সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ‘শিকারি’দের তালিকায় ট্রাম্প

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আরএসএফের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ‘শিকারি’দের তালিকার একাংশ। ছবি: আরএসএফ
আরএসএফের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ‘শিকারি’দের তালিকার একাংশ। ছবি: আরএসএফ

সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের ওপর ধারাবাহিক আক্রমণের অভিযোগে ২০২৬ সালের ‘প্রেস ফ্রিডম প্রিডেটরস’ বা ‘সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার শিকারি’দের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম যোগ করেছে সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংগঠন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ)।

সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের দায়মুক্তি অবসানের আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষ্যে সোমবার তালিকাটি প্রকাশ করে আরএসএফ। এ বছর ট্রাম্পসহ ৩৩ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামের তালিকা প্রকাশ করেছে সংগঠনটি।

আরএসএফ তালিকায় থাকা ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ, স্বাধীন সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত করা এবং মানুষের তথ্য জানার অধিকার ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ তুলেছে। সংগঠনটির ভাষ্য, তালিকাভুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কৌশল ভিন্ন হলেও লক্ষ্য অভিন্ন— স্বাধীন সাংবাদিকতাকে দমন করা। সাংবাদিক হত্যা, কারাবন্দি, অপপ্রচার, অনলাইন ট্রল বাহিনী, আইনি হয়রানি ও অর্থনৈতিক চাপ— বিভিন্ন পদ্ধতিতে সংবাদমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে তারা।

আরএসএফ প্রতি বছরই এ তালিকা প্রকাশ করে থাকে। গত বছরের তালিকায় জায়গা না পেলেও এবার ট্রাম্পের নাম যুক্ত হয়েছে। দ্বিতীয় মেয়াদের দুই বছরেরও কম সময়ে সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে তার ধারাবাহিক আক্রমণ ও সাংবাদিকতাকে রাজনৈতিক প্রচারণার হাতিয়ারে পরিণত করার চেষ্টাকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে আরএসএফ।

সংগঠনটির মতে, ট্রাম্পের সংবাদমাধ্যমবিরোধী অবস্থান এখন শুধু বক্তব্য ও নীতিগত সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ নেই, সাংবাদিকদের ওপর সরাসরি শারীরিক বিধিনিষেধও আরোপ করা হচ্ছে। আরএসএফের ২০২৬ সালের বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ৬৪তম।

তালিকায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও নিকারাগুয়ার প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল ওর্তেগার মতো পরিচিত নামও রয়েছে। ‘নিরাপত্তা’ বিভাগে রাখা হয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী, মেক্সিকোর মাদক কার্টেল ও চীনা কমিউনিস্ট পার্টিকে। গাজা, পশ্চিম তীর ও লেবাননে সাংবাদিকদের ওপর দমন-পীড়ন চালানোর অভিযোগ রয়েছে ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের শাসনাধীন দেশটিকে সাংবাদিকদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে বড় কারাগার হিসেবে উল্লেখ করেছে আরএসএফ। মেক্সিকোয় চলতি বছরের শুরু থেকে সংগঠিত অপরাধী চক্রের হাতে প্রায় প্রতি মাসে একজন করে সাংবাদিক নিহত হয়েছেন বলেও জানিয়েছে সংগঠনটি।

এ বিভাগে নতুন সংযোজন মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তার সরকারের বিরুদ্ধে তথ্য যাচাইকারী ওয়েবসাইট মাতসাদ্দাশের সাংবাদিকদের আটক এবং সংবাদমাধ্যম মাদা মাসর বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।

‘আইনি’ বিভাগে রয়েছে কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্ট কাসিম-জোমার্ট তোকায়েভ। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং ভারতীয় ব্যবসায়ী গৌতম আদানির নেতৃত্বাধীন ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর পাশাপাশি তার নাম রেখেছে আরএসএফ। সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে সাংবাদিকতাকে অপরাধ হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে এ তালিকাভুক্তদের বিরুদ্ধে।

‘সামাজিক’ বিভাগে রয়েছে বুরকিনা ফাসোর র‍্যাপিড কমিউনিকেশন ইন্টারভেনশন ব্যাটালিয়ন এবং ভারতের ওপইন্ডিয়া। স্বাধীন সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে অনলাইনে ঘৃণা ছড়ানো ও ডিজিটাল আক্রমণে ভূমিকার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেয়ও এ বিভাগে স্থান পেয়েছেন। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে তাঁর বক্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আক্রমণের মাত্রা তুলে ধরে আরএসএফ জানিয়েছে, ২০২৬ সালের এপ্রিল ও মে মাসের মাত্র ৪৭ দিনে নিজের এক্স অ্যাকাউন্টে সংবাদমাধ্যমবিরোধী এক হাজার ৬০০টির বেশি পোস্ট করেছিলেন তিনি।

‘অর্থনৈতিক’ বিভাগে রয়েছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেট ও মেটা, জর্জিয়ার প্রভাবশালী ধনকুবের বিদজিনা ইভানিশভিলি, ফরাসি ব্যবসায়ী ভিনসেন্ট বলোরে এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ভ্লাদিমির তাবাক। অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ, সংবাদমাধ্যমের অর্থায়ন দুর্বল করা এবং সম্পাদকীয় স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করার কৌশলের জন্য তাদের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

আরএসএফের মহাপরিচালক থিবো ব্রুটিন বলেছেন, তালিকাটি এক অর্থে সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে সবচেয়ে খারাপ আক্রমণ ও নির্যাতনের একটি ব্যঙ্গাত্মক ‘নেতিবাচক পুরস্কার’। তবে এর প্রতিটি নামের পেছনে রয়েছে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডের বিবরণ। তালিকাটি কেবল অভিযুক্তদের চিহ্নিত করে না, বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে অবনতির পেছনে কারা দায়ী, সেটিও সামনে আনে।

এবারের তালিকায় গত বছরের কয়েকজনের নাম বাদ পড়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি, যিনি গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মুখে প্রাণ হারিয়েছেন। বাদ পড়েছেন ভেনেজুয়েলার নিকোলাস মাদুরো, যিনি নজিরবিহীন মার্কিন আগ্রাসনের মুখে মার্কিন কারাগারে বন্দি। হাঙ্গেরির ভিক্টর অরবান ও সার্বিয়ার আলেকসান্দার ভুচিচও তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন। নির্বাচনে পরাজয়ের কারণে এই দুই সাবেক প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা হারানোর ঘটনাকে নাগরিকদের স্বাধীনতা হরণের বিরুদ্ধে ভোটের মাধ্যমে জবাব দেওয়ার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে সংগঠনটি।

আরএসএফ বলেছে, সাংবাদিকদের ওপর শারীরিক ও মৌখিক হামলা, ভয়ভীতি, আইনি হয়রানি, তথ্যের ডিজিটাল বিকৃতি কিংবা অর্থনৈতিক চাপ— যে পথেই হোক, এসব কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য স্বাধীন সাংবাদিকতা বন্ধ করা এবং নাগরিকদের নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত করা। সাংবাদিকদের কাজ বাধাগ্রস্ত করার এসব প্রচেষ্টাকে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad