‘বিশ্বাসঘাতক’ ট্রাম্পের ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতায় ক্ষোভ, এককভাবে লড়াইয়ের পক্ষে ইসরায়েলিরা

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ২০ জুন ২০২৬, ১৪: ২৬
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সমঝোতা ইসরায়েলের ভেতরে তীব্র হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি করেছে। ছবি: সংগৃহীত

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের যুদ্ধের আশঙ্কা আপাতত কমিয়েছে। কিন্তু এই চুক্তিই ইসরায়েলের ভেতরে জন্ম দিয়েছে তীব্র হতাশা, ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা। অনেক ইসরায়েলির বিশ্বাস, ওয়াশিংটন তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা স্বার্থ উপেক্ষা করেছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ‘বিশ্বাসঘাতকতার’ অভিযোগও তুলছেন কেউ কেউ।

তেল আবিব থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের শহর রেহোভতকে দীর্ঘদিন ধরেই ইসরায়েলের 'মধ্যপন্থি জনমতে'র প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। শহরের ব্যস্ত হারজল স্ট্রিটের একটি রেস্তোরাঁয় বসে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বললে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও একটি বিষয়ে তাদের অবস্থান প্রায় একই— ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা ইসরায়েলের জন্য ভালো হয়নি।

৫৫ বছর বয়সী প্রকৌশলী আভি পেরেজের ভাষায়, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।’

যুদ্ধ থেমেছে, কিন্তু নিরাপত্তাহীনতা নয়

চুক্তির কয়েক দিন পরই ইসরায়েলে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা চলছে। রাস্তায় যানজট, নতুন বাস রুট নির্মাণ, দোকানপাটে ভিড়— সবই যেন স্বাভাবিকতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। কিন্তু অনেকের মতে, বাস্তবতা মোটেও বদলায়নি।

৩৫ বছর বয়সী শাহাম নোভিক বলেন, ’একদিন আমরা সন্তানদের নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে ছিলাম। পরদিন বলা হচ্ছে সবকিছু স্বাভাবিক। কিন্তু আসলে তো কোনো সমস্যারই সমাধান হয়নি।’

তার মতে, যুদ্ধ থামলেও ইরানের সামরিক সক্ষমতা কিংবা ভবিষ্যৎ হুমকি দূর হয়নি। বরং পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।

‘ইরান আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরবে’

ইসরায়েলের রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং কৌশলগত পরামর্শক উদি তেনের মতে, অধিকাংশ ইসরায়েলির চোখে ইরান ও হিজবুল্লাহ আলাদা কোনো সত্তা নয়। তিনি বলেন, ‘ইসরায়েলে বসবাসকারী সবাই বোঝেন, ইরান ও হিজবুল্লাহ একই নিরাপত্তা হুমকির দুই রূপ।’

ইসরায়েলি গণমাধ্যমেও চুক্তিকে ‘আত্মসমর্পণ’ ও ‘অপমানজনক সমঝোতা’ হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। অনেক বিশ্লেষকের আশঙ্কা, যুদ্ধের ক্ষতি কাটিয়ে ইরান আবারও আগের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে লেবাননে হওয়া সমঝোতা ভবিষ্যতে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানও সীমিত করে দিতে পারে।

লেবানন সীমান্তে বাড়ছে উদ্বেগ

সমঝোতা নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই লেবানন সীমান্তে আবারও সংঘাত শুরু হয়েছে। হিজবুল্লাহর হামলায় চার ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার পর ইসরায়েল লেবাননে ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। এতে অন্তত ১৮ জন নিহত এবং আরও ৩৩ জন আহত হন।

লেবানন সীমান্তবর্তী মেতুলা শহরের রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী ড্যানিয়েল ডরফম্যান বলেন, ‘ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নিয়ে সবাই সন্তুষ্ট ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের এই সমঝোতা ইসরায়েলের জন্য মোটেও ভালো নয়। এটা বড় ভুল।’

যুদ্ধের লক্ষ্যই পূরণ হয়নি?

অনেক ইসরায়েলির মতে, সরকার যেসব লক্ষ্য সামনে রেখে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছিল, তার একটিও পূরণ হয়নি।

সরকার বলেছিল, ইরানের শাসনব্যবস্থা দুর্বল করা হবে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা হবে এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ভেঙে দেওয়া হবে। সমালোচকদের অভিযোগ, বাস্তবে এসবের কোনোটিই অর্জিত হয়নি।

এর চেয়েও বড় ধাক্কা এসেছে কূটনৈতিক পর্যায়ে। যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে’ চললেও শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন কার্যত ইসরায়েলকে পাশে না রেখেই চুক্তি সম্পন্ন করেছে। ফলে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আগের মতো হোয়াইট হাউজের ঘনিষ্ঠ অংশীদার নন— এমন ধারণাও জোরালো হয়েছে।

নেতানিয়াহুর জন্য কঠিন পরীক্ষা

৭৬ বছর বয়সী নেতানিয়াহুর জন্য পরিস্থিতি রাজনৈতিকভাবেও কঠিন হয়ে উঠেছে। দুর্নীতির মামলায় বিচারাধীন এই নেতা এখন ভোটারদের বোঝানোর চেষ্টা করছেন, দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এখনও তিনিই সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি।

জনমত বিশ্লেষক অধ্যাপক তামার হারম্যানের মতে, নেতানিয়াহু যুদ্ধের লক্ষ্য খুব স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছিলেন। ফলে সেগুলো অর্জন না হওয়ায় এখন তার নেতৃত্ব নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। তার ভাষায়, ‘আপনি যখন এত স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেন, কিন্তু তা পূরণ করতে পারেন না, তখন মানুষ আপনাকে অযোগ্য ভাবতে শুরু করে।‘

তবুও নেতানিয়াহুর ওপর আস্থা আছে অনেকের। সমালোচনা বাড়লেও নেতানিয়াহুর জনপ্রিয়তা পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি।

সাম্প্রতিক জরিপে অনির্ধারিত ভোটারদের ৪৩ শতাংশ বলেছেন, ইরানের মতো নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায় নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোটের ওপরই তাদের সবচেয়ে বেশি আস্থা।

প্রকৌশলী আভি পেরেজ বলেন, ‘নেতানিয়াহুও মানুষ, তাই ভুল করেন। কিন্তু তিনি জানেন কীভাবে ভুল ঠিক করতে হয়। তিনি জানেন ইসরায়েলের কী প্রয়োজন। ট্রাম্প দেশের জন্য নয়, নিজের ব্যবসার জন্য কথা বলেন।‘

বিশ্লেষকদের মতে, এ কারণেই আগামী জাতীয় নির্বাচন অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে পারে। বহু রাজনৈতিক সংকট সামলে ক্ষমতায় টিকে থাকা নেতানিয়াহুকে এখনো হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।

হামাস হামলার ক্ষত এখনো তাজা

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা ইসরায়েলি সমাজে গভীর আঘাত তৈরি করে। ওই হামলায় প্রায় ১,২০০ জন নিহত হন এবং প্রায় ২৫০ জনকে জিম্মি করা হয়।

এরপর গাজায় দীর্ঘ সামরিক অভিযানে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে ইসরায়েল। কয়েক বছর ধরে চলা অভিযানে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটলেও হামাসকে পুরোপুরি নির্মূল করা যায়নি। লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধেও ধারাবাহিক অভিযান চালিয়েও চূড়ান্ত সাফল্য পায়নি ইসরায়েল।

ফলে অনেক ভোটারের মনেই প্রশ্ন— এত যুদ্ধের পরও যদি নিরাপত্তা নিশ্চিত না হয়, তাহলে এর রাজনৈতিক মূল্য কী?

