পুতিনের ‘বন্ধু’, কুরাসাওয়ের বিশ্বকাপ রূপকার

সিদ্দিকী নুর বাপ্পী
আপডেট : ১৯ জুন ২০২৬, ১৩: ৫৭
২০২৪ সালে দায়িত্ব নিয়ে ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র কুরাসাওকে বিশ্বকাপে তুলেছেন ডিক অ্যাডভোকাট। ছবি: সংগৃহীত

পুতিন: লিডারশিপ বলতে কী বোঝো?

ডিক অ্যাডভোকাট: যদি আমি অথবা আপনি কোনো রুমে প্রবেশ করি, সঙ্গে সঙ্গে রুমটি নিস্তব্ধ হয়ে যাবে।

উত্তরটি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মনে ধরেছিল। যিনি উত্তরটি দিয়েছিলেন সেই ভদ্রলোকের পুরো নাম ডার্ক নিকোলাস ‘ডিক’ অ্যাডভোকাট!

ফুটবলের জগতে উনার নাম প্রথম শুনে হাসি পেয়েছিল, ভেবেছিলাম এ আবার কীসের উকিলরে বাবা!! পরে ভুল ভাঙল, শব্দটা অ্যাডভোকাট, অ্যাডভোকেট নয়।

পুতিনের সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল রাশিয়া জাতীয় দলের দায়িত্বে থাকাকালীন। শুরুতে বলা ঘটনাটিও তখনকার। সেই ঘটনার পর রুশ প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বলা চলে খানিকটা সখ্যই গড়ে ওঠে অ্যাডভোকাটের।

কিন্তু কুরাসাওয়ের সঙ্গে সেই ‘পুতিনের বন্ধু’র সম্পর্ক কী? কুরাসাওকে নিয়ে লিখতে বসে কেন তার প্রসঙ্গ? কারণটা হলো— ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে কুরাসাওকে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা এনে দেওয়া কোচটি যে আর কেউ নন, সেই ডিক অ্যাডভোকাট।

কুরাসাও দেশটির আয়তন মাত্র ৪৪৪ বর্গকিলোমিটার, যা বাংলাদেশের গড়পড়তা যেকোনো উপজেলার চেয়েও ছোট। জনসংখ্যা দেড় লাখের সামান্য বেশি। পুঁচকে এই দেশটিই সবাইকে চমকে দিয়ে জায়গা করে নিয়েছে এবারের ফুটবল বিশ্বকাপে, যার নেপথ্যের কারিগর সাবেক ডাচ ফুটবলার ও কোচ ডিক অ্যাডভোকাট।

কুরাসাও জাতীয় দলের সঙ্গে কোচ ডিক অ্যাডভোকাট। ছবি: সংগৃহীত
কুরাসাও জাতীয় দলের সঙ্গে কোচ ডিক অ্যাডভোকাট। ছবি: সংগৃহীত

বর্ণিল ও দীর্ঘ ক্যারিয়ারে সেই অ্যাডভোকাট দক্ষিণ কোরিয়া, ইরাক, সার্বিয়া ও বেলজিয়াম ছাড়াও নিজ দেশ নেদারল্যান্ডসের কোচ ছিলেন। কোচিংয়ে যুক্ত ছিলেন আরও অনেক দলের সঙ্গে। গত শতকের আশির দশকে জার্সি-বুট খুলে স্যুট-টাই গায়ে চাপান তিনি।

অ্যাডভোকাটের কোচিংয়ে আসাটা অবশ্য ভিন্ন এক গল্প। বড় ভাই ইয়াপ অ্যাডভোকাটকে কোচিংয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল নেদারল্যান্ডসের একটি ছোট ক্লাব। ইয়াপ সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন ছোট ভাইয়ের কথা। সেই থেকে শুরু। খেলোয়াড়ি জীবনের পর কোচ হওয়ার আগে অবশ্য তিনি কখনো শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক, কখনো ছাদ নির্মাণের কাজও করেছেন!

