
ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম

বাংলাদেশ সীমান্তের নদীঘেরা দুর্গম অংশে কাঁটাতারের বেড়া বসানো কঠিন হওয়ায় সেখানে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান ঠেকাতে ‘প্রাকৃতিক প্রতিরোধক’ হিসেবে কুমির ও বিষধর সাপ ছাড়ার পরিকল্পনা করেছে ভারত। এই উদ্যোগ ঘিরে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দেশটির মানবাধিকার কর্মী ও পরিবেশবিদরা বলছেন, এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে তা জনজীবন ও পরিবেশের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের বেশির ভাগ অংশই দুর্গম ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে গেছে—যেখানে অনেক জায়গায় বেড়া দেওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
গত ২৬ মার্চ ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) তাদের পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সদর দপ্তরগুলোকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ নদীভিত্তিক ফাঁকফোকরে সরীসৃপ ব্যবহারের সম্ভাব্যতা যাচাই’ করতে নির্দেশ দেয়। এই নতুন উদ্যোগ ভারতেই মানবাধিকারকর্মী ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণবাদীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
এই পদক্ষেপ সীমান্তের দুই পাশের স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও আঞ্চলিক বাস্তুতন্ত্রের জন্য কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে— এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
কেন ‘হিংস্র বন্যপ্রাণী’ ব্যবহার করতে চায় ভারত?
পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় ও মিজোরাম রাজ্যের মধ্য দিয়ে গেছে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত। এই এলাকাগুলোর ভূপ্রকৃতি পাহাড়, নদী ও উপত্যকা মিলিয়ে বেশ প্রতিকূল।
ভারত ইতোমধ্যে প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার সীমান্তে বেড়া নির্মাণ করেছে। তবে বাকি অংশের অনেকটাই জলাভূমি ও নদীবেষ্টিত এলাকা, যেখানে দুই পাশেই জনবসতি রয়েছে।

সাম্প্রতিক নির্দেশনায় বিএসএফ তাদের সীমান্ত ইউনিটগুলোকে নদীভিত্তিক ফাঁকফোকরে ‘সরীসৃপ ব্যবহারের মাধ্যমে কঠোরভাবে নির্দেশনা বাস্তবায়ন’ নিশ্চিত করতে বলেছে। আঞ্চলিক গণমাধ্যম নর্থইস্ট নিউজ প্রথম এ তথ্য প্রকাশ করে।
এর আগে গত বছর ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিকূল ভূপ্রকৃতি সত্ত্বেও বিএসএফ অবৈধ সীমান্ত পারাপার ও অনথিভুক্ত অভিবাসন রোধে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছে।
ওই প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, নদীবেষ্টিত বা নিচুভূমি এলাকা, সীমান্তঘেঁষা বসতি, জমি অধিগ্রহণের জটিলতা এবং স্থানীয়দের প্রতিবাদের কারণে কিছু অংশে বেড়া নির্মাণ ধীরগতির।
সাম্প্রতিক উদ্যোগে কুমিরের মতো বিপজ্জনক প্রাণী ব্যবহার করে শরণার্থী ও অভিবাসীদের ঠেকানোর পরিকল্পনায় বিশ্লেষক ও অধিকারকর্মীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। উত্তর-পূর্ব ও পূর্ব ভারতের সীমান্ত অঞ্চল নিয়ে কাজ করা গবেষক অংশুমান চৌধুরী বলেন, ‘এটা হাস্যকর হতো, যদি না বিষয়টি এতটা ভয়ংকর ও বিপজ্জনক হতো। সত্যিই এটি অযৌক্তিক।’
তিনি আরও বলেন, ‘একবার বিষধর সাপ বা কুমির ছেড়ে দিলে তারা তো আর বুঝতে পারবে না কে বাংলাদেশি, আর কে ভারতীয়।’
অংশুমান চৌধুরীর ভাষ্য, ‘এটি অনথিভুক্ত অভিবাসীদের বিরুদ্ধে নিষ্ঠুরতা ও অমানবিক আচরণের চূড়ান্ত উদাহরণ। প্রকৃতি ও প্রাণীদের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার এক নতুন পদ্ধতি— এটি এক ধরনের বায়োপলিটিক্যাল সহিংসতা।’
তিনি আরও বলেন, “ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ‘দুর্বলতম অংশ’ হচ্ছে নদী। বিএসএফ বরাবরই মনে করে এসেছে, সীমান্তের নদী অংশে বেড়া দেওয়া কার্যত অসম্ভব।”

