
ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম

আকাশে ঘুরছে কয়েকটি নজরদারি ড্রোন। সেখান থেকে সরাসরি সম্প্রচারিত হচ্ছে লাইভ ভিডিও। আর যুদ্ধক্ষেত্র থেকে প্রায় ডজনখানেক মাইল দূরে, মাটির নিচের এক গোপন বাঙ্কারে আরামদায়ক গেমিং চেয়ারে বসে মাউস আর কিবোর্ডে আঙুল চালাচ্ছেন ইউক্রেনীয় কমান্ডাররা। মাঠপর্যায়ে কোনো সেনার উপস্থিতি ছাড়াই পূর্ব ইউক্রেনের রুশ ঘাঁটিতে একের পর এক নিখুঁত হামলা চালানো হচ্ছে। বহুল আলোচিত ইউক্রেন যুদ্ধ এখন প্রযুক্তির ছোঁয়ায় রূপ নিয়েছে এক স্বয়ংক্রিয় 'কিলিং গেমে'।
ইউক্রেনের আভদিভকা ও বাখমুতের মতো সবচেয়ে নৃশংস ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধগুলোতে অংশ নেওয়া এই অভিজ্ঞ যোদ্ধারা এখন সম্পূর্ণ নতুন এক ধরনের যুদ্ধ পরিচালনা করছেন, যার ভয়াবহতা তারা কাছাকাছি থেকে স্পর্শ করতে পারেন না, ঘ্রাণ পান না, এমনকি সরাসরি চোখেও দেখেন না। পূর্ব ইউক্রেনে রাশিয়ার সম্মুখসারির তিনটি লক্ষ্যবস্তুতে মোট ছয়টি রোবট বিস্ফোরণ ঘটানোর এই পুরো অভিযানে মাঠপর্যায়ে কোনো ইউক্রেনীয় সেনার উপস্থিতিরই প্রয়োজন হয়নি। পুরো যুদ্ধটি পরিচালিত হয়েছে গেমিং চেয়ারে বসে, মাথার ওপরে থাকা নজরদারি ড্রোন থেকে লাইভস্ট্রিমের মাধ্যমে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে।

কয়েক মাস ধরে চরম জনবল সংকট এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনিশ্চিত সামরিক সহায়তার কারণে ব্যাকফুটে থাকা ইউক্রেনীয় বাহিনী নিজেদের রণকৌশলে এক অবিশ্বাস্য পরিবর্তন এনেছে। তাদের যুদ্ধের এক বিশাল অংশ এখন পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন ধরনের রোবট, ড্রোন এবং দূরনিয়ন্ত্রিত ট্যাংক ব্যবহারের মাধ্যমে তারা ধীরগতির ও ক্লান্ত রুশ বাহিনীর ওপর একটি আকস্মিক, তবে ভঙ্গুর আধিপত্য বিস্তার করতে পেরেছে।
গত এপ্রিলে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দাবি করেন, এই প্রথম তারা সম্পূর্ণ রোবট এবং ড্রোনের সহায়তায় রাশিয়ার একটি সামরিক ঘাঁটি দখল করতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি আরও জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রগুলো দিয়ে ২২ হাজারেরও বেশি সামরিক মিশন পরিচালনা করা হয়েছে।
রুশ বাহিনীর ‘নীরব মৃত্যু’
কম্পিউটার প্রসেসরের কুলিং ফ্যানের কমলা রঙের আলো আর মাথার ওপরের মৃদু লাইটের নিচে বসে এই নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন করছেন ইউক্রেনীয় প্রকৌশলীরা। মূলত টিকে থাকার লড়াই থেকেই এই উদ্ভাবনের জন্ম। এখানকার সামরিক ইউনিটটি আটক হওয়া রুশ যুদ্ধবন্দিদের কাছ থেকে জানতে পেরেছে যে, চার চাকার চেসিসের ওপর বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক বহনকারী এই রোবটগুলোকে রুশ বাহিনী ‘নীরব মৃত্যু’ (সাইলেন্ট ডেথ) নামে ডাকছে। রুশ সেনারা এই রোবটগুলোর আসার শব্দ তখনই শুনতে পায়, যখন সেগুলো মাত্র ১০ মিটার দূরে থাকে— যা মূলত রোবটগুলোর বিস্ফোরণের আওতার একেবারে ভেতরে।
যুদ্ধক্ষেত্রের একটি লাইভ স্ক্রিনে দেখা যায়, ছয়টি রোবটের প্রথমটি অ্যালুমিনিয়ামের ধ্বংসাবশেষের ওপর পড়ে কিছুটা হোঁচট খেল। তবে বাধাটি এড়িয়ে সামনে যাওয়ার জন্য এর চাকাগুলো মরিয়া হয়ে ঘুরছিল। অবশেষে এটি রাস্তার গর্তটি পার হতে সক্ষম হয়। ওপরের নজরদারি ড্রোন থেকে দেখা গেল, একটি ছোটখাটো মাশরুম ক্লাউডের মতো সাদা আগুনের কুণ্ডলী তৈরি হলো— যা প্রথম বিস্ফোরণের তাপীয় মানচিত্র (থার্মাল ফুটপ্রিন্ট) ফুটিয়ে তুলেছে। এরপরই ঘটল দ্বিতীয় বিস্ফোরণ। আক্রমণের এই প্রাথমিক ধাক্কাটির উদ্দেশ্য ছিল রুশ সেনাদের মনোযোগ অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া, যাতে বাকি রোবটগুলো অনায়াসে শত্রুর সীমানার ভেতরে ঢুকে পড়তে পারে।
