
ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম

ব্রেক্সিট গণভোটের ১০ বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০১৬ সালের ২৩ জুন ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ছাড়ার পক্ষে রায় দিয়েছিলেন যুক্তরাজ্যের ভোটাররা। পরবর্তী সাড়ে তিন বছরের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া শেষে ২০২০ সালের ৩১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউ ত্যাগ করে দেশটি। তবে ওই গণভোটের প্রভাব শুধু ব্রিটেনের ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এর প্রভাব পড়েছে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, নেতৃত্ব এবং নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও।
ব্রেক্সিট-পরবর্তী এক দশকে যুক্তরাজ্যে ছয়জন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেছেন। গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমারের পদত্যাগের ঘোষণার মধ্য দিয়ে সপ্তম প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পথ তৈরি হয়েছে। আগাম নির্বাচন, নেতৃত্ব পরিবর্তন, উচ্চ ঋণ, মন্থর অর্থনীতির চাপ, দলীয় বিদ্রোহ এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান— সব মিলিয়ে গত ১০ বছর যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে ছিল ঘটনাবহুল।
ব্রেক্সিট গণভোটের ১০ বছর পূর্তির দিনে সেই রাজনৈতিক যাত্রাপথের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায়, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগের সিদ্ধান্ত দেশটির জন্য শুধু একটি পররাষ্ট্র বা অর্থনৈতিক নীতিগত পরিবর্তন ছিল না; বরং এটি যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে, যার প্রভাব এখনো দেশটির রাজনীতিতে স্পষ্ট।
গণভোট থেকে বিচ্ছেদ
২০১৬ সালের ২৩ জুন অনুষ্ঠিত গণভোটে যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের সামনে প্রশ্ন ছিল— দেশটি ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকবে, নাকি বেরিয়ে যাবে। ভোটের ফলাফলে ৫২ শতাংশ মানুষ ইইউ ত্যাগের পক্ষে এবং ৪৮ শতাংশ বিপক্ষে মত দেন।
এরপর ২০১৭ সালের ২৯ মার্চ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে লিসবন চুক্তির ৫০ অনুচ্ছেদ কার্যকর করে ইইউ ত্যাগের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করেন। দীর্ঘ আলোচনা ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের পর ২০১৯ সালের ১৭ অক্টোবর বরিস জনসনের সরকার এবং ইইউ আলোচকরা প্রত্যাহার চুক্তি (Withdrawal Agreement) সই করে।
অবশেষে ২০২০ সালের ৩১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যায় যুক্তরাজ্য। ৪৭ বছরের সম্পর্কের অবসান ঘটিয়ে ব্রিটেন নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করে। সে সময় প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন দিনটিকে আখ্যা দিয়েছিলেন ‘ব্রিটেনের নতুন যুগের সূচনা’ হিসেবে।
জুন ২০১৬: ক্যামেরনের বিদায়
ব্রেক্সিট গণভোটে ইইউ ত্যাগের পক্ষে রায় বিশ্বকে বিস্মিত করে। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের অবসানের পথ খুলে যায়। ফল ঘোষণার পরপরই পদত্যাগ করেন কনজারভেটিভ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। তার স্থলাভিষিক্ত হন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেরেসা মে।
জুন ২০১৭: আগাম নির্বাচনের উলটো ফল
ব্রেক্সিট আইন সহজে পাস করানোর লক্ষ্য নিয়ে আগাম নির্বাচন ডাকেন থেরেসা মে। কিন্তু তার এই রাজনৈতিক জুয়া উলটো ফল দেয়। কনজারভেটিভ পার্টি সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায় এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টির (ডিইউপি) সমর্থনে সরকার গঠন করতে বাধ্য হয়।
জুলাই ২০১৯: মের বিদায়, জনসনের আগমন
ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে পার্লামেন্টের দীর্ঘ অচলাবস্থা কাটাতে ব্যর্থ হয়ে ২০১৯ সালের জুনে কনজারভেটিভ পার্টির নেতার পদ থেকে ছাড়েন থেরেসা মে। জুলাইয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তার জায়গায় ক্ষমতায় আসেন ব্রেক্সিট আন্দোলনের অন্যতম মুখ বরিস জনসন।
ডিসেম্বর ২০১৯: জনসনের বড় জয়
ব্রেক্সিট চুক্তি নিয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। বরিস জনসন এই অচলাবস্থা ভাঙতে এবং পার্লামেন্টে নিজের দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে নির্ধারিত সময়ের আগেই নির্বাচন ডাকার সিদ্ধান্ত নেন। ‘গেট ব্রেক্সিট ডান’ স্লোগান সামনে রেখে ডিসেম্বরের সেই আগাম নির্বাচনে অংশ নিয়ে বরিস জনসনের নেতৃত্বে কনজারভেটিভ পার্টি ১৯৮৭ সালে মার্গারেট থ্যাচারের পর সবচেয়ে বড় নির্বাচনি জয় অর্জন করে।
জানুয়ারি ২০২০: ব্রেক্সিট সম্পন্ন
নির্বাচনি ম্যান্ডেটকে কাজে লাগিয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ও ব্রাসেলসের অনুমোদন নিয়ে ব্রেক্সিট চুক্তি কার্যকর করেন জনসন। এর মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগকারী প্রথম রাষ্ট্র হিসেবে ইতিহাস গড়ে যুক্তরাজ্য।
সেপ্টেম্বর ২০২২: জনসনের পতন
করোনা মহামারির কঠিন সময়ে দেশ পরিচালনা করলেও একের পর এক কেলেঙ্কারি ও রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন বরিস জনসন। দলীয় চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। জুলাইয়ে কনজারভেটিভ পার্টির প্রধানের পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন তিনি। পরে সেপ্টেম্বরের শুরুতে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন।
অক্টোবর ২০২২: ৪৪ দিনের প্রধানমন্ত্রী ট্রাস
জনসনের উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব নেন লিজ ট্রাস। কিন্তু অর্থের উৎস ছাড়াই ব্যাপক কর ছাড়ের প্রস্তাব দিয়ে ঘোষিত তার ‘মিনি বাজেট’ আর্থিক বাজারে তীব্র অস্থিরতা সৃষ্টি করে। ঋণের খরচ বেড়ে যায়, বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যায়। ৬ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব নিয়ে মাত্র ৪৪ দিন পর ২০ অক্টোবর পদত্যাগ করতে বাধ্য হন ট্রাস।
অক্টোবর ২০২২: দায়িত্বে ঋষি সুনাক
অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী হন ঋষি সুনাক। অর্থনীতি, স্বাস্থ্য সেবা ও অবৈধ অভিবাসন মোকাবিলাসহ পাঁচটি প্রধান অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেন তিনি। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে উত্তর আয়ারল্যান্ডের বাণিজ্য ব্যবস্থা নিয়ে ইইউর সঙ্গে ‘উইন্ডসর ফ্রেমওয়ার্ক’ চুক্তি করেন সুনাক, যা দুই পক্ষের সম্পর্ক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
জুলাই ২০২৪: ঋষি সুনাকের কনজারভেটিভ পার্টির ভরাডুবি
জনমত জরিপে লেবার পার্টির চেয়ে প্রায় ২০ পয়েন্ট পিছিয়ে থেকেও ২০২৪ সালের ৪ জুলাই সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দেন সুনাক। নির্বাচনে তার দল কনজারভেটিভ পার্টি পরাজিত হওয়ার পর, ৫ জুলাই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
জুলাই ২০২৪: স্টারমারের উত্থান
নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেয়ে প্রধানমন্ত্রী হন লেবার পার্টির নেতা কিয়ের স্টারমার। বিজয়ের পর তিনি ঘোষণা দেন, ‘আমরা বলেছিলাম বিশৃঙ্খলা শেষ করব, এবং আমরা তা-ই করব।’ তবে আধুনিক ব্রিটিশ ইতিহাসে সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম ভোটের হার নিয়েই এই বড় জয় পায় লেবার পার্টি।
আগস্ট ২০২৪: ‘আরও খারাপ সময় আসছে’
ক্ষমতায় এসেই দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে সতর্কবার্তা দেন স্টারমার। তিনি দাবি করেন, আগের সরকারের কাছ থেকে লেবার একটি বড় ‘অর্থনৈতিক ব্ল্যাক হোল’ উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে। জনগণকে তিনি জানান, পরিস্থিতি বদলাতে আরও কঠিন সময় পার করতে হবে।
অক্টোবর ২০২৪: প্রথম বাজেটেই বিতর্ক
