
ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম

ইউক্রেন যুদ্ধে চীন নিজেদের ‘নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী’ দাবি করলেও রুশ সামরিক বাহিনীর কিছু সদস্যকে চীনের মাটিতে ‘গোপনে’ ড্রোন ও যুদ্ধকৌশলের প্রশিক্ষণ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পশ্চিমা গোয়েন্দারা দাবি করেছেন, গত বছরের শেষভাগে চীনের সশস্ত্র বাহিনী সে দেশের মাটিতে প্রায় ২০০ রুশ সেনাকে ‘গোপনে’ বিশেষ সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়েছে।
তিনটি ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য এবং গোপন নথির বরাত দিয়ে এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের শেষভাগে চীনে প্রশিক্ষণ নেওয়া রুশ সেনারা ইতোমধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিতে রণক্ষেত্রে ফিরেছে।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক আগ্রাসন শুরুর পর থেকে মস্কো ও বেইজিং বেশ কয়েকটি যৌথ সামরিক মহড়া পরিচালনা করলেও, চীন বরাবরই এই সংঘাতের বিষয়ে নিজেদের ‘নিরপেক্ষ’ দাবি করে আসছে এবং নিজেদের একটি ‘শান্তি মধ্যস্থতাকারী’ দেশ হিসেবে উপস্থাপন করছে।
তবে রয়টার্সের পর্যালোচনা করা রুশ ও চীনা ভাষার একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী, এই গোপন প্রশিক্ষণ সেশনগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল ড্রোন বা চালকবিহীন বিমানের ব্যবহারের ওপর। ২০২৫ সালের ২ জুলাই বেইজিংয়ে দুই দেশের ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল।
চুক্তি অনুযায়ী, বেইজিং এবং পূর্বাঞ্চলীয় শহর নানজিংসহ বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় প্রায় ২০০ রুশ সেনাকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা উল্লেখ ছিল। গোয়েন্দা সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, পরবর্তীতে তারা চীনে গিয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছে। চুক্তিতে আরও উল্লেখ ছিল যে, চীনের শত শত সেনাও রাশিয়ার সামরিক স্থাপনাগুলোতে প্রশিক্ষণ নেবে।
একজন পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, রাশিয়ার সামরিক বাহিনীকে কার্যকর এবং কৌশলগত স্তরে প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে ইউক্রেন যুদ্ধে চীন আগের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি সরাসরি জড়িয়ে পড়েছে। অবশ্য এই প্রতিবেদনের বিস্তারিত তথ্য নিয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে রাশিয়া ও চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় রয়টার্সকে কোনো সাড়া দেয়নি।
তবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রয়টার্সকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘ইউক্রেন সংকটের বিষয়ে চীন সবসময় একটি বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেছে এবং শান্তি আলোচনার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এটি একটি ধারাবাহিক ও স্পষ্ট অবস্থান, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় প্রত্যক্ষ করেছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর উচিত নয় ইচ্ছাকৃতভাবে সংঘাত উসকে দেওয়া বা অন্যের ওপর দোষ চাপানো।’
এসব সংবেদনশীল তথ্য নিয়ে আলোচনার স্বার্থে পরিচয় গোপন রাখার শর্তে রয়টার্সের সাথে কথা বলেছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। ইউরোপীয় শক্তিগুলো, যারা রাশিয়াকে তাদের প্রধান নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখে, তারা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার চীনের সাথে রাশিয়ার এই ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে গভীর উদ্বেগের সাথে পর্যবেক্ষণ করছে।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের মাত্র কয়েক দিন আগে দুই দেশ একটি ‘সীমাহীন’ কৌশলগত অংশীদারিত্বের ঘোষণা দিয়েছিল এবং তাদের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় সাধনের জন্য সামরিক মহড়া পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। পশ্চিমা বিশ্ব যখন রাশিয়াকে একঘরে করার চেষ্টা করছিল, তখন চীন রাশিয়ার তেল, গ্যাস এবং কয়লা কিনে দেশটির অর্থনীতির লাইফলাইন সচল রেখেছিল।