এই উদ্যোগের নেপথ্যে কী?
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদী সরকার দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, অনথিভুক্ত অভিবাসীরা দেশের জনসংখ্যার ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে।
মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বক্তব্য ব্যবহার করে ভারত সরকার বিশেষ করে দেশের পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাঙালি মুসলমানসহ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারতের বিভাজনের ফলে বাংলা অঞ্চল দুই ভাগে বিভক্ত হয়। তবে সীমান্তের দুই পাশের মানুষের মধ্যে এখনও সাংস্কৃতিক ও জাতিগত সম্পর্ক রয়েছে।
বিএসএফ সদস্যদের বিরুদ্ধে এর আগে একাধিকবার বন্দুকের মুখে ভারতীয় মুসলমানদের বাংলাদেশে পুশ-ইনের (সন্দেহভাজন অবৈধ অনুপ্রবেশকারীকে গোপনে সীমান্ত দিয়ে ঠেলে দেওয়া) অভিযোগও উঠে এসেছে।
ভারতে অনথিভুক্ত অভিবাসীর সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই। চলতি মাসে নতুন জনগণনা শুরু হলেও সর্বশেষ জনগণনা হয়েছিল ২০১১ সালে।
মানবাধিকারকর্মী হর্ষ মন্দর বলেন, অনথিভুক্ত অভিবাসীর সংখ্যা বাড়লেও বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সমন্বয় ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে ভারত ‘বিচারবহির্ভূত পদ্ধতি’ বেছে নিয়েছে।
অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, অভিবাসী ইস্যুকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে মুসলমানদের, অন্যায্যভাবে টার্গেট করা হচ্ছে।
হর্ষ মন্দর বলেন, “ভারতের ‘বিতর্কিত নাগরিকত্ব’ ইস্যুতে অবস্থান নিষ্ঠুর এবং সংবিধান ও আন্তর্জাতিক নীতির পরিপন্থি।” তিনি অভিযোগ করেন, সরকার অভিবাসী ধরার নামে বাস্তবে ভারতীয় মুসলমানদের সীমান্ত পার করে বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করছে।
‘এভাবে মুসলমানদের মধ্যে স্থায়ী ভয় তৈরি করা হচ্ছে— যেন তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হতে পারে এবং তারা রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়তে পারে,’ যোগ করেন তিনি।

গবেষক অংশুমান চৌধুরী বলেন, আসাম রাজ্যে ‘ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল’ নামে বিশেষ আদালত গঠন করা হয়েছে, যা সন্দেহভাজন ব্যক্তি বিদেশি না ভারতীয় নাগরিক— তা নির্ধারণ করে। তবে অনেক ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব প্রমাণের কাগজপত্র দেখাতে না পারায় ভারতীয়দেরও ‘বিদেশি’ ঘোষণা করা হয়েছে।
তার ভাষায়, এই জোরপূর্বক ঠেলে দেওয়া সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের এক ‘নতুন ও ভয়ংকর’ পদ্ধতি। তিনি মনে করেন, কুমির ও বিষধর সাপ ব্যবহারের ধারণা ওই একই নীতিরই ‘সম্প্রসারিত রূপ’।
বাস্তুতন্ত্রে এর প্রভাব কেমন হতে পারে?
বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের নদীবেষ্টিত এলাকায় স্বাভাবিকভাবে কুমির পাওয়া যায় না। ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়ার কর্মকর্তা রথীন বর্মন বলেন, পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবনে এক ধরনের এবং আসামের নির্দিষ্ট জলাভূমিতে আরেক প্রজাতির কুমির থাকলেও সীমান্ত এলাকায় এগুলো স্বাভাবিকভাবে বাস করে না। সেখানে নিয়ে গেলে তারা টিকে থাকতে নাও পারে।
তিনি বলেন, ‘প্রথমেই দেখা যাবে, অল্প সময়ের মধ্যেই কুমিরগুলো মারা যাচ্ছে। একই কথা কথিত বিষধর সাপের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রজাতির স্বাভাবিক বিস্তারে হস্তক্ষেপ করলে পুরো বাস্তুতন্ত্রেই প্রভাব পড়তে পারে। এতে পুরো খাদ্যশৃঙ্খল ও পরিবেশগত ভারসাম্য ব্যাহত হতে পারে।
রথীন বর্মন আরও বলেন, ‘ওই এলাকায় থাকা অন্যান্য প্রাণীরও বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। প্রযুক্তিগতভাবেও এটি মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রবাহমান নদীতে এ ধরনের পরিকল্পনা কখনোই কার্যকর হবে না।’

