে পানি পান করেন এবং বাকি পানির বোতলগুলো ভিড়ের দিকে ছুঁড়ে দেন। তখন এক তরুণ বিক্ষোভকারী চিৎকার করে বলে ওঠেন, ‘আই লাভ ইউ, অভিজিৎ!’ অনেক প্রতিবাদকারীকে দেখা গেছে তেলাপোকার মাস্ক পরে আসতে। কারও হাতে ছিল গোলাপ ফুল বা তোড়া, কারও হাতে বই— ঠিক যেভাবে দিপকের দল সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের আহ্বান জানিয়েছিল।
পরে ভারতীয় ক্রিকেট দলের নীল জার্সি গায়ে জড়িয়ে দিপক বলেন, ‘যারা মনে করেন ভারতের যুবসমাজ কেবল সোশ্যাল মিডিয়াতেই পোস্ট করতে পারে, তারা এখানে এসে নিজের চোখে দেখে যান। আর যারা ভাবছেন আমরা কিছুক্ষণ চিৎকার-চেঁচামেচি করে চলে যাব, তাদের বলে রাখি— আমরা তেলাপোকা, যতক্ষণ না মন্ত্রী পদত্যাগ করছেন, আমরা এখানেই থাকব।’
‘রাস্তায় নামার এটাই সময়’
দিল্লির একটি স্যাটেলাইট টাউনশিপ থেকে আসা ২৮ বছর বয়সী গিগ-ওয়ার্কার (অস্থায়ী শ্রমিক) মোহাম্মদ আফতাব। দিপককে একটু স্পষ্ট করে দেখার জন্য তিনি যন্তর মন্তরের একটি গাছের ডালে চড়ে বসেছিলেন। আফতাব জানান, চরম অর্থনৈতিক অনটনের কারণে তিনি হাইস্কুলের গণ্ডি পার হতে পারেননি। এখন কোনো সামাজিক নিরাপত্তা ছাড়াই জীবিকার তাগিদে বাড়ি বাড়ি মুদি মালামাল সরবরাহ (গ্রোসারি ডেলিভারি) করেন।

মুখে তেলাপোকার মাস্ক পরা আফতাব জানান, একদিন কাজ না করার মানে হলো রাতে না খেয়ে থাকা। তা সত্ত্বেও আমি এখানে আসতে চেয়েছি। তিনি বলেন, ‘আমি নিজে স্কুলে যেতে পারিনি ঠিকই, কিন্তু এমন লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী আছে যারা তাদের পরীক্ষার জন্য, নিজেদের একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য রাতের পর রাত জেগে পড়াশোনা করেছে। সেই অপরাধী মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে এই শিক্ষার্থীদের পাশে এসে দাঁড়ানো আমাদের সবার কর্তব্য।’
তবে এই বিশাল বিক্ষোভের বিষয়ে মোদি সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া বা মন্তব্য পাওয়া যায়নি। জনতার থেকে বেশ কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে এই বিক্ষোভের দিকে গভীর দৃষ্টি রাখছিলেন শিবানী নামের এক নারী পুলিশ কর্মকর্তা। সরকারের তরফ থেকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ভয়ে তিনি তার পুরো নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান।
বিক্ষোভকারীদের ভিড়ে তার বড় মেয়েও রয়েছে এবং এতে তার কোনো ‘আপত্তি নেই’। শিবানী বলেন, ‘এই ছেলেমেয়েরা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তিত, আর একজন অভিভাবক হিসেবে আমিও চিন্তিত। জীবনে এমন একটা সময় আসেই, যখন মানুষকে রাজপথে নামতে হয়, তাই নয় কি?’