অর্থমন্ত্রী র্যাচেল রিভস বছরে ৪০ বিলিয়ন পাউন্ড (৫২.৭৬ বিলিয়ন ডলার) কর বৃদ্ধির পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। নিয়োগকর্তাদের সামাজিক নিরাপত্তা খাতে অবদান বাড়িয়ে এই অর্থ সংগ্রহের প্রস্তাব দেওয়া হয়। ফলে শান্তিকালীন ব্রিটেনের ইতিহাসে করের বোঝা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যায় এবং ব্যবসায়ী মহলে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়।
ফেব্রুয়ারি ২০২৫: ফারাজের উত্থান
প্রথমবারের মতো জাতীয় জনমত জরিপে লেবারকে ছাড়িয়ে যায় ডানপন্থি ও অভিবাসনবিরোধী দল রিফর্ম ইউকে। ব্রেক্সিট আন্দোলনের আরেক পরিচিত মুখ নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বে দলটি দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
জুন ২০২৫: লেবার পার্টিতে বিদ্রোহ
সামাজিক কল্যাণ খাতে ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা নিয়ে নিজ দলের এমপিদের তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়েন স্টারমার। শেষ পর্যন্ত তাকে পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে হয়।
সেপ্টেম্বর ২০২৫–এপ্রিল ২০২৬: ম্যান্ডেলসন কেলেঙ্কারি
ওয়াশিংটনে ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত হিসেবে পিটার ম্যান্ডেলসনকে নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। পরে প্রয়াত দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টাইনের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ সামনে এলে তাকে পদচ্যুত করা হয়। ঘটনাটি স্টারমারের নেতৃত্ব ও নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
মে ২০২৬: স্থানীয় নির্বাচনে ধাক্কা, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ
ইংল্যান্ডের স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের নির্বাচনে বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়ে লেবার পার্টি। সবচেয়ে বেশি লাভবান হয় রিফর্ম ইউকে। স্টারমারের নেতৃত্বের ওপর আস্থা হারানোর কথা জানিয়ে পদত্যাগ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং। একই সঙ্গে তিনি নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের দাবি তোলেন।
জুন ২০২৬: প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বিদায়
প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানো নিয়ে দীর্ঘ মতবিরোধের জেরে পদত্যাগ করেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি। তিনি অভিযোগ করেন, বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির বাস্তবতায় প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার।
চলমান এই তীব্র রাজনৈতিক সংকটের মধ্যেই গত ১৮ জুন ইংল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলে মেকারফিল্ড আসনের উপনির্বাচন ব্রিটিশ রাজনীতির সমীকরণ অনেকটাই বদলে দেয়। রিফর্ম ইউকের প্রার্থীকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন গ্রেটার ম্যানচেস্টারের ৫৬ বছর বয়সী জনপ্রিয় লেবার নেতা অ্যান্ডি বার্নহ্যাম।
মেকারফিল্ডের এই উপনির্বাচনে লড়তে গিয়ে তিনি নিজের মেয়রের পদ থেকে ইস্তফা দেন এবং ৫৪.৮% ভোটের এক বিশাল ব্যবধানে জয়ী হয়ে ওয়েস্টমিনস্টারের রাজনীতিতে নিজের রাজকীয় প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করেন।
গতকাল সোমবার মেকারফিল্ড আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে হাউজ অব কমন্সে বার্নহ্যামের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের সময় লেবার বেঞ্চ থেকে আসা তুমুল করতালি ও জোরালো উল্লাসধ্বনি পুরো সংসদকে মুখরিত করে তোলে। শপথ শেষ হতেই সহকর্মীদের সঙ্গে সেলফি তোলার হিড়িক পড়ে। হাউজ অব কমন্সের এই দৃশ্য স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, লেবার পার্টির একটি বড় অংশ ইতোমধ্যেই নেতৃত্বের লড়াইয়ে বার্নহ্যামের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে।
কে এই ‘কিং অফ দ্য নর্থ’?
