
ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম

উল্লাসধ্বনিতে মুখরিত শিশুদের কুচকাওয়াজ, সামরিক গার্ড অব অনার, তোপধ্বনি আর সুসজ্জিত মার্চিং ব্যান্ডের জমকালো সুর— সব মিলিয়ে বেইজিংয়ের 'গ্রেট হল অব দ্য পিপলে'র বাইরের পুরো আয়োজনটিই মনে করিয়ে দিচ্ছিল ঠিক এক সপ্তাহ আগের এক দৃশ্যপট। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যেভাবে বরণ করেছিল চীন, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ক্ষেত্রেও তার বিন্দুমাত্র কমতি ছিল না।
মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে বিশ্বের প্রধান দুই পরাশক্তির শীর্ষ নেতার এই হাইপ্রোফাইল সফর মূলত চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সেই কাঙ্ক্ষিত ভূ-রাজনৈতিক কৌশলেরই বাস্তব প্রতিফলন; যেখানে তিনি বার্তা দিতে চান— চীন সবার সঙ্গেই আলোচনা করতে পারে, কিন্তু এককভাবে কারও বলয়ে আটকা পড়ে নেই। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক বিশেষ বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এই কূটনৈতিক সমীকরণের আদ্যোপান্ত উঠে এসেছে।

বিবিসি বলছে, চীনের জন্য এই সফর দুটি প্রমাণ করে যে, দেশটির বিশাল অর্থনীতি এবং নতুন কূটনৈতিক প্রভাবের কারণে এখন সব পথই বেইজিংয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে। দুই সফরের বাহ্যিক দৃশ্যপট প্রায় একই রকম ছিল— স্বাগতিক হিসেবে স্পটলাইটে শি জিনপিং বেশ আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। তবে ট্রাম্পের সফরের সঙ্গে পুতিনের সফরের পেছনের রাজনীতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

ব্রিটিশ ভূ-রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এবং লন্ডনের কিংস কলেজের শিক্ষক ড. সমীর পুরি বলেন, 'বিশ্ব রাজনীতির নতুন যুগ এখন অনেকটাই পশ্চিমকেন্দ্রিকতা থেকে বেরিয়ে আসছে। বিশ্বমঞ্চে চীনের প্রচুর সুপ্ত ক্ষমতা রয়েছে, তবে বিরোধ নিষ্পত্তিতে তারা সরাসরি তা ব্যবহার করছে না। বরং চীন তাদের এই মর্যাদাকে ধীরে ধীরে কাজে লাগানোর কৌশল নিয়েছে।'
বিবিসির খবরে বলা হয়, ২০ বারেরও বেশি চীন সফর করা পুতিনের সঙ্গে শি জিনপিংয়ের ব্যক্তিগত সম্পর্ক বেশ গভীর বলেই মনে হয়। তবে ইউক্রেন যুদ্ধ এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে পুতিন এখন বেইজিংয়ের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। চীন এখন রাশিয়ার শীর্ষ বাণিজ্য অংশীদার এবং তেল-গ্যাসের সবচেয়ে বড় ক্রেতা।
বেশ কিছু দিন ধরেই এটি একটি অসম অংশীদারিত্বে পরিণত হয়েছে এবং আজ তা আবারও প্রমাণিত হলো। বেজিংয়ে দুই নেতার বৈঠকে বাণিজ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ে ২০টিরও বেশি চুক্তি হলেও, পুতিন যে রুশ গ্যাস পাইপলাইনের জন্য বছরের পর বছর ধরে চাপ দিচ্ছিলেন, তা এবারও অনুমোদন পায়নি। এমনকি একটি দীর্ঘ যৌথ বিবৃতিতেও বড় কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।

সাংহাইয়ের ইস্ট চায়না নরমাল ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর রাশিয়ান স্টাডিজের অধ্যাপক ড. ঝেং রুনইউ বলেন, 'চীন ও রাশিয়া উভয়েরই একে অপরকে প্রয়োজন, তবে বৈশ্বিক মঞ্চে রাশিয়ার এখন আগের চেয়ে চীনকে বেশি প্রয়োজন। বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় চীনের সঙ্গে গভীর সহযোগিতা রাশিয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।'
এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনার সময়ও শি জিনপিংয়ের অবস্থান বেশ সুবিধাজনক ছিল। বিশ্বের বাকি দেশগুলোর সঙ্গে শক্তিশালী বাণিজ্য সম্পর্ক এবং বিরল খনিজ ও উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থায় চীনের আধিপত্য তাকে এই বাড়তি সুবিধা দিয়েছে। ট্রাম্পের 'অনাকাঙ্ক্ষিত' সিদ্ধান্তের বিপরীতে বেইজিং নিজেকে ওয়াশিংটনের সমকক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।