এ ছাড়া, সীমান্তবর্তী জলাভূমিগুলোতে প্রায়ই বন্যা হয়। ফলে বিষধর সাপ বসতিতে ঢুকে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা বিশেষ করে জেলে সম্প্রদায়সহ স্থানীয়দের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
মানবাধিকারকর্মী হর্ষ মন্দর বলেন, ‘এ ধরনের নীতি রাষ্ট্রের নিষ্ঠুরতার প্রতিফলন। কোনো অনথিভুক্ত অভিবাসীকে কুমির-সাপের মুখে ফেলা বা বন্দুকের মুখে ঠেলে দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।’
তিনি বলেন, “এই প্রাণীরা কখনোই নির্ধারণ করতে পারবে না কে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’। ফলে তারা সীমান্তের দুই পাশের স্থানীয় মানুষকেই আক্রমণ করতে পারে।”
বিশ্বের অন্য কোথাও এমন নজির রয়েছে?
আধুনিক বিশ্বে আন্তর্জাতিক সীমান্ত রক্ষায় প্রাকৃতিক শিকারি প্রাণী ব্যবহারের কোনো নজির নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে সীমান্তে অভিবাসী ঠেকাতে সাপ বা অ্যালিগেটরে ভরা খাল নির্মাণের মতো ধারণা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন বলে জানা যায়। যদিও তিনি পরে তা অস্বীকার করে ‘ভুয়া খবর’ বলেন।
তবে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে একটি তুলনামূলক উদাহরণ সামনে এসেছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে চালু হওয়া সাউথ ফ্লোরিডা ডিটেনশন ফ্যাসিলিটি— যা ‘অ্যালিগেটর আলকাট্রাজ’ নামে পরিচিত— যেখানে প্রাকৃতিকভাবে শিকারি প্রাণী থাকার কারণে পালানো প্রায় অসম্ভব।
মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, ওই কেন্দ্রটি অমানবিক পরিবেশের জন্য সমালোচিত হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বৈচিত্র্যময় ও সংবেদনশীল ‘এভারগ্লেডস বাস্তুতন্ত্রে’র ক্ষতি করছে— এ কারণে এটি বন্ধের দাবি উঠেছে।
রাজনীতি/আইআর