রাজনীতি/আইআর

মাত্র ১৭ বছর বয়সী সৌরভ কুশওয়াহা। পরনের কাপড় ছাড়া সঙ্গে আর কিছুই নেননি তিনি। মধ্যভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের একটি প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে বড় ভাইয়ের হাত ধরে সারা রাত ট্রেনে জার্নি করে আজ শনিবার ভোরেই এসে পৌঁছান রাজধানী নয়াদিল্লিতে। এরপর দুই ভাই মিলে ফুটপাতে বসেই একটু জিরিয়ে নিচ্ছিলেন। তারা অপেক্ষা করছিলেন সুদূর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা অভিজিৎ দিপকের।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার খবরে বলা হয়, ১.৪ বিলিয়নের (১৪০ কোটি) দেশ ভারতে মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরই বয়স ২৫ বছরের নিচে। দেশটির এই বিশাল তরুণ সমাজের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে এক তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ তুষের আগুনের মতো ধিকিধিকি জ্বলছিল। প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং দেশের বৃহত্তম স্কুল বোর্ডগুলোর নানামুখী অনিয়ম-অসংগতির কারণে সেই ক্ষোভের আগুন এখন চরম রূপ নিয়েছে।
আর তরুণদের সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবার প্রকাশ পাওয়ার জন্য বেছে নিয়েছে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত এক রাজনৈতিক মঞ্চ— যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। কটূক্তি আর উপহাস থেকে জন্ম নেওয়া এই প্রতীকী দলই এখন কাঁপিয়ে দিচ্ছে দিল্লির রাজপথ।
ঘটনার সূত্রপাত গত মাসে, যখন ভারতের প্রধান বিচারপতি দেশের যুবসমাজকে পরোক্ষভাবে ‘তেলাপোকা’র সঙ্গে তুলনা করে মন্তব্য করেন। এই মন্তব্য দেশ জুড়ে তরুণদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। সেই সময় বোস্টন ইউনিভার্সিটির সদ্য গ্র্যাজুয়েট অভিজিৎ দিপক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) একটি কৌতুকপূর্ণ প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন: ‘যদি দেশের সব তেলাপোকা এক হয়ে যায়, তাহলে কেমন হবে?’
এই সামান্য রসিকতাই ভারতীয় ইন্টারনেট দুনিয়ায় তোলপাড় সৃষ্টি করে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ‘ভারতীয় জনতা পার্টি’র (বিজেপি) নামের আদলে জন্ম নেয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। দিপকের এই সাধারণ খোঁচাটি ইনস্টাগ্রামে এতটাই জনপ্রিয় হয় যে, অল্প সময়ের মধ্যেই এর অনুসারী সংখ্যা দাঁড়ায় ২২ মিলিয়নেরও (২ কোটি ২০ লাখ) বেশি। এই সংখ্যা ২০১৪ সাল থেকে ভারতের ক্ষমতায় থাকা নরেন্দ্র মোদির নিজস্ব দলের অনুসারী সংখ্যার চেয়েও প্রায় দ্বিগুণ!
তবে আজ শনিবার দিল্লির যন্তর মন্তরে মোদি সরকারের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে দিপক এবং তার সঙ্গে জড়ো হওয়া শত শত তরুণ যে বিক্ষোভ প্রদর্শন করলেন, তা আর কোনো তামাশা বা রসিকতার পর্যায়ে নেই। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া এক বিশাল জনসমুদ্রের উদ্দেশে দিপক বলেন, ‘মোদি সরকারের প্রতি আমাদের বার্তা একদম পরিষ্কার ও সহজ: শিক্ষামন্ত্রীকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে বলুন। অন্যথায় আমরা এখান থেকে এক চুলও নড়ব না।’
‘সব তেলাপোকা এক হও!’
মধ্যপ্রদেশ থেকে আসা স্কুলছাত্র সৌরভ কুশওয়াহাও এই আন্দোলনের অন্যতম শরিক। তিনি সম্প্রতি ভারতের সেন্ট্রাল বোর্ড অব সেকেন্ডারি এডুকেশন (সিবিএসই) থেকে দ্বাদশ শ্রেণীর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। কিন্তু খাতার ডিজিটাল মূল্যায়নসহ একাধিক গুরুতর অসংগতির কারণে পুরো পরীক্ষা প্রক্রিয়াটিই তীব্র বিতর্কের মুখে পড়েছে।
সৌরভ নিশ্চিত নন যে তিনি উচ্চশিক্ষার খরচ চালাতে পারবেন কি না, তবে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের চেয়েও তার বেশি ক্ষোভ সরকারের ওপর। তিনি বলেন, ‘যে জনগণ ভোট দিয়ে এই সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়েছে, তাদের প্রতি এই সরকার সম্পূর্ণ উদাসীন ও নিষ্ঠুর।’

