ফিচার

হিউয়েন সাংয়ের ভারত ভ্রমণ

অরুণাভ বিশ্বাস
চ্যাটজিপিটির চোখে হিউয়েন সাং

চীনেরে বিখ্যাত পরিব্রাজক হিউয়েন সাং-এর (Xuanzang) ভারত ভ্রমণ এসেছিলেন আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে। এসেছিলেন বাংলায়ও। ইতিহাসে তিনি যেমন একজন ভ্রমণপ্রেমী, তেমনি এক অসামান্য সংস্কৃতি-অনুসন্ধানীর সাহসী অভিযাত্রার তাঁর সেই ভ্রমণকাহিনি। সপ্তম শতকে তাঁর এই দীর্ঘ ভ্রমণ আমাদের আজও নিয়ে যায় প্রাচীন ভারতের ধর্ম, শিক্ষা, রাজনীতি এবং সামাজিক জীবনের এক মূল্যবান ছবিতে। হিউয়েন সাং-এর যাত্রা ছিল বৌদ্ধধর্ম অনুসন্ধানের উদ্দেশ্যে, কিন্তু তিনি যে নিখুঁতভাবে ভারতকে বর্ণনা করে গেছেন, তা ভারতের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বোঝার এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে উঠেছে।

৬০২ খ্রিষ্টাব্দে চীনের হেনান প্রদেশে জন্ম নেওয়া হিউয়েন সাং ছোটবেলা থেকেই বৌদ্ধধর্মের প্রতি গভীর আগ্রহী ছিলেন। বড় হয়ে তিনি 'তাং' (Tang) সাম্রাজ্যের বিখ্যাত বৌদ্ধ সন্ন্যাসী হয়ে ওঠেন। সে সময় চীনে পালি ও সংস্কৃত ভাষার বহু বৌদ্ধ গ্রন্থ অনুবাদিত হলেও, তাঁদের অনেকগুলোতেই অস্পষ্টতা ও ভুল ছিল। সেই সমস্যাগুলোর সমাধান খুঁজতেই হিউয়েন সাং সিদ্ধান্ত নেন ভারত ভ্রমণের।

৬২৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি গোপনে চীন ছাড়েন, কারণ সে সময় সম্রাটের অনুমতি ছাড়া বিদেশ ভ্রমণ করা নিষিদ্ধ ছিল। তাঁর যাত্রাপথ ছিল বিপদে ভরা—গিরি, মরুভূমি, ডাকাতি, খরা, এবং ঠাণ্ডা—সবই পেরিয়ে তিনি অবশেষে ৬৩০ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল, আজকের পাকিস্তান অংশে প্রবেশ করেন।

হিউয়েন সাং ভারতবর্ষে প্রায় ১৭ বছর কাটান। এর মধ্যে ১৩ বছর ভ্রমণে এবং ৪ বছর মূলত নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন ও অনুবাদকাজে নিয়োজিত ছিলেন। তাঁর রচনার সবচেয়ে বিখ্যাত অংশ হলো “সি-ইউ-কি” (Si-Yu-Ki), যার অর্থ ‘পশ্চিম দেশে যাত্রার রেকর্ড’। এই গ্রন্থে তিনি ভারতের ১৩৮টি রাজ্য, নানা সম্প্রদায়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মন্দির, রাজনীতি ও সমাজ ব্যবস্থা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন।

তাঁর মতে, ভারত ছিল একটি বহুজাতিক ও বহুধর্মীয় সভ্যতা যেখানে বৌদ্ধ, হিন্দু, জৈন ও অন্যান্য ধর্মের মানুষ সহাবস্থান করত। বিশেষ করে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্ণনায় তিনি লিখেছেন, সেখানে দশ হাজারেরও বেশি ছাত্র ও শিক্ষক থাকতেন এবং তারা বহু ভাষা ও দর্শনে দক্ষ ছিলেন।

নালন্দার বর্ণনা দিতে গিয়ে হিউয়েন সাং লিখেছেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অসাধারণ জ্ঞানসম্পন্ন। ছাত্রদের প্রবেশের আগে কঠিন মৌখিক পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়।” তিনি নিজেও সেখানে অধ্যয়ন করেন এবং পরে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধ গ্রন্থ অনুবাদ করে চীনে নিয়ে যান।