এখানকার হিসাব-নিকাশ অত্যন্ত সহজ ও স্পষ্ট। ইউক্রেনের দুর্ধর্ষ ও দক্ষ সামরিক বিগ্রেড থার্ড অ্যাসাল্টের ‘এনসি১৩’ ইউনিট হিসাব করে দেখেছে, তাদের পরিচালিত ১৬৪টি অভিযানে রোবটের বদলে সাধারণ সেনা ব্যবহার করলে ২ হাজার ৩০০ জন সৈন্যের প্রয়োজন হতো। এর মধ্যে ধারণামতে অর্ধেক সৈন্যই মারা যেতেন অথবা গুরুতর আহত হতেন। সেই হিসেবে, স্ক্রিনের সামনে চলতে থাকা এই চালকবিহীন খুঁড়িয়ে চলা বোমাগুলো একটি বড় প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, যা নিশ্চিতভাবে এক হাজার ইউক্রেনীয় সেনার জীবন বাঁচিয়েছে।
দনবাসে নৃশংস যুদ্ধের স্মৃতিচারণ করে এই ইউনিটের উপ-অধিনায়ক বার বলেন, ‘সেই দিনগুলোতে আমি এমন কোনো প্রযুক্তির কথা কল্পনাও করতে পারতাম না। কিন্তু এখন আমি বুঝতে পারছি, তখন যদি আমাদের কাছে এই ধরনের সরঞ্জাম থাকত… তবে আমার অনেক সহযোদ্ধা আজ বেঁচে থাকতেন।’
তবে এই ইউনিটের কমান্ডার মাকার জিনকেভিচ এই নতুন যুদ্ধব্যবস্থায় কিছুটা অপূর্ণতা দেখছেন। তিনি বলেন, 'আগের যুদ্ধগুলো ছিল অনেক বেশি পুরুষোচিত ও সাহসিকতার। সেখানে আপনার ব্যক্তিগত দক্ষতা, আপনি কতটা প্রশিক্ষিত বা কতটা শৃঙ্খলাবদ্ধ, তা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আর এখন, প্রযুক্তি সবকিছু নির্ধারণ করে দিচ্ছে। পুরো বিষয়টি দাঁড়িয়েছে কে কত দ্রুত এই চালকবিহীন দূরনিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারছে, তার ওপর।
নতুন যুদ্ধ, নতুন নায়ক
ইউক্রেনের এই নতুন রণকৌশলের জন্ম হয়েছে তীব্র জনবল সংকট থেকে। চার বছর ধরে চলা রুশ আগ্রাসনে ইউক্রেনের সীমিত জনসংখ্যার একটি বড় অংশ আজ বিপর্যস্ত। তবে কিয়েভ শুরু থেকেই যেভাবে ড্রোন প্রযুক্তিকে আপন করে নিয়েছে এবং এর নির্ভুলতা ও শক্তিকে যেভাবে ব্যাপক শিল্পায়নে রূপ দিয়েছে, তা মস্কোর ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।
ইউক্রেনের বর্তমান নীতি হলো— প্রতি মাসে অন্তত ৩৫ হাজার রুশ সেনাকে হতাহত করা, যা তারা চলতি বছরে সফলভাবে ধরে রেখেছে। তাদের লক্ষ্য ক্রেমলিনকে মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে সৈন্য রিক্রুট করতে বাধ্য করা— যা রাশিয়ার অভ্যন্তরে রাজনৈতিক চাপ তৈরি করবে। গত বুধবার ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা জিসিএইচকিউ নতুন তথ্যের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, যুদ্ধে এ পর্যন্ত রাশিয়ার মোট নিহতের সংখ্যা প্রায় ৫ লাখে পৌঁছেছে।

এই নতুন যুদ্ধক্ষেত্রের নায়করাও সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘরানার। এমনই একজন ২২ বছর বয়সী গোরা। নিজেকে শুধু একজন ‘সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার’ হিসেবে পরিচয় দেওয়ার পর মুহূর্তেই তিনি নিজেই নিজের ভুল সংশোধন করে জোর দিয়ে বলেন, ‘আমি একজন এমবেডেড হার্ডওয়্যার অ্যান্ড সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার।’ তিনি কন্ট্রোল হাবের লাইভ স্ট্রিমটি চালু করে দেখালেন, যেখানে নষ্ট হয়ে যাওয়া রোবটগুলো মেরামত এবং নতুন রোবট তৈরি করা হচ্ছে। যুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন গোরার বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর।
পূর্ব কিয়েভে রুশ ড্রোনের ক্রমাগত হামলার শব্দে রাতের পর রাত জেগে থাকতে থাকতে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। তখনই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, তার আইটি ব্যবস্থার দক্ষতাই হতে পারে যুদ্ধের নতুন ফ্রন্টলাইন। গোরা বলেন, ‘এখানে আসল বিষয় গাড়ি বা রোবট নয়, মূল বিষয় হলো মানুষের মস্তিষ্ক এবং তারা এটি কীভাবে পরিকল্পনা করছে। তারা কীভাবে বিভিন্ন রোবট এবং অপারেটরদের মধ্যে যোগাযোগের নেটওয়ার্ক তৈরি করছে, সেটাই আসল।’