সাধারণত ব্রিটেনের রাজনীতি সব সময়ই লন্ডন এবং সেখানকার তথাকথিত ‘পলিটিক্যাল এলিট’ বা রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণির নিয়ন্ত্রণে থাকে। অ্যান্ডি বার্নহ্যাম এই বৃত্তের সম্পূর্ণ বাইরের একজন ব্যতিক্রমী নেতা। লন্ডন-কেন্দ্রিক পক্ষপাতমূলক সরকারি নীতির বিরুদ্ধে উত্তর ইংল্যান্ডের গণমানুষের অধিকার আদায়ের আপসহীন লড়াইয়ের কারণে অনুগামীরা তাকে ভালোবেসে নাম দিয়েছেন ‘কিং অফ দ্য নর্থ’ (উত্তরের রাজা)। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে তিনি মূলত ‘সফট-লেফট’ বা নরমপন্থি বাম ধারার রাজনীতিক।
বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ক্যারিয়ার
২০০১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় লেই (Leigh) আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বার্নহ্যাম। এর আগে তিনি টনি ব্লেয়ার এবং গর্ডন ব্রাউনের মন্ত্রিসভায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রোটফোলিও সামলেছেন। ২০১৭ সালে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে তিনি ‘গ্রেটার ম্যানচেস্টার কম্বাইন্ড অথরিটি’র প্রথম ‘মেট্রো মেয়র’ নির্বাচিত হন। এরপর ২০২১ এবং ২০২৪ সালেও তিনি রেকর্ড ভোটে একই পদে পুনর্নির্বাচিত হন।
মেয়র থাকাকালীন ম্যানচেস্টারের বাস নেটওয়ার্ককে বেসরকারি মালিকানার কব্জা থেকে মুক্ত করে সম্পূর্ণ সরকারি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা ছিল তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা সামাজিক সাফল্য। এ ছাড়াও গৃহহীন মানুষদের সহায়তার জন্য তিনি ‘আ বেড এভরি নাইট’ (A Bed Every Night) নামে একটি অনন্য মানবিক উদ্যোগ চালু করেন। এই প্রকল্পের তহবিলে তিনি নিজের বেতনের ১৫ শতাংশ নিয়মিত দান করতেন, যা তৃণমূল পর্যায়ে তার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
আন্তর্জাতিক ইস্যুতে নিজস্ব ও দৃঢ় অবস্থান
জাতীয় রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বার্নহ্যাম সব সময় তার নিজস্ব এবং অত্যন্ত সাহসী অবস্থান তুলে ধরেছেন:
২০১২ সালে ‘লেবার ফ্রেন্ডস অফ প্যালেস্তাইনে’র প্রতিনিধি হিসেবে তিনি ওয়েস্ট ব্যাংক (পশ্চিম তীর) সফর করেছিলেন। তবে তিনি ঢালাও ইসরায়েলবিরোধী নন; ২০১৫ সাল থেকে তিনি ‘লেবার ফ্রেন্ডস অফ ইসরায়েলে’রও সক্রিয় সদস্য। ইসরায়েল বয়কট করার বিষয়ে লেবারদের অভ্যন্তরে যে প্রচারণা চলে, তাকে তিনি ‘বিদ্বেষপূর্ণ’ বলে মনে করেন।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে সবার আগে
কিয়ের স্টারমারের নাটকীয় পদত্যাগের ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে অ্যান্ডি বার্নহ্যাম লেবার পার্টির নেতৃত্ব এবং দেশের প্রধানমন্ত্রিত্বের লড়াইয়ে নামার চূড়ান্ত ঘোষণা দেন।
বিবৃতিতে বিদায়ী প্রধানমন্ত্রীকে সম্মান জানিয়ে তিনি বলেন, “কিয়ের আমাদের দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। এই কঠিন সময়ে তার দৃঢ় নেতৃত্ব ও নিষ্ঠার জন্য আমি তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। এখন আমাদের সামনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্বর্তীকালীন অধ্যায় শুরু হচ্ছে, যা অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও দায়িত্বশীল উপায়ে সম্পন্ন করা প্রয়োজন।”
বার্নহ্যাম তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে আরও বলেন, দেশের মানুষ এখন একটি দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল সরকার চায়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ফিরিয়ে আনা, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, জনসেবার মানোন্নয়ন, আবাসন সংকট সমাধান এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য নতুন সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করাই হবে তার সরকারের প্রধান কাজ।
এরই মধ্যে লেবার পার্টির সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে আলোচনায় থাকা সাবেক প্রভাবশালী স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং নিজে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়িয়ে বার্নহ্যামের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ঘোষণা করেছেন। ফলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকদের মতে, লেবার পার্টির পরবর্তী শীর্ষ নেতা এবং যুক্তরাজ্যের সম্ভাব্য সপ্তম প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে অ্যান্ডি বার্নহ্যাম এখন অন্য সবার চেয়ে শক্তিশালী ও সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন।

ব্রেক্সিট গণভোটের ১০ বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০১৬ সালের ২৩ জুন ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ছাড়ার পক্ষে রায় দিয়েছিলেন যুক্তরাজ্যের ভোটাররা। পরবর্তী সাড়ে তিন বছরের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া শেষে ২০২০ সালের ৩১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউ ত্যাগ করে দেশটি। তবে ওই গণভোটের প্রভাব শুধু ব্রিটেনের ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এর প্রভাব পড়েছে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, নেতৃত্ব এবং নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও।
ব্রেক্সিট-পরবর্তী এক দশকে যুক্তরাজ্যে ছয়জন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেছেন। গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমারের পদত্যাগের ঘোষণার মধ্য দিয়ে সপ্তম প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পথ তৈরি হয়েছে। আগাম নির্বাচন, নেতৃত্ব পরিবর্তন, উচ্চ ঋণ, মন্থর অর্থনীতির চাপ, দলীয় বিদ্রোহ এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান— সব মিলিয়ে গত ১০ বছর যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে ছিল ঘটনাবহুল।
ব্রেক্সিট গণভোটের ১০ বছর পূর্তির দিনে সেই রাজনৈতিক যাত্রাপথের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায়, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগের সিদ্ধান্ত দেশটির জন্য শুধু একটি পররাষ্ট্র বা অর্থনৈতিক নীতিগত পরিবর্তন ছিল না; বরং এটি যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে, যার প্রভাব এখনো দেশটির রাজনীতিতে স্পষ্ট।
গণভোট থেকে বিচ্ছেদ
২০১৬ সালের ২৩ জুন অনুষ্ঠিত গণভোটে যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের সামনে প্রশ্ন ছিল— দেশটি ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকবে, নাকি বেরিয়ে যাবে। ভোটের ফলাফলে ৫২ শতাংশ মানুষ ইইউ ত্যাগের পক্ষে এবং ৪৮ শতাংশ বিপক্ষে মত দেন।
এরপর ২০১৭ সালের ২৯ মার্চ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে লিসবন চুক্তির ৫০ অনুচ্ছেদ কার্যকর করে ইইউ ত্যাগের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করেন। দীর্ঘ আলোচনা ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের পর ২০১৯ সালের ১৭ অক্টোবর বরিস জনসনের সরকার এবং ইইউ আলোচকরা প্রত্যাহার চুক্তি (Withdrawal Agreement) সই করে।
অবশেষে ২০২০ সালের ৩১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যায় যুক্তরাজ্য। ৪৭ বছরের সম্পর্কের অবসান ঘটিয়ে ব্রিটেন নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করে। সে সময় প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন দিনটিকে আখ্যা দিয়েছিলেন ‘ব্রিটেনের নতুন যুগের সূচনা’ হিসেবে।
জুন ২০১৬: ক্যামেরনের বিদায়
ব্রেক্সিট গণভোটে ইইউ ত্যাগের পক্ষে রায় বিশ্বকে বিস্মিত করে। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের অবসানের পথ খুলে যায়। ফল ঘোষণার পরপরই পদত্যাগ করেন কনজারভেটিভ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। তার স্থলাভিষিক্ত হন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেরেসা মে।
জুন ২০১৭: আগাম নির্বাচনের উলটো ফল
ব্রেক্সিট আইন সহজে পাস করানোর লক্ষ্য নিয়ে আগাম নির্বাচন ডাকেন থেরেসা মে। কিন্তু তার এই রাজনৈতিক জুয়া উলটো ফল দেয়। কনজারভেটিভ পার্টি সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায় এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টির (ডিইউপি) সমর্থনে সরকার গঠন করতে বাধ্য হয়।
জুলাই ২০১৯: মের বিদায়, জনসনের আগমন
ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে পার্লামেন্টের দীর্ঘ অচলাবস্থা কাটাতে ব্যর্থ হয়ে ২০১৯ সালের জুনে কনজারভেটিভ পার্টির নেতার পদ থেকে ছাড়েন থেরেসা মে। জুলাইয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তার জায়গায় ক্ষমতায় আসেন ব্রেক্সিট আন্দোলনের অন্যতম মুখ বরিস জনসন।
ডিসেম্বর ২০১৯: জনসনের বড় জয়