১৯৪৭ সালে হেগ শহরের এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম ডিক অ্যাডভোকাটের। পাঁচ ভাইবোনের সংসার। বড় ভাই ইয়াপের পথ অনুসরণ করে পেশাদার ফুটবলে যুক্ত হয়ে পড়েন। ছিলেন মধ্যমাঠের নিরলস যোদ্ধা। কনকনে শীতেও ছোট হাতার জার্সি আর গোড়ালি পর্যন্ত নামানো মোজা পরে খেলতেন। বিশেষ দক্ষতা ছিল প্রতিপক্ষের অ্যাকিলিস টেন্ডনে পা লাগিয়ে দেওয়া। এতটাই নিবেদিত ছিলেন যে সত্তরের দশকের ফুটবলারদের মধ্যে বিরল ব্যতিক্রম হিসেবে তিনি মদ ছুঁতেন না।

১৯৮৪ সালে একদিন ফোন এলো কিংবদন্তি ডাচ কোচ রাইনাস মিশেলসের কাছ থেকে। অ্যাডভোকাট ভেবেছিলেন, কেউ মজা করছে। ফোন কেটে দিয়েছিলেন। পরে জানা গেল, সত্যিই মিশেলস তাকে সহকারী হিসেবে চান। না করার প্রশ্নই ওঠে না। যুক্ত হয়ে যান মিশেলসের কোচিং টিমে। সেখানেই তিনি খুঁজে পান নিজের আদর্শকে।

স্বভাবে আবেগপ্রবণ অ্যাডভোকাট সহজেই কেঁদে ফেলতেন। বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো সুযোগ পেয়ে প্রথম ম্যাচেই জার্মানির বিপক্ষে যখন কুরাসাও গোল পেল তখনো তার চোখে জল, যদিও মিশেলস তাকে শিখিয়েছিলেন— দুর্বলতা প্রকাশ করতে নেই। তবে কুরাসাওয়ের মতো একটি দেশকে বিশ্বকাপে টেনে তোলা আর সারা বিশ্বের শত কোটি দর্শকের সামনে সেই দলের প্রথম গোল কি আর আবেগে বাঁধ দিতে পারে!

কনকাকাফ গোল্ডকাপে এল সালভাদরের বিপক্ষে ম্যাচে ডাগআউটে ডিক অ্যাডভোকাট। ছবি: সংগৃহীত
কনকাকাফ গোল্ডকাপে এল সালভাদরের বিপক্ষে ম্যাচে ডাগআউটে ডিক অ্যাডভোকাট। ছবি: সংগৃহীত

মিশেলস তাকে আরও শিখিয়েছিলেন— খেলোয়াড়দের সঙ্গে কথা বলতে হবে ছোট ও স্পষ্ট বাক্যে এবং কখনো বিতর্কে জড়ানো যাবে না। এসব শিক্ষা অবশ্য কোচিংয়ের সময় অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলার চেষ্টা করেছেন অ্যাডভোকাট। ধীরে ধীরে যেন হয়ে উঠছিলেন মিশেলসের প্রতিচ্ছবি। আর সে কারণেই তার তকমা হয়ে যায় ‘লিটল জেনারেল’, কারণ ‘জেনারেল’ নামটা বরাদ্দ ছিল তারই গুরু মিশেলসের জন্যে।

নিজেকে কোচ হিসেবে এক শব্দে বর্ণনা করতে বললে অ্যাডভোকাটের উত্তর ছিল— ‘ক্লারিটি’, অর্থাৎ স্বচ্ছতা। যা কিছু করতেন, স্বচ্ছতার সঙ্গেই করতেন। না জেনে না বুঝে করতেন না কিছুই। শুধু তাই নয়, দলের ভালো জন্য যে সিদ্ধান্ত সঠিক মনে করতেন, তা যতই অজনপ্রিয় হোক বা সমালোচনার শিকার হোক, তা থেকে পিছু হটতেন না।

ফুটবল ছিল তার নেশা। টয়লেটে যাওয়ার সময়ও নোটবই সঙ্গে নিয়ে যেতেন, নতুন ফরমেশন আঁকার জন্য। একবার স্বীকারও করেছিলেন, ‘আমার রসবোধ বলে কিছু নেই।’