তবে যুদ্ধক্ষেত্রের চ্যালেঞ্জগুলোও প্রতিনিয়ত পালটাচ্ছে। একজন অপারেটর তার কমান্ডারকে বলছিলেন, ‘সালাম্যান্ডার ৬ এর জিপিএস সিগন্যাল জ্যাম করে দেওয়া হয়েছে। আমরা আনুমানিক একটি রুট ম্যাপ তৈরি করে জিপিএস ছাড়াই এটি পরিচালনা করছি।’ যুদ্ধক্ষেত্রে লোকেশন ডেটার ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক সময় দিনের বেলা রেকর্ড করা ড্রোন ফুটেজ এবং কর্দমাক্ত চাষের জমির ওপর দিয়ে নিখুঁত গবেষণার মাধ্যমে রোবটগুলোর পথ খুঁজে নিতে হয়।

এরই মধ্যে আরও দুটি রোবট একটি ঝোপঝাড়পূর্ণ গাছের সারির দিকে এগিয়ে গেল এবং সেখানে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটল। ইউনিটের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সেখানে আগে থেকেই রুশ সেনাদের অবস্থান শনাক্ত করা হয়েছিল। তবে পঞ্চম রোবটটি ততটা কার্যকর হতে পারেনি, এটি একটি পরিখার মধ্যে কাত হয়ে পড়ে যায় এবং ষষ্ঠ রোবটটিকে রুশ সেনারা মাঝপথেই আটকে দিতে সক্ষম হয়।
মাটির ওপরে পদাতিক বাহিনীর সবচেয়ে মৌলিক কাজগুলোও এখন রোবট দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে। জাল দিয়ে ঢাকা একটি গোপন জায়গায় একটি রোবটের ওপর বিশাল ব্রাউনিং হেভি মেশিনগান মাউন্ট করার কাজ করছিলেন কিছু সেনা। দূরনিয়ন্ত্রিত এই যানটিতে বেশ কয়েকটি ক্যামেরা লাগানো রয়েছে, যা লক্ষ্যবস্তুর চারপাশের প্রশস্ত দৃশ্য দেখায়। এই স্বয়ংক্রিয় যানটি শত্রুর অপেক্ষায় দিনের পর দিন ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে থাকতে পারে। এর কোনো খাবারের প্রয়োজন হয় না, পায়ে ক্লান্তি আসে না।
কমান্ডার সাইবার জানান, এর একমাত্র সীমাবদ্ধতা হলো গোলাবারুদ। ৪০০ রাউন্ড গুলি শেষ হয়ে গেলে এটিকে আবার ক্যাম্পে ফিরিয়ে আনতে হয়। তিনি বলেন, 'আমরা যখন প্রথম শত্রুর বিরুদ্ধে এই রোবটটি ব্যবহার করেছিলাম, তারা পুরোপুরি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। তারা মাটিতে শুয়ে গড়াগড়ি খাচ্ছিল এবং বুঝতে পারছিল না যে কী করা উচিত।'
সাইবারের ইউনিটে এই ধরনের পাঁচটি মেশিন রয়েছে, যা তারা খুব হিসাব করে ব্যবহার করেন। তারা এখন আরও একটি দ্রুতগতির রোবট তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যা ঘণ্টায় ১০ মাইল বেগে চলতে পারবে এবং কালাশনিকভের মতো ছোট আগ্নেয়াস্ত্র বহন করে যুদ্ধ করতে পারবে।
ইউক্রেনের এই অটোমেশন সাফল্যে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে চালকবিহীন এই যানগুলো সম্মুখসারির সাধারণ কৌতুহল থেকে নিয়মিত সামরিক সরঞ্জামে পরিণত হয়েছে। এই রোবটগুলো এখন আহতদের উদ্ধার করছে এবং সম্মুখভাগের সৈন্যদের কাছে রসদ পৌঁছে দিচ্ছে।
জীবনের ঝুঁকি ও ফ্রন্টলাইনের বাস্তব চিত্র
আকাশে রুশ ড্রোনের সার্বক্ষণিক নজরদারির কারণে রসদ সরবরাহকারী রোবটগুলোতে মালপত্র লোড করার কাজটিও চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইউক্রেনীয় বাহিনীর ৯৩তম ব্রিগেড দ্রুজিলকা শহরের চারপাশে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ঘোরাঘুরি করছিল, যাতে গাছের নিচে লুকিয়ে থাকা রোবট ইউনিটগুলোর কাছে গোলাবারুদ, খাবার ও পানি পৌঁছে দেওয়া যায়। শহরটিতে এখনো কিছু বেসামরিক মানুষ বসবাস করছেন, তবে রুশ ড্রোনের নিখুঁত নজরদারির কারণে ইউক্রেনীয় সৈন্যরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে থাকারও সুযোগ পাচ্ছে না।
একটি খামারবাড়িতে রসদ খালাস করা হচ্ছিল, যেখানে একটি রোবটের পিঠে পাঁচটি গোলাবারুদের বাক্স বেঁধে দেওয়া হয়। মাইলখানেক দূরের বাঙ্কার থেকে একজন রিমোটের মাধ্যমে রোবটটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এটি সচল হয়ে ওঠে। দুটি ছোট বাড়ির বেড়ার মাঝখানের কর্দমাক্ত পথ দিয়ে সাধারণ মানুষদের পাশ কাটিয়ে রোবটটি ধীরগতিতে এগিয়ে যেতে থাকে। সম্মুখ সমরে পৌঁছানোর জন্য এটি তার ১০ ঘণ্টার দীর্ঘ যাত্রা শুরু করছিল।

সম্মুখসারিতে থাকা ইউক্রেনীয় সৈন্যদের জন্য এই রসদগুলো জরুরি প্রয়োজন, কারণ তারা বর্তমানে তাদের সহ্যক্ষমতার শেষ সীমায় পৌঁছে গেছেন। এর কিছু সময় পর, কিয়েভ কীভাবে যুদ্ধোপযোগী পুরুষ সৈন্য খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছে, তার দুটি বেদনাদায়ক বাস্তব চিত্র দেখা গেল।
২৪তম মেকানাইজড ব্রিগেডের দুই সেনা সদস্য ইভান এবং মাইকেল (ছদ্মনাম)। তারা যথাক্রমে ৩৪৪ এবং ৩৩৪ দিন একটানা সম্মুখসারির বাঙ্কারে কাটিয়েছেন। ইভানের সামান্য খুঁড়িয়ে চলা এবং চোখের ঝাপসা দৃষ্টিই বলে দিচ্ছিল তিনি কী ধরনের চরম মানসিক ও শারীরিক যাতনার মধ্য দিয়ে গেছেন। আজ ভোরেই তার সেই দীর্ঘ ডিউটি শেষ হয়েছে এবং এরপর তিনি নিরাপদে পৌঁছানোর জন্য ১২ ঘণ্টায় ২০ মাইল পথ হেঁটে এসেছেন।
ইভান বলেন, ‘একমাত্র আমার স্ত্রী ও সন্তানদের মুখ মনে করেই আমি টিকে ছিলাম, অন্যথায় আমি অনেক আগেই পাগল হয়ে যেতাম।’ তিনি খুব শিগগিরই বাড়ি ফিরবেন। বাঙ্কারে থাকা অবস্থায় স্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি কোনো কথা বলার সুযোগ পাননি তিনি। ইভান বলেন, ‘আমি ওয়াকিটকির মাধ্যমে তার জন্য একটি বার্তা রেকর্ড করতাম এবং পরে সেটি পাঠিয়ে দিতাম।’
অন্যদিকে মাইকেলের গা থেকে তখনো বাঙ্কারের তীব্র গন্ধ আসছিল, তবে তার চোখে-মুখে ছিল এক ধরনের অপরাজেয় ভাব। তিনি জানান, ড্রোন হামলা এতটাই অবিরাম ছিল যে, প্রতিরক্ষার সময়টুকুও তারা পাচ্ছিলেন না। নিজের জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ দিনের যুদ্ধের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘আমরা বস্তায় মাটি ভরে তা সাজিয়ে রাখার মতো সময় পাচ্ছিলাম না। আমাদের বস্তা শেষ হয়ে গিয়েছিল। আমরা নিজেদের আড়াল করতে এবং বেঁচে থাকার জন্য হাতের কাছে যা পেয়েছি, তা-ই ব্যবহার করেছি।’
দীর্ঘ প্রায় এক বছর পর এই দুই সেনা যখন তাদের প্রথম কোমল পানীয়ের ক্যানে চুমুক দিচ্ছিলেন এবং পরিষ্কার কাপড়ের কথা ভাবছিলেন, ঠিক তখনই ক্রামাতোরস্ক শহরের আকাশে আরেকটি এফপিভি (ফার্স্ট-পারসন ভিউ) ড্রোনের আওয়াজ শোনা গেল। মুহূর্তের মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দারা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছোটাছুটি শুরু করলেন। এই যুদ্ধে মেশিন বা যন্ত্র এখন সর্বত্র বিরাজমান এবং এটিই পুরোপুরি বদলে দিচ্ছে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ।
সিএনএন অবলম্বনে

আকাশে ঘুরছে কয়েকটি নজরদারি ড্রোন। সেখান থেকে সরাসরি সম্প্রচারিত হচ্ছে লাইভ ভিডিও। আর যুদ্ধক্ষেত্র থেকে প্রায় ডজনখানেক মাইল দূরে, মাটির নিচের এক গোপন বাঙ্কারে আরামদায়ক গেমিং চেয়ারে বসে মাউস আর কিবোর্ডে আঙুল চালাচ্ছেন ইউক্রেনীয় কমান্ডাররা। মাঠপর্যায়ে কোনো সেনার উপস্থিতি ছাড়াই পূর্ব ইউক্রেনের রুশ ঘাঁটিতে একের পর এক নিখুঁত হামলা চালানো হচ্ছে। বহুল আলোচিত ইউক্রেন যুদ্ধ এখন প্রযুক্তির ছোঁয়ায় রূপ নিয়েছে এক স্বয়ংক্রিয় 'কিলিং গেমে'।
ইউক্রেনের আভদিভকা ও বাখমুতের মতো সবচেয়ে নৃশংস ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধগুলোতে অংশ নেওয়া এই অভিজ্ঞ যোদ্ধারা এখন সম্পূর্ণ নতুন এক ধরনের যুদ্ধ পরিচালনা করছেন, যার ভয়াবহতা তারা কাছাকাছি থেকে স্পর্শ করতে পারেন না, ঘ্রাণ পান না, এমনকি সরাসরি চোখেও দেখেন না। পূর্ব ইউক্রেনে রাশিয়ার সম্মুখসারির তিনটি লক্ষ্যবস্তুতে মোট ছয়টি রোবট বিস্ফোরণ ঘটানোর এই পুরো অভিযানে মাঠপর্যায়ে কোনো ইউক্রেনীয় সেনার উপস্থিতিরই প্রয়োজন হয়নি। পুরো যুদ্ধটি পরিচালিত হয়েছে গেমিং চেয়ারে বসে, মাথার ওপরে থাকা নজরদারি ড্রোন থেকে লাইভস্ট্রিমের মাধ্যমে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে।

কয়েক মাস ধরে চরম জনবল সংকট এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনিশ্চিত সামরিক সহায়তার কারণে ব্যাকফুটে থাকা ইউক্রেনীয় বাহিনী নিজেদের রণকৌশলে এক অবিশ্বাস্য পরিবর্তন এনেছে। তাদের যুদ্ধের এক বিশাল অংশ এখন পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন ধরনের রোবট, ড্রোন এবং দূরনিয়ন্ত্রিত ট্যাংক ব্যবহারের মাধ্যমে তারা ধীরগতির ও ক্লান্ত রুশ বাহিনীর ওপর একটি আকস্মিক, তবে ভঙ্গুর আধিপত্য বিস্তার করতে পেরেছে।
গত এপ্রিলে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দাবি করেন, এই প্রথম তারা সম্পূর্ণ রোবট এবং ড্রোনের সহায়তায় রাশিয়ার একটি সামরিক ঘাঁটি দখল করতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি আরও জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রগুলো দিয়ে ২২ হাজারেরও বেশি সামরিক মিশন পরিচালনা করা হয়েছে।
রুশ বাহিনীর ‘নীরব মৃত্যু’
কম্পিউটার প্রসেসরের কুলিং ফ্যানের কমলা রঙের আলো আর মাথার ওপরের মৃদু লাইটের নিচে বসে এই নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন করছেন ইউক্রেনীয় প্রকৌশলীরা। মূলত টিকে থাকার লড়াই থেকেই এই উদ্ভাবনের জন্ম। এখানকার সামরিক ইউনিটটি আটক হওয়া রুশ যুদ্ধবন্দিদের কাছ থেকে জানতে পেরেছে যে, চার চাকার চেসিসের ওপর বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক বহনকারী এই রোবটগুলোকে রুশ বাহিনী ‘নীরব মৃত্যু’ (সাইলেন্ট ডেথ) নামে ডাকছে। রুশ সেনারা এই রোবটগুলোর আসার শব্দ তখনই শুনতে পায়, যখন সেগুলো মাত্র ১০ মিটার দূরে থাকে— যা মূলত রোবটগুলোর বিস্ফোরণের আওতার একেবারে ভেতরে।
যুদ্ধক্ষেত্রের একটি লাইভ স্ক্রিনে দেখা যায়, ছয়টি রোবটের প্রথমটি অ্যালুমিনিয়ামের ধ্বংসাবশেষের ওপর পড়ে কিছুটা হোঁচট খেল। তবে বাধাটি এড়িয়ে সামনে যাওয়ার জন্য এর চাকাগুলো মরিয়া হয়ে ঘুরছিল। অবশেষে এটি রাস্তার গর্তটি পার হতে সক্ষম হয়। ওপরের নজরদারি ড্রোন থেকে দেখা গেল, একটি ছোটখাটো মাশরুম ক্লাউডের মতো সাদা আগুনের কুণ্ডলী তৈরি হলো— যা প্রথম বিস্ফোরণের তাপীয় মানচিত্র (থার্মাল ফুটপ্রিন্ট) ফুটিয়ে তুলেছে। এরপরই ঘটল দ্বিতীয় বিস্ফোরণ। আক্রমণের এই প্রাথমিক ধাক্কাটির উদ্দেশ্য ছিল রুশ সেনাদের মনোযোগ অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া, যাতে বাকি রোবটগুলো অনায়াসে শত্রুর সীমানার ভেতরে ঢুকে পড়তে পারে।
এখানকার হিসাব-নিকাশ অত্যন্ত সহজ ও স্পষ্ট। ইউক্রেনের দুর্ধর্ষ ও দক্ষ সামরিক বিগ্রেড থার্ড অ্যাসাল্টের ‘এনসি১৩’ ইউনিট হিসাব করে দেখেছে, তাদের পরিচালিত ১৬৪টি অভিযানে রোবটের বদলে সাধারণ সেনা ব্যবহার করলে ২ হাজার ৩০০ জন সৈন্যের প্রয়োজন হতো। এর মধ্যে ধারণামতে অর্ধেক সৈন্যই মারা যেতেন অথবা গুরুতর আহত হতেন। সেই হিসেবে, স্ক্রিনের সামনে চলতে থাকা এই চালকবিহীন খুঁড়িয়ে চলা বোমাগুলো একটি বড় প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, যা নিশ্চিতভাবে এক হাজার ইউক্রেনীয় সেনার জীবন বাঁচিয়েছে।
দনবাসে নৃশংস যুদ্ধের স্মৃতিচারণ করে এই ইউনিটের উপ-অধিনায়ক বার বলেন, ‘সেই দিনগুলোতে আমি এমন কোনো প্রযুক্তির কথা কল্পনাও করতে পারতাম না। কিন্তু এখন আমি বুঝতে পারছি, তখন যদি আমাদের কাছে এই ধরনের সরঞ্জাম থাকত… তবে আমার অনেক সহযোদ্ধা আজ বেঁচে থাকতেন।’