বাংলাদেশ সীমান্তের নদীঘেরা দুর্গম অংশে কাঁটাতারের বেড়া বসানো কঠিন হওয়ায় সেখানে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান ঠেকাতে ‘প্রাকৃতিক প্রতিরোধক’ হিসেবে কুমির ও বিষধর সাপ ছাড়ার পরিকল্পনা করেছে ভারত। এই উদ্যোগ ঘিরে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দেশটির মানবাধিকার কর্মী ও পরিবেশবিদরা বলছেন, এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে তা জনজীবন ও পরিবেশের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের বেশির ভাগ অংশই দুর্গম ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে গেছে—যেখানে অনেক জায়গায় বেড়া দেওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
গত ২৬ মার্চ ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) তাদের পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সদর দপ্তরগুলোকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ নদীভিত্তিক ফাঁকফোকরে সরীসৃপ ব্যবহারের সম্ভাব্যতা যাচাই’ করতে নির্দেশ দেয়। এই নতুন উদ্যোগ ভারতেই মানবাধিকারকর্মী ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণবাদীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
এই পদক্ষেপ সীমান্তের দুই পাশের স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও আঞ্চলিক বাস্তুতন্ত্রের জন্য কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে— এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
কেন ‘হিংস্র বন্যপ্রাণী’ ব্যবহার করতে চায় ভারত?
পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় ও মিজোরাম রাজ্যের মধ্য দিয়ে গেছে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত। এই এলাকাগুলোর ভূপ্রকৃতি পাহাড়, নদী ও উপত্যকা মিলিয়ে বেশ প্রতিকূল।
ভারত ইতোমধ্যে প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার সীমান্তে বেড়া নির্মাণ করেছে। তবে বাকি অংশের অনেকটাই জলাভূমি ও নদীবেষ্টিত এলাকা, যেখানে দুই পাশেই জনবসতি রয়েছে।

সাম্প্রতিক নির্দেশনায় বিএসএফ তাদের সীমান্ত ইউনিটগুলোকে নদীভিত্তিক ফাঁকফোকরে ‘সরীসৃপ ব্যবহারের মাধ্যমে কঠোরভাবে নির্দেশনা বাস্তবায়ন’ নিশ্চিত করতে বলেছে। আঞ্চলিক গণমাধ্যম নর্থইস্ট নিউজ প্রথম এ তথ্য প্রকাশ করে।
এর আগে গত বছর ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিকূল ভূপ্রকৃতি সত্ত্বেও বিএসএফ অবৈধ সীমান্ত পারাপার ও অনথিভুক্ত অভিবাসন রোধে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছে।
ওই প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, নদীবেষ্টিত বা নিচুভূমি এলাকা, সীমান্তঘেঁষা বসতি, জমি অধিগ্রহণের জটিলতা এবং স্থানীয়দের প্রতিবাদের কারণে কিছু অংশে বেড়া নির্মাণ ধীরগতির।
সাম্প্রতিক উদ্যোগে কুমিরের মতো বিপজ্জনক প্রাণী ব্যবহার করে শরণার্থী ও অভিবাসীদের ঠেকানোর পরিকল্পনায় বিশ্লেষক ও অধিকারকর্মীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। উত্তর-পূর্ব ও পূর্ব ভারতের সীমান্ত অঞ্চল নিয়ে কাজ করা গবেষক অংশুমান চৌধুরী বলেন, ‘এটা হাস্যকর হতো, যদি না বিষয়টি এতটা ভয়ংকর ও বিপজ্জনক হতো। সত্যিই এটি অযৌক্তিক।’
তিনি আরও বলেন, ‘একবার বিষধর সাপ বা কুমির ছেড়ে দিলে তারা তো আর বুঝতে পারবে না কে বাংলাদেশি, আর কে ভারতীয়।’
অংশুমান চৌধুরীর ভাষ্য, ‘এটি অনথিভুক্ত অভিবাসীদের বিরুদ্ধে নিষ্ঠুরতা ও অমানবিক আচরণের চূড়ান্ত উদাহরণ। প্রকৃতি ও প্রাণীদের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার এক নতুন পদ্ধতি— এটি এক ধরনের বায়োপলিটিক্যাল সহিংসতা।’
তিনি আরও বলেন, “ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ‘দুর্বলতম অংশ’ হচ্ছে নদী। বিএসএফ বরাবরই মনে করে এসেছে, সীমান্তের নদী অংশে বেড়া দেওয়া কার্যত অসম্ভব।”

