রাশিয়ার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা স্থগিত পুতিনের জন্য ‘পুরস্কার’: জেলেনস্কি

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
(বাঁ থেকে) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: সংগৃহীত
(বাঁ থেকে) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: সংগৃহীত

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাশিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের উদ্যোগ স্থগিত করার সিদ্ধান্তকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য ‘পুরস্কার’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তার আশঙ্কা, এই সিদ্ধান্ত পুতিনকে আরও উৎসাহিত করবে এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ আরও তীব্র হবে।

জেলেনস্কি আরও বলেছেন, ভবিষ্যতে রাশিয়ার ওপর থেকে আরও নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে পারে ট্রাম্প প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্র যখন মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন ও ব্যবসায়িক চুক্তির চেষ্টা করছে, তখন ইউরোপকে রাশিয়ার সঙ্গে নিজস্ব আলোচনার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, এমন পরিস্থিতির মধ্যেই শীত আসার আগে ইউক্রেনের শহরগুলোকে বিদ্যুৎহীন করে দেওয়ার লক্ষ্যে দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে অন্যতম ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে রাশিয়া।

এদিকে শনিবার জেলেনস্কি বলেন, “দুর্ভাগ্যজনকভাবে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া অব্যাহত থাকবে। আমার বিশ্বাস, ‘ডিজেল চুক্তি’ এর প্রথম পদক্ষেপ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমার মনে হচ্ছে, এতে পুতিন থামবেন না; বরং এমন সমর্থন পেয়ে তিনি আনন্দিত ও খুশি হবেন।”

এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় জেলেনস্কি লেখেন, “যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার অকার্যকারিতা, আগ্রাসনকারীর ওপর চাপ কমানো এবং পুতিনকে আর্থিক সুবিধা দেওয়া—এসবই তাকে আরও হামলা চালাতে উৎসাহিত করছে। আমাদের একচুলও পিছু হটা চলবে না।”

তিনি আরও লেখেন, “যুদ্ধ বন্ধের চেষ্টা আমাদের চালিয়ে যেতে হবে। লক্ষ্য যুদ্ধ বন্ধ করা, পুতিনকে অনির্দিষ্টকাল যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সব কারণ জুগিয়ে দেওয়া নয়।”

রাশিয়ার সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর সর্বশেষ উদ্যোগ হিসেবে শুক্রবার নতুন নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজ স্থগিতের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। রুশ অর্থনীতিকে লক্ষ্য করে তৈরি ওই প্যাকেজটি কংগ্রেসের উভয় কক্ষে পাস হয়েছিল। তবে ট্রাম্প কংগ্রেসকে জানান, আইনটি কার্যকর করার প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা জাতীয় স্বার্থের জন্য প্রয়োজনীয়।

প্রয়াত সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের নামে নামকরণ করা ওই আইনে রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব ছিল। এর মধ্যে রাশিয়ার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ তেল আমদানি করে এমন দেশগুলোর ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের বিধানও ছিল। চীন ও ভারতের মতো দেশগুলো এর আওতায় পড়তে পারত। পাশাপাশি রাশিয়ার জ্বালানি খাত, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং তেল পরিবহনে ব্যবহৃত দেশটির ছায়া নৌবহরের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা ছিল।

শনিবার জেলেনস্কি বলেন, নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের সিদ্ধান্ত পুতিনকে ইউক্রেনে যুদ্ধ আরও তীব্র করতে উৎসাহিত করবে। তিনি মার্কিন আইনপ্রণেতাদের প্রতি বিলটি আবার কার্যকর করার উদ্যোগ নিতে সমর্থন জানানোর আহ্বান জানান।

এক বিবৃতিতে তিনি লেখেন, “রাশিয়া যখন আমাদের জ্বালানি অবকাঠামোয় এত বড় আকারের হামলা চালাল, তখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমেরিকায় লিন্ডসে গ্রাহাম আইনটি পুরোপুরি উপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। অথচ যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়ার ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টির কথা ছিল এই আইনের মাধ্যমে। এই আইন অনেক সহায়তা করতে পারত— এখনো পারে! তবে আইনটিকে বাস্তবে কার্যকর হতে হবে, আর এর পক্ষে প্রতিটি কণ্ঠস্বরই গুরুত্বপূর্ণ।”

এদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, “গ্রাহাম আইন স্থগিত করার ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সত্যিকার অর্থেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত।”

আইনটি কার্যকর হওয়ার কথা ছিল দুই দিনের মধ্যে। এর আওতায় রাশিয়ার কর্মকর্তা, ব্যাংক এবং দেশটির জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখতে ব্যবহৃত ছায়া নৌবহরের ট্যাংকারগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিধান ছিল।

এ ছাড়া রাশিয়ার তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাসের শীর্ষ পাঁচ আমদানিকারক দেশের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ক্ষমতা ট্রাম্পকে দেওয়ার কথা ছিল। তবে যেসব দেশ রাশিয়ার মোট প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানির ১৫ শতাংশের কম আমদানি করে এবং সেই আমদানি কমাতে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ছাড় রাখার বিধান ছিল।