ব্রেক্সিট চুক্তি নিয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। বরিস জনসন এই অচলাবস্থা ভাঙতে এবং পার্লামেন্টে নিজের দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে নির্ধারিত সময়ের আগেই নির্বাচন ডাকার সিদ্ধান্ত নেন। ‘গেট ব্রেক্সিট ডান’ স্লোগান সামনে রেখে ডিসেম্বরের সেই আগাম নির্বাচনে অংশ নিয়ে বরিস জনসনের নেতৃত্বে কনজারভেটিভ পার্টি ১৯৮৭ সালে মার্গারেট থ্যাচারের পর সবচেয়ে বড় নির্বাচনি জয় অর্জন করে।
জানুয়ারি ২০২০: ব্রেক্সিট সম্পন্ন
নির্বাচনি ম্যান্ডেটকে কাজে লাগিয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ও ব্রাসেলসের অনুমোদন নিয়ে ব্রেক্সিট চুক্তি কার্যকর করেন জনসন। এর মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগকারী প্রথম রাষ্ট্র হিসেবে ইতিহাস গড়ে যুক্তরাজ্য।
সেপ্টেম্বর ২০২২: জনসনের পতন
করোনা মহামারির কঠিন সময়ে দেশ পরিচালনা করলেও একের পর এক কেলেঙ্কারি ও রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন বরিস জনসন। দলীয় চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। জুলাইয়ে কনজারভেটিভ পার্টির প্রধানের পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন তিনি। পরে সেপ্টেম্বরের শুরুতে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন।
অক্টোবর ২০২২: ৪৪ দিনের প্রধানমন্ত্রী ট্রাস
জনসনের উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব নেন লিজ ট্রাস। কিন্তু অর্থের উৎস ছাড়াই ব্যাপক কর ছাড়ের প্রস্তাব দিয়ে ঘোষিত তার ‘মিনি বাজেট’ আর্থিক বাজারে তীব্র অস্থিরতা সৃষ্টি করে। ঋণের খরচ বেড়ে যায়, বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যায়। ৬ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব নিয়ে মাত্র ৪৪ দিন পর ২০ অক্টোবর পদত্যাগ করতে বাধ্য হন ট্রাস।
অক্টোবর ২০২২: দায়িত্বে ঋষি সুনাক
অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী হন ঋষি সুনাক। অর্থনীতি, স্বাস্থ্য সেবা ও অবৈধ অভিবাসন মোকাবিলাসহ পাঁচটি প্রধান অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেন তিনি। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে উত্তর আয়ারল্যান্ডের বাণিজ্য ব্যবস্থা নিয়ে ইইউর সঙ্গে ‘উইন্ডসর ফ্রেমওয়ার্ক’ চুক্তি করেন সুনাক, যা দুই পক্ষের সম্পর্ক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
জুলাই ২০২৪: ঋষি সুনাকের কনজারভেটিভ পার্টির ভরাডুবি
জনমত জরিপে লেবার পার্টির চেয়ে প্রায় ২০ পয়েন্ট পিছিয়ে থেকেও ২০২৪ সালের ৪ জুলাই সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দেন সুনাক। নির্বাচনে তার দল কনজারভেটিভ পার্টি পরাজিত হওয়ার পর, ৫ জুলাই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
জুলাই ২০২৪: স্টারমারের উত্থান
নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেয়ে প্রধানমন্ত্রী হন লেবার পার্টির নেতা কিয়ের স্টারমার। বিজয়ের পর তিনি ঘোষণা দেন, ‘আমরা বলেছিলাম বিশৃঙ্খলা শেষ করব, এবং আমরা তা-ই করব।’ তবে আধুনিক ব্রিটিশ ইতিহাসে সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম ভোটের হার নিয়েই এই বড় জয় পায় লেবার পার্টি।
আগস্ট ২০২৪: ‘আরও খারাপ সময় আসছে’
ক্ষমতায় এসেই দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে সতর্কবার্তা দেন স্টারমার। তিনি দাবি করেন, আগের সরকারের কাছ থেকে লেবার একটি বড় ‘অর্থনৈতিক ব্ল্যাক হোল’ উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে। জনগণকে তিনি জানান, পরিস্থিতি বদলাতে আরও কঠিন সময় পার করতে হবে।
অক্টোবর ২০২৪: প্রথম বাজেটেই বিতর্ক
অর্থমন্ত্রী র্যাচেল রিভস বছরে ৪০ বিলিয়ন পাউন্ড (৫২.৭৬ বিলিয়ন ডলার) কর বৃদ্ধির পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। নিয়োগকর্তাদের সামাজিক নিরাপত্তা খাতে অবদান বাড়িয়ে এই অর্থ সংগ্রহের প্রস্তাব দেওয়া হয়। ফলে শান্তিকালীন ব্রিটেনের ইতিহাসে করের বোঝা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যায় এবং ব্যবসায়ী মহলে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়।
ফেব্রুয়ারি ২০২৫: ফারাজের উত্থান
প্রথমবারের মতো জাতীয় জনমত জরিপে লেবারকে ছাড়িয়ে যায় ডানপন্থি ও অভিবাসনবিরোধী দল রিফর্ম ইউকে। ব্রেক্সিট আন্দোলনের আরেক পরিচিত মুখ নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বে দলটি দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
জুন ২০২৫: লেবার পার্টিতে বিদ্রোহ
সামাজিক কল্যাণ খাতে ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা নিয়ে নিজ দলের এমপিদের তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়েন স্টারমার। শেষ পর্যন্ত তাকে পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে হয়।