এই উদ্যোগের নেপথ্যে কী?
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদী সরকার দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, অনথিভুক্ত অভিবাসীরা দেশের জনসংখ্যার ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে।
মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বক্তব্য ব্যবহার করে ভারত সরকার বিশেষ করে দেশের পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাঙালি মুসলমানসহ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারতের বিভাজনের ফলে বাংলা অঞ্চল দুই ভাগে বিভক্ত হয়। তবে সীমান্তের দুই পাশের মানুষের মধ্যে এখনও সাংস্কৃতিক ও জাতিগত সম্পর্ক রয়েছে।
বিএসএফ সদস্যদের বিরুদ্ধে এর আগে একাধিকবার বন্দুকের মুখে ভারতীয় মুসলমানদের বাংলাদেশে পুশ-ইনের (সন্দেহভাজন অবৈধ অনুপ্রবেশকারীকে গোপনে সীমান্ত দিয়ে ঠেলে দেওয়া) অভিযোগও উঠে এসেছে।
ভারতে অনথিভুক্ত অভিবাসীর সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই। চলতি মাসে নতুন জনগণনা শুরু হলেও সর্বশেষ জনগণনা হয়েছিল ২০১১ সালে।
মানবাধিকারকর্মী হর্ষ মন্দর বলেন, অনথিভুক্ত অভিবাসীর সংখ্যা বাড়লেও বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সমন্বয় ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে ভারত ‘বিচারবহির্ভূত পদ্ধতি’ বেছে নিয়েছে।
অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, অভিবাসী ইস্যুকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে মুসলমানদের, অন্যায্যভাবে টার্গেট করা হচ্ছে।
হর্ষ মন্দর বলেন, “ভারতের ‘বিতর্কিত নাগরিকত্ব’ ইস্যুতে অবস্থান নিষ্ঠুর এবং সংবিধান ও আন্তর্জাতিক নীতির পরিপন্থি।” তিনি অভিযোগ করেন, সরকার অভিবাসী ধরার নামে বাস্তবে ভারতীয় মুসলমানদের সীমান্ত পার করে বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করছে।
‘এভাবে মুসলমানদের মধ্যে স্থায়ী ভয় তৈরি করা হচ্ছে— যেন তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হতে পারে এবং তারা রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়তে পারে,’ যোগ করেন তিনি।

গবেষক অংশুমান চৌধুরী বলেন, আসাম রাজ্যে ‘ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল’ নামে বিশেষ আদালত গঠন করা হয়েছে, যা সন্দেহভাজন ব্যক্তি বিদেশি না ভারতীয় নাগরিক— তা নির্ধারণ করে। তবে অনেক ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব প্রমাণের কাগজপত্র দেখাতে না পারায় ভারতীয়দেরও ‘বিদেশি’ ঘোষণা করা হয়েছে।
তার ভাষায়, এই জোরপূর্বক ঠেলে দেওয়া সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের এক ‘নতুন ও ভয়ংকর’ পদ্ধতি। তিনি মনে করেন, কুমির ও বিষধর সাপ ব্যবহারের ধারণা ওই একই নীতিরই ‘সম্প্রসারিত রূপ’।
বাস্তুতন্ত্রে এর প্রভাব কেমন হতে পারে?
বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের নদীবেষ্টিত এলাকায় স্বাভাবিকভাবে কুমির পাওয়া যায় না। ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়ার কর্মকর্তা রথীন বর্মন বলেন, পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবনে এক ধরনের এবং আসামের নির্দিষ্ট জলাভূমিতে আরেক প্রজাতির কুমির থাকলেও সীমান্ত এলাকায় এগুলো স্বাভাবিকভাবে বাস করে না। সেখানে নিয়ে গেলে তারা টিকে থাকতে নাও পারে।
তিনি বলেন, ‘প্রথমেই দেখা যাবে, অল্প সময়ের মধ্যেই কুমিরগুলো মারা যাচ্ছে। একই কথা কথিত বিষধর সাপের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রজাতির স্বাভাবিক বিস্তারে হস্তক্ষেপ করলে পুরো বাস্তুতন্ত্রেই প্রভাব পড়তে পারে। এতে পুরো খাদ্যশৃঙ্খল ও পরিবেশগত ভারসাম্য ব্যাহত হতে পারে।
রথীন বর্মন আরও বলেন, ‘ওই এলাকায় থাকা অন্যান্য প্রাণীরও বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। প্রযুক্তিগতভাবেও এটি মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রবাহমান নদীতে এ ধরনের পরিকল্পনা কখনোই কার্যকর হবে না।’