এমন এক সময়ে এই নথির তথ্য সামনে এল, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাই-প্রোফাইল চীন সফরের এক সপ্তাহের মাথায়, আজ বুধবার বেইজিংয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে আতিথেয়তা দিচ্ছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। পুতিনের এটি ২৫তম চীন সফর। পশ্চিমা দেশগুলো বেইজিংকে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে মস্কোর ওপর চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানালেও, চীন ও রাশিয়া এই সফরকে তাদের ‘অটল ও দৃঢ় সম্পর্কের’ আরও একটি বড় প্রমাণ হিসেবে দেখিয়েছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন ড্রোন যুদ্ধ
ইউক্রেনীয় রণক্ষেত্রে ড্রোন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রাণঘাতী অস্ত্র হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। উভয় পক্ষই শত শত মাইল দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে দূরপাল্লার ড্রোন ব্যবহার করছে। অন্যদিকে, যুদ্ধক্ষেত্রের একদম সম্মুখভাগে ফার্স্ট পার্সন ভিউ (এফপিভি) প্রযুক্তিসম্পন্ন ও বিস্ফোরকবাহী ছোট ছোট ড্রোন আকাশ নিয়ন্ত্রণ করছে, যা সাঁজোয়া যান বা পদাতিক বাহিনীর চলাচলকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
গত সেপ্টেম্বরে রয়টার্স ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের সূত্রে জানিয়েছিল যে, চীনের বেসরকারি কোম্পানির বিশেষজ্ঞরা রাশিয়ার একটি ড্রোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য সামরিক ড্রোনের প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কাজ করেছেন। চীন তখন সেই সহযোগিতার কথা অস্বীকার করেছিল। তবে গত মাসে ওই দুটি চীনা কোম্পানিকে নিষেধাজ্ঞা দেয় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।
রয়টার্সের হাতে আসা প্রশিক্ষণ চুক্তি অনুযায়ী, রুশ সেনাদের ড্রোন পরিচালনা, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার (ইলেকট্রনিক যুদ্ধপদ্ধতি), আর্মি এভিয়েশন এবং সাঁজোয়া পদাতিক বাহিনীর মতো বিষয়গুলোতে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা ছিল। এই চুক্তিতে দুই দেশের গণমাধ্যমে সফরের যেকোনো ধরনের কভারেজ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এবং বলা হয়েছিল কোনো তৃতীয় পক্ষকে এই বিষয়ে জানানো যাবে না।

দুইটি গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছে, অন্তত ২০২৪ সাল থেকে চীনা সেনারা প্রশিক্ষণের জন্য রাশিয়ায় যাতায়াত করলেও, রাশিয়ানদের চীনে গিয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়ার ঘটনা একেবারেই নতুন। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার ব্যাপক বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকলেও, চীনের বিশাল ড্রোন শিল্প তাদের উন্নত প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং ফ্লাইট সিমুলেটরের মতো আধুনিক প্রশিক্ষণ পদ্ধতির সুবিধা দিতে সক্ষম।
চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) গত কয়েক দশকে কোনো বড় যুদ্ধে অংশ না নিলেও, গত ২০ বছরে তাদের সামরিক সক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে তারা মার্কিন সামরিক শক্তির সমকক্ষ হয়ে উঠেছে।
পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জানিয়েছে, চীনে প্রশিক্ষণ নেওয়া রুশ কর্মকর্তা ও সেনাদের একটি বড় অংশই ছিলেন উচ্চপদস্থ সামরিক প্রশিক্ষক (ইনস্ট্রাক্টর), যারা ফিরে গিয়ে অন্য সেনাদের এই জ্ঞান বা প্রশিক্ষণ দিতে সক্ষম।
একটি গোয়েন্দা সংস্থা নিশ্চিত করেছে যে, তারা চীনে প্রশিক্ষণ নেওয়া কয়েকজন রুশ সেনা সদস্যের পরিচয় শনাক্ত করতে পেরেছে, যারা পরবর্তীতে ইউক্রেনের অধিকৃত ক্রিমিয়া এবং জাপোরিঝিয়া অঞ্চলে সরাসরি ড্রোন হামলায় অংশ নিয়েছে। ওই সেনাদের পদবি জুনিয়র সার্জেন্ট থেকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পর্যন্ত।