সেপ্টেম্বর ২০২৫–এপ্রিল ২০২৬: ম্যান্ডেলসন কেলেঙ্কারি
ওয়াশিংটনে ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত হিসেবে পিটার ম্যান্ডেলসনকে নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। পরে প্রয়াত দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টাইনের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ সামনে এলে তাকে পদচ্যুত করা হয়। ঘটনাটি স্টারমারের নেতৃত্ব ও নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
মে ২০২৬: স্থানীয় নির্বাচনে ধাক্কা, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ
ইংল্যান্ডের স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের নির্বাচনে বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়ে লেবার পার্টি। সবচেয়ে বেশি লাভবান হয় রিফর্ম ইউকে। স্টারমারের নেতৃত্বের ওপর আস্থা হারানোর কথা জানিয়ে পদত্যাগ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং। একই সঙ্গে তিনি নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের দাবি তোলেন।
জুন ২০২৬: প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বিদায়
প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানো নিয়ে দীর্ঘ মতবিরোধের জেরে পদত্যাগ করেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি। তিনি অভিযোগ করেন, বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির বাস্তবতায় প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার।
চলমান এই তীব্র রাজনৈতিক সংকটের মধ্যেই গত ১৮ জুন ইংল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলে মেকারফিল্ড আসনের উপনির্বাচন ব্রিটিশ রাজনীতির সমীকরণ অনেকটাই বদলে দেয়। রিফর্ম ইউকের প্রার্থীকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন গ্রেটার ম্যানচেস্টারের ৫৬ বছর বয়সী জনপ্রিয় লেবার নেতা অ্যান্ডি বার্নহ্যাম।
মেকারফিল্ডের এই উপনির্বাচনে লড়তে গিয়ে তিনি নিজের মেয়রের পদ থেকে ইস্তফা দেন এবং ৫৪.৮% ভোটের এক বিশাল ব্যবধানে জয়ী হয়ে ওয়েস্টমিনস্টারের রাজনীতিতে নিজের রাজকীয় প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করেন।
গতকাল সোমবার মেকারফিল্ড আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে হাউজ অব কমন্সে বার্নহ্যামের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের সময় লেবার বেঞ্চ থেকে আসা তুমুল করতালি ও জোরালো উল্লাসধ্বনি পুরো সংসদকে মুখরিত করে তোলে। শপথ শেষ হতেই সহকর্মীদের সঙ্গে সেলফি তোলার হিড়িক পড়ে। হাউজ অব কমন্সের এই দৃশ্য স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, লেবার পার্টির একটি বড় অংশ ইতোমধ্যেই নেতৃত্বের লড়াইয়ে বার্নহ্যামের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে।
কে এই ‘কিং অফ দ্য নর্থ’?
সাধারণত ব্রিটেনের রাজনীতি সব সময়ই লন্ডন এবং সেখানকার তথাকথিত ‘পলিটিক্যাল এলিট’ বা রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণির নিয়ন্ত্রণে থাকে। অ্যান্ডি বার্নহ্যাম এই বৃত্তের সম্পূর্ণ বাইরের একজন ব্যতিক্রমী নেতা। লন্ডন-কেন্দ্রিক পক্ষপাতমূলক সরকারি নীতির বিরুদ্ধে উত্তর ইংল্যান্ডের গণমানুষের অধিকার আদায়ের আপসহীন লড়াইয়ের কারণে অনুগামীরা তাকে ভালোবেসে নাম দিয়েছেন ‘কিং অফ দ্য নর্থ’ (উত্তরের রাজা)। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে তিনি মূলত ‘সফট-লেফট’ বা নরমপন্থি বাম ধারার রাজনীতিক।
বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ক্যারিয়ার
২০০১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় লেই (Leigh) আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বার্নহ্যাম। এর আগে তিনি টনি ব্লেয়ার এবং গর্ডন ব্রাউনের মন্ত্রিসভায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রোটফোলিও সামলেছেন। ২০১৭ সালে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে তিনি ‘গ্রেটার ম্যানচেস্টার কম্বাইন্ড অথরিটি’র প্রথম ‘মেট্রো মেয়র’ নির্বাচিত হন। এরপর ২০২১ এবং ২০২৪ সালেও তিনি রেকর্ড ভোটে একই পদে পুনর্নির্বাচিত হন।