ট্রাম্প এবং পুতিন— দুই নেতাই বর্তমানে তাদের প্রত্যাশার চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যয়বহুল যুদ্ধে জর্জরিত। ট্রাম্পের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ একটি বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হয়েছে, যা দেশে তার জনপ্রিয়তা কমিয়ে দিয়েছে। আর পুতিনের জন্য ইউক্রেন যুদ্ধ, যা রাশিয়ার জনগণের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে।
উভয় ক্ষেত্রেই এটি স্পষ্ট যে, বিশ্বমঞ্চে চীন এখন নিজের শর্ত ও গতিতে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
শি জিনপিংয়ের চীনা স্বপ্ন
মাত্র পাঁচ বছর আগেও যে দেশটি কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার দ্বারপ্রান্তে ছিল, তার জন্য এটি একটি অসাধারণ ঘুরে দাঁড়ানো।
সে সময় করোনা মহামারির কারণে চীনের সীমান্ত বন্ধ ছিল, যেটিকে প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় থাকাকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প 'চীনা ভাইরাস' বলে অভিহিত করেছিলেন। তথাকথিত 'উলফ ওয়ারিয়র' বা আগ্রাসী কূটনীতির উত্থানের কারণে পশ্চিমের সঙ্গে সম্পর্কের তীব্র অবনতি ঘটেছিল, যেখানে চীনা কূটনীতিক এবং রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম পশ্চিমা সমালোচকদের দমনে আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করত।
সিনজিয়াংয়ে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং হংকংয়ের ওপর বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান নিয়ন্ত্রণের কারণে আন্তর্জাতিক সমালোচনা বাড়ছিল এবং পশ্চিমা সরকারগুলো চীনা পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিল। চীনও নিয়েছিল পালটা ব্যবস্থা।
অথচ করোনা মহামারির পাঁচ বছর পর, চীন নিজেকে বৈশ্বিক কূটনীতি ও বাণিজ্যের একটি অপরিহার্য কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এখন চীনকে দমনের চেষ্টা করার চেয়ে, তার সঙ্গে যুক্ত হওয়াকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বেইজিং অবশ্য অস্বস্তিকর বাস্তবতা অনুধাবন করেই তাদের কূটনৈতিক শৈলীতে পরিবর্তন এনেছে। অর্থনৈতিক মন্দার কারণে দেশটির এখন আরও বেশি বিদেশি বিনিয়োগ ও বাণিজ্য প্রয়োজন, যার জন্য স্থিতিশীল সম্পর্ক জরুরি। তা ছাড়া, অতিরিক্ত সংঘাতের কারণে দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের মতো আঞ্চলিক গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদাররা ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছিল।
তবে এই সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে চীন অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং যুক্তরাজ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামত করেছে। কানাডা, যুক্তরাজ্য এবং জার্মানির রাষ্ট্রপ্রধানদের মতো বিশ্বনেতারা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির সাথে চুক্তি করতে বেইজিংয়ের লালগালিচায় পা রেখেছেন।
গত এক দশক ধরে শি দেশের জনগণকে 'চীনা জাতির মহান পুনরুত্থানের' প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছেন এবং গত সপ্তাহের এই কূটনৈতিক তৎপরতা দেশের ভেতরে একটি চমৎকার প্রচারণার সুযোগ করে দিয়েছে: চীনা নেতাকে এখন এমন একজন মানুষ মনে হচ্ছে, যার সঙ্গে সবাই দেখা করতে চায়। কিন্তু এই সফর চীনের কূটনৈতিক ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও ফুটিয়ে তুলেছে।
কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা
পুতিন সঙ্গে আলোচনায় শি কেবল একটি যুদ্ধের কথাই উল্লেখ করেছেন— তা হলো মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত। তিনি পুতিনকে বলেছেন যে, ইরানে যুদ্ধ সম্পূর্ণ বন্ধ করা 'অত্যন্ত জরুরি', অথচ রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের বিষয়ে কোনো আলোচনাই হয়নি।
শি এবং পুতিন উভয়েই 'অন্যান্য দেশের ওপর বিশ্বাসঘাতকতামূলক সামরিক হামলা, আলোচনার আড়ালে কপটভাবে হামলার প্রস্তুতি, সার্বভৌম রাষ্ট্রের নেতাদের হত্যা, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করা এবং সরকার পরিবর্তনের উসকানি, এবং বিচারের জন্য জাতীয় নেতাদের অন্যায়ভাবে অপহরণের' নিন্দা জানিয়েছেন।
বিবিসি বলছে, এই অবস্থানটি ছিল বেশ বৈপরীত্যপূর্ণ এবং এর প্রভাব চীনের গ্রেট হলের বাইরেও পড়তে পারে। চীন যখন অন্যত্র যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানাচ্ছে এবং মার্কিন পদক্ষেপের সমালোচনা করছে, তখন লক্ষাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটানো ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে তাদের নীরবতা ইউরোপে প্রশ্ন তুলবে যে, বেইজিং আসলে কতটা নিরপেক্ষ বৈশ্বিক খেলোয়াড় হতে প্রস্তুত বা সক্ষম।
ইউক্রেন যুদ্ধে বেইজিং নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করলেও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ উভয়ই চীনকে মস্কোর অর্থনৈতিক লাইফলাইন কেটে দেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়ে আসছে।
তবে পুতিন যুদ্ধে হেরে গেলে চীন তার একটি প্রধান মিত্র হারানোর আশঙ্কায় রয়েছে। এ ছাড়া এত বড় প্রতিবেশীর মধ্যে যেকোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা বেইজিংয়ের জন্য উদ্বেগের কারণ হবে।
সমীর পুরি বলেন, 'অবশ্যই শি জিনপিং সহজ পথ বেছে নিয়ে এই বিষয়ে নীরব থাকতে পারেন। পরোক্ষভাবে এর অর্থ দাঁড়ায়— রাশিয়া, তোমরা তোমাদের আক্রমণ চালিয়ে যাও।'
তিনি আরও বলেন, 'যুদ্ধবিরতি বা যুদ্ধ-পরবর্তী ভবিষ্যৎ কেমন হতে পারে তা নিয়ে যদি কোনো আলোচনা হয়ে থাকে, তবে আমি অবাক হব। রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধে চীন তার প্রভাব খাটাতে চায় কি না, তা এখনো একটি বড় ধোঁয়াশা।'
এর বিপরীতে, ইরানের যুদ্ধ চীনের স্বার্থকে আঘাত করছে। বেইজিংয়ের কাছে পর্যাপ্ত তেলের মজুত থাকলেও, হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধকারী এই সংকটের আপাতত কোনো শেষ দেখা যাচ্ছে না।
বিবিসি বলছে, বিশ্বমঞ্চে কেন্দ্রীয় ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টাকালে একটি যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানানো এবং অন্যটি নিয়ে নীরব থাকা শির গ্রহণযোগ্যতাকে ক্ষুণ্ণ করে। এটি এমন এক সময়ে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ককে ঝুঁকিতে ফেলছে, যখন বেইজিং তাদের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে সেই সম্পর্ক জোরদার করতে চাইছে।
চীনে উচ্চপর্যায়ের এই কূটনৈতিক সপ্তাহটি যতই আকর্ষণীয় দেখাক না কেন, শির সামনে এখনো অনেক বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। কারণ শির অধীনে আরও শক্তিশালী হওয়া চীনের কর্তৃত্ববাদী নেতৃত্ব এখনও অনেকের কাছে বিতর্কিত।
রাজনীতি/আইআর

