হরমুজ নিয়ে বৈঠক স্থগিত, তেল সরবরাহ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪: ৫৬
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের লারাক দ্বীপসংলগ্ন জলসীমায় নোঙর করা একটি জাহাজ। ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক সমঝোতার প্রচেষ্টা আবারও ধাক্কা খেয়েছে। হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশের মধ্যে সোমবার অনুষ্ঠেয় একটি বৈঠক স্থগিত করা হয়েছে। একই সময়ে অঞ্চলটির গুরুত্বপূর্ণ দুটি তেল পরিবহনপথের আশপাশে হামলা অব্যাহত থাকায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) তেলের দাম ৩ শতাংশের বেশি বেড়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল রপ্তানিকারক সৌদি আরবে হুতিদের হামলা, সপ্তাহান্তে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং উপসাগরে জাহাজে হামলার কারণে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে।

রয়টার্সের খবরে বলা হয়, ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সায়িদ বদর আলবুসাইদি রোববার রাতে জানান, সোমবারের আঞ্চলিক বৈঠকটি ‘ঐকমত্যের স্বার্থে’ স্থগিত করা হয়েছে। এর ফলে অদূর ভবিষ্যতে কূটনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনাও কিছুটা ফিকে হয়ে এসেছে।

সৌদি আরব আপাতত পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনটি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরই হরমুজ নিয়ে বৈঠক স্থগিতের খবর আসে। হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যের তেল পরিবহনের প্রধান পথ হিসেবে ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইনটি ব্যবহৃত হয়ে আসছিল।

ইরানের কর্মকর্তারা এর আগে জানিয়েছিলেন, উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে ওই বৈঠকে তারা অংশ নেবেন। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কীভাবে পরিচালনা করা হবে, সে বিষয়ে ওমানের সঙ্গে করা একটি চুক্তি সেখানে উপস্থাপনের কথা ছিল। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো।

ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ফারস নিউজ একজন ইরানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, কয়েকটি আঞ্চলিক দেশের অনুরোধে বৈঠকটি স্থগিত করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত তেহরান ও মাসকাট যৌথভাবে নিয়েছে। বৈঠকের নতুন তারিখ ঠিক করতে ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করবে ইরান।

এদিকে তেল পরিবহনের জন্য হরমুজ প্রণালি এখনো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে আছে। যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও রোববার জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলার সময় একটি জাহাজে একটি বস্তু আঘাত হানে। এতে জাহাজটিতে আগুন ধরে যায় এবং নাবিকদের সরিয়ে নিতে হয়।

ইরানও জানিয়েছে, তাদের উপকূলের কাছে একটি ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা হয়েছে। এতে একজন নিহত এবং চারজন নাবিক আহত হয়েছেন।

সোমবার প্রকাশিত প্রাথমিক জাহাজ চলাচলসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, সপ্তাহান্তে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলের সংখ্যা এক অঙ্কে নেমে এসেছে। গত ১০ দিনের গড় হিসেবে প্রতিদিন ১৪টি জাহাজ চলাচল করলেও এখন তা অনেক কমে গেছে। তবে যেসব জাহাজ শনাক্ত হওয়া এড়াতে স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা (এআইএস) ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করে প্রণালি পার হয়ে থাকতে পারে, এই হিসাবের মধ্যে সেগুলো নেই।

যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দামেও নতুন রেকর্ড

গত সপ্তাহে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। জুলাইয়ের পর এই প্রথম তেলের দাম এতটা বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর জ্বালানি ডিজেলের খুচরা দামও রোববার গ্যালনপ্রতি ৬ দশমিক ২০ ডলারের ওপরে উঠে নতুন সর্বোচ্চ রেকর্ড করেছে।

রোববার রয়টার্সকে কয়েকজন ব্যবসায়ী ও সৌদি আরবের তেল ক্রেতা জানিয়েছেন, শুক্রবার হামলার শিকার হওয়া পাইপলাইনটি বন্ধ থাকলে সৌদি আরবের লোহিত সাগরীয় বন্দর ইয়ানবুতে মজুত তেল দিয়ে দেশটি মাত্র পাঁচ থেকে সাত দিন রপ্তানি চালিয়ে যেতে পারবে।

