ইতিহাস

ইরানের মোসাদ্দেক সরকারকে যেভাবে উৎখাত করেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেন

অরুণাভ বিশ্বাস

ইরান নামটা আজ বিশ্বরাজনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। পারমাণবিক কর্মসূচি, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা কিংবা ধর্মীয় বিপ্লব—সব কিছুতেই ইরান আলোচনার কেন্দ্রে। কিন্তু ইরানের ইতিহাসে এমন এক সময় ছিল, যখন দেশটি গণতন্ত্রের পথে এগোচ্ছিল শান্তিপূর্ণভাবে। সেই পথের সবচেয়ে উজ্জ্বল মুখ ছিলেন ড. মোহাম্মদ মোসাদ্দেক। তিনি ছিলেন একজন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, যিনি নিজের দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ—বিশেষ করে তেল—বিদেশিদের হাত থেকে উদ্ধার করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই চেষ্টার জন্য তাঁকে চড়া মূল্য দিতে হয়। ১৯৫৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এবং বৃটেনের এমআই৬ মিলে এক গোপন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়। ইতিহাসে এই অভিযান “অপারেশন_ajax” নামে পরিচিত। এটি ছিল আধুনিক ইতিহাসে প্রথম যুক্তরাষ্ট্র-পরিচালিত অভ্যুত্থান, যা পরবর্তীতে আরও বহু দেশে এ ধরনের হস্তক্ষেপের পথ খুলে দেয়।

মোসাদ্দেক ছিলেন সত্যিকার গণতান্ত্রিক নেতা। ১৯৫১ সালে তিনি যখন প্রধানমন্ত্রী হন, তখন তিনি তেল শিল্পকে জাতীয়করণ করেন। কারণ তাঁর বিশ্বাস ছিল, ইরানের জনগণের সম্পদ শুধুমাত্র ইরানিদেরই কাজে লাগা উচিত। কিন্তু সমস্যা বাধে তখনই। ইরানের তেল তখন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করত একটি বৃটিশ কোম্পানি—অ্যাংলো-ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি (বর্তমানে বিপি)। মোসাদ্দেকের জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত বৃটেনকে ক্ষিপ্ত করে তোলে। তারা এই উদ্যোগকে ‘অবৈধ’ ও ‘কমিউনিস্টপন্থী’ বলে প্রচার করতে থাকে। বৃটেন প্রথমে কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে, পরে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্রকে অভ্যুত্থানে সহযোগিতা করতে রাজি করায়।

তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ছিলেন ডাওাইট আইজেনহাওয়ার। তাঁর প্রশাসন শীতল যুদ্ধের সময় কমিউনিজমের প্রসার ঠেকাতে সর্বোচ্চ সতর্ক ছিল। বৃটেন মার্কিন প্রশাসনকে বোঝাতে সক্ষম হয় যে, মোসাদ্দেক যদি ক্ষমতায় থাকেন, তবে ইরান সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। এই যুক্তিতে রাজি হয়ে সিআইএ গোপনে ‘অপারেশন_ajax’ চালায়। অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন কেরমিট রুজভেল্ট জুনিয়র—তৎকালীন সিআইএ কর্মকর্তা এবং সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্টের নাতি।

কেরমিট রুজভেল্ট তাঁর আত্মজীবনী "Countercoup" গ্রন্থে লেখেন, ‘‘এই অভ্যুত্থান ছিল ভয়ংকর কৌশলের খেলা। আমরা মিডিয়া কিনেছি, ভুয়া আন্দোলন তৈরি করেছি, ধর্মীয় নেতাদের ঘুষ দিয়েছি এবং সেনাবাহিনীকে প্রলুব্ধ করেছি।’’ অর্থাৎ এটি ছিল এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক ও আর্থিক যুদ্ধ। সিআইএ ও এমআই৬ স্থানীয় গুন্ডা, ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠী এবং সামরিক কর্মকর্তাদের মিলে একটি ভুয়া জনবিক্ষোভ সংগঠিত করে। এই বিক্ষোভের ছত্রছায়ায় তাঁরা মোসাদ্দেকের বাড়ি ঘেরাও করে, তাঁকে গ্রেফতার করে এবং জেনারেল ফজলুল্লাহ জাহেদিকে ক্ষমতায় বসায়।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী ইতিহাসবিদ স্টিফেন কিন্জার তাঁর বই "All the Shah's Men"–এ লিখেছেন, ‘‘এই অভ্যুত্থান ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশ নীতিতে এক নৈতিক বিপর্যয়ের সূচনা। আমরা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জবরদস্তি করে কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করেছিলাম, শুধুমাত্র তেলের কারণে।’’ তাঁর মতে, ইরানে যদি এই অভ্যুত্থান না ঘটত, তবে হয়তো মধ্যপ্রাচ্য আজ এক ভিন্ন পথে যেত।