নালন্দার বাইরেও তিনি যাত্রা করেছেন কাশী, প্রয়াগ, পাটলিপুত্র (আজকের পাটনা), গয়া, মথুরা, কাঞ্চী, অন্ধ্র, কলিঙ্গ, উজ্জয়িনী, এবং কাশ্মীর পর্যন্ত। এসব অঞ্চলে বিভিন্ন রাজা তাঁকে সম্মানিত করেন, আশ্রয় দেন এবং বহু প্রশ্নের উত্তর চান ধর্ম নিয়ে।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো রাজা হর্ষবর্ধনের (Harshavardhana) সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। এই রাজা তখন উত্তর ভারতের বিশাল অংশের অধিপতি। হিউয়েন সাং তাঁর রাজসভায় আমন্ত্রিত হন, এবং তিনদিনব্যাপী ধর্মসভায় ধর্ম, দর্শন এবং নীতিবোধ নিয়ে বিতর্ক ও আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

হিউয়েন সাং ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে তিনি মনে করতেন ভারত হচ্ছে আত্মার সত্য অনুসন্ধানের শ্রেষ্ঠ ভূমি। তিনি নানা আচার, ধর্মীয় উৎসব, পোশাক-পরিচ্ছদ, জীবনযাত্রা এবং শিক্ষা ব্যবস্থার গভীর বিশ্লেষণ করেছেন।

ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ও ভারতবিদ অধ্যাপক রোমিলা থাপার এই ভ্রমণবৃত্তান্তকে ভারত-চীন সম্পর্কের এক ঐতিহাসিক সেতু হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, “হিউয়েন সাং-এর লেখা শুধুমাত্র একটি পর্যবেক্ষণ নয়; বরং এটি প্রাচীন ভারত সম্পর্কে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও বিস্তারিত তথ্যসূত্র।”

অন্যদিকে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ইতিহাসবিদ ড. জর্জ গ্রিনহাম বলেন, “সি-ইউ-কি নিছক একটি ভ্রমণবৃত্তান্ত নয়। এটি এমন এক দলিল, যা প্রাচীন ভারতের সমাজ-রাজনীতির নির্মোহ প্রতিফলন। এতে দেখা যায়, ভারতের একদিকে ধর্মীয় সহনশীলতা, অন্যদিকে জাতপাত ও সামাজিক বৈষম্য কেমনভাবে সহাবস্থান করত।”

তিনি আরও বলেন, “হিউয়েন সাং-এর লেখায় প্রাচীন ভারতের অসাধারণ বৈচিত্র্য উঠে এসেছে—কোথাও বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব, কোথাও শৈব বা বৈষ্ণব প্রাধান্য, আবার কোথাও সমানভাবে জৈন ধর্মের প্রসার।”

হিউয়েন সাং শুধু ভারতের ধর্ম নয়, বরং চিকিৎসা, গণিত, জ্যোতিষ, ভাষাতত্ত্ব, শিল্প ও স্থাপত্য নিয়েও তথ্য সংগ্রহ করেন। তিনি দেখেছেন কীভাবে ভারতের বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসকেরা আয়ুর্বেদ ব্যবহার করেন, কীভাবে সমাজে জ্যোতিষীদের সম্মান রয়েছে, কিংবা কীভাবে ভাস্কর্য ও মন্দির নির্মাণ করা হয়।

তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্ত থেকে আমরা জানতে পারি, প্রাচীন ভারতে রাস্তাঘাট উন্নত না হলেও, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল ভালো। কোথাও কোথাও রাজারা পথিকদের জন্য বিশ্রামাগার ও খাবারের ব্যবস্থা করতেন।

একটি চমকপ্রদ তথ্য হলো—হিউয়েন সাং তাঁর রচনায় কুম্ভমেলারও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “প্রত্যেক বারো বছর অন্তর গঙ্গার তীরে লক্ষ লক্ষ লোক সমবেত হন, স্নান করেন, দান করেন এবং ধর্মকথা শ্রবণ করেন।” গবেষকদের মতে, এটি কুম্ভমেলার সবচেয়ে প্রাচীন বিদেশি বর্ণনা।

হিউয়েন সাং ভারতে যে সময় এসেছিলেন, তখন বৌদ্ধধর্ম ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা হারাচ্ছিল। তিনি নিজেও তা লক্ষ্য করেন এবং লিখে যান, “অনেক জায়গায় মঠ পরিত্যক্ত, ভিক্ষুরা কমে গেছে। কিন্তু যেসব জায়গায় বৌদ্ধ শিক্ষা টিকে আছে, সেখানকার ভিক্ষুরা ভীষণ নিষ্ঠাবান।”

তাঁর লেখায় একদিকে যেমন ভারতের প্রশংসা আছে, তেমনি কিছু সমালোচনাও রয়েছে। যেমন তিনি জাতিভেদের কড়া সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, “ভারতবাসীরা শুচিতার প্রতি খুব যত্নবান হলেও, একে অপরকে জাত ও বর্ণভেদে ভাগ করে রাখে, যা সমাজের অগ্রগতিতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