মেয়র থাকাকালীন ম্যানচেস্টারের বাস নেটওয়ার্ককে বেসরকারি মালিকানার কব্জা থেকে মুক্ত করে সম্পূর্ণ সরকারি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা ছিল তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা সামাজিক সাফল্য। এ ছাড়াও গৃহহীন মানুষদের সহায়তার জন্য তিনি ‘আ বেড এভরি নাইট’ (A Bed Every Night) নামে একটি অনন্য মানবিক উদ্যোগ চালু করেন। এই প্রকল্পের তহবিলে তিনি নিজের বেতনের ১৫ শতাংশ নিয়মিত দান করতেন, যা তৃণমূল পর্যায়ে তার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
আন্তর্জাতিক ইস্যুতে নিজস্ব ও দৃঢ় অবস্থান
জাতীয় রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বার্নহ্যাম সব সময় তার নিজস্ব এবং অত্যন্ত সাহসী অবস্থান তুলে ধরেছেন:
২০১২ সালে ‘লেবার ফ্রেন্ডস অফ প্যালেস্তাইনে’র প্রতিনিধি হিসেবে তিনি ওয়েস্ট ব্যাংক (পশ্চিম তীর) সফর করেছিলেন। তবে তিনি ঢালাও ইসরায়েলবিরোধী নন; ২০১৫ সাল থেকে তিনি ‘লেবার ফ্রেন্ডস অফ ইসরায়েলে’রও সক্রিয় সদস্য। ইসরায়েল বয়কট করার বিষয়ে লেবারদের অভ্যন্তরে যে প্রচারণা চলে, তাকে তিনি ‘বিদ্বেষপূর্ণ’ বলে মনে করেন।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে সবার আগে
কিয়ের স্টারমারের নাটকীয় পদত্যাগের ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে অ্যান্ডি বার্নহ্যাম লেবার পার্টির নেতৃত্ব এবং দেশের প্রধানমন্ত্রিত্বের লড়াইয়ে নামার চূড়ান্ত ঘোষণা দেন।
বিবৃতিতে বিদায়ী প্রধানমন্ত্রীকে সম্মান জানিয়ে তিনি বলেন, “কিয়ের আমাদের দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। এই কঠিন সময়ে তার দৃঢ় নেতৃত্ব ও নিষ্ঠার জন্য আমি তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। এখন আমাদের সামনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্বর্তীকালীন অধ্যায় শুরু হচ্ছে, যা অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও দায়িত্বশীল উপায়ে সম্পন্ন করা প্রয়োজন।”
বার্নহ্যাম তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে আরও বলেন, দেশের মানুষ এখন একটি দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল সরকার চায়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ফিরিয়ে আনা, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, জনসেবার মানোন্নয়ন, আবাসন সংকট সমাধান এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য নতুন সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করাই হবে তার সরকারের প্রধান কাজ।
এরই মধ্যে লেবার পার্টির সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে আলোচনায় থাকা সাবেক প্রভাবশালী স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং নিজে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়িয়ে বার্নহ্যামের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ঘোষণা করেছেন। ফলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকদের মতে, লেবার পার্টির পরবর্তী শীর্ষ নেতা এবং যুক্তরাজ্যের সম্ভাব্য সপ্তম প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে অ্যান্ডি বার্নহ্যাম এখন অন্য সবার চেয়ে শক্তিশালী ও সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন।

সুইজারল্যান্ডে আলোচনার পর জেডি ভ্যান্স জানিয়েছিলেন যে, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার সঙ্গে আলোচনা "আজ থেকেই শুরু হতে পারে"।
৬ ঘণ্টা আগে
ইউক্রেনের ব্যাপক ড্রোন হামলায় রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে একদিনে ৮৪টি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে রুশ কর্তৃপক্ষ। এর জেরে রাজধানীর চারটি প্রধান বিমানবন্দরে সাময়িকভাবে উড়োজাহাজ চলাচল বন্ধ রাখা হয়। অন্যদিকে রাশিয়ার পালটা হামলায় ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলে অন্তত ছয়জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ১৩ বছর বয়সী এক
৭ ঘণ্টা আগে
গালফ নিউজের খবরে বলা হয়েছে, রোববার (২১ জুন) শেষ রাতের দিকে রাস লাফানের বারজানের একটি অভ্যন্তরীণ গ্যাস সরবরাহ কেন্দ্রে এ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ওই সময় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানায়, জরুরি উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
১৯ ঘণ্টা আগে
ওয়েস্টমিনস্টারে ফিরে আসা বার্নহ্যাম সোমবার (২২ জুন) হাউজ অব কমন্সে শপথ নেন। হাউজ অব কমন্সে তার শপথ গ্রহণ ঘিরে লেবার পার্টির এমপিদের উচ্ছ্বাস ও দলটির জ্যেষ্ঠ নেতাদের প্রকাশ্য সমর্থন নতুন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে তাকে স্পষ্টভাবে এগিয়ে দিয়েছে।
২০ ঘণ্টা আগে