মার্কিন ইতিহাসের ভয়াবহতম সেই হামলার দিন ও তারপর কী ঘটেছিল

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
গোটা বিশ্বব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল নাইন-ইলেভেনখ্যাত এই হামলা। ছবি: সংগৃহীত

২৫ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে চারটি যাত্রীবাহী জেট বিমান ছিনতাই করে সেগুলো দিয়ে আঘাত হানা হয় নিউইয়র্কের দুটি আকাশচুম্বী ভবনে, যে ঘটনায় নিহত হয় কয়েক হাজার মানুষ। এ হামলা ছিল শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ একটি হামলা। শুধু আমেরিকানদের জন্যই নয়, গোটা বিশ্ব চমকে গিয়েছিল ঘটনার ভয়াবহতায়।

দিনটি ছিল ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার। ছিনতাইকারীরা ছোট ছোট দলে পূর্ব আমেরিকার আকাশপথ দিয়ে ওড়া চারটি বিমান একইসঙ্গে ছিনতাই করে। তারা বিমানগুলোকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে নিউইয়র্ক আর ওয়াশিংটনের গুরুত্বপূর্ণ ভবনে আঘাত হানার জন্য।

সে দিন দুটি বিমান বিধ্বস্ত করা হয় নিউইয়র্কে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ার ভবনে। প্রথম বিমানটি আঘাত হানে নর্থ টাওয়ারে আমেরিকার পূর্বাঞ্চলীয় সময় সকাল ৮টা ৪৬ মিনিটে। দ্বিতীয় বিমানটি সাউথ টাওয়ারে বিধ্বস্ত করা হয় ১৭ মিনিট পরে— সকাল ৯টা ৩ মিনিটে।

দুটি ভবনেই আগুন ধরে যায়। ভবন দুটির ওপরতলায় মানুষজন আটকা পড়ে যায়। শহরের আকাশে ছড়িয়ে পড়ে ধোঁয়ার কুণ্ডলী। দুটি টাওয়ার ভবনই ছিল ১১০ তলা। মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে দুটি ভবনই বিশাল ধুলার ঝড় তুলে মাটিতে ভেঙে গুঁড়িয়ে পড়ে।

তৃতীয় বিমানটি পেন্টাগনের সদর দপ্তরের পশ্চিম অংশে আঘাত হানে স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ৩৭ মিনিটে। রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসির উপকণ্ঠে ছিল আমেরিকান প্রতিরক্ষা বিভাগের বিশাল এই সদর দপ্তর পেন্টাগন ভবন।

এরপর সকাল ১০টা ৩ মিনিটে চতুর্থ বিমানটি আছড়ে পড়ে পেনসিলভ্যানিয়ার এক মাঠে। ছিনতাই হওয়া চতুর্থ বিমানের যাত্রীরা ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর পর সেটি বিধ্বস্ত হয়। ধারণা করা হয়, ছিনতাইকারীরা চতুর্থ বিমানটি দিয়ে ওয়াশিংটন ডিসিতে ক্যাপিটল ভবনের ওপর আঘাত হানতে চেয়েছিল।

কত মানুষ মারা গিয়েছিল?

এসব হামলায় সব মিলিয়ে মারা গিয়েছিল দুই হাজার ৯৭৭ জন। এই হিসাবের মধ্যে ১৯ জন ছিনতাইকারী অন্তর্ভুক্ত নেই। নিহতদের বেশিরভাগই ছিল নিউইয়র্কের লোক।

  • চারটি বিমানের ২৪৬ জন যাত্রী ও ক্রুর প্রত্যেকে মারা যান
  • টুইন টাওয়ারের দুটি ভবনে তাৎক্ষণিক ও হামলার আঘাতে পরে মারা যান দুই হাজার ৬০৬ জন
  • পেন্টাগনের হামলায় প্রাণ হারান ১২৫ জন
  • সবচেয়ে কম বয়সী নিহতের বয়স ছিল দুই বছর। নাম ক্রিস্টিন লি হ্যানসন। মা-বাবার সঙ্গে সে একটি বিমানের যাত্রী ছিল।
  • নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বয়সী ছিলেন ৮২ বছর বয়সী রবার্ট নর্টন। তিনি ছিলেন অন্য আরেকটি বিমানে, স্ত্রী জ্যাকুলিনের সঙ্গে তিনি একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন।

