সিএনএনের অনুসন্ধান

ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনে কুর্দিদের অস্ত্র দিচ্ছে সিআইএ

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২৬, ১৯: ৩২
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার প্রতিবাদে তেহরানের রাস্তায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছবি হাতে বিক্ষোভ (বাঁয়ে) ও সিআইএর লোগো (ডানে)। ছবি: সংগৃহীত

ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্যে একটি গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অত্যাধুনিক অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করছে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ)। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে একটি গোপন পরিকল্পনাও চূড়ান্ত হয়েছে।

পরিকল্পনাটি সম্পর্কে অবগত একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে মঙ্গলবার (৩ মার্চ) এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এ চাঞ্চল্যকর তথ্য জানিয়েছে মার্কিন সংবাদ সংস্থা সিএনএন।

সিএনএনের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন বর্তমানে ইরানি বিরোধী দল এবং ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলে অবস্থানরত কুর্দি নেতাদের সাথে সক্রিয়ভাবে সামরিক সহায়তা প্রদানের বিষয়ে আলোচনা করছে। এই আলোচনার মূল উদ্দেশ্য ছিল ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় কুর্দি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে একটি শক্তিশালী সামরিক ফ্রন্ট তৈরি করা, যা সরাসরি তেহরানের কেন্দ্রীয় শাসনের ভিত নাড়িয়ে দিতে সক্ষম হবে।

গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে সিএনএন বলছে, এই প্রকল্পের মাধ্যমে ইরানি কুর্দি যোদ্ধাদের কেবল হালকা অস্ত্র নয়, বরং প্রয়োজনীয় সামরিক সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে যাতে তারা ইরানি নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সম্মুখযুদ্ধে টিকে থাকতে পারে। ইরাক-ইরান সীমান্ত এলাকায় বর্তমানে হাজার হাজার কুর্দি যোদ্ধা সক্রিয় রয়েছে, যাদের প্রধান ঘাঁটি ইরাকের আধা-স্বায়ত্তশাসিত কুর্দিস্তান অঞ্চলে। ইরান যুদ্ধের শুরু থেকেই এই গোষ্ঠীগুলো প্রকাশ্য বিবৃতিতে ইরানি বাহিনীকে দলত্যাগের আহ্বান জানাচ্ছে এবং বড় ধরনের অভিযানের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

গতকাল মঙ্গলবার ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এই কুর্দি ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। কুর্দিরা এখন ওয়াশিংটন ও ইসরায়েলের সমর্থনের অপেক্ষায় রয়েছে। এই সামরিক সহায়তার নেপথ্যে ওয়াশিংটনের একটি ‘গভীর কৌশলগত পরিকল্পনা’ কাজ করছে বলে জানায় সিএনএন।

সিআইএর গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের ধারণা, কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো যদি ইরানের সীমান্ত এলাকায় বড় ধরনের সংঘাত শুরু করতে পারে, তবে তেহরান তাদের অভিজাত বাহিনী আইআরজিসিকে সীমান্ত সুরক্ষায় মোতায়েন করতে বাধ্য হবে। ফলে ইরানের শহরগুলোতে সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি ও শক্তি অনেকটাই কমে আসবে।

এদিকে মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করছেন, আইআরজিসির এই ব্যস্ততাকে কাজে লাগিয়ে ইরানের সাধারণ জনগণ রাস্তায় নেমে বড় ধরনের গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে সক্ষম হবে, যা গত জানুয়ারির অস্থিরতার মতো আর দমনের মুখে পড়বে না। মূলত, সীমান্ত সংঘাতকে একটি ‘ডাইভারশন’ বা মনোযোগ সরানোর কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে ইরানের প্রধান শহরগুলোতে বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতা ছড়িয়ে দেওয়াই এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের মৃত্যুতে তেহরানে যে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে, তাকে পশ্চিমা শক্তিগুলো একটি ‘ঐতিহাসিক সুযোগ’ হিসেবে দেখছে। একজন জ্যেষ্ঠ কুর্দি কর্মকর্তা সিএনএনকে জানিয়েছেন, তারা বিশ্বাস করেন— এখন তাদের সামনে সবচেয়ে বড় সুযোগ। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পশ্চিম ইরানে একটি বড় ধরনের স্থল অভিযান শুরু হতে পারে।

সিএনএনকে ওই কুর্দি নেতা বলেন, ডেমোক্রেটিক পার্টি অফ ইরানিয়ান কুর্দিস্তানের (কেডিপিআই) প্রেসিডেন্ট মুস্তাফা হিজরির সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফোনে কথা বলেছেন। ট্রাম্প গত রোববার ইরাকি কুর্দি নেতাদের সঙ্গে ইরানে সামরিক অভিযানের অগ্রগতি এবং পারস্পরিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেছেন। এ ছাড়া আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই পশ্চিম ইরানে কুর্দি বাহিনী একটি স্থল অভিযানে অংশ নিতে পারে বলে জানিয়েছেন ওই কুর্দি নেতা।

কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সিআইএর অস্ত্র সহায়তার পরিকল্পনায় মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এই অস্ত্র ও রসদ মূলত ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চল হয়ে ইরানে প্রবেশ করার কথা রয়েছে, যা ইরাক ও ইরানের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল ধরাতে পারে। তবে এই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন সহজ নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ওবামা প্রশাসনের সাবেক পেন্টাগন কর্মকর্তা অ্যালেক্স প্লিটাস মনে করেন, আমেরিকা মূলত ইরানিদের সরকার পতনের প্রক্রিয়াকে ‘জাম্প-স্টার্ট’ করতে কুর্দিদের ব্যবহার করছে। তবে জো বাইডেনের সাবেক পররাষ্ট্র কর্মকর্তা জেন গ্যাভিটো উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, এই পদক্ষেপে ইরাকের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হতে পারে এবং কোনো জবাবদিহিতা ছাড়াই মিলিশিয়াদের হাতে বিশাল ক্ষমতা চলে যেতে পারে।

সিএনএন বলছে, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীও ইতোমধ্যে ইরাক সীমান্তে ইরানি নিরাপত্তা চৌকিগুলোতে হামলা জোরদার করেছে যাতে কুর্দি যোদ্ধাদের ইরানে প্রবেশের পথ সহজ হয়। পুরো পরিকল্পনাটির সাথে জড়িয়ে আছে একটি দীর্ঘ এবং জটিল ইতিহাস। ঐতিহাসিকভাবে কুর্দিরা একটি রাষ্ট্রহীন জাতি যাদের সংখ্যা প্রায় ২৫-৩০ মিলিয়ন।

সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ দশকের পর দশক ধরে ইরাকি কুর্দিদের সাথে কাজ করছে এবং বর্তমানে ইরাকি কুর্দিস্তানে তাদের গোপন আউটপোস্ট এবং ইরবিলে কনসুলেট রয়েছে। তবে অতীতে মার্কিনিদের কাছে ‘পরিত্যক্ত’ হওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতাও রয়েছে কুর্দিদের।

বর্তমানে কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর নিজেদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিভেদ, ভিন্ন আদর্শ এবং দীর্ঘদিনের রেষারেষি সিআইএর সঙ্গে তাদের পরিকল্পনা ও সম্ভাব্য সাফল্যের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। এ ছাড়া কুর্দিরা নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কতটুকু আজ্ঞাবহ থাকবে, তা নিয়েও ট্রাম্প প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

জন্মস্থান মাশহাদে সমাহিত হবেন খামেনি

ফার্স নিউজ জানিয়েছে, খামেনিকে বিদায় জানাতে রাজধানীতে একটি গণ-স্মরণানুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা করছেন দেশটির সরকার। তবে দাফন, জানাজা বা স্মরণ অনুষ্ঠানের তারিখ এখনো জানানো হয়নি।

১২ ঘণ্টা আগে

ভারত মহাসাগরে মার্কিন ডেস্ট্রয়ারে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

ইরানি সামরিক বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে মার্কিন ডেস্ট্রয়ার ও জ্বালানি ট্যাংকার উভয় জাহাজেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার পর ওই এলাকা থেকে বিশাল ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশে ছড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানানো হয়। যদিও এই ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে এখন পর্যন্ত মার্কি

১২ ঘণ্টা আগে

জ্বালানি নিরাপত্তায় মার্কিন নৌবাহিনী মোতায়েনের হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের

এদিকে যুদ্ধের প্রভাবে ইরাকের তেল উৎপাদন প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে; দেশটির রুমাইলা ও ওয়েস্ট কুর্না-২ এর মতো বৃহৎ তেলক্ষেত্রগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। সংঘাতের উত্তাপ ছড়িয়েছে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতেও; দুবাইয়ে মার্কিন কনস্যুলেট ড্রোন হামলার শিকার হওয়ার খবর পাওয়া

১৩ ঘণ্টা আগে

রিয়াদে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার স্টেশনে ড্রোন হামলা

সংঘাত চলাকালে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসেও হামলা হয়েছে। সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, দুটি ড্রোন ব্যবহার করে দূতাবাসটিতে হামলা চালানো হয়। এতে সীমিত আকারে আগুন লাগে। কিছু বস্তুগত ক্ষয়ক্ষতি হয়।

১৪ ঘণ্টা আগে