বিভক্ত সমাজ, বাড়ছে হতাশা

রেহোভতের চিকিৎসক লি নোভিক মনে করেন, ইসরায়েলি সমাজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি বিভক্ত। তার অভিযোগ, ‘নেতানিয়াহু বহু বছর ধরে মানুষকে বিভক্ত করেছেন এবং সেটি সফলও হয়েছে। এর ফলে বাড়ির দাম, মূল্যস্ফীতি কিংবা মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার মতো বিষয়গুলো আর আলোচনায়ই থাকে না।‘

তিনি বলেন, ইরান যে ইসরায়েলকে ধ্বংস করতে চায়— সে বিষয়ে তার সন্দেহ নেই। তবে একই সঙ্গে সরকারের বিরুদ্ধেও অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, যুদ্ধকে ব্যবহার করে বিভাজনমূলক আইন পাস এবং ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করা হচ্ছে।

তবে অধ্যাপক হারম্যান ভিন্ন মত দেন। তার মতে, রাজনৈতিক বিতর্ক থাকলেও অধিকাংশ ইহুদি ইসরায়েলির মধ্যে মৌলিক কয়েকটি বিষয়ে বিস্তৃত ঐকমত্য রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শক্ত নিরাপত্তা নীতি, কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং ইসরায়েলকে ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে ধরে রাখার প্রশ্ন।

‘শান্তি আর আসবে না‘

রেহোভতের বাসিন্দা ৫৫ বছর বয়সী ডালিয়া পেরেজের কথায় যেন ফুটে ওঠে বর্তমান ইসরায়েলি মানসিকতার সারাংশ। তিনি বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম হয়তো যুদ্ধের শেষ দেখতে পাব। এখন মনে হচ্ছে, আমাদের সারাজীবন অস্ত্র নিয়েই বাঁচতে হবে।‘

পোরেজের উপলব্ধি আরও কঠিন, ‘আমরা এখন বুঝে গেছি, আমাদের প্রকৃত কোনো বন্ধু নেই। কাউকে বিশ্বাসও করা যায় না।‘

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ঝুঁকি সাময়িকভাবে কমিয়ে আনলেও ইসরায়েলের ভেতরে এটি নতুন এক রাজনৈতিক ও মানসিক সংকট তৈরি করেছে। একদিকে নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা কমে যাওয়া এবং নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক— সব মিলিয়ে দেশটি এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আগামী জাতীয় নির্বাচন শুধু সরকার পরিবর্তনের লড়াই হবে না; বরং ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কৌশল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যে তার অবস্থান কোন পথে এগোবে, সেই প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজবে দেশটির জনগণ।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান অবলম্বনে

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে বড় সুবিধা পাবে আইআরজিসির ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য

যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের দৃষ্টিতে যাকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেই ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এই সম্ভাব্য সমঝোতার মাধ্যমে সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগীদের একটিতে পরিণত হতে পারে।

৬ ঘণ্টা আগে

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা: সুইজারল্যান্ড যাচ্ছেন উইটকফ ও আরাগচি

লেবাননে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর অন্তর্বর্তীকালীন ইরান যুদ্ধ চুক্তিকে একটি স্থায়ী আঞ্চলিক চুক্তিতে রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টা আবারও জোরদার হয়েছে। এই আলোচনার অংশ হিসেবে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি উভয়েই সুইজারল্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন বলে এক্সিওসের বরাতে জানিয়ে

৯ ঘণ্টা আগে

ইরান ইস্যুই গড়তে পারে জে ডি ভ্যান্সের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ

কূটনৈতিক প্রথা অনুযায়ী এ ধরনের হাই-প্রোফাইল আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর। কিন্তু ট্রাম্প দৃশ্যত রুবিওর পরিবর্তে ভ্যান্সকেই সামনে নিয়ে এসেছেন। ফলে প্রশাসনের ভেতরে রুবিওর প্রকৃত ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

৯ ঘণ্টা আগে

লেবাননে 'যুদ্ধবিরতিতে সম্মত' ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ, জানালেন মার্কিন কর্মকর্তা

লেবাননে নতুন করে ইসরায়েলি হামলা শুরু হওয়ায় ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা চুক্তিটিকে একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে রূপান্তরের সম্ভাবনা চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছিল। এরপরই এই যুদ্ধবিরতির খবর এলো।

১ দিন আগে