মোসাদ্দেক পরবর্তী ৩ বছর গৃহবন্দী ছিলেন এবং বাকিজীবন নজরদারির মধ্যে কাটান। তাঁর জনপ্রিয়তা তখনও তুঙ্গে ছিল, কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক জীবন কার্যত শেষ হয়ে যায়। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেন যাকে ক্ষমতায় বসায়, সেই শাহ রেজা পাহলভি এক কর্তৃত্ববাদী শাসক হয়ে ওঠেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের আস্থাভাজন হিসেবে ইরান চালান, কিন্তু দেশের মানুষের স্বাধীনতা ও মত প্রকাশের অধিকার ক্ষুণ্ণ হতে থাকে। শেষমেশ এই একনায়কতন্ত্রই ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লব ডেকে আনে, যার ফলে আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে দেশটি হয়ে ওঠে এক ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্র।

বিশ্বরাজনীতিতে ইরানকে ঘিরে আজ যে উত্তেজনা, তার মূল শিকড় অনেকাংশে ১৯৫৩ সালের সেই অভ্যুত্থানে নিহিত। এ বিষয়টি বহু গবেষক ও বিশ্লেষক স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। আমেরিকান নীতিনির্ধারকদের জন্য এটি এক শিক্ষা হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু তারা বহু সময়ই তা গ্রহণ করেনি। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের বিশ্লেষক ব্রুস রিডেল বলেন, ‘‘ইরানে ১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থান ছিল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় কৌশলগত ভুল। এটি আমাদের প্রতি ইরানিদের অবিশ্বাস তৈরি করেছে, যা আজও চলমান।’’

তেল, ক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি—এই ত্রিভুজ সম্পর্কের জালেই জড়িয়ে পড়েছিল ইরান। মোসাদ্দেক চেয়েছিলেন একটি স্বাধীন, স্বনির্ভর ও গণতান্ত্রিক ইরান। কিন্তু তেলশক্তির লোভ, ঠান্ডা যুদ্ধের আতঙ্ক এবং ভূরাজনৈতিক লাভ-ক্ষতির কষাকষিতে সেই স্বপ্ন চুরমার হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেনের সেই যৌথ অভ্যুত্থান কেবল একজন নেতাকে সরিয়ে দেয়নি, এটি ইরানের ভবিষ্যৎ ইতিহাসও বদলে দিয়েছে। ফলে ইতিহাস শুধু অতীত নয়—তা আমাদের আজকেও ব্যাখ্যা করে, এমনকি আগামীকেও রূপরেখা দেয়। ১৯৫৩ সালের মোসাদ্দেক অধ্যায় তার প্রমাণ।

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

সৌদিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি হুতিদের, যুদ্ধবিরতি ভাঙার শঙ্কা

এর আগে ২০২২ সালে সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনায় বড় ধরনের হামলা চালিয়েছিল হুতিরা। এরপর জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি শুরু হয়। সোমবারের হামলার মধ্য দিয়ে সেই সমঝোতা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

৬ ঘণ্টা আগে

হরমুজ প্রণালিতে ট্যাংকারে ইরানের হামলায় ভারতীয় নাবিক নিহত

বিবৃতিতে বলা হয়, "প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এই দুঃসাহসিক হামলার নিন্দা জানায়, যা একটি গুরুতর লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট অবমাননা। এটি অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি।"

৭ ঘণ্টা আগে

যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

আইআরজিসির একটি বিবৃতির বরাত দিয়ে জানা গেছে, বাহরাইনে মার্কিন এই ঘাঁটি লক্ষ্য করে চালানো হামলায় তাদের জ্বালানি সংরক্ষণাগারে ভয়াবহ আগুন ধরে যায়। এছাড়া ঘাঁটিতে থাকা প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা রাডার, এয়ার কন্ট্রোল রাডার, সি-র‍্যাম আগাম সতর্কীকরণ রাডার ব্যবস্থা এবং মানববিহীন সারফেস ভেসেল নিয়ন্ত্

৯ ঘণ্টা আগে

ইরানে রাতভর মার্কিন হামলা, পারমাণবিক স্থাপনা টার্গেট করার ঘোষণা ট্রাম্পের

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, ইরানের অভ্যন্তরে একটি পারমাণবিক স্থাপনায়ও হামলা চালানোর বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে ওয়াশিংটন।

১১ ঘণ্টা আগে