অভিবাসীদের বৈধতা দিতে শুরু করেছে স্পেন, আশা-উৎকণ্ঠায় আবেদনকারীরা

স্পেনে নথিপত্রহীন প্রায় ৫ লাখ অভিবাসীদের বৈধ করার লক্ষ্যে দেশটির বামপন্থি সরকারের গণ-বৈধকরণ প্রকল্প চালু হয়েছে। এ উদ্যোগকে ঘিরে অভিবাসীদের মধ্যে যেমন নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে, তেমনি আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দেখা দিয়েছে নানা উৎকণ্ঠা ও দৌড়ঝাঁপ।
বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ ও আবেদন জমা দিতে বিভিন্ন দেশের দূতাবাস ও সরকারি কার্যালয়ে ভিড় করছেন হাজারও মানুষ।
মাদ্রিদের পেরুভিয়ান কনস্যুলেটের সামনে অপেক্ষমাণ ২৮ বছর বয়সী ম্যাডেলিন কাস্তিলো বলেন, নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণে প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করতে এসে নানা জটিলতার মুখে পড়ছেন তিনি। তিন সন্তানের এই জননী বলেন, ‘সবকিছুই বিনামূল্যে হবে বলা হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে আইনজীবীর সহায়তা ছাড়া এগোনো কঠিন।’
অন্যদিকে, ইতিবাচক অভিজ্ঞতার কথাও জানিয়েছেন অনেকে। ৩০ বছর বয়সী কলম্বিয়ান নারী ক্যারোলিনা (ছদ্মনাম) মাদ্রিদ আঞ্চলিক সরকারের কার্যালয় থেকে প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করে বের হন হাসিমুখে। তার মতে, এই প্রকল্প তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। তিনি বলেন, ‘সাধারণ নিয়মে বৈধ হতে আরও দুই বছর অপেক্ষা করতে হতো। কিন্তু এই বিশেষ উদ্যোগে তা অনেকটাই সহজ হয়েছে।’
এই প্রকল্পে আবেদন করতে স্পেনে অন্তত টানা পাঁচ মাস অবস্থানের প্রমাণ দেখাতে হবে, যা গণপরিবহনের কার্ড, রেমিট্যান্স রসিদ বা হাসপাতালের অ্যাপয়েন্টমেন্টের মতো নথির মাধ্যমে নিশ্চিত করা যাচ্ছে।
ইউরোপের অনেক দেশ যখন অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে, তখন স্পেন উল্টো পথ বেছে নিয়ে নীতি শিথিল করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই উদ্যোগের আওতায় প্রায় পাঁচ লাখ অভিবাসী বৈধ হওয়ার সুযোগ পাবেন, যাদের বড় অংশ ল্যাটিন আমেরিকার নাগরিক।
তবে সবার জন্য পথটি সহজ নয়। কলম্বিয়ার বোগোটা থেকে আসা ৩৮ বছর বয়সী আলেজান্দ্রা জানান, তার নিজের কাগজপত্র থাকলেও স্বামীর ক্ষেত্রে জটিলতা রয়ে গেছে। প্রয়োজনীয় নথি না থাকায় তিনি কাজও পাচ্ছেন না, আবার সার্টিফিকেট সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
এ সপ্তাহের শুরুতে আইনে পরিণত হওয়া এক নতুন ডিক্রি অনুযায়ী, আবেদনকারীর বিরুদ্ধে স্পেন বা নিজ দেশে কোনো অপরাধের রেকর্ড থাকা যাবে না এবং জননিরাপত্তার জন্য হুমকি হওয়া চলবে না। এ ছাড়া আবেদনকারীর প্রোফাইল অনুযায়ী কাজের অভিজ্ঞতা বা পারিবারিক তথ্যও জমা দিতে হতে পারে।
বৃহস্পতিবার শুরু হওয়া এই আবেদন প্রক্রিয়া চলবে ৩০ জুন পর্যন্ত। আবেদন জমার ১৫ দিনের মধ্যে কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত জানাবে বলে জানানো হয়েছে।
এই বিশাল প্রশাসনিক কার্যক্রম সামাল দিতে সরকার বাড়তি পদক্ষেপ নিয়েছে। অভিবাসনমন্ত্রী এলমা সাইস জানান, সামাজিক নিরাপত্তা, ডাক ও অভিবাসন দপ্তরের প্রায় ৪৫০টি শাখা বাড়তি সময় খোলা রাখা হচ্ছে এবং নতুন করে ৫৫০ জন কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, বিপুল সংখ্যক আবেদন এবং নথিপত্র যাচাই প্রক্রিয়া বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আইনি সহায়তা প্রতিষ্ঠান ‘এক্সট্রানজারিয়া ক্লারা ডটকমে’র পরিচালক গুইলার্মো ভালদেরাবানো জানান, প্রতিদিন প্রায় ৪০০ মানুষ তাদের কাছে ফোন করে আইনি সহায়তা চাচ্ছেন।
গুইলার্মো ভালদেরাবানোর মতে, কেবল বিপুল সংখ্যক আবেদনই চ্যালেঞ্জ নয়; বরং নথিপত্রগুলোর সঠিক মূল্যায়ন ও ব্যবস্থাপনা বড় বিষয়। অতীতে এসব জায়গাতেই মূলত দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছিল। বর্তমানে জনবল বাড়ানো হলেও বাস্তবে এই চাপ সামাল দেওয়া কতটা সম্ভব, তা সময়ই বলে দেবে।




