এরপর বিশ্ববাজারে মোট তেল সরবরাহের আরও ৪ শতাংশ পর্যন্ত ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এর সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার কারণে ইতিমধ্যে প্রতিদিন যে কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেল সরবরাহ থেকে বাদ পড়ছে, সেটিও রয়েছে।

সৌদি আরব এখনো পাইপলাইনের ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ বিবরণ দেয়নি। এটি কতদিন বন্ধ থাকবে, সেটিও জানায়নি। রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা বিভিন্ন সূত্র মেরামতে প্রয়োজনীয় সময় নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিয়েছে। কারও মতে, কয়েক দিন সময় লাগতে পারে; আবার কারও মতে, কয়েক সপ্তাহও প্রয়োজন হতে পারে। স্যাটেলাইট ছবিতে পাইপলাইনের বিভিন্ন স্থান থেকে বিপুল পরিমাণ ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ছয় মাস আগে যে যুদ্ধ শুরু করেছিল, তার সঙ্গে সম্পর্কিত সাম্প্রতিক সহিংসতায় আগস্টের তুলনায় পরিস্থিতি আবারও অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। আগস্টে কিছুটা শান্ত পরিস্থিতির মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ ধীরে ধীরে বাড়ছিল।

লন্ডনভিত্তিক প্যান-আরব সংবাদমাধ্যম আল-আরাবি আল-জাদিদকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, ওমানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হলেও যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের দাবিগুলো পূরণ না করা পর্যন্ত ইরান হরমুজ প্রণালি আবার খুলবে না।

ইরানের বিরুদ্ধে ফেব্রুয়ারিতে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে লক্ষ্যগুলো নির্ধারণ করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখনো সেগুলো অর্জন করতে পারেনি। এসব লক্ষ্যের মধ্যে ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা, প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলা চালানোর সক্ষমতা থেকে দেশটিকে বিরত রাখা এবং ইরানের জনগণের জন্য তাদের শাসকদের ক্ষমতাচ্যুত করার মতো পরিস্থিতি তৈরি করা।

সপ্তাহান্তে আয়ারল্যান্ড সফরে গিয়ে ট্রাম্প আবারও বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এ বছরই শেষ হবে বলে তিনি আশা করছেন। নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই যুদ্ধ শেষ হতে পারে বলেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন। যুদ্ধ শেষ হলে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম ‘পাথরের মতো’ দ্রুত কমে যাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

হুতিদের হামলা অব্যাহত

সৌদি আরবে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের সর্বশেষ আন্তসীমান্ত হামলায় ক্ষয়ক্ষতির ভিডিও প্রকাশ করেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। এতে দক্ষিণাঞ্চলীয় জাজান প্রদেশের কয়েকটি বাড়ি ও একটি মসজিদ ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেখা যায়। হুতিরা দাবি করেছে, তারা জাজানের পাশের একটি প্রদেশে সৌদি আরবের একটি সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে।

এর আগে হুতিরা লোহিত সাগরের প্রবেশমুখ নিয়ন্ত্রণকারী বাব এল-মান্দেব প্রণালির পেরিম দ্বীপ দখল করে নেয়। ‘গেট অব টিয়ার্স’ বা ‘অশ্রুর দরজা’ নামে পরিচিত এই প্রণালিটি লোহিত সাগরের প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণ করে। লোহিত সাগরের উপকূল ধরে হুতিদের এই অগ্রযাত্রা ইয়েমেনে কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় লড়াইয়ের বিস্তার ঘটিয়েছে।

হুতিদের এই অগ্রযাত্রা এবং সৌদি আরবে তাদের হামলা যুক্তরাষ্ট্রের সামনে নতুন এক সংকট তৈরি করেছে। ওয়াশিংটন একদিকে সৌদি মিত্রদের সমর্থন দিতে এবং জাহাজ চলাচল সুরক্ষিত রাখতে চায়। অন্যদিকে আরেকটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সতর্ক।

রয়টার্স লিখেছে, হুতিদের হামলার কারণে উপসাগরীয় দেশগুলোর সামনেও কঠিন সিদ্ধান্তের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তাদের হয় ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ক্ষতি মেনে নিতে হবে, নয়তো ইরানের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে হবে।

এর আগে ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র দুই মাস ধরে হুতিদের ওপর বোমা হামলা চালিয়েছিল। তবে হুতিরা লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে হামলার হুমকি প্রত্যাহার করেছে— এমন ঘোষণা দেওয়ার পর ট্রাম্প ওই অভিযান বন্ধ করে দেন।

রয়টার্সকে তিনটি সূত্র জানিয়েছে, সৌদি আরবের কার্যত শাসক ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান গত বৃহস্পতিবার ট্রাম্পকে ফোন করে হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য সামরিক সহায়তা চেয়েছিলেন। তবে আপাতত তাকে শুধু গোয়েন্দা সহায়তার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

শনিবার ট্রাম্পও স্বীকার করেন যে তিনি ক্রাউন প্রিন্সের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, হুতিরাও মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং ওয়াশিংটনকে ইয়েমেনের যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়ার আহ্বান জানিয়েছে।

Ad
Ad
ad
ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

ইরান যুদ্ধের মধ্যেই ঐক্যের ডাক ব্রিকসের, বিকল্প বিশ্বব্যবস্থার বার্তা কতটা বাস্তব?

ইরান যুদ্ধের মধ্যেই নিজেদের মধ্যে ঐক্যের বার্তা দিলো ব্রিকস। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, একতরফা বাণিজ্যনীতি ও সামরিক আগ্রাসনের বিরোধিতা করে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে ১১ দেশের জোটটি। তবে দুই দিনের নয়াদিল্লি সম্মেলনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে থাকল— ব্রিকস কি সত্যিই পশ্চিমা

৬ ঘণ্টা আগে

মধ্যপ্রাচ্যে ‘সর্বোচ্চ সংযমে’র আহ্বান, আরও যা আছে ব্রিকসের যৌথ ঘোষণায়

৪০টির বেশি পৃষ্ঠার ঘোষণায় ব্রিকস নেতারা মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির দ্রুত অবনতিতে গভীর উদ্বেগ জানান। সংঘাত আরও বাড়াতে পারে— এমন যেকোনো পদক্ষেপ এড়িয়ে সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়ে তারা সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে সংকট সমাধানের ওপর জোর দেন। তবে ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়ে

৭ ঘণ্টা আগে

ইউক্রেনের ট্রেনে রুশ হামলা, কয়েক মিনিটের ব্যবধানে রক্ষা পেলেন বরিস জনসন

ইউক্রেনীয় রেল কর্তৃপক্ষের ধারণা, হামলার লক্ষ্য ওই কূটনৈতিক ট্রেনটিও হয়ে থাকতে পারে। তবে মস্কো বলেছে, তারা ইউক্রেনের রেল অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে, যেগুলো ইউরোপ থেকে সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনে ব্যবহৃত হচ্ছে।

৮ ঘণ্টা আগে

ইয়েমেনে হুতি-সরকারি বাহিনীর লড়াই তীব্র, সৌদির ১২৯ বিমান হামলার দাবি

শনিবার ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী জানায়, লোহিত সাগর উপকূলে হুতিদের অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানো হয়েছে। সরকারি সংবাদ সংস্থা সাবার প্রতিবেদনে বলা হয়, মোখার কাছে হামলায় হুতিদের কয়েকটি যান ও অস্ত্র ধ্বংস এবং বেশ কয়েকজন যোদ্ধা নিহত হয়েছে। মোখা-ধুবাব সড়কেও হুতিদের যান ও সদস্যদের লক্ষ্য করে হামলা চালান

১৮ ঘণ্টা আগে
Advertisement