এ ছাড়া, সীমান্তবর্তী জলাভূমিগুলোতে প্রায়ই বন্যা হয়। ফলে বিষধর সাপ বসতিতে ঢুকে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা বিশেষ করে জেলে সম্প্রদায়সহ স্থানীয়দের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
মানবাধিকারকর্মী হর্ষ মন্দর বলেন, ‘এ ধরনের নীতি রাষ্ট্রের নিষ্ঠুরতার প্রতিফলন। কোনো অনথিভুক্ত অভিবাসীকে কুমির-সাপের মুখে ফেলা বা বন্দুকের মুখে ঠেলে দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।’
তিনি বলেন, “এই প্রাণীরা কখনোই নির্ধারণ করতে পারবে না কে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’। ফলে তারা সীমান্তের দুই পাশের স্থানীয় মানুষকেই আক্রমণ করতে পারে।”
বিশ্বের অন্য কোথাও এমন নজির রয়েছে?
আধুনিক বিশ্বে আন্তর্জাতিক সীমান্ত রক্ষায় প্রাকৃতিক শিকারি প্রাণী ব্যবহারের কোনো নজির নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে সীমান্তে অভিবাসী ঠেকাতে সাপ বা অ্যালিগেটরে ভরা খাল নির্মাণের মতো ধারণা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন বলে জানা যায়। যদিও তিনি পরে তা অস্বীকার করে ‘ভুয়া খবর’ বলেন।
তবে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে একটি তুলনামূলক উদাহরণ সামনে এসেছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে চালু হওয়া সাউথ ফ্লোরিডা ডিটেনশন ফ্যাসিলিটি— যা ‘অ্যালিগেটর আলকাট্রাজ’ নামে পরিচিত— যেখানে প্রাকৃতিকভাবে শিকারি প্রাণী থাকার কারণে পালানো প্রায় অসম্ভব।
মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, ওই কেন্দ্রটি অমানবিক পরিবেশের জন্য সমালোচিত হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বৈচিত্র্যময় ও সংবেদনশীল ‘এভারগ্লেডস বাস্তুতন্ত্রে’র ক্ষতি করছে— এ কারণে এটি বন্ধের দাবি উঠেছে।
রাজনীতি/আইআর

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি এবং লেবাননের কৃষি মন্ত্রণালয় বুধবার এক যৌথ বিবৃতিতে জানায়, বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ ৪০ হাজার (১.২৪ মিলিয়ন) মানুষ ‘সংকট পর্যায় বা তার চেয়েও গুরুতর’ খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকিতে রয়েছে।
৯ ঘণ্টা আগে
মার্কিন কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে এই ব্যয় নিয়ে রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। একদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন রিপাবলিকানরা হাউজে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে লড়াইয়ের মুখে, অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা জনমত জরিপে এগিয়ে থেকে এই ব্যয়বহুল ও অজনপ্রিয় যুদ্ধকে ‘দাম বেড়ে যাওয়ার’ ইস্যুর সঙ্গে
১৮ ঘণ্টা আগে
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষে প্রকাশ হতে শুরু করেছে বুথফেরত জরিপের ফলাফল। বেশিরভাগ জরিপে বিজেপি এগিয়ে, আবার কোনোটিতে বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত রয়েছে। বুথফেরত সমীক্ষার ফল সত্যি হলে প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে বিজেপি।
২০ ঘণ্টা আগে
এর মধ্যে বিক্ষোভের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে অন্তত নয়জন, বিরোধী দলের সদস্য অভিযোগে দশ জনকে এবং গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে দুই জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
১ দিন আগে