যে প্রজন্মে জোহান ক্রুইফ, গাস হিডিঙ্ক ও লুই ফন গাল আক্রমণাত্মক ডাচ ফুটবলের পতাকা বহন করছিলেন, সেই প্রজন্মেই অ্যাডভোকাট ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি বিশ্বাস করতেন রক্ষণে। নিজেও ছিলেন একজন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার।

কুরাসাও জাতীয় দল যখন তাদের ছোট্ট ক্যারিবীয় দ্বীপে থাকে, তখন খেলোয়াড়দের যাতায়াতের বাহন একটি পুরাতন আমেরিকান বাস। বাসটির কোথাও দরজা নেই, কোথাও জানালা ভাঙা। ফাঁকফোকর দিয়ে বাতাস ঢোকে, আর বাসে থাকা স্পিকার থেকে অবিরাম বেজে চলে ক্যারিবীয় সুর। সেই কোলাহলের মাঝখানে বসে থাকেন ৭৮ বছর বয়সী ডাচ ভদ্রলোক— ডিক অ্যাডভোকাট। বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক কোচ। আবার বিশ্বকাপে খেলা সবচেয়ে ক্ষুদ্র জনসংখ্যার দেশেরও পথপ্রদর্শক।

স্কটিশ লিগের দল রেঞ্জার্সকেও কোচিং করিয়েছেন অ্যাডভোকাট। ২০১৫ সালে শিরোপা জেতার পর তাকে নিয়ে রেঞ্জার্সদের উল্লাস। ছবি: সংগৃহীত
স্কটিশ লিগের দল রেঞ্জার্সকেও কোচিং করিয়েছেন অ্যাডভোকাট। ২০১৫ সালে শিরোপা জেতার পর তাকে নিয়ে রেঞ্জার্সদের উল্লাস। ছবি: সংগৃহীত

নিয়মনীতি মেনে চলা কোচ অ্যাডভোকাট। তবু প্রতিদিন সকালে নাশতার সময় দলের খেলোয়াড়দের জড়িয়ে ধরেন একে একে। কুরাসাওয়ে তিনি এমনকি দলকে পর্যটকদের সঙ্গে একই হোটেলের উন্মুক্ত বুফেতে খাওয়ার অনুমতিও দিয়েছিলেন।

এবারের বিশ্বকাপে আরও এক বিরল ঘটনা ঘটেছে। বেশির ভাগ দলের মতো পরিবারকে দূরে না রেখে কুরাসাওয়ের খেলোয়াড়েরা নিজেদের পরিবারকে সঙ্গে নিয়েই অবস্থান করছে ফ্লোরিডার বোকা রাটনের দলীয় ক্যাম্পে। একসময়ের কঠোর নিয়মানুবর্তী, কাজপাগল অ্যাডভোকাটের কাছ থেকে এমন দৃশ্য কেউ আশা করত না।

বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের শেষ ম্যাচে জামাইকার বিপক্ষে ড্র করলেই চলত। ম্যাচের আগে অসুস্থ মেয়ের কাছে থাকতে নেদারল্যান্ডসে ফিরে যান অ্যাডভোকাট। খেলোয়াড়দের কিছু বলেননি। কারণ বলতে গেলে হয়তো তিনি নিজেই কেঁদে ফেলতেন। আর তিনি চাননি কেউ তার জন্য দুঃখ অনুভব করুক।

সেদিনের ম্যাচটি গোলশূন্য ড্র হলে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত হয় কুরাসাওয়ের। সে ফলাফলের পর অ্যাডভোকাটের প্রতিক্রিয়া— নিজের কোচিং ক্যারিয়ারে এর চেয়ে সম্মানের কিছু আর পাননি।

মেয়ের পাশে থাকার জন্য পদত্যাগও করেছিলেন অ্যাডভোকাট। উত্তরসূরি হিসেবে প্রস্তাব করেছিলেন ফ্রেড রুটেনের নাম। কিন্তু মেয়ের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলে খেলোয়াড়েরা, এমনকি প্রধান স্পনসরও তার প্রত্যাবর্তন দাবি করে। শেষ পর্যন্ত রুটেন সরে দাঁড়ান, আর ফিরে আসেন পুরনো ‘লিটল জেনারেল’।