মেডিকেল কলেজের ভর্তি পরীক্ষা (নিট) প্রশ্ন ফাঁসের কারণে বাতিল হওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় এই স্কুল বোর্ডের কেলেঙ্কারিটি সামনে আসে। হতাশ শিক্ষার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, ভারতে প্রতি বছরই এমন ঘটনা ঘটছে এবং এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক জবাবদিহিতা নেই।
অনলাইনে বিপুল সাড়া পাওয়ার পর, দিপকের নেতৃত্বাধীন ‘সিজেপি’ তরুণদের এই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে মাঠপর্যায়ের আন্দোলন গড়ে তোলে। দলের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ডাক দেওয়া হয়েছিল— দিল্লির ঐতিহ্যবাহী প্রতিবাদ স্থল যন্তর মন্তরে যেন ‘সব তেলাপোকা একযোগে সমবেত হয়’ এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করে।
বিক্ষোভের ভিড়ে দাঁড়িয়ে সৌরভ কুশওয়াহা বলেন, ‘প্রথমে আমি স্রেফ মজার ছলে ওদের ইনস্টাগ্রাম পেজটি ফলো করতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু এখন এখানে এসে মনে হচ্ছে, আমরা সত্যিই এই মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করতে পারব।’ যদি তেমন কিছু ঘটে, তবে নরেন্দ্র মোদির টানা ১২ বছরের শাসনকালে এটিই হবে আন্দলনের মুখে কোনো মন্ত্রীর প্রথম পদত্যাগের ঘটনা।
ভারতের জেন জি প্রজন্মের এই বিশাল তরুণ সমাজ— যারা বিশ্বে এই বয়সী জনসংখ্যার দিক থেকে বৃহত্তম— তারা তাদের সচেতন জীবনে কেবল নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকারের শাসনই দেখেছে। সমালোচকদের মতে, মোদি সরকার যেকোনো ভিন্নমতকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করছে এবং ২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিভিন্ন বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক সূচকে ভারতের অবস্থান ক্রমাগত তলিয়ে যাচ্ছে।
আমেরিকার শীত ছেড়ে দিল্লির তপ্ত রাজপথে
আমেরিকার কনকনে শীতের আবহাওয়া ছেড়ে দিল্লির তীব্র, দমবন্ধ করা গরমের মধ্যে এসে নেমেছেন দিপক। গায়ে একটি কালো জিপ-আপ হুডি, মাথার ক্যাপটি মুখের ওপর টানা। চারপাশে সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার উপচে পড়া ভিড় ঠেলে দিপক যখন মাইকের সামনে এসে দাঁড়ালেন, মুহূর্তেই পুরো জনতা স্লোগানে স্লোগানে কেঁপে উঠল। গরমে ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে তিনি একপর্যায়ে গায়ের হুডিটি খুলে ফেলেন।

বক্তৃতার শুরুতেই দিপক তার রুদ্ধশ্বাস ওভারনাইট ফ্লাইটের কথা স্মরণ করেন। তিনি জানান, দিল্লিতে নামার পর তিনি গ্রেপ্তার হতে পারেন— এমন শঙ্কায় তার পুরো পরিবার আতঙ্কিত ছিল। ‘কিন্তু এই ভয়টা শুধু আমার মায়ের একার নয়,’ দিপকের এই কথার সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের জনতা চিৎকার করে ওঠে— ‘ধিক্কার! ধিক্কার!’
দিপক যোগ করেন, ‘এই দেশের প্রতিটি মা আজ এই আতঙ্কে থাকেন যে, তার সন্তান যদি রাজনীতি নিয়ে কথা বলে, এই সরকারের বিরুদ্ধে মুখ খোলে, তবে তাকে হয়তো জেলে যেতে হবে।’
গত কয়েক বছরে মোদি সরকার বেশ কয়েকজন মানবাধিকার কর্মী ও ছাত্র নেতাকে কারারুদ্ধ করেছে। বিরোধী দল এবং সমালোচকদের স্পষ্ট অভিযোগ— দেশটি ক্রমশ একনায়কতন্ত্রের দিকে ধাবিত হচ্ছে। যদিও বিজেপি এবং মোদি সরকার এই অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে এবং তাদের দাবি—তারা দেশের আইন ও সংবিধান মেনেই সব পদক্ষেপ নিচ্ছে।
৩০ বছর বয়সী দিপক মাত্র দুই বছর আগে পাবলিক রিলেশনস (জনসংযোগ) বিষয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি পোস্ট যে তাকে এভাবে হঠাৎ একটি গণআন্দোলনের নেতায় পরিণত করবে, তা তিনি নিজেও ভাবেননি। গত মাসে আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দিপক বলেছিলেন, তার এই উদ্যোগের পেছনে তরুণদের যে অভাবনীয় সাড়া মিলেছে, তার জন্য তিনি এক ধরনের দায়বদ্ধতা অনুভব করছেন।