তবে এই ইউনিটের কমান্ডার মাকার জিনকেভিচ এই নতুন যুদ্ধব্যবস্থায় কিছুটা অপূর্ণতা দেখছেন। তিনি বলেন, 'আগের যুদ্ধগুলো ছিল অনেক বেশি পুরুষোচিত ও সাহসিকতার। সেখানে আপনার ব্যক্তিগত দক্ষতা, আপনি কতটা প্রশিক্ষিত বা কতটা শৃঙ্খলাবদ্ধ, তা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আর এখন, প্রযুক্তি সবকিছু নির্ধারণ করে দিচ্ছে। পুরো বিষয়টি দাঁড়িয়েছে কে কত দ্রুত এই চালকবিহীন দূরনিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারছে, তার ওপর।
নতুন যুদ্ধ, নতুন নায়ক
ইউক্রেনের এই নতুন রণকৌশলের জন্ম হয়েছে তীব্র জনবল সংকট থেকে। চার বছর ধরে চলা রুশ আগ্রাসনে ইউক্রেনের সীমিত জনসংখ্যার একটি বড় অংশ আজ বিপর্যস্ত। তবে কিয়েভ শুরু থেকেই যেভাবে ড্রোন প্রযুক্তিকে আপন করে নিয়েছে এবং এর নির্ভুলতা ও শক্তিকে যেভাবে ব্যাপক শিল্পায়নে রূপ দিয়েছে, তা মস্কোর ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।
ইউক্রেনের বর্তমান নীতি হলো— প্রতি মাসে অন্তত ৩৫ হাজার রুশ সেনাকে হতাহত করা, যা তারা চলতি বছরে সফলভাবে ধরে রেখেছে। তাদের লক্ষ্য ক্রেমলিনকে মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে সৈন্য রিক্রুট করতে বাধ্য করা— যা রাশিয়ার অভ্যন্তরে রাজনৈতিক চাপ তৈরি করবে। গত বুধবার ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা জিসিএইচকিউ নতুন তথ্যের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, যুদ্ধে এ পর্যন্ত রাশিয়ার মোট নিহতের সংখ্যা প্রায় ৫ লাখে পৌঁছেছে।

এই নতুন যুদ্ধক্ষেত্রের নায়করাও সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘরানার। এমনই একজন ২২ বছর বয়সী গোরা। নিজেকে শুধু একজন ‘সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার’ হিসেবে পরিচয় দেওয়ার পর মুহূর্তেই তিনি নিজেই নিজের ভুল সংশোধন করে জোর দিয়ে বলেন, ‘আমি একজন এমবেডেড হার্ডওয়্যার অ্যান্ড সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার।’ তিনি কন্ট্রোল হাবের লাইভ স্ট্রিমটি চালু করে দেখালেন, যেখানে নষ্ট হয়ে যাওয়া রোবটগুলো মেরামত এবং নতুন রোবট তৈরি করা হচ্ছে। যুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন গোরার বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর।
পূর্ব কিয়েভে রুশ ড্রোনের ক্রমাগত হামলার শব্দে রাতের পর রাত জেগে থাকতে থাকতে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। তখনই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, তার আইটি ব্যবস্থার দক্ষতাই হতে পারে যুদ্ধের নতুন ফ্রন্টলাইন। গোরা বলেন, ‘এখানে আসল বিষয় গাড়ি বা রোবট নয়, মূল বিষয় হলো মানুষের মস্তিষ্ক এবং তারা এটি কীভাবে পরিকল্পনা করছে। তারা কীভাবে বিভিন্ন রোবট এবং অপারেটরদের মধ্যে যোগাযোগের নেটওয়ার্ক তৈরি করছে, সেটাই আসল।’
তবে যুদ্ধক্ষেত্রের চ্যালেঞ্জগুলোও প্রতিনিয়ত পালটাচ্ছে। একজন অপারেটর তার কমান্ডারকে বলছিলেন, ‘সালাম্যান্ডার ৬ এর জিপিএস সিগন্যাল জ্যাম করে দেওয়া হয়েছে। আমরা আনুমানিক একটি রুট ম্যাপ তৈরি করে জিপিএস ছাড়াই এটি পরিচালনা করছি।’ যুদ্ধক্ষেত্রে লোকেশন ডেটার ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক সময় দিনের বেলা রেকর্ড করা ড্রোন ফুটেজ এবং কর্দমাক্ত চাষের জমির ওপর দিয়ে নিখুঁত গবেষণার মাধ্যমে রোবটগুলোর পথ খুঁজে নিতে হয়।

এরই মধ্যে আরও দুটি রোবট একটি ঝোপঝাড়পূর্ণ গাছের সারির দিকে এগিয়ে গেল এবং সেখানে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটল। ইউনিটের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সেখানে আগে থেকেই রুশ সেনাদের অবস্থান শনাক্ত করা হয়েছিল। তবে পঞ্চম রোবটটি ততটা কার্যকর হতে পারেনি, এটি একটি পরিখার মধ্যে কাত হয়ে পড়ে যায় এবং ষষ্ঠ রোবটটিকে রুশ সেনারা মাঝপথেই আটকে দিতে সক্ষম হয়।