মেয়ের অসুস্থতার কারণে কুরাসাও জাতীয় দলকে না বলে দিয়েছিলেন অ্যাডভোকাট। পরে অবশ্য সবার ‘দাবি’র মুখে ফিরতে হয় তাকে। ছবি: সংগৃহীত
মেয়ের অসুস্থতার কারণে কুরাসাও জাতীয় দলকে না বলে দিয়েছিলেন অ্যাডভোকাট। পরে অবশ্য সবার ‘দাবি’র মুখে ফিরতে হয় তাকে। ছবি: সংগৃহীত

এখন বিশ্বকাপে প্রতিদিন প্রায় ১৪ ঘণ্টা করে কাজ করেন। মাঝে মাঝে এখনো চিৎকার করেন। তবে এখন ড্রেসিংরুমে নাচ-গান, হাসি-ঠাট্টার অনুমতি দেন। এমনকি দলের প্রতিদিনের সম্মিলিত প্রার্থনাতেও অংশ নেন। জার্মানি, আইভরি কোস্ট কিংবা ইকুয়েডর— প্রতিটি দলই প্রায় সব পজিশনে কুরাসাওয়ের চেয়ে শক্তিশালী। তাদের প্রথম গোলরক্ষক এলোয় রুম বিশ্বকাপে ওঠার সময় কোনো ক্লাবের সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন না। পরে যোগ দেন ছোট্ট ক্লাব এফসি মায়ামিতে। আর দলের তৃতীয় গোলরক্ষক তো এখনো পেশাদার পর্যায়ে একটি ম্যাচও খেলেননি।

তবু কুরাসাও স্বপ্ন দেখে। ১৯৩৮ সালে কিউবার পর প্রথম ক্যারিবীয় দল হিসেবে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ওঠার স্বপ্ন। আর তাদের এই স্বপ্ন দেখিয়েছেন তাদেরই ‘আবেগি’ কোচ।

ad
ad

খেলা থেকে আরও পড়ুন

দক্ষিণ কোরিয়াকে হারিয়ে সবার আগে শেষ ৩২ নিশ্চিত মেক্সিকোর

জাপোপানে অনুষ্ঠিত ম্যাচের শুরুতে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেছে দক্ষিণ কোরিয়া। অধিনায়ক সং হিউং-মিনের নেতৃত্বে একের পর এক আক্রমণ শানালেও গোলের দেখা পায়নি দলটি।

১৫ ঘণ্টা আগে

শেষ ২২ মিনিটে সুইসদের ‘সুপার সাব’ ঝড়ে লন্ডভন্ড বসনিয়া

২১ ঘণ্টা আগে

বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার শুভসূচনা, হারল উজবেকিস্তান

তবে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে আসা দলটির এই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে দেয়নি কলম্বিয়া। মাত্র ৫ মিনিট পর, অর্থাৎ ৬৫তম মিনিটে লুইস দিয়াজ নিজেই গোল করে কলম্বিয়াকে আবারও এগিয়ে নেন (২-১)। আর ম্যাচের একদম অন্তিম মুহূর্তে জেমিনটন ক্যাম্পাজ গোল করলে ৩-১ ব্যবধানের বড় জয় নিশ্চিত হয় কলম্বিয়ার।

২ দিন আগে

শেষ মুহূর্তের ম্যাজিকে পানামাকে কাঁদিয়ে ঘানার নাটকীয় জয়

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ধাক্কা খায় ঘানা। চোটে পড়েন দলের প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক লরেন্স আতি-জিগি। ফলে তাকে তুলে নিয়ে মাঠে নামানো হয় বেঞ্জামিন আসারেকে। গোলরক্ষক বদলের পরও নিজেদের রক্ষণ সামলে আক্রমণে মনোযোগ দেয় ঘানা।

২ দিন আগে