উল্লাসধ্বনিতে মুখরিত শিশুদের কুচকাওয়াজ, সামরিক গার্ড অব অনার, তোপধ্বনি আর সুসজ্জিত মার্চিং ব্যান্ডের জমকালো সুর— সব মিলিয়ে বেইজিংয়ের 'গ্রেট হল অব দ্য পিপলে'র বাইরের পুরো আয়োজনটিই মনে করিয়ে দিচ্ছিল ঠিক এক সপ্তাহ আগের এক দৃশ্যপট। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যেভাবে বরণ করেছিল চীন, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ক্ষেত্রেও তার বিন্দুমাত্র কমতি ছিল না।
মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে বিশ্বের প্রধান দুই পরাশক্তির শীর্ষ নেতার এই হাইপ্রোফাইল সফর মূলত চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সেই কাঙ্ক্ষিত ভূ-রাজনৈতিক কৌশলেরই বাস্তব প্রতিফলন; যেখানে তিনি বার্তা দিতে চান— চীন সবার সঙ্গেই আলোচনা করতে পারে, কিন্তু এককভাবে কারও বলয়ে আটকা পড়ে নেই। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক বিশেষ বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এই কূটনৈতিক সমীকরণের আদ্যোপান্ত উঠে এসেছে।