৬৪৫ খ্রিষ্টাব্দে হিউয়েন সাং চীনে ফিরে যান। সঙ্গে নিয়ে যান ৬৫৭টি বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ, বহু পাণ্ডুলিপি এবং প্রতিমা। তিনি জীবনের শেষ ১৯ বছর কাটিয়েছেন চীনে সেসব অনুবাদ ও ব্যাখ্যা করতে। তাঁর অনুবাদকর্ম এতটাই নিখুঁত ছিল যে আজও সেগুলো বৌদ্ধধর্মের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হিসেবে গণ্য হয়।

চীনের লুয়োইয়াং শহরে তিনি তাঁর জীবন শেষ করেন। চীন তাঁকে স্মরণ করে ‘তাং সাম্রাজ্যের আলোকবর্তিকা’ নামে। ভারতও তাঁকে স্মরণ করে, কারণ তাঁর চোখ দিয়েই আমরা সেই সময়ের ভারতকে চিনতে পারি।

সাম্প্রতিক সময়ে ইউনেস্কো হিউয়েন সাং-এর ভ্রমণকে 'সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সেতু' হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ২০১৬ সালে ভারত ও চীনের যৌথ উদ্যোগে একটি টেলিভিশন ধারাবাহিক তৈরি হয় তাঁর জীবন অবলম্বনে, যা দুই দেশের বন্ধুত্বের প্রতীক হয়ে ওঠে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, হিউয়েন সাং শুধু একজন পর্যটক ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক অনন্য গবেষক, যিনি নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন দুটি সভ্যতার মধ্যে জ্ঞানের সংযোগ ঘটানোর দায়িত্ব। তাঁর চোখ দিয়ে আমরা দেখতে পাই—প্রাচীন ভারতের ধর্মীয় সহনশীলতা, জ্ঞানচর্চার ধারা, ও সাংস্কৃতিক গভীরতা কী রকম ছিল। আজকের দিনে যখন পৃথিবী আবার নানা বিভাজনে ক্ষতবিক্ষত, তখন হিউয়েন সাং-এর যাত্রা আমাদের শেখায়—জ্ঞান, সহনশীলতা ও বন্ধুত্বই সবচেয়ে বড় সম্পদ।

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

লাগামহীন দ্রব্যমূল্য, ইরানে সহিংস বিক্ষোভে নিহত ৬

চরম অর্থনৈতিক সংকট ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে চলমান এ বিক্ষোভ এরই মধ্যে গত তিন বছরের মধ্যে দেশটিতে হওয়া সবচেয়ে বড় বিক্ষোভে রূপ নিয়েছে।

৮ ঘণ্টা আগে

আফগানিস্তানে ভারী বৃষ্টি: খরা কাটলেও আকস্মিক বন্যায় নিহত ১৭

মৌসুমের প্রথম ভারী বৃষ্টি ও তুষারপাত আফগানিস্তানে দীর্ঘদিনের খরা পরিস্থিতির অবসান ঘটলেও বিভিন্ন এলাকায় আকস্মিক বন্যা দেখা দিয়েছে। এতে অন্তত ১৭ জন নিহত এবং ১১ জন আহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) এনবিসির খবরে এ তথ্য জানানো হয়।

১০ ঘণ্টা আগে

যুক্তরাষ্ট্রের চাপ, ভেনেজুয়েলার কারাগার থেকে মুক্তি পেল ৮৮ ভিন্নমতাবলম্বী

দেশটি কারা মন্ত্রণালয় জানায়, বৃহস্পতিবার মুক্তি পাওয়া ৮৮ জন ‘চরমপন্থি গোষ্ঠীর সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার’ অভিযোগে কারাবন্দি ছিলেন। এর আগে দুটি মানবাধিকার সংগঠনও অন্তত ৮৭ জন বন্দির মুক্তির খবর নিশ্চিত করে।

১১ ঘণ্টা আগে

সুইজারল্যান্ডে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে আগুন: ৪০ জন নিহত, ৫ দিনের শোক

সুইজারল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি বিলাসবহুল স্কি রিসোর্টে নববর্ষ উদযাপনের সময় এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৪০ জন নিহত এবং অন্তত ১১৫ জন আহত হয়েছেন। দেশটির প্রেসিডেন্ট গি পারমেলা এ ঘটনায় পাঁচ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছেন।

১১ ঘণ্টা আগে