মর্টার ও ফ্লাইট সিমুলেটর
চীনে রুশ সেনাদের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হওয়ার পর প্রস্তুতকৃত রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ চারটি সামরিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করেছে রয়টার্স।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসের একটি প্রতিবেদনে চীনা শহর শিজিয়াজুয়াংয়ে পিএলএর গ্রাউন্ড ফোর্সেস আর্মি ইনফ্যান্ট্রি অ্যাকাডেমির শাখায় প্রায় ৫০ জন রুশ সেনার একটি সম্মিলিত যুদ্ধাস্ত্রের ওপর প্রশিক্ষণ কোর্সের বিবরণ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই কোর্সে লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করার জন্য ড্রোন বা আনম্যানড এরিয়াল ভেহিকল (ইউএভি) ব্যবহার করে ৮২ মিলিমিটার মর্টার ফায়ার করার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল।

দ্বিতীয় একটি প্রতিবেদনে একটি সামরিক স্থাপনায় বিমান প্রতিরক্ষা প্রশিক্ষণের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ছিল ধেয়ে আসা ড্রোন প্রতিহত করার জন্য ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার রাইফেল, নেট-থ্রোয়িং ডিভাইস (জাল ছুড়ে ড্রোন আটকানোর যন্ত্র) এবং নিজস্ব ড্রোনের ব্যবহার। কর্মকর্তারা জানান, এই স্থাপনাটি চীনা শহর ঝেংঝুতে অবস্থিত।
এই সব সরঞ্জামই ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার রাইফেলগুলো ড্রোন সিগন্যালে হস্তক্ষেপ করে তা অচল করে দেয়, আর নেট-থ্রোয়ার দিয়ে কাছাকাছি আসা ড্রোনকে জালের ভেতর আটকে ফেলা যায়। বর্তমানে উভয় পক্ষই ফাইবার-অপটিক ড্রোন ব্যবহার করছে যা তারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হয় এবং এগুলোকে ইলেকট্রনিকভাবে জ্যাম বা অচল করা যায় না। এগুলো সাধারণত ১০ থেকে ২০ কিলোমিটার, ক্ষেত্রবিশেষে ৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত কাজ করে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরের একজন রুশ মেজরের লেখা আরেকটি প্রতিবেদনে চীনা শহর ইবিনের পিএলএ ট্রেনিং সেন্টার ফর মিলিটারি এভিয়েশনের প্রথম ব্রিগেডে রুশ সেনাদের ড্রোন প্রশিক্ষণের কথা বলা হয়েছে। এই কোর্সটি মূলত মাল্টিমিডিয়া প্রেজেন্টেশন এবং ফ্লাইট সিমুলেটর ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে তৈরি ছিল, যেখানে বিভিন্ন ধরনের এফপিভি ড্রোন এবং আরও দুটি ভিন্ন মডেলের ড্রোন চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
চতুর্থ আরেক প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের নভেম্বরে পিএলএ ইনফ্যান্ট্রির ‘নানজিং ইউনিভার্সিটি অফ মিলিটারি ইঞ্জিনিয়ারিং’-এ অনুষ্ঠিত একটি কোর্সের বিবরণ দেওয়া হয়েছে। সেই প্রশিক্ষণে বিস্ফোরক প্রযুক্তি, মাইন স্থাপন, মাইন নিষ্ক্রিয়করণ এবং অবিস্ফোরিত ল্যান্ডমাইন ও ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) অপসারণের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এই প্রতিবেদনে চীনা সামরিক পোশাক পরিহিত ইনস্ট্রাক্টরদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন— এমন ইউনিফর্ম পরিহিত রুশ সেনাদের বেশ কিছু আলোকচিত্র সংযুক্ত ছিল। ছবিগুলোতে রুশ সেনাদের ইঞ্জিনিয়ারিং সরঞ্জাম এবং কীভাবে মাইন সুইপ বা মাইন শনাক্ত করতে হয় তা শেখাতে দেখা গেছে।
রাজনীতি/আইআর

ইউক্রেন যুদ্ধে চীন নিজেদের ‘নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী’ দাবি করলেও রুশ সামরিক বাহিনীর কিছু সদস্যকে চীনের মাটিতে ‘গোপনে’ ড্রোন ও যুদ্ধকৌশলের প্রশিক্ষণ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পশ্চিমা গোয়েন্দারা দাবি করেছেন, গত বছরের শেষভাগে চীনের সশস্ত্র বাহিনী সে দেশের মাটিতে প্রায় ২০০ রুশ সেনাকে ‘গোপনে’ বিশেষ সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়েছে।