বিবিসি বলছে, চীনের জন্য এই সফর দুটি প্রমাণ করে যে, দেশটির বিশাল অর্থনীতি এবং নতুন কূটনৈতিক প্রভাবের কারণে এখন সব পথই বেইজিংয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে। দুই সফরের বাহ্যিক দৃশ্যপট প্রায় একই রকম ছিল— স্বাগতিক হিসেবে স্পটলাইটে শি জিনপিং বেশ আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। তবে ট্রাম্পের সফরের সঙ্গে পুতিনের সফরের পেছনের রাজনীতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

ব্রিটিশ ভূ-রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এবং লন্ডনের কিংস কলেজের শিক্ষক ড. সমীর পুরি বলেন, 'বিশ্ব রাজনীতির নতুন যুগ এখন অনেকটাই পশ্চিমকেন্দ্রিকতা থেকে বেরিয়ে আসছে। বিশ্বমঞ্চে চীনের প্রচুর সুপ্ত ক্ষমতা রয়েছে, তবে বিরোধ নিষ্পত্তিতে তারা সরাসরি তা ব্যবহার করছে না। বরং চীন তাদের এই মর্যাদাকে ধীরে ধীরে কাজে লাগানোর কৌশল নিয়েছে।'
বিবিসির খবরে বলা হয়, ২০ বারেরও বেশি চীন সফর করা পুতিনের সঙ্গে শি জিনপিংয়ের ব্যক্তিগত সম্পর্ক বেশ গভীর বলেই মনে হয়। তবে ইউক্রেন যুদ্ধ এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে পুতিন এখন বেইজিংয়ের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। চীন এখন রাশিয়ার শীর্ষ বাণিজ্য অংশীদার এবং তেল-গ্যাসের সবচেয়ে বড় ক্রেতা।
বেশ কিছু দিন ধরেই এটি একটি অসম অংশীদারিত্বে পরিণত হয়েছে এবং আজ তা আবারও প্রমাণিত হলো। বেজিংয়ে দুই নেতার বৈঠকে বাণিজ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ে ২০টিরও বেশি চুক্তি হলেও, পুতিন যে রুশ গ্যাস পাইপলাইনের জন্য বছরের পর বছর ধরে চাপ দিচ্ছিলেন, তা এবারও অনুমোদন পায়নি। এমনকি একটি দীর্ঘ যৌথ বিবৃতিতেও বড় কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।

সাংহাইয়ের ইস্ট চায়না নরমাল ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর রাশিয়ান স্টাডিজের অধ্যাপক ড. ঝেং রুনইউ বলেন, 'চীন ও রাশিয়া উভয়েরই একে অপরকে প্রয়োজন, তবে বৈশ্বিক মঞ্চে রাশিয়ার এখন আগের চেয়ে চীনকে বেশি প্রয়োজন। বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় চীনের সঙ্গে গভীর সহযোগিতা রাশিয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।'
এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনার সময়ও শি জিনপিংয়ের অবস্থান বেশ সুবিধাজনক ছিল। বিশ্বের বাকি দেশগুলোর সঙ্গে শক্তিশালী বাণিজ্য সম্পর্ক এবং বিরল খনিজ ও উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থায় চীনের আধিপত্য তাকে এই বাড়তি সুবিধা দিয়েছে। ট্রাম্পের 'অনাকাঙ্ক্ষিত' সিদ্ধান্তের বিপরীতে বেইজিং নিজেকে ওয়াশিংটনের সমকক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।