তীব্র গরমে ক্লান্ত দিপক একপর্যায়ে মাইকটি অন্যের হাতে দিয়ে দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে পানি পান করেন এবং বাকি পানির বোতলগুলো ভিড়ের দিকে ছুঁড়ে দেন। তখন এক তরুণ বিক্ষোভকারী চিৎকার করে বলে ওঠেন, ‘আই লাভ ইউ, অভিজিৎ!’ অনেক প্রতিবাদকারীকে দেখা গেছে তেলাপোকার মাস্ক পরে আসতে। কারও হাতে ছিল গোলাপ ফুল বা তোড়া, কারও হাতে বই— ঠিক যেভাবে দিপকের দল সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের আহ্বান জানিয়েছিল।
পরে ভারতীয় ক্রিকেট দলের নীল জার্সি গায়ে জড়িয়ে দিপক বলেন, ‘যারা মনে করেন ভারতের যুবসমাজ কেবল সোশ্যাল মিডিয়াতেই পোস্ট করতে পারে, তারা এখানে এসে নিজের চোখে দেখে যান। আর যারা ভাবছেন আমরা কিছুক্ষণ চিৎকার-চেঁচামেচি করে চলে যাব, তাদের বলে রাখি— আমরা তেলাপোকা, যতক্ষণ না মন্ত্রী পদত্যাগ করছেন, আমরা এখানেই থাকব।’
‘রাস্তায় নামার এটাই সময়’
দিল্লির একটি স্যাটেলাইট টাউনশিপ থেকে আসা ২৮ বছর বয়সী গিগ-ওয়ার্কার (অস্থায়ী শ্রমিক) মোহাম্মদ আফতাব। দিপককে একটু স্পষ্ট করে দেখার জন্য তিনি যন্তর মন্তরের একটি গাছের ডালে চড়ে বসেছিলেন। আফতাব জানান, চরম অর্থনৈতিক অনটনের কারণে তিনি হাইস্কুলের গণ্ডি পার হতে পারেননি। এখন কোনো সামাজিক নিরাপত্তা ছাড়াই জীবিকার তাগিদে বাড়ি বাড়ি মুদি মালামাল সরবরাহ (গ্রোসারি ডেলিভারি) করেন।

মুখে তেলাপোকার মাস্ক পরা আফতাব জানান, একদিন কাজ না করার মানে হলো রাতে না খেয়ে থাকা। তা সত্ত্বেও আমি এখানে আসতে চেয়েছি। তিনি বলেন, ‘আমি নিজে স্কুলে যেতে পারিনি ঠিকই, কিন্তু এমন লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী আছে যারা তাদের পরীক্ষার জন্য, নিজেদের একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য রাতের পর রাত জেগে পড়াশোনা করেছে। সেই অপরাধী মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে এই শিক্ষার্থীদের পাশে এসে দাঁড়ানো আমাদের সবার কর্তব্য।’
তবে এই বিশাল বিক্ষোভের বিষয়ে মোদি সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া বা মন্তব্য পাওয়া যায়নি। জনতার থেকে বেশ কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে এই বিক্ষোভের দিকে গভীর দৃষ্টি রাখছিলেন শিবানী নামের এক নারী পুলিশ কর্মকর্তা। সরকারের তরফ থেকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ভয়ে তিনি তার পুরো নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান।
বিক্ষোভকারীদের ভিড়ে তার বড় মেয়েও রয়েছে এবং এতে তার কোনো ‘আপত্তি নেই’। শিবানী বলেন, ‘এই ছেলেমেয়েরা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তিত, আর একজন অভিভাবক হিসেবে আমিও চিন্তিত। জীবনে এমন একটা সময় আসেই, যখন মানুষকে রাজপথে নামতে হয়, তাই নয় কি?’
রাজনীতি/আইআর

বৈরুত-তেল আবিব যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার পর, নিজেদের লেবানিজ মিত্র হিজবুল্লাহর প্রতি আবারও প্রকাশ্য ও জোরালো সমর্থন ব্যক্ত করেছে ইরান। একই সঙ্গে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি বাহিনীকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে তেহরান।
১৩ ঘণ্টা আগে
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট একটি যুদ্ধবিরতিরও আহবান জানান এবং চিঠিতে কিছু ক্ষেত্রে তিনি দৃঢ় অবস্থান দেখান আবার কিছু ক্ষেত্রে তাঁর বক্তব্যের সুর ছিল বিদ্রূপাত্মক।
১৫ ঘণ্টা আগে
এই ঘটনায় কোনো মার্কিন সেনা হতাহত বা বাহরাইনের পঞ্চম নৌবহরের সদর দফতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি উল্লেখ করে সেন্টকম জানায়, পর্দার আড়ালে স্থায়ী যুদ্ধবিরতির আলোচনা চললেও সাম্প্রতিক এই মুখোমুখি সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আবারও চরম উত্তেজনার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
১৫ ঘণ্টা আগে
মার্কিন সূত্র জানায়, ওই ড্রোনগুলো আন্তর্জাতিক নৌপথে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওপর নজরদারির উদ্দেশ্যে মোতায়েন করা হয়েছিল। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট হরমুজ প্রণালি দিয়ে যুদ্ধ শুরুর আগে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হতো। বর্তমানে অঞ্চলটিতে উত্তেজনার কারণে প্রণালির স্বাভাব
১৬ ঘণ্টা আগে