তিনটি ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য এবং গোপন নথির বরাত দিয়ে এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের শেষভাগে চীনে প্রশিক্ষণ নেওয়া রুশ সেনারা ইতোমধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিতে রণক্ষেত্রে ফিরেছে।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক আগ্রাসন শুরুর পর থেকে মস্কো ও বেইজিং বেশ কয়েকটি যৌথ সামরিক মহড়া পরিচালনা করলেও, চীন বরাবরই এই সংঘাতের বিষয়ে নিজেদের ‘নিরপেক্ষ’ দাবি করে আসছে এবং নিজেদের একটি ‘শান্তি মধ্যস্থতাকারী’ দেশ হিসেবে উপস্থাপন করছে।
তবে রয়টার্সের পর্যালোচনা করা রুশ ও চীনা ভাষার একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী, এই গোপন প্রশিক্ষণ সেশনগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল ড্রোন বা চালকবিহীন বিমানের ব্যবহারের ওপর। ২০২৫ সালের ২ জুলাই বেইজিংয়ে দুই দেশের ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল।
চুক্তি অনুযায়ী, বেইজিং এবং পূর্বাঞ্চলীয় শহর নানজিংসহ বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় প্রায় ২০০ রুশ সেনাকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা উল্লেখ ছিল। গোয়েন্দা সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, পরবর্তীতে তারা চীনে গিয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছে। চুক্তিতে আরও উল্লেখ ছিল যে, চীনের শত শত সেনাও রাশিয়ার সামরিক স্থাপনাগুলোতে প্রশিক্ষণ নেবে।
একজন পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, রাশিয়ার সামরিক বাহিনীকে কার্যকর এবং কৌশলগত স্তরে প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে ইউক্রেন যুদ্ধে চীন আগের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি সরাসরি জড়িয়ে পড়েছে। অবশ্য এই প্রতিবেদনের বিস্তারিত তথ্য নিয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে রাশিয়া ও চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় রয়টার্সকে কোনো সাড়া দেয়নি।
তবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রয়টার্সকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘ইউক্রেন সংকটের বিষয়ে চীন সবসময় একটি বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেছে এবং শান্তি আলোচনার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এটি একটি ধারাবাহিক ও স্পষ্ট অবস্থান, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় প্রত্যক্ষ করেছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর উচিত নয় ইচ্ছাকৃতভাবে সংঘাত উসকে দেওয়া বা অন্যের ওপর দোষ চাপানো।’
এসব সংবেদনশীল তথ্য নিয়ে আলোচনার স্বার্থে পরিচয় গোপন রাখার শর্তে রয়টার্সের সাথে কথা বলেছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। ইউরোপীয় শক্তিগুলো, যারা রাশিয়াকে তাদের প্রধান নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখে, তারা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার চীনের সাথে রাশিয়ার এই ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে গভীর উদ্বেগের সাথে পর্যবেক্ষণ করছে।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের মাত্র কয়েক দিন আগে দুই দেশ একটি ‘সীমাহীন’ কৌশলগত অংশীদারিত্বের ঘোষণা দিয়েছিল এবং তাদের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় সাধনের জন্য সামরিক মহড়া পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। পশ্চিমা বিশ্ব যখন রাশিয়াকে একঘরে করার চেষ্টা করছিল, তখন চীন রাশিয়ার তেল, গ্যাস এবং কয়লা কিনে দেশটির অর্থনীতির লাইফলাইন সচল রেখেছিল।
এমন এক সময়ে এই নথির তথ্য সামনে এল, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাই-প্রোফাইল চীন সফরের এক সপ্তাহের মাথায়, আজ বুধবার বেইজিংয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে আতিথেয়তা দিচ্ছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। পুতিনের এটি ২৫তম চীন সফর। পশ্চিমা দেশগুলো বেইজিংকে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে মস্কোর ওপর চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানালেও, চীন ও রাশিয়া এই সফরকে তাদের ‘অটল ও দৃঢ় সম্পর্কের’ আরও একটি বড় প্রমাণ হিসেবে দেখিয়েছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন ড্রোন যুদ্ধ
