
ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম

নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার ও পেন্টাগনে হামলার ২৫ বছর পরও বিশ্ব রাজনীতিতে রয়ে গেছে এর দীর্ঘ ছায়া। আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধ, ‘ওয়ার অন টেরর’, নজরদারি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিস্তার, আল-কায়েদার পর আইএসের উত্থান— সব মিলিয়ে নাইন-ইলেভেন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস নয়, বদলে দিয়েছে আন্তর্জাতিক রাজনীতি আর বিশ্বব্যবস্থার গতিপথও।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সকাল। যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে ছিনতাই করা চারটি যাত্রীবাহী বিমান। নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দুটি টাওয়ারে আঘাত হানে দুটি বিমান। তৃতীয়টি আঘাত করে ওয়াশিংটনের পেন্টাগনে। চতুর্থ বিমানটি পেনসিলভানিয়ার একটি মাঠে বিধ্বস্ত হয়— যাত্রীদের প্রতিরোধের পর।
আল-কায়েদার ১৯ ছিনতাইকারীসহ ওই হামলায় নিহত হন দুই হাজার ৯৭৭ জন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র বুঝে যায়, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী হামলা নয়; দেশটির নিরাপত্তা ও বৈদেশিক নীতির সামনে নতুন এক যুগের সূচনা হয়েছে। নাইন-ইলেভেন কমিশনের তদন্তে হামলার পরিকল্পনা, গোয়েন্দা ব্যর্থতা ও আল-কায়েদার উত্থানের বিস্তারিত চিত্র উঠে আসে।
২৫ বছর পর সেই প্রশ্নই আবার সামনে— নাইন-ইলেভেনের পর যে বিশ্ব তৈরি হয়েছিল, তা কি এখনো টিকে আছে?

হামলার মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর, ২০০১ সালের অক্টোবরে আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। লক্ষ্য ছিল আল-কায়েদাকে ধ্বংস করা এবং সংগঠনটির নেতা ওসামা বিন লাদেনকে আশ্রয় দেওয়া তালেবান সরকারকে উৎখাত করা।
তালেবান সরকার দ্রুত ক্ষমতা হারালেও যুদ্ধ শেষ হয়নি। বরং শুরু হয় দীর্ঘ বিদ্রোহ, পালটা সামরিক অভিযান ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের চেষ্টা। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ন্যাটো বাহিনী দুই দশক আফগানিস্তানে অবস্থান করে। ২০২১ সালের আগস্টে তালেবান আবার কাবুল দখল করলে শেষ হয় যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘতম যুদ্ধের অধ্যায়।
কিন্তু ২০ বছর পরও প্রশ্ন থেকে যায়— এই যুদ্ধে আসলে কী অর্জিত হলো?
ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ওয়াটসন ইনস্টিটিউটের ‘কস্ট অব ওয়ার’ প্রকল্পের হিসাবে, ২০০১ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত যুদ্ধ ও সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা কর্মকাণ্ডে ২০২১ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় আট ট্রিলিয়ন ডলারে। এর মধ্যে আফগানিস্তান-পাকিস্তান যুদ্ধাঞ্চলের ব্যয়ই ছিল প্রায় ২.৩ ট্রিলিয়ন ডলার। প্রকল্পটির হিসাবে এসব যুদ্ধে সরাসরি সহিংসতায় নিহত মানুষের সংখ্যা ৯ লাখের বেশি।
আর যুদ্ধ শেষ হলেও খরচ শেষ হয়নি। ব্রাউনের হিসাবে, আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধে অংশ নেওয়া মার্কিন সেনা ও ভেটেরানদের চিকিৎসা ও অন্যান্য সুবিধার দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় ২০৫০ সাল পর্যন্ত ২ দশমিক ২ থেকে ২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার হতে পারে।

৯/১১ হামলার সঙ্গে ইরাকের সরাসরি সম্পর্ক প্রমাণিত না হলেও ২০০৩ সালে ইরাকে হামলার পেছনে সাদ্দাম হোসেনের হাতে গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার অভিযোগ বড় যুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু পরে সেই অস্ত্রের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০০৩ সালের যুদ্ধের পক্ষে ব্যবহৃত তিনটি প্রধান যুক্তি— ইরাকের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকা, নতুন অস্ত্র তৈরির চেষ্টা এবং জাতিসংঘের নিরস্ত্রীকরণ বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন— শেষ পর্যন্ত যার কোনোটাই সত্য প্রমাণিত হয়নি। যুক্তরাজ্যের চিলকোট ইনকোয়ারিও ইরাক যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ও যুদ্ধ-পরবর্তী পরিকল্পনার ওপর গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
ইরাক যুদ্ধের পরিণতিও ছিল সুদূরপ্রসারী। সাদ্দাম সরকারের পতন ঘটলেও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দুর্বলতা, সাম্প্রদায়িক সংঘাত ও বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে ইরাক পরিণত হয় জঙ্গিবাদের নতুন ক্ষেত্র হিসেবে। সেখান থেকেই পরবর্তী দশকে জন্ম নেয় আরও ভয়ংকর এক সংগঠন— ইসলামিক স্টেট (আইএস)।

৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্র আল-কায়েদার কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান চালায়। ২০১১ সালে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে মার্কিন অভিযানে নিহত হন ওসামা বিন লাদেন। কিন্তু একজন নেতাকে হত্যা করেই তার আদর্শ বা নেটওয়ার্ক শেষ করা সম্ভব হয়নি।
ইরাক যুদ্ধের অস্থিরতা ও সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সুযোগ নিয়ে আল-কায়েদার ইরাক শাখা থেকে বিকশিত হয় আইএস। ২০১৪ সালে সংগঠনটি ইরাক ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে ‘খিলাফত’ ঘোষণা করে।
পরে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের সামরিক অভিযানে আইএস তার দখল করা প্রায় সব ভূখণ্ড হারায়। কিন্তু সংগঠনটি পুরোপুরি বিলীন হয়নি; বরং আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় বিভিন্ন শাখা ও সহযোগী সংগঠনের মাধ্যমে সক্রিয় থাকে।
২০২৫ সালের গ্লোবাল টেরোরিজম ইনডেক্স বলছে, সন্ত্রাসবাদের কেন্দ্র ক্রমেই পশ্চিমা বিশ্বের বাইরে সরে গেছে। বিশেষ করে সাহেল অঞ্চল, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য এখন বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদের বড় কেন্দ্র। একই সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোতে একক হামলাকারী বা ‘লোক অ্যাক্টরে’র ঝুঁকিও বেড়েছে।
অর্থাৎ ৯/১১-এর মতো একটি কেন্দ্রীয় সংগঠনের সুপরিকল্পিত হামলার মডেল থেকে সন্ত্রাসবাদ অনেক বেশি বিকেন্দ্রীভূত, অনলাইননির্ভর ও স্থানীয় সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত রূপ নিয়েছে।

৯/১১-এর প্রভাব থেকে রক্ষা পায়নি যুক্তরাষ্ট্রও। ওই হামলার পর দেশটির পররাষ্ট্রনীতিই কেবল বদলায়নি, বদলে দিয়েছে দেশটির ভেতরের রাষ্ট্রীয় কাঠামোও। ২০০২ সালে গঠিত হয় ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি। বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থায় আসে আমূল পরিবর্তন। গড়ে ওঠে ট্রান্সপোর্টেশন সিকিউরিটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (টিএসএ)। ককপিট নিরাপত্তা, যাত্রী ও লাগেজ তল্লাশি, বিমানবন্দরে প্রবেশাধিকার— সবকিছুই আগের তুলনায় অনেক কঠোর হয়।
২৫ বছর পরও সেই পরিবর্তনের ছাপ স্পষ্ট। এমনকি ২০২৬ সালে টিএসএ পরীক্ষামূলকভাবে কিছু অনুমোদিত যাত্রীকে টিকিট ছাড়াই বিমানবন্দরের গেট এলাকায় প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে— ৯/১১-এর পর যে প্রবেশাধিকার প্রায় সর্বত্র বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তার একটি সীমিত প্রত্যাবর্তন হিসেবে বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে।
একই সময়ে নজরদারি ক্ষমতা বাড়ানো হয়। ৯/১১-এর পর পাস হয় ইউএসএ প্যাট্রিয়ট অ্যাক্ট, যার মাধ্যমে সন্ত্রাসবিরোধী তদন্তে সরকারের নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহের ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়।
এ নিয়ে শুরু হয় আরেক বিতর্ক— নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্র কতটা ক্ষমতা পাবে, আর ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সীমা কোথায়? ৯/১১-এর পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিতর্কগুলোরও একটি হয়ে ওঠে এই ‘নিরাপত্তা বনাম নাগরিক স্বাধীনতা’ প্রশ্ন।

৯/১১-এর পর আল-কায়েদার মতো জঙ্গিগোষ্ঠী ও ইসলামকে এক করে দেখার প্রবণতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্য, নজরদারি, বিমানবন্দরে অতিরিক্ত তল্লাশি এবং ‘ইসলামোফোবিয়া’— এসব শব্দ আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন গুরুত্ব পায়।
একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ে। আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে ড্রোন হামলা, ইরাক যুদ্ধ, পরে সিরিয়া ও অন্যান্য দেশে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান— সবকিছু মিলিয়ে ‘ওয়ার অন টেরর’ একটি নির্দিষ্ট যুদ্ধের বদলে হয়ে ওঠে দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক নিরাপত্তা অভিযান।
ব্রাউন ইউনিভার্সিটির বর্তমান ‘কস্ট অব ওয়ার’ সংকলন অনুযায়ী, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন, সোমালিয়া, লিবিয়া ও অন্যান্য যুদ্ধক্ষেত্রে ৯/১১-পরবর্তী সংঘাতের কারণে সরাসরি সহিংসতায় অন্তত ৯ লাখ ৪০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। যুদ্ধের কারণে স্বাস্থ্যব্যবস্থা, অর্থনীতি, খাদ্য ও অবকাঠামো ধ্বংসের মতো পরোক্ষ মৃত্যু হিসাবে ধরলে এর পরিমাণ আরও বেশি। গবেষণাটির হিসাব, এসব যুদ্ধের কারণে প্রায় তিন কোটি ৮০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

৯/১১-এর পর প্রথম দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা উদ্বেগ ছিল বিদেশি জঙ্গি সংগঠন— আল-কায়েদা, আইএস বা তাদের সহযোগী গোষ্ঠী। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে আমেরিকানদের উদ্বেগের চিত্র বদলে গেছে।
রয়টার্স/ইপসস গত ২৮ থেকে ৩১ আগস্ট একটি জরিপ পরিচালনা করে। ওই জরিপ অনুযায়ী, ৯/১১-এর ২৫ বছর পর বিদেশি সন্ত্রাসবাদের চেয়ে দেশীয় উগ্রবাদ নিয়ে আমেরিকানদের উদ্বেগ বেশি। ৩৩ শতাংশ উত্তরদাতা দেশীয় সন্ত্রাসবাদকে নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় হুমকি বলেছেন, যেখানে বিদেশি সন্ত্রাসবাদকে বলেছেন ২০ শতাংশ। আরও ৬১ শতাংশ বলেছেন, বিদেশি উগ্রবাদীদের তুলনায় আদর্শগতভাবে প্ররোচিত দেশীয় উগ্রবাদীদের হামলা এখন বড় হুমকি।
অর্থাৎ ২০০১ সালে যে প্রশ্ন ছিল ‘বিদেশ থেকে আসা সন্ত্রাসবাদী হামলা থেকে আমেরিকাকে কীভাবে রক্ষা করা হবে?’, ২৫ বছর পর বদলে হয়েছে— ‘নিজের সমাজের ভেতর থেকে সহিংস উগ্রবাদ কীভাবে ঠেকানো হবে?’

৯/১১-এর সময় ইন্টারনেট ছিল, কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল না। আজকের জঙ্গিবাদ সেই বাস্তবতায় নেই। সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো এখন প্রচার, নিয়োগ, অর্থ সংগ্রহ, মতাদর্শ ছড়ানো এবং হামলার নির্দেশনার জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে পারে। সংগঠিত বড় হামলার পাশাপাশি একক হামলাকারী বা ছোট সেলের ওপর গুরুত্ব বেড়েছে।
২০২৫ সালের গ্লোবাল টেরোরিজম ইনডেক্স দেখিয়েছে, সন্ত্রাসবাদ এখন ক্রমেই স্থানীয় সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। আর ইউরোপীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা ২০২৬ সালে অনলাইনভিত্তিক নতুন ধরনের সহিংস উগ্রবাদ নিয়ে সতর্ক করছেন— যেখানে রাজনৈতিক বা ধর্মীয় মতাদর্শের চেয়ে সহিংসতার প্রতি আকর্ষণ, অনলাইন পরিচিতি ও ‘ভাইরাল’ হওয়ার প্রবণতা বড় ভূমিকা রাখছে।
এই পরিবর্তন ৯/১১-এর উত্তরাধিকার বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সন্ত্রাসবাদকে শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে নির্মূল করার ধারণা ২৫ বছরে বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
তাহলে কি ‘ওয়ার অন টেরর’ ব্যর্থ? এক কথায় এর উত্তর দেওয়া কঠিন। কারণ একদিকে ৯/১১-এর মতো মাত্রার আর কোনো হামলা যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে হয়নি, আল-কায়েদার কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ভেঙে দেওয়া হয়েছে, বিন লাদেন নিহত হয়েছেন এবং আইএস তার ভূখণ্ড হারিয়েছে। বিমানবন্দর নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সমন্বয়েও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।
অন্যদিকে যে যুদ্ধগুলো সন্ত্রাসবাদ নির্মূলের লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয়েছিল, সেগুলোর মানবিক ও আর্থিক মূল্য ছিল বিপুল। আফগানিস্তানে দুই দশক পর তালেবান আবার ক্ষমতায় ফিরে এসেছে। ইরাক যুদ্ধের পরিণতিতে তৈরি অস্থিরতা-পরবর্তী সময়ে আইএসের উত্থানের পথ তৈরি করেছে। আর সন্ত্রাসবাদ পৃথিবী থেকে বিলীন হওয়ার বদলে নতুন অঞ্চল, নতুন প্রযুক্তি ও নতুন কৌশলে ছড়িয়ে পড়েছে।
ব্রাউন ইউনিভার্সিটির গবেষণাও দেখিয়েছে, ৯/১১-পরবর্তী যুদ্ধগুলোর ব্যয় শুধু সামরিক বাজেটে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ঋণের সুদ, ক্ষতিগ্রস্তদের চিকিৎসা, বাস্তুচ্যুতি, অবকাঠামো ধ্বংস ও দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ক্ষতির হিসাব ধরলে এর প্রভাব বহু প্রজন্ম পর্যন্ত থাকবে।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলা ছিল প্রায় তিন হাজার মানুষের প্রাণহানির এক ভয়াবহ ঘটনা। কিন্তু তার রাজনৈতিক অভিঘাত সেই দিনের চেয়ে অনেক বড় হয়ে উঠেছে। ৯/১১ যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘ যুদ্ধের পথে ঠেলে দিয়েছে। সেই যুদ্ধ বদলে দিয়েছে আফগানিস্তান ও ইরাককে, মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে প্রভাব ফেলেছে, নতুন জঙ্গিগোষ্ঠীর জন্ম দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও নজরদারি কাঠামো পালটেছে এবং বিশ্ব জুড়ে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছে।
আজকের বিশ্ব অবশ্য আর ২০০১ সালের বিশ্ব নয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন শুধু সন্ত্রাসবাদকে ঘিরে নয়; চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতা, ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, সাইবার যুদ্ধ ও নতুন প্রযুক্তিও নিরাপত্তার কেন্দ্রে এসেছে।
কিন্তু ৯/১১-এর ছায়া পুরোপুরি সরে যায়নি। ২০২৬ সালের ২৫তম বার্ষিকীতে রয়টার্সের এক বিশ্লেষণে সতর্ক করা হয়েছে, সন্ত্রাসবিরোধী অবকাঠামো ও মনোযোগ কমে গেলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও আত্মতুষ্টির ঝুঁকিতে পড়তে পারে। অর্থাৎ ৯/১১-এর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো শুধু কীভাবে একটি হামলা ঠেকাতে হবে তা নয়— একটি হুমকি কমে গেলে তার জায়গায় নতুন হুমকি তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিও বুঝতে হবে।
২৫ বছর পর তাই ৯/১১ শুধু অতীতের একটি দিন নয়। এটি একটি প্রশ্ন— সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে বিশ্ব কতটা বদলেছে, সেই বদলের মূল্য কত, আর সেই যুদ্ধ থেকে আগামী বিশ্বের জন্য আসল শিক্ষা কী?
সূত্র: রয়টার্স, এএফপি, বিবিসি, সিএনএন, আল-জাজিরা

নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার ও পেন্টাগনে হামলার ২৫ বছর পরও বিশ্ব রাজনীতিতে রয়ে গেছে এর দীর্ঘ ছায়া। আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধ, ‘ওয়ার অন টেরর’, নজরদারি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিস্তার, আল-কায়েদার পর আইএসের উত্থান— সব মিলিয়ে নাইন-ইলেভেন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস নয়, বদলে দিয়েছে আন্তর্জাতিক রাজনীতি আর বিশ্বব্যবস্থার গতিপথও।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সকাল। যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে ছিনতাই করা চারটি যাত্রীবাহী বিমান। নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দুটি টাওয়ারে আঘাত হানে দুটি বিমান। তৃতীয়টি আঘাত করে ওয়াশিংটনের পেন্টাগনে। চতুর্থ বিমানটি পেনসিলভানিয়ার একটি মাঠে বিধ্বস্ত হয়— যাত্রীদের প্রতিরোধের পর।
আল-কায়েদার ১৯ ছিনতাইকারীসহ ওই হামলায় নিহত হন দুই হাজার ৯৭৭ জন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র বুঝে যায়, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী হামলা নয়; দেশটির নিরাপত্তা ও বৈদেশিক নীতির সামনে নতুন এক যুগের সূচনা হয়েছে। নাইন-ইলেভেন কমিশনের তদন্তে হামলার পরিকল্পনা, গোয়েন্দা ব্যর্থতা ও আল-কায়েদার উত্থানের বিস্তারিত চিত্র উঠে আসে।
২৫ বছর পর সেই প্রশ্নই আবার সামনে— নাইন-ইলেভেনের পর যে বিশ্ব তৈরি হয়েছিল, তা কি এখনো টিকে আছে?

হামলার মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর, ২০০১ সালের অক্টোবরে আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। লক্ষ্য ছিল আল-কায়েদাকে ধ্বংস করা এবং সংগঠনটির নেতা ওসামা বিন লাদেনকে আশ্রয় দেওয়া তালেবান সরকারকে উৎখাত করা।
তালেবান সরকার দ্রুত ক্ষমতা হারালেও যুদ্ধ শেষ হয়নি। বরং শুরু হয় দীর্ঘ বিদ্রোহ, পালটা সামরিক অভিযান ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের চেষ্টা। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ন্যাটো বাহিনী দুই দশক আফগানিস্তানে অবস্থান করে। ২০২১ সালের আগস্টে তালেবান আবার কাবুল দখল করলে শেষ হয় যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘতম যুদ্ধের অধ্যায়।
কিন্তু ২০ বছর পরও প্রশ্ন থেকে যায়— এই যুদ্ধে আসলে কী অর্জিত হলো?
ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ওয়াটসন ইনস্টিটিউটের ‘কস্ট অব ওয়ার’ প্রকল্পের হিসাবে, ২০০১ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত যুদ্ধ ও সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা কর্মকাণ্ডে ২০২১ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় আট ট্রিলিয়ন ডলারে। এর মধ্যে আফগানিস্তান-পাকিস্তান যুদ্ধাঞ্চলের ব্যয়ই ছিল প্রায় ২.৩ ট্রিলিয়ন ডলার। প্রকল্পটির হিসাবে এসব যুদ্ধে সরাসরি সহিংসতায় নিহত মানুষের সংখ্যা ৯ লাখের বেশি।
আর যুদ্ধ শেষ হলেও খরচ শেষ হয়নি। ব্রাউনের হিসাবে, আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধে অংশ নেওয়া মার্কিন সেনা ও ভেটেরানদের চিকিৎসা ও অন্যান্য সুবিধার দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় ২০৫০ সাল পর্যন্ত ২ দশমিক ২ থেকে ২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার হতে পারে।

৯/১১ হামলার সঙ্গে ইরাকের সরাসরি সম্পর্ক প্রমাণিত না হলেও ২০০৩ সালে ইরাকে হামলার পেছনে সাদ্দাম হোসেনের হাতে গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার অভিযোগ বড় যুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু পরে সেই অস্ত্রের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০০৩ সালের যুদ্ধের পক্ষে ব্যবহৃত তিনটি প্রধান যুক্তি— ইরাকের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকা, নতুন অস্ত্র তৈরির চেষ্টা এবং জাতিসংঘের নিরস্ত্রীকরণ বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন— শেষ পর্যন্ত যার কোনোটাই সত্য প্রমাণিত হয়নি। যুক্তরাজ্যের চিলকোট ইনকোয়ারিও ইরাক যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ও যুদ্ধ-পরবর্তী পরিকল্পনার ওপর গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
ইরাক যুদ্ধের পরিণতিও ছিল সুদূরপ্রসারী। সাদ্দাম সরকারের পতন ঘটলেও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দুর্বলতা, সাম্প্রদায়িক সংঘাত ও বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে ইরাক পরিণত হয় জঙ্গিবাদের নতুন ক্ষেত্র হিসেবে। সেখান থেকেই পরবর্তী দশকে জন্ম নেয় আরও ভয়ংকর এক সংগঠন— ইসলামিক স্টেট (আইএস)।

৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্র আল-কায়েদার কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান চালায়। ২০১১ সালে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে মার্কিন অভিযানে নিহত হন ওসামা বিন লাদেন। কিন্তু একজন নেতাকে হত্যা করেই তার আদর্শ বা নেটওয়ার্ক শেষ করা সম্ভব হয়নি।
ইরাক যুদ্ধের অস্থিরতা ও সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সুযোগ নিয়ে আল-কায়েদার ইরাক শাখা থেকে বিকশিত হয় আইএস। ২০১৪ সালে সংগঠনটি ইরাক ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে ‘খিলাফত’ ঘোষণা করে।
পরে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের সামরিক অভিযানে আইএস তার দখল করা প্রায় সব ভূখণ্ড হারায়। কিন্তু সংগঠনটি পুরোপুরি বিলীন হয়নি; বরং আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় বিভিন্ন শাখা ও সহযোগী সংগঠনের মাধ্যমে সক্রিয় থাকে।
২০২৫ সালের গ্লোবাল টেরোরিজম ইনডেক্স বলছে, সন্ত্রাসবাদের কেন্দ্র ক্রমেই পশ্চিমা বিশ্বের বাইরে সরে গেছে। বিশেষ করে সাহেল অঞ্চল, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য এখন বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদের বড় কেন্দ্র। একই সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোতে একক হামলাকারী বা ‘লোক অ্যাক্টরে’র ঝুঁকিও বেড়েছে।
অর্থাৎ ৯/১১-এর মতো একটি কেন্দ্রীয় সংগঠনের সুপরিকল্পিত হামলার মডেল থেকে সন্ত্রাসবাদ অনেক বেশি বিকেন্দ্রীভূত, অনলাইননির্ভর ও স্থানীয় সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত রূপ নিয়েছে।

৯/১১-এর প্রভাব থেকে রক্ষা পায়নি যুক্তরাষ্ট্রও। ওই হামলার পর দেশটির পররাষ্ট্রনীতিই কেবল বদলায়নি, বদলে দিয়েছে দেশটির ভেতরের রাষ্ট্রীয় কাঠামোও। ২০০২ সালে গঠিত হয় ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি। বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থায় আসে আমূল পরিবর্তন। গড়ে ওঠে ট্রান্সপোর্টেশন সিকিউরিটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (টিএসএ)। ককপিট নিরাপত্তা, যাত্রী ও লাগেজ তল্লাশি, বিমানবন্দরে প্রবেশাধিকার— সবকিছুই আগের তুলনায় অনেক কঠোর হয়।
২৫ বছর পরও সেই পরিবর্তনের ছাপ স্পষ্ট। এমনকি ২০২৬ সালে টিএসএ পরীক্ষামূলকভাবে কিছু অনুমোদিত যাত্রীকে টিকিট ছাড়াই বিমানবন্দরের গেট এলাকায় প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে— ৯/১১-এর পর যে প্রবেশাধিকার প্রায় সর্বত্র বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তার একটি সীমিত প্রত্যাবর্তন হিসেবে বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে।
একই সময়ে নজরদারি ক্ষমতা বাড়ানো হয়। ৯/১১-এর পর পাস হয় ইউএসএ প্যাট্রিয়ট অ্যাক্ট, যার মাধ্যমে সন্ত্রাসবিরোধী তদন্তে সরকারের নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহের ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়।
এ নিয়ে শুরু হয় আরেক বিতর্ক— নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্র কতটা ক্ষমতা পাবে, আর ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সীমা কোথায়? ৯/১১-এর পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিতর্কগুলোরও একটি হয়ে ওঠে এই ‘নিরাপত্তা বনাম নাগরিক স্বাধীনতা’ প্রশ্ন।

৯/১১-এর পর আল-কায়েদার মতো জঙ্গিগোষ্ঠী ও ইসলামকে এক করে দেখার প্রবণতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্য, নজরদারি, বিমানবন্দরে অতিরিক্ত তল্লাশি এবং ‘ইসলামোফোবিয়া’— এসব শব্দ আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন গুরুত্ব পায়।
একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ে। আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে ড্রোন হামলা, ইরাক যুদ্ধ, পরে সিরিয়া ও অন্যান্য দেশে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান— সবকিছু মিলিয়ে ‘ওয়ার অন টেরর’ একটি নির্দিষ্ট যুদ্ধের বদলে হয়ে ওঠে দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক নিরাপত্তা অভিযান।
ব্রাউন ইউনিভার্সিটির বর্তমান ‘কস্ট অব ওয়ার’ সংকলন অনুযায়ী, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন, সোমালিয়া, লিবিয়া ও অন্যান্য যুদ্ধক্ষেত্রে ৯/১১-পরবর্তী সংঘাতের কারণে সরাসরি সহিংসতায় অন্তত ৯ লাখ ৪০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। যুদ্ধের কারণে স্বাস্থ্যব্যবস্থা, অর্থনীতি, খাদ্য ও অবকাঠামো ধ্বংসের মতো পরোক্ষ মৃত্যু হিসাবে ধরলে এর পরিমাণ আরও বেশি। গবেষণাটির হিসাব, এসব যুদ্ধের কারণে প্রায় তিন কোটি ৮০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

৯/১১-এর পর প্রথম দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা উদ্বেগ ছিল বিদেশি জঙ্গি সংগঠন— আল-কায়েদা, আইএস বা তাদের সহযোগী গোষ্ঠী। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে আমেরিকানদের উদ্বেগের চিত্র বদলে গেছে।
রয়টার্স/ইপসস গত ২৮ থেকে ৩১ আগস্ট একটি জরিপ পরিচালনা করে। ওই জরিপ অনুযায়ী, ৯/১১-এর ২৫ বছর পর বিদেশি সন্ত্রাসবাদের চেয়ে দেশীয় উগ্রবাদ নিয়ে আমেরিকানদের উদ্বেগ বেশি। ৩৩ শতাংশ উত্তরদাতা দেশীয় সন্ত্রাসবাদকে নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় হুমকি বলেছেন, যেখানে বিদেশি সন্ত্রাসবাদকে বলেছেন ২০ শতাংশ। আরও ৬১ শতাংশ বলেছেন, বিদেশি উগ্রবাদীদের তুলনায় আদর্শগতভাবে প্ররোচিত দেশীয় উগ্রবাদীদের হামলা এখন বড় হুমকি।
অর্থাৎ ২০০১ সালে যে প্রশ্ন ছিল ‘বিদেশ থেকে আসা সন্ত্রাসবাদী হামলা থেকে আমেরিকাকে কীভাবে রক্ষা করা হবে?’, ২৫ বছর পর বদলে হয়েছে— ‘নিজের সমাজের ভেতর থেকে সহিংস উগ্রবাদ কীভাবে ঠেকানো হবে?’