প্রথম বিমানটি যখন ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে আঘাত করে, তখন ভেতরে আনুমানিক ১৭ হাজার ৪০০ জন লোক ছিল। নর্থ টাওয়ারের যে অংশে বিমান আঘাত করে, তার ওপরের কোনো তলার মানুষই প্রাণে বাঁচেনি। তবে সাউথ টাওয়ারে যেখানে বিমান আঘাত করে, তার ওপরের অংশ থেকে ১৮ জন প্রাণ নিয়ে বের হতে পেরেছিল।

হতাহতের মধ্যে ৭৭টি ভিন্ন ভিন্ন দেশের মানুষ ছিলেন। নিউইয়র্ক শহরে যারা প্রথম ঘটনাস্থলে জরুরি অবস্থা মোকাবিলায় দৌড়ে যান, তাদের মধ্যে মারা যান ৪৪১ জন।

হাজার হাজার মানুষ আহত হন, যারা পরে নানাধরনের অসুস্থতার শিকার হন। যেমন— ফায়ার সার্ভিসের অনেক কর্মী বিষাক্ত বর্জ্যের মধ্যে কাজ করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন।

নাইন-ইলেভেন হামলার মূল হোতা আল-কায়েদার প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন লাদেন। ছবি: সংগৃহীত
নাইন-ইলেভেন হামলার মূল হোতা আল-কায়েদার প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন লাদেন। ছবি: সংগৃহীত

কারা ছিল হামলাকারী?

উগ্র মতাদর্শের ইসলামপন্থি সংগঠন আল-কায়দা আফগানিস্তান থেকে এই হামলার পরিকল্পনা করেছিল। ওসামা বিন লাদেনের নেতৃত্বাধীন এই গোষ্ঠী মুসলিম বিশ্বে সংঘাত তৈরির জন্য দায়ী করেছিল আমেরিকা ও তার মিত্র দেশগুলোকে।

ছিনতাইকারী ছিলেন মোট ১৯ জন। এদের মধ্যে তিনটি দলে ছিল পাঁচজন করে, যারা বিমান হামলা চালান টুইন টাওয়ার ও পেন্টাগনে। আর যে বিমানটি পেনসিলভেনিয়ায় ভেঙে পড়ে, তাতে ছিনতাইকারী দলে ছিলেন চারজন।

প্রত্যেক দলে একজন ছিনতাইকারীর বিমানচালকের প্রশিক্ষণ ছিল। এই ছিনতাইকারীরা তাদের পাইলটের ট্রেনিং নেন খোদ আমেরিকার ফ্লাইং স্কুলে। ছিনতাইকারীদের মধ্যে ১৫ জন ছিলেন ওসামা বিন লাদেনের মতো সৌদি আরবে নাগরিক। বাকি চারজনের মধ্যে দুজন সংযুক্ত আরব আমিরাত, একজন মিশরের ও একজন লেবাননের নাগরিক ছিলেন।

মার্কিন ইতিহাসের ভয়াবহতম হামলায় বিধ্বস্ত ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ার। ছবি: সংগৃহীত
মার্কিন ইতিহাসের ভয়াবহতম হামলায় বিধ্বস্ত ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ার। ছবি: সংগৃহীত

আমেরিকার প্রতিক্রিয়া কী ছিল?

ওই হামলার এক মাসেরও কম সময় পর আল-কায়দাকে নিশ্চিহ্ন করতে এবং ওসামা বিন লাদেনকে খুঁজে বের করতে আফগানিস্তান আক্রমণ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিউ বুশ। আমেরিকার নেতৃত্বাধীন এই অভিযানে যোগ দেয় আন্তর্জাতিক মিত্র জোট।

যুদ্ধ শুরুর কয়েক বছর পর ২০১১ সালে মার্কিন সৈন্যরা অবশেষে ওসামা বিন লাদেনকে খুঁজে পায় প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানে এবং তাকে হত্যা করে।

নাইন-ইলেভেন হামলায় অভিযুক্ত পরিকল্পনাকারী খালিদ শেখ মোহাম্মদকে গ্রেপ্তার করা হয় পাকিস্তানে, হামলার দুই বছর পর ২০০৩ সালে। এরপর থেকে তাকে গুয়ানতানামো বের বন্দিশিবিরে আমেরিকার তত্ত্বাবধানে আটক করে রাখা হয়। এখনো তিনি বিচারের অপেক্ষায় আছেন।

আল-কায়দা এখনো আছে। আফ্রিকায় সাহারা মরুভূমির দক্ষিণের দেশগুলোতে আল-কায়দা সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী। তবে আফগানিস্তানের ভেতরেও এখন আল-কায়দার সদস্য রয়েছে।

আমেরিকার অভিযান শুরুর পর আমেরিকান সৈন্যদের আফগানিস্তান ছেড়ে যেতে সময় লেগেছে প্রায় ২০ বছর পর।

হামলার পরদিনও ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ছিল গোটা এলাকা। ছবি: সংগৃহীত
হামলার পরদিনও ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ছিল গোটা এলাকা। ছবি: সংগৃহীত

নাইন-ইলেভনের পর যা হয়েছে

২৫ বছর আগের ১১ সেপ্টেম্বরের ওই হামলার ঘটনার পর থেকে সারা বিশ্বে বিমান ভ্রমণের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে বিমানবন্দর ও বিমানের ভেতর নিরাপত্তা আরও কঠোর করতে ট্রান্সপোর্টেশান সিকিউরিটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (টিএসএ) নামে পরিবহন নিরাপত্তা প্রশাসন গঠন করা হয়েছে।

নিউইয়র্কে হামলার স্থান, যেখানে টুইন টাওয়ার বিধ্বস্ত হয়েছিল, সেই ‘গ্রাউন্ড জিরো’র ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করতে সময় লেগেছিল আট মাসেরও বেশি।

ওই স্থানে এখন তৈরি হয়েছে একটি জাদুঘর ও একটি স্মৃতিসৌধ। ভবনগুলো আবার নির্মিত হয়েছে, তবে ভিন্ন নকশায়। সেখানে কেন্দ্রে রয়েছে ওয়ান ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার বা ‘ফ্রিডম টাওয়ার’, যা উচ্চতায় আগের নর্থ টাওয়ারের চেয়েও বেশি। নর্থ টাওয়ারের উচ্চতা ছিল ১ হাজার ৩৬৮ ফুট, আর নতুন ফ্রিডম টাওয়ার ১ হাজার ৭৭৬ ফুট উঁচু।

হামলায় বিধ্বস্ত পেন্টাগন পুনর্নিমাণে সময় লেগেছিল এক বছরের কিছু কম। ২০০২ সালের অগাস্টের মধ্যে পেন্টাগনের কর্মচারীরা আবার তাদের কর্মস্থলে ফিরে যান।

সূত্র: বিবিসি, এএফপি, রয়টার্স

Ad
Ad
ad
ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

হুতিদের ‘দখলে’ ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর, হুমকিতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, ইয়েমেন সরকারের চারটি সামরিক সূত্র জানিয়েছে, মোখা দখলের মধ্য দিয়ে লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তের বাব এল-মান্দেব প্রণালির ওপর হুতিদের প্রভাব আরও বেড়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হিসেবে পরিচিত এই প্রণালির কৌশলগত হানিশ দ্বীপপুঞ্জেও হুতিরা হামলা চালাচ্ছে।

১৭ ঘণ্টা আগে

নির্বাচনে রিপাবলিকানরা জিতলে প্রত্যেক নাগরিককে ৫ হাজার ডলার দেবেন ট্রাম্প

ট্রাম্পের পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নযোগ্য কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে যখন পণ্যের দাম বাড়ছে, যার পেছনে ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের সঙ্গে শুরু করা যুদ্ধের প্রভাব রয়েছে। ইরান এর পালটা পদক্ষেপ হিসেবে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি ও মিত্রদের লক্ষ্য করে হামলা

১৮ ঘণ্টা আগে

যুদ্ধে টিকতে না পেরে মার্কিন নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে মরিয়া ইরান: ট্রাম্প

ছয় মাস ধরে চলা এই যুদ্ধে গত দুই দিনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান নৌযানকে লক্ষ্য করে সবচেয়ে বড় পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি স্থাপনায় আবারও হামলার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প।

১ দিন আগে

মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলা: একাধিক যুদ্ধবিমান ক্ষতিগ্রস্ত

আমেরিকান কর্মকর্তাদের মতে, লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালির কাছে ১০টি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলার জবাবে সম্প্রতি পাঁচটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার লক্ষ্য করে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এতে অন্তত এক নাবিক নিহত এবং একজন নিখোঁজ হন। এর পরই মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা জোরদার করে ইরান।

১ দিন আগে
Advertisement