ইউক্রেনীয় রণক্ষেত্রে ড্রোন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রাণঘাতী অস্ত্র হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। উভয় পক্ষই শত শত মাইল দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে দূরপাল্লার ড্রোন ব্যবহার করছে। অন্যদিকে, যুদ্ধক্ষেত্রের একদম সম্মুখভাগে ফার্স্ট পার্সন ভিউ (এফপিভি) প্রযুক্তিসম্পন্ন ও বিস্ফোরকবাহী ছোট ছোট ড্রোন আকাশ নিয়ন্ত্রণ করছে, যা সাঁজোয়া যান বা পদাতিক বাহিনীর চলাচলকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
গত সেপ্টেম্বরে রয়টার্স ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের সূত্রে জানিয়েছিল যে, চীনের বেসরকারি কোম্পানির বিশেষজ্ঞরা রাশিয়ার একটি ড্রোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য সামরিক ড্রোনের প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কাজ করেছেন। চীন তখন সেই সহযোগিতার কথা অস্বীকার করেছিল। তবে গত মাসে ওই দুটি চীনা কোম্পানিকে নিষেধাজ্ঞা দেয় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।
রয়টার্সের হাতে আসা প্রশিক্ষণ চুক্তি অনুযায়ী, রুশ সেনাদের ড্রোন পরিচালনা, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার (ইলেকট্রনিক যুদ্ধপদ্ধতি), আর্মি এভিয়েশন এবং সাঁজোয়া পদাতিক বাহিনীর মতো বিষয়গুলোতে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা ছিল। এই চুক্তিতে দুই দেশের গণমাধ্যমে সফরের যেকোনো ধরনের কভারেজ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এবং বলা হয়েছিল কোনো তৃতীয় পক্ষকে এই বিষয়ে জানানো যাবে না।

দুইটি গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছে, অন্তত ২০২৪ সাল থেকে চীনা সেনারা প্রশিক্ষণের জন্য রাশিয়ায় যাতায়াত করলেও, রাশিয়ানদের চীনে গিয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়ার ঘটনা একেবারেই নতুন। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার ব্যাপক বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকলেও, চীনের বিশাল ড্রোন শিল্প তাদের উন্নত প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং ফ্লাইট সিমুলেটরের মতো আধুনিক প্রশিক্ষণ পদ্ধতির সুবিধা দিতে সক্ষম।
চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) গত কয়েক দশকে কোনো বড় যুদ্ধে অংশ না নিলেও, গত ২০ বছরে তাদের সামরিক সক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে তারা মার্কিন সামরিক শক্তির সমকক্ষ হয়ে উঠেছে।
পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জানিয়েছে, চীনে প্রশিক্ষণ নেওয়া রুশ কর্মকর্তা ও সেনাদের একটি বড় অংশই ছিলেন উচ্চপদস্থ সামরিক প্রশিক্ষক (ইনস্ট্রাক্টর), যারা ফিরে গিয়ে অন্য সেনাদের এই জ্ঞান বা প্রশিক্ষণ দিতে সক্ষম।
একটি গোয়েন্দা সংস্থা নিশ্চিত করেছে যে, তারা চীনে প্রশিক্ষণ নেওয়া কয়েকজন রুশ সেনা সদস্যের পরিচয় শনাক্ত করতে পেরেছে, যারা পরবর্তীতে ইউক্রেনের অধিকৃত ক্রিমিয়া এবং জাপোরিঝিয়া অঞ্চলে সরাসরি ড্রোন হামলায় অংশ নিয়েছে। ওই সেনাদের পদবি জুনিয়র সার্জেন্ট থেকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পর্যন্ত।
মর্টার ও ফ্লাইট সিমুলেটর
চীনে রুশ সেনাদের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হওয়ার পর প্রস্তুতকৃত রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ চারটি সামরিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করেছে রয়টার্স।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসের একটি প্রতিবেদনে চীনা শহর শিজিয়াজুয়াংয়ে পিএলএর গ্রাউন্ড ফোর্সেস আর্মি ইনফ্যান্ট্রি অ্যাকাডেমির শাখায় প্রায় ৫০ জন রুশ সেনার একটি সম্মিলিত যুদ্ধাস্ত্রের ওপর প্রশিক্ষণ কোর্সের বিবরণ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই কোর্সে লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করার জন্য ড্রোন বা আনম্যানড এরিয়াল ভেহিকল (ইউএভি) ব্যবহার করে ৮২ মিলিমিটার মর্টার ফায়ার করার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল।