৯/১১-এর সময় ইন্টারনেট ছিল, কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল না। আজকের জঙ্গিবাদ সেই বাস্তবতায় নেই। সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো এখন প্রচার, নিয়োগ, অর্থ সংগ্রহ, মতাদর্শ ছড়ানো এবং হামলার নির্দেশনার জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে পারে। সংগঠিত বড় হামলার পাশাপাশি একক হামলাকারী বা ছোট সেলের ওপর গুরুত্ব বেড়েছে।
২০২৫ সালের গ্লোবাল টেরোরিজম ইনডেক্স দেখিয়েছে, সন্ত্রাসবাদ এখন ক্রমেই স্থানীয় সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। আর ইউরোপীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা ২০২৬ সালে অনলাইনভিত্তিক নতুন ধরনের সহিংস উগ্রবাদ নিয়ে সতর্ক করছেন— যেখানে রাজনৈতিক বা ধর্মীয় মতাদর্শের চেয়ে সহিংসতার প্রতি আকর্ষণ, অনলাইন পরিচিতি ও ‘ভাইরাল’ হওয়ার প্রবণতা বড় ভূমিকা রাখছে।
এই পরিবর্তন ৯/১১-এর উত্তরাধিকার বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সন্ত্রাসবাদকে শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে নির্মূল করার ধারণা ২৫ বছরে বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
তাহলে কি ‘ওয়ার অন টেরর’ ব্যর্থ? এক কথায় এর উত্তর দেওয়া কঠিন। কারণ একদিকে ৯/১১-এর মতো মাত্রার আর কোনো হামলা যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে হয়নি, আল-কায়েদার কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ভেঙে দেওয়া হয়েছে, বিন লাদেন নিহত হয়েছেন এবং আইএস তার ভূখণ্ড হারিয়েছে। বিমানবন্দর নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সমন্বয়েও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।
অন্যদিকে যে যুদ্ধগুলো সন্ত্রাসবাদ নির্মূলের লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয়েছিল, সেগুলোর মানবিক ও আর্থিক মূল্য ছিল বিপুল। আফগানিস্তানে দুই দশক পর তালেবান আবার ক্ষমতায় ফিরে এসেছে। ইরাক যুদ্ধের পরিণতিতে তৈরি অস্থিরতা-পরবর্তী সময়ে আইএসের উত্থানের পথ তৈরি করেছে। আর সন্ত্রাসবাদ পৃথিবী থেকে বিলীন হওয়ার বদলে নতুন অঞ্চল, নতুন প্রযুক্তি ও নতুন কৌশলে ছড়িয়ে পড়েছে।
ব্রাউন ইউনিভার্সিটির গবেষণাও দেখিয়েছে, ৯/১১-পরবর্তী যুদ্ধগুলোর ব্যয় শুধু সামরিক বাজেটে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ঋণের সুদ, ক্ষতিগ্রস্তদের চিকিৎসা, বাস্তুচ্যুতি, অবকাঠামো ধ্বংস ও দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ক্ষতির হিসাব ধরলে এর প্রভাব বহু প্রজন্ম পর্যন্ত থাকবে।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলা ছিল প্রায় তিন হাজার মানুষের প্রাণহানির এক ভয়াবহ ঘটনা। কিন্তু তার রাজনৈতিক অভিঘাত সেই দিনের চেয়ে অনেক বড় হয়ে উঠেছে। ৯/১১ যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘ যুদ্ধের পথে ঠেলে দিয়েছে। সেই যুদ্ধ বদলে দিয়েছে আফগানিস্তান ও ইরাককে, মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে প্রভাব ফেলেছে, নতুন জঙ্গিগোষ্ঠীর জন্ম দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও নজরদারি কাঠামো পালটেছে এবং বিশ্ব জুড়ে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছে।
আজকের বিশ্ব অবশ্য আর ২০০১ সালের বিশ্ব নয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন শুধু সন্ত্রাসবাদকে ঘিরে নয়; চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতা, ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, সাইবার যুদ্ধ ও নতুন প্রযুক্তিও নিরাপত্তার কেন্দ্রে এসেছে।
কিন্তু ৯/১১-এর ছায়া পুরোপুরি সরে যায়নি। ২০২৬ সালের ২৫তম বার্ষিকীতে রয়টার্সের এক বিশ্লেষণে সতর্ক করা হয়েছে, সন্ত্রাসবিরোধী অবকাঠামো ও মনোযোগ কমে গেলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও আত্মতুষ্টির ঝুঁকিতে পড়তে পারে। অর্থাৎ ৯/১১-এর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো শুধু কীভাবে একটি হামলা ঠেকাতে হবে তা নয়— একটি হুমকি কমে গেলে তার জায়গায় নতুন হুমকি তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিও বুঝতে হবে।
২৫ বছর পর তাই ৯/১১ শুধু অতীতের একটি দিন নয়। এটি একটি প্রশ্ন— সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে বিশ্ব কতটা বদলেছে, সেই বদলের মূল্য কত, আর সেই যুদ্ধ থেকে আগামী বিশ্বের জন্য আসল শিক্ষা কী?
সূত্র: রয়টার্স, এএফপি, বিবিসি, সিএনএন, আল-জাজিরা

রয়টার্সের খবরে বলা হয়, বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে মক্কা চুক্তির আওতায় পাকিস্তান কীভাবে নিজেদের দায়িত্ব পালন করবে— এমন প্রশ্নের জবাবে সাজ্জাদ হায়দার বলেন, ‘এ মুহূর্তে এমন কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে না। সময় এলে আমরা চুক্তির আওতায় পদক্ষেপ নেব।’
১৮ ঘণ্টা আগে
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, ইয়েমেন সরকারের চারটি সামরিক সূত্র জানিয়েছে, মোখা দখলের মধ্য দিয়ে লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তের বাব এল-মান্দেব প্রণালির ওপর হুতিদের প্রভাব আরও বেড়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হিসেবে পরিচিত এই প্রণালির কৌশলগত হানিশ দ্বীপপুঞ্জেও হুতিরা হামলা চালাচ্ছে।
১৯ ঘণ্টা আগে
ট্রাম্পের পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নযোগ্য কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে যখন পণ্যের দাম বাড়ছে, যার পেছনে ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের সঙ্গে শুরু করা যুদ্ধের প্রভাব রয়েছে। ইরান এর পালটা পদক্ষেপ হিসেবে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি ও মিত্রদের লক্ষ্য করে হামলা
২০ ঘণ্টা আগে
ছয় মাস ধরে চলা এই যুদ্ধে গত দুই দিনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান নৌযানকে লক্ষ্য করে সবচেয়ে বড় পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি স্থাপনায় আবারও হামলার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প।
১ দিন আগে