এদিকে ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর ব্যবহৃত সামরিক কাজে উপযোগী স্টারলিংক টার্মিনালগুলোর কার্যকারিতা এখনো সীমিত বলে জানিয়েছেন জেলেনস্কি। ঘণ্টায় ১৬১ কিলোমিটারের বেশি গতিতে চললে এসব টার্মিনাল নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। এতে ড্রোন পরিচালনায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে।

মঙ্গলবার কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই ইউক্রেনের ভেতরে স্টারলিংক সেবার কার্যকারিতা সীমিত করা হয়। জেলেনস্কি বলেন, তার সরকার তদন্ত করে দেখেছে, নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাধাগ্রস্ত করতেই ‘ইচ্ছাকৃতভাবে’ এই বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

ইউক্রেনীয়রা টার্মিনালগুলো যানবাহনে বসিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে নিয়ে পরীক্ষা করে দেখেন, সেখানে ঘণ্টায় ১৮০ কিলোমিটারের বেশি গতিতেও সেগুলো কাজ করছে। এর মধ্য দিয়ে কার্যত প্রমাণিত হয়, বিধিনিষেধটি শুধু ইউক্রেনের ভেতরেই কার্যকর।

জেলেনস্কি বলেন, “সিদ্ধান্তটি স্পষ্ট: বিধিনিষেধ ইউক্রেনের ভেতরে কার্যকর, কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে তা প্রযোজ্য নয়। অন্য কথায়, এটি একটি পরিকল্পিত অভিযান।”

রাশিয়ার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের ঘোষণার এক সপ্তাহ আগে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম কমানোর চেষ্টা হিসেবে ওয়াশিংটন রাশিয়া থেকে ডিজেল কেনার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। ট্রাম্পের এ ঘোষণায় ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধ বন্ধে মস্কোর ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর কয়েক বছরের চাপের নীতিতে পরিবর্তন আসে।

গত সপ্তাহে ট্রাম্প বলেছিলেন, রাশিয়া তাৎক্ষণিকভাবে তিন লাখ টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করবে। এরপর নভেম্বরে আরও পাঁচ লাখ টন এবং ‘এর অব্যবহিত পরেই’ ১০ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করা হবে। এর পর অল্প সময়ের মধ্যে আরও ৩০ লাখ টন ডিজেল পাঠানো হবে বলে তিনি লেখেন।

জেলেনস্কির সঙ্গে ট্রাম্পের তীব্র মতবিরোধের সর্বশেষ পরিণতি হিসেবে দেখা হচ্ছে নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের এ সিদ্ধান্তকে। চলতি সপ্তাহে একাধিকবার ইউক্রেনকে সম্ভাব্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগাম গোয়েন্দা তথ্য দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। এ ছাড়া হোয়াইট হাউজ পেন্টাগনকে ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর ব্যবহৃত সামরিক সংস্করণের স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবার কার্যকারিতা সীমিত করার নির্দেশ দিয়েছে বলেও খবর প্রকাশিত হয়েছে।

জেলেনস্কি বলেন, “আমরা আন্তরিকভাবে আশা করি— আর আমি ব্যক্তিগতভাবেও আশা করি— যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পুতিনকে হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে, আমাদের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা থামাতে এবং এই যুদ্ধের অবসান ঘটাতে সবকিছু করবেন। কিন্তু রাশিয়া আমাদের মানুষ হত্যা করলেও তার জবাবে ইউক্রেন কী করতে পারবে, তা সীমিত করে এই লক্ষ্য অর্জন করা যায় না। নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে তো আরও নয়।”

ট্রাম্প ইউক্রেনকে রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন। বিশ্ব জুড়ে ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ার জন্য তিনি হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিবর্তে ইউক্রেনের যুদ্ধকে দায়ী করেছেন। গত সপ্তাহে ট্রাম্প ‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতি’ ঘোষণা করার পর ইউক্রেন একতরফাভাবে রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ রেখেছিল। তবে রাশিয়া ইউক্রেনের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে হামলা বাড়িয়ে দিলে কিয়েভ আবারও হামলা শুরু করে।

শনিবার জেলেনস্কি জানান, ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় এখন পর্যন্ত অন্যতম ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার ১৫টির বেশি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা হয়েছে, যার পরিণতি ‘গুরুতর’।

ইউক্রেনের হাতে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার অস্ত্রের মজুত কমে আসায় প্রতি রাতে রাশিয়ার ছোড়া বিপুলসংখ্যক একমুখী আক্রমণকারী ড্রোন, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়েছে বলেও ইঙ্গিত দেন জেলেনস্কি।

তিনি বলেন, “আমাদের যোদ্ধারা এগুলোর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভূপাতিত করলেও রাশিয়ার হামলার ব্যাপকতা ও নিরবচ্ছিন্ন গতি— বিশেষ করে আমাদের জ্বালানি খাতকে লক্ষ্য করে চালানো হামলা— দুর্ভাগ্যজনকভাবে গুরুতর পরিণতি ডেকে আনছে।”

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement