ব্রেক্সিটের পর ইইউয়ে ‘ফ্রি মুভমেন্ট’ নিয়ে নতুন বিতর্ক ব্রিটেনে

ব্রেক্সিটের প্রায় এক দশক পর আবারও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে অবাধ চলাচলের ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে যুক্তরাজ্যে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম বলেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যদেশগুলোর নাগরিকদের ব্রিটেনে অবাধে কাজ করার সুযোগ, অর্থাৎ ‘ফ্রিডম অব মুভমেন্ট’ নিয়ে নতুন করে আলোচনা হওয়া উচিত।
গার্ডিয়ান ও বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটের আগে এটিই ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের বিষয়। ওই গণভোটে ইইউ ছাড়ার পক্ষে ভোট পড়ে এবং ২০২০ সালের শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউ ত্যাগ করে যুক্তরাজ্য।
রোববার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে সানডে টাইমস। সেখানে তিনি বলেন, ব্রেক্সিটের আগে ইউরোপীয় দেশগুলো থেকে বিপুলসংখ্যক কর্মীর ব্রিটেনে আসা ‘খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিছু চ্যালেঞ্জ’ তৈরি করেছিল। তবে সেই সময়ের অভিবাসন পরিস্থিতি বর্তমান সময়ের তুলনায় হয়তো কম কঠিন ছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বার্নহ্যামের ভাষায়, আগে অনেক ইউরোপীয় কর্মী ব্রিটেনে এসে কাজ করে আবার নিজ দেশে ফিরে যেতেন। এখন অভিবাসনের ধরন ও ভারসাম্য বদলে গেছে। তাই বিষয়টি নিয়ে ‘সৎভাবে আলোচনা’ প্রয়োজন।
বার্নহ্যাম বলেন, ‘ফ্রিডম অব মুভমেন্ট’কে আলাদা কোনো ইস্যু হিসেবে না দেখে ইইউয়ের সঙ্গে ব্রিটেনের সম্পর্ক নতুন করে সাজানোর বৃহত্তর আলোচনার অংশ হিসেবে দেখা উচিত। এর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ও অভিবাসন ব্যবস্থাও থাকতে পারে।
২০২১ সালের শুরুতে ব্রেক্সিট-পরবর্তী নতুন অভিবাসন ব্যবস্থা চালুর পর ব্রিটেনে অভিবাসন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়। তবে সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে দীর্ঘমেয়াদি নিট অভিবাসন নতুন ব্যবস্থাটি চালুর আগের সময়ের কাছাকাছি নেমে এসেছে।
গত সেপ্টেম্বরেই কিয়ার স্টারমারকে সরিয়ে লেবার পার্টির নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার দুই মাস পর বার্নহ্যাম বলেছিলেন, ইইউয়ের সঙ্গে ব্রিটেনের সম্পর্ক নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। একদিন দেশটি আবার ইইউয়ে যোগ দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করতে পারে বলে তিনি তখন মন্তব্য করেছিলেন।
তবে বার্নহ্যামের সবশেষ বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, তিনি এখনই ব্রিটেনকে ইইউয়ে ফিরিয়ে নেওয়ার কোনো প্রস্তাব দিচ্ছেন না। বরং অর্থনীতি ও বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্রাসেলসের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার কথা বলছেন।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্রিটেনের ইইউয়ের একক বাজারে (সিংগেল মার্কেট) যুক্ত হওয়া কিংবা কাস্টমস ইউনিয়নে ফেরার জন্য নতুন গণভোটের প্রয়োজন নাও হতে পারে। তবে ইইউয়ে পূর্ণ সদস্য হিসেবে ফিরে যেতে হলে নতুন গণভোট প্রয়োজন হবে।
একই সঙ্গে ইউরো মুদ্রা গ্রহণ কিংবা ইইউয়ের সীমান্তমুক্ত ভ্রমণব্যবস্থা শেনজেনে যোগ দেওয়ার সুপারিশ করার কথা কল্পনাও করতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী।
ইইউয়ের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিন্যাসের এই আলোচনা এমন সময়ে সামনে এলো, যখন ব্রিটিশ অর্থনীতিকে দ্রুত গতিশীল করার উপায় খুঁজছেন বার্নহ্যাম। আগামী ২০ নভেম্বর ইইউয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার একটি সম্মেলনে বসার কথা রয়েছে। ওই বৈঠকে ব্রিটেন-ইইউ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে বার্নহামের মন্তব্যের বিরোধিতা করেছেন সাবেক কনজারভেটিভ অর্থমন্ত্রী জেরেমি হান্ট। ২০১৬ সালের গণভোটে ইইউয়ে থাকার পক্ষে প্রচার চালানো হান্টও মনে করেন, সেই গণভোটের অন্যতম মৌলিক বিতর্ক আবার উসকে দেওয়া ভুল হবে।
স্কাই নিউজকে জেরেমি বলেন, অভিবাসন নীতিতে শৈথিল্য ব্রিটেনের মানুষের জন্য ক্ষতিকর হবে। তার মতে, এটি মানুষকে সরকারি ভাতা থেকে বের করে কর্মসংস্থানে আনার প্রচেষ্টায় বড় আঘাত হানতে পারে।
ব্রেক্সিটের পর ব্রিটেন-ইইউ সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর প্রশ্নগুলোর একটি ছিল শ্রমিকদের অবাধ চলাচল। বার্নহ্যামের বক্তব্য সেই পুরোনো বিতর্ককে আবার সামনে নিয়ে এলেও তার অবস্থান আপাতত পূর্ণাঙ্গভাবে ব্রেক্সিট উলটে দেওয়ার নয়। বরং অর্থনীতি, অভিবাসন, তথ্য আদান-প্রদান ও বাণিজ্যের মতো একাধিক ক্ষেত্রে ইইউয়ের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের মাধ্যমে ব্রিটেনের জন্য নতুন সমীকরণ তৈরির চেষ্টা বলেই তার বক্তব্যকে দেখা হচ্ছে।
