মাটির ওপরে পদাতিক বাহিনীর সবচেয়ে মৌলিক কাজগুলোও এখন রোবট দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে। জাল দিয়ে ঢাকা একটি গোপন জায়গায় একটি রোবটের ওপর বিশাল ব্রাউনিং হেভি মেশিনগান মাউন্ট করার কাজ করছিলেন কিছু সেনা। দূরনিয়ন্ত্রিত এই যানটিতে বেশ কয়েকটি ক্যামেরা লাগানো রয়েছে, যা লক্ষ্যবস্তুর চারপাশের প্রশস্ত দৃশ্য দেখায়। এই স্বয়ংক্রিয় যানটি শত্রুর অপেক্ষায় দিনের পর দিন ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে থাকতে পারে। এর কোনো খাবারের প্রয়োজন হয় না, পায়ে ক্লান্তি আসে না।
কমান্ডার সাইবার জানান, এর একমাত্র সীমাবদ্ধতা হলো গোলাবারুদ। ৪০০ রাউন্ড গুলি শেষ হয়ে গেলে এটিকে আবার ক্যাম্পে ফিরিয়ে আনতে হয়। তিনি বলেন, 'আমরা যখন প্রথম শত্রুর বিরুদ্ধে এই রোবটটি ব্যবহার করেছিলাম, তারা পুরোপুরি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। তারা মাটিতে শুয়ে গড়াগড়ি খাচ্ছিল এবং বুঝতে পারছিল না যে কী করা উচিত।'
সাইবারের ইউনিটে এই ধরনের পাঁচটি মেশিন রয়েছে, যা তারা খুব হিসাব করে ব্যবহার করেন। তারা এখন আরও একটি দ্রুতগতির রোবট তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যা ঘণ্টায় ১০ মাইল বেগে চলতে পারবে এবং কালাশনিকভের মতো ছোট আগ্নেয়াস্ত্র বহন করে যুদ্ধ করতে পারবে।
ইউক্রেনের এই অটোমেশন সাফল্যে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে চালকবিহীন এই যানগুলো সম্মুখসারির সাধারণ কৌতুহল থেকে নিয়মিত সামরিক সরঞ্জামে পরিণত হয়েছে। এই রোবটগুলো এখন আহতদের উদ্ধার করছে এবং সম্মুখভাগের সৈন্যদের কাছে রসদ পৌঁছে দিচ্ছে।
জীবনের ঝুঁকি ও ফ্রন্টলাইনের বাস্তব চিত্র
আকাশে রুশ ড্রোনের সার্বক্ষণিক নজরদারির কারণে রসদ সরবরাহকারী রোবটগুলোতে মালপত্র লোড করার কাজটিও চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইউক্রেনীয় বাহিনীর ৯৩তম ব্রিগেড দ্রুজিলকা শহরের চারপাশে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ঘোরাঘুরি করছিল, যাতে গাছের নিচে লুকিয়ে থাকা রোবট ইউনিটগুলোর কাছে গোলাবারুদ, খাবার ও পানি পৌঁছে দেওয়া যায়। শহরটিতে এখনো কিছু বেসামরিক মানুষ বসবাস করছেন, তবে রুশ ড্রোনের নিখুঁত নজরদারির কারণে ইউক্রেনীয় সৈন্যরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে থাকারও সুযোগ পাচ্ছে না।
একটি খামারবাড়িতে রসদ খালাস করা হচ্ছিল, যেখানে একটি রোবটের পিঠে পাঁচটি গোলাবারুদের বাক্স বেঁধে দেওয়া হয়। মাইলখানেক দূরের বাঙ্কার থেকে একজন রিমোটের মাধ্যমে রোবটটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এটি সচল হয়ে ওঠে। দুটি ছোট বাড়ির বেড়ার মাঝখানের কর্দমাক্ত পথ দিয়ে সাধারণ মানুষদের পাশ কাটিয়ে রোবটটি ধীরগতিতে এগিয়ে যেতে থাকে। সম্মুখ সমরে পৌঁছানোর জন্য এটি তার ১০ ঘণ্টার দীর্ঘ যাত্রা শুরু করছিল।

সম্মুখসারিতে থাকা ইউক্রেনীয় সৈন্যদের জন্য এই রসদগুলো জরুরি প্রয়োজন, কারণ তারা বর্তমানে তাদের সহ্যক্ষমতার শেষ সীমায় পৌঁছে গেছেন। এর কিছু সময় পর, কিয়েভ কীভাবে যুদ্ধোপযোগী পুরুষ সৈন্য খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছে, তার দুটি বেদনাদায়ক বাস্তব চিত্র দেখা গেল।
২৪তম মেকানাইজড ব্রিগেডের দুই সেনা সদস্য ইভান এবং মাইকেল (ছদ্মনাম)। তারা যথাক্রমে ৩৪৪ এবং ৩৩৪ দিন একটানা সম্মুখসারির বাঙ্কারে কাটিয়েছেন। ইভানের সামান্য খুঁড়িয়ে চলা এবং চোখের ঝাপসা দৃষ্টিই বলে দিচ্ছিল তিনি কী ধরনের চরম মানসিক ও শারীরিক যাতনার মধ্য দিয়ে গেছেন। আজ ভোরেই তার সেই দীর্ঘ ডিউটি শেষ হয়েছে এবং এরপর তিনি নিরাপদে পৌঁছানোর জন্য ১২ ঘণ্টায় ২০ মাইল পথ হেঁটে এসেছেন।
ইভান বলেন, ‘একমাত্র আমার স্ত্রী ও সন্তানদের মুখ মনে করেই আমি টিকে ছিলাম, অন্যথায় আমি অনেক আগেই পাগল হয়ে যেতাম।’ তিনি খুব শিগগিরই বাড়ি ফিরবেন। বাঙ্কারে থাকা অবস্থায় স্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি কোনো কথা বলার সুযোগ পাননি তিনি। ইভান বলেন, ‘আমি ওয়াকিটকির মাধ্যমে তার জন্য একটি বার্তা রেকর্ড করতাম এবং পরে সেটি পাঠিয়ে দিতাম।’
অন্যদিকে মাইকেলের গা থেকে তখনো বাঙ্কারের তীব্র গন্ধ আসছিল, তবে তার চোখে-মুখে ছিল এক ধরনের অপরাজেয় ভাব। তিনি জানান, ড্রোন হামলা এতটাই অবিরাম ছিল যে, প্রতিরক্ষার সময়টুকুও তারা পাচ্ছিলেন না। নিজের জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ দিনের যুদ্ধের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘আমরা বস্তায় মাটি ভরে তা সাজিয়ে রাখার মতো সময় পাচ্ছিলাম না। আমাদের বস্তা শেষ হয়ে গিয়েছিল। আমরা নিজেদের আড়াল করতে এবং বেঁচে থাকার জন্য হাতের কাছে যা পেয়েছি, তা-ই ব্যবহার করেছি।’
দীর্ঘ প্রায় এক বছর পর এই দুই সেনা যখন তাদের প্রথম কোমল পানীয়ের ক্যানে চুমুক দিচ্ছিলেন এবং পরিষ্কার কাপড়ের কথা ভাবছিলেন, ঠিক তখনই ক্রামাতোরস্ক শহরের আকাশে আরেকটি এফপিভি (ফার্স্ট-পারসন ভিউ) ড্রোনের আওয়াজ শোনা গেল। মুহূর্তের মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দারা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছোটাছুটি শুরু করলেন। এই যুদ্ধে মেশিন বা যন্ত্র এখন সর্বত্র বিরাজমান এবং এটিই পুরোপুরি বদলে দিচ্ছে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ।
সিএনএন অবলম্বনে

গত ১৩ মে ফল প্রকাশের পর থেকে ৪ লাখেরও বেশি পরীক্ষার্থী মোট ১১ লাখ উত্তরপত্র দেখতে চেয়ে শিক্ষা বোর্ডের কাছে আবেদন করেছে, যা দেশটির ইতিহাসে নজিরবিহীন। ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি প্রক্রিয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই পরীক্ষায় এ বছর প্রায় ১৭ লাখ শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল।
১১ ঘণ্টা আগে
হরমুজ প্রণালি এলাকায় অবস্থানরত বিদেশি সামরিক বাহিনীগুলোকেও সতর্ক করেছে তেহরান। ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, সামুদ্রিক চলাচল বা প্রণালির ব্যবস্থাপনায় কোনো ধরনের হস্তক্ষেপের চেষ্টা করা হলে তার উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে।
১২ ঘণ্টা আগে
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা গত বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে আলোচনার পর একটি খসড়া চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে, যা এখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। তবে আলোচনার টেবিলে অগ্রগতির খবর মিললেও সামরিক উত্তেজনা কমার কোনো লক্ষণ নেই। গত কয়েক দিনে ইরানে দ্বিতীয় দফায়
১ দিন আগে
জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী বলেন, ভারতের সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী আধুনিক ও বহুমাত্রিক যুদ্ধ পরিস্থিতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যৌথ সক্ষমতা আরও জোরদার করছে। বর্তমানে যুদ্ধ সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলেও সশস্ত্র বাহিনী উচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে এবং ভবিষ্যতের যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
১ দিন আগে