ট্রাম্প এবং পুতিন— দুই নেতাই বর্তমানে তাদের প্রত্যাশার চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যয়বহুল যুদ্ধে জর্জরিত। ট্রাম্পের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ একটি বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হয়েছে, যা দেশে তার জনপ্রিয়তা কমিয়ে দিয়েছে। আর পুতিনের জন্য ইউক্রেন যুদ্ধ, যা রাশিয়ার জনগণের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে।
উভয় ক্ষেত্রেই এটি স্পষ্ট যে, বিশ্বমঞ্চে চীন এখন নিজের শর্ত ও গতিতে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
শি জিনপিংয়ের চীনা স্বপ্ন
মাত্র পাঁচ বছর আগেও যে দেশটি কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার দ্বারপ্রান্তে ছিল, তার জন্য এটি একটি অসাধারণ ঘুরে দাঁড়ানো।
সে সময় করোনা মহামারির কারণে চীনের সীমান্ত বন্ধ ছিল, যেটিকে প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় থাকাকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প 'চীনা ভাইরাস' বলে অভিহিত করেছিলেন। তথাকথিত 'উলফ ওয়ারিয়র' বা আগ্রাসী কূটনীতির উত্থানের কারণে পশ্চিমের সঙ্গে সম্পর্কের তীব্র অবনতি ঘটেছিল, যেখানে চীনা কূটনীতিক এবং রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম পশ্চিমা সমালোচকদের দমনে আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করত।
সিনজিয়াংয়ে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং হংকংয়ের ওপর বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান নিয়ন্ত্রণের কারণে আন্তর্জাতিক সমালোচনা বাড়ছিল এবং পশ্চিমা সরকারগুলো চীনা পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিল। চীনও নিয়েছিল পালটা ব্যবস্থা।
অথচ করোনা মহামারির পাঁচ বছর পর, চীন নিজেকে বৈশ্বিক কূটনীতি ও বাণিজ্যের একটি অপরিহার্য কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এখন চীনকে দমনের চেষ্টা করার চেয়ে, তার সঙ্গে যুক্ত হওয়াকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বেইজিং অবশ্য অস্বস্তিকর বাস্তবতা অনুধাবন করেই তাদের কূটনৈতিক শৈলীতে পরিবর্তন এনেছে। অর্থনৈতিক মন্দার কারণে দেশটির এখন আরও বেশি বিদেশি বিনিয়োগ ও বাণিজ্য প্রয়োজন, যার জন্য স্থিতিশীল সম্পর্ক জরুরি। তা ছাড়া, অতিরিক্ত সংঘাতের কারণে দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের মতো আঞ্চলিক গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদাররা ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছিল।
তবে এই সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে চীন অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং যুক্তরাজ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামত করেছে। কানাডা, যুক্তরাজ্য এবং জার্মানির রাষ্ট্রপ্রধানদের মতো বিশ্বনেতারা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির সাথে চুক্তি করতে বেইজিংয়ের লালগালিচায় পা রেখেছেন।
গত এক দশক ধরে শি দেশের জনগণকে 'চীনা জাতির মহান পুনরুত্থানের' প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছেন এবং গত সপ্তাহের এই কূটনৈতিক তৎপরতা দেশের ভেতরে একটি চমৎকার প্রচারণার সুযোগ করে দিয়েছে: চীনা নেতাকে এখন এমন একজন মানুষ মনে হচ্ছে, যার সঙ্গে সবাই দেখা করতে চায়। কিন্তু এই সফর চীনের কূটনৈতিক ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও ফুটিয়ে তুলেছে।
কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা
পুতিন সঙ্গে আলোচনায় শি কেবল একটি যুদ্ধের কথাই উল্লেখ করেছেন— তা হলো মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত। তিনি পুতিনকে বলেছেন যে, ইরানে যুদ্ধ সম্পূর্ণ বন্ধ করা 'অত্যন্ত জরুরি', অথচ রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের বিষয়ে কোনো আলোচনাই হয়নি।
শি এবং পুতিন উভয়েই 'অন্যান্য দেশের ওপর বিশ্বাসঘাতকতামূলক সামরিক হামলা, আলোচনার আড়ালে কপটভাবে হামলার প্রস্তুতি, সার্বভৌম রাষ্ট্রের নেতাদের হত্যা, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করা এবং সরকার পরিবর্তনের উসকানি, এবং বিচারের জন্য জাতীয় নেতাদের অন্যায়ভাবে অপহরণের' নিন্দা জানিয়েছেন।
বিবিসি বলছে, এই অবস্থানটি ছিল বেশ বৈপরীত্যপূর্ণ এবং এর প্রভাব চীনের গ্রেট হলের বাইরেও পড়তে পারে। চীন যখন অন্যত্র যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানাচ্ছে এবং মার্কিন পদক্ষেপের সমালোচনা করছে, তখন লক্ষাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটানো ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে তাদের নীরবতা ইউরোপে প্রশ্ন তুলবে যে, বেইজিং আসলে কতটা নিরপেক্ষ বৈশ্বিক খেলোয়াড় হতে প্রস্তুত বা সক্ষম।
ইউক্রেন যুদ্ধে বেইজিং নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করলেও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ উভয়ই চীনকে মস্কোর অর্থনৈতিক লাইফলাইন কেটে দেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়ে আসছে।
তবে পুতিন যুদ্ধে হেরে গেলে চীন তার একটি প্রধান মিত্র হারানোর আশঙ্কায় রয়েছে। এ ছাড়া এত বড় প্রতিবেশীর মধ্যে যেকোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা বেইজিংয়ের জন্য উদ্বেগের কারণ হবে।
সমীর পুরি বলেন, 'অবশ্যই শি জিনপিং সহজ পথ বেছে নিয়ে এই বিষয়ে নীরব থাকতে পারেন। পরোক্ষভাবে এর অর্থ দাঁড়ায়— রাশিয়া, তোমরা তোমাদের আক্রমণ চালিয়ে যাও।'
তিনি আরও বলেন, 'যুদ্ধবিরতি বা যুদ্ধ-পরবর্তী ভবিষ্যৎ কেমন হতে পারে তা নিয়ে যদি কোনো আলোচনা হয়ে থাকে, তবে আমি অবাক হব। রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধে চীন তার প্রভাব খাটাতে চায় কি না, তা এখনো একটি বড় ধোঁয়াশা।'
এর বিপরীতে, ইরানের যুদ্ধ চীনের স্বার্থকে আঘাত করছে। বেইজিংয়ের কাছে পর্যাপ্ত তেলের মজুত থাকলেও, হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধকারী এই সংকটের আপাতত কোনো শেষ দেখা যাচ্ছে না।
বিবিসি বলছে, বিশ্বমঞ্চে কেন্দ্রীয় ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টাকালে একটি যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানানো এবং অন্যটি নিয়ে নীরব থাকা শির গ্রহণযোগ্যতাকে ক্ষুণ্ণ করে। এটি এমন এক সময়ে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ককে ঝুঁকিতে ফেলছে, যখন বেইজিং তাদের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে সেই সম্পর্ক জোরদার করতে চাইছে।
চীনে উচ্চপর্যায়ের এই কূটনৈতিক সপ্তাহটি যতই আকর্ষণীয় দেখাক না কেন, শির সামনে এখনো অনেক বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। কারণ শির অধীনে আরও শক্তিশালী হওয়া চীনের কর্তৃত্ববাদী নেতৃত্ব এখনও অনেকের কাছে বিতর্কিত।
রাজনীতি/আইআর