দ্বিতীয় একটি প্রতিবেদনে একটি সামরিক স্থাপনায় বিমান প্রতিরক্ষা প্রশিক্ষণের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ছিল ধেয়ে আসা ড্রোন প্রতিহত করার জন্য ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার রাইফেল, নেট-থ্রোয়িং ডিভাইস (জাল ছুড়ে ড্রোন আটকানোর যন্ত্র) এবং নিজস্ব ড্রোনের ব্যবহার। কর্মকর্তারা জানান, এই স্থাপনাটি চীনা শহর ঝেংঝুতে অবস্থিত।
এই সব সরঞ্জামই ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার রাইফেলগুলো ড্রোন সিগন্যালে হস্তক্ষেপ করে তা অচল করে দেয়, আর নেট-থ্রোয়ার দিয়ে কাছাকাছি আসা ড্রোনকে জালের ভেতর আটকে ফেলা যায়। বর্তমানে উভয় পক্ষই ফাইবার-অপটিক ড্রোন ব্যবহার করছে যা তারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হয় এবং এগুলোকে ইলেকট্রনিকভাবে জ্যাম বা অচল করা যায় না। এগুলো সাধারণত ১০ থেকে ২০ কিলোমিটার, ক্ষেত্রবিশেষে ৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত কাজ করে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরের একজন রুশ মেজরের লেখা আরেকটি প্রতিবেদনে চীনা শহর ইবিনের পিএলএ ট্রেনিং সেন্টার ফর মিলিটারি এভিয়েশনের প্রথম ব্রিগেডে রুশ সেনাদের ড্রোন প্রশিক্ষণের কথা বলা হয়েছে। এই কোর্সটি মূলত মাল্টিমিডিয়া প্রেজেন্টেশন এবং ফ্লাইট সিমুলেটর ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে তৈরি ছিল, যেখানে বিভিন্ন ধরনের এফপিভি ড্রোন এবং আরও দুটি ভিন্ন মডেলের ড্রোন চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
চতুর্থ আরেক প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের নভেম্বরে পিএলএ ইনফ্যান্ট্রির ‘নানজিং ইউনিভার্সিটি অফ মিলিটারি ইঞ্জিনিয়ারিং’-এ অনুষ্ঠিত একটি কোর্সের বিবরণ দেওয়া হয়েছে। সেই প্রশিক্ষণে বিস্ফোরক প্রযুক্তি, মাইন স্থাপন, মাইন নিষ্ক্রিয়করণ এবং অবিস্ফোরিত ল্যান্ডমাইন ও ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) অপসারণের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এই প্রতিবেদনে চীনা সামরিক পোশাক পরিহিত ইনস্ট্রাক্টরদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন— এমন ইউনিফর্ম পরিহিত রুশ সেনাদের বেশ কিছু আলোকচিত্র সংযুক্ত ছিল। ছবিগুলোতে রুশ সেনাদের ইঞ্জিনিয়ারিং সরঞ্জাম এবং কীভাবে মাইন সুইপ বা মাইন শনাক্ত করতে হয় তা শেখাতে দেখা গেছে।
রাজনীতি/আইআর

শুক্রবার ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনী জানিয়েছে, তারা কৌশলগত উপকূলীয় শহর মোকায় হুথি যোদ্ধাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। এর এক দিন আগে হুথিরা লোহিত সাগরের পুরো উপকূলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করেছিল।
১৮ ঘণ্টা আগে
সংগঠনটির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানান, সৌদি আরবের শারুরাহ সামরিক ঘাঁটিটি ছিল তাদের মূল লক্ষ্য। সেখানে থাকা প্রধান অস্ত্রের গুদাম এবং ‘কমান্ড ও কন্ট্রোল সেন্টার’ লক্ষ্য করে এই হামলা পরিচালিত হয়।
২০ ঘণ্টা আগে
ইরানের ক্ষেত্রে ঝুঁকিটা আরও বড়। কারণ এটি ইরাক বা আফগানিস্তানের মতো দুর্বল রাষ্ট্র নয়। প্রায় ৯ কোটি মানুষের দেশটির রয়েছে শক্তিশালী সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামো, বিশাল ভূখণ্ড, উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক এবং নিজস্ব জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক পরিচয়। ফলে তেহরানে সরকার পতন ঘটানো গেলেও
২১ ঘণ্টা আগে
ভারতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাবেক রাষ্ট্রদূত সুনজয় সুধীর রয়টার্সকে বলেন, যুদ্ধ শেষ করার চাবিকাঠি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হাতে। তার মতে, ভারত কঠিন আলোচনাগুলো চালু রাখার সুযোগ তৈরি করেছে, যাতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো একই টেবিলে বসতে পারে, কূটনৈতিকভাবে আলোচনা করতে পারে এবং যেসব বিষয়ে তাদের স্বার্থের মিল রয়েছ
১ দিন আগে