দক্ষিণ লেবাননের টাইর জেলার দেইর কানুন আল-নাহর শহরে একটি বড় ধরনের বিমান হামলা চালানো হয়। এতে নারী ও শিশুসহ ১০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় স্থানীয় উদ্ধারকারী দল তল্লাশি অভিযান চালাচ্ছে। এছাড়া কফারসির শহরের আল-মাহফারা এলাকায় একটি আবাসিক ভবন সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে এবং সেখানে চারজন নিহত
১১ ঘণ্টা আগে
আইএসপিআর জানায়, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ওই এলাকায় অস্ত্রধারীদের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার পর ১৭ মে থেকে সেখানে ‘স্যানিটাইজেশন অপারেশন’ শুরু করা হয়। পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় নিরাপত্তা বাহিনী অভিযান জোরদার করে অস্ত্রধারীদের অবস্থান ঘিরে ফেলে এবং তীব্র গোলাগুলির পর ২২ জনকে হত্যা করা হয়।
১১ ঘণ্টা আগে
আইএস সদস্যদের হত্যার পাশাপাশি নাইজেরিয়ার বিভিন্ন এলাকায় গোষ্ঠীটির বেশ কয়েকটি চেকপয়েন্ট, অস্ত্রাগার, লজিস্টিক কেন্দ্র ধ্বংস করা হয়েছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন তিনি।
১২ ঘণ্টা আগে
আসন্ন ঈদুল আজহার আগে গবাদিপশু জবাই সংক্রান্ত কয়েক দশকের পুরনো একটি আইন কঠোরভাবে কার্যকরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী। তবে রাজ্যের নতুন সরকারের এই পদক্ষেপ গ্রামীণ পশুপালন অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
১ দিন আগে