মেসির বিদায়, এক মহাকাব্যের অবসান

একটি মাঠ, হাজার হাজার মানুষের গর্জন, হাতে নীল-সাদা পতাকা আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ— লিওনেল মেসি; যে মানুষটির বাঁ পায়ের জাদুতে কেবল আর্জেন্টিনা নয়, গোটা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ গত দুই দশক ধরে কখনো কেঁদেছে, কখনো হেসেছে; আবার কখনো অসম্ভবকে সম্ভব হওয়ার অপেক্ষায় রাত জেগেছে।
সেইসব হাসি, সেইসব কান্না আর সেইসব অপেক্ষার দিন ফুরলো। আকাশী-নীলের জার্সিতে আর বাঁ পায়ের জাদু দেখা যাবে না সবুজ ঘাসের বুকে। টেলিভিশনের স্ক্রিনে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আর অপেক্ষায় থাকতে হবে না কোটি চোখকে। মেসি যে এবার জাতীয় দলের জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নামবেন!
আর্জেন্টাইন সময় অনুযায়ী মঙ্গলবার রাত ৮টায় শুরু হবে মেসির এই বিদায়ী ম্যাচ। ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশি ভক্ত-সমর্থকদের জন্য তখন বাংলাদেশের ঘড়ির কাঁটায় সময় হবে বুধবার ভোর ৫টা।
মেসির বিদায়ী ম্যাচ, যা আর দশটি ম্যাচের মতো নয়। এটি একটি যুগের শেষ দৃশ্য। এমন একটি যুগ, যেখানে ফুটবল মানেই ছিল মেসি; আর মেসি মানেই ছিল আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সি।
বুয়েনস এইরেসের ঐতিহাসিক মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে যখন মেসি শেষবারের মতো জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নামবেন, তখন হয়তো তার সামনে থাকবে একটি প্রতিপক্ষ, একটি গোলপোস্ট এবং ৯০ মিনিটের একটি ম্যাচ। কিন্তু গ্যালারির দর্শকদের কাছে সেই ৯০ মিনিটের মূল্য হবে গত দুই দশকের সমান।

যে পথটা সহজ ছিল না
আজ মেসিকে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় ফুটবল-নায়ক হিসেবে দেখাটা স্বাভাবিক। কিন্তু তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরুর দিনগুলো মোটেও এমন ছিল না।
বার্সেলোনার হয়ে একের পর এক রেকর্ড গড়েছেন, অসংখ্য শিরোপা জিতেছেন, বিশ্বের সেরা ফুটবলারের স্বীকৃতি পেয়েছেন। কিন্তু জাতীয় দলের হয়ে প্রথম বড় সাফল্যের জন্য তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে বছরের পর বছর।
২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হার। ২০১৫ কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে পরাজয়। পরের বছরও একই প্রতিপক্ষের কাছে একই মঞ্চে হার। প্রতিবারই মেসির স্বপ্ন ভেঙেছে ফাইনালে।
সমালোচনাও কম হয়নি। কেউ বলেছেন, ক্লাবের মেসি আর জাতীয় দলের মেসি এক নন। কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, জাতীয় দলের হয়ে তিনি আদৌ বড় ম্যাচের নায়ক হতে পারেন কি না।
সবচেয়ে কঠিন সময় এসেছিল ২০১৬ সালে। কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে হারের পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন মেসি।
কিন্তু গল্পটি সেখানেই শেষ হয়নি। বরং সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়।
ফিরে এসে বদলে দিলেন ইতিহাস
জাতীয় দলে ফিরে মেসি যেন আগের চেয়ে আরও পরিণত, আরও ধৈর্যশীল হয়ে উঠলেন। তিনি বুঝেছিলেন— সব প্রশ্নের উত্তর মাঠেই দিতে হবে।
২০২১ কোপা আমেরিকা সেই উত্তরের প্রথম বড় অধ্যায়। ব্রাজিলের মারাকানা স্টেডিয়ামে ব্রাজিলকে হারিয়ে আর্জেন্টিনা যখন কোপা আমেরিকার শিরোপা জিতল, মেসির মুখে দেখা গেল এমন এক আনন্দ, যা আগে খুব কমই দেখা গিয়েছিল।
জাতীয় দলের হয়ে এটিই যে মেসির প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা। তারপর ফাইনালিসিমা। তারপর এলো কাতার, সেটি যেন মেসির জন্যই লেখা কোনো মহাকাব্য।

কাতারে পূর্ণতা পেল স্বপ্ন
বিশ্বকাপ শুরু হয়েছিল দুঃস্বপ্ন দিয়ে। সৌদি আরবের কাছে হার। চারদিকে প্রশ্ন— আর্জেন্টিনা কি পারবে?
কিন্তু মেসি জানতেন, গল্প এখনো শেষ হয়নি।
মেক্সিকোর বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ গোল। পোল্যান্ডের বিপক্ষে নেতৃত্ব। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচ। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স। এরপর ফাইনাল।
ফ্রান্সের বিপক্ষে সেই ফাইনাল আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় ম্যাচ। একবার আর্জেন্টিনা এগিয়ে যায়। আবার ফ্রান্স ফিরে আসে। মেসি গোল করেন। কিলিয়ান এমবাপ্পে জোড়া গোল করে ম্যাচে ফেরান ফ্রান্সকে। অতিরিক্ত সময়ে মেসি আবার গোল করেন। শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকার।
তারপর— আর্জেন্টিনা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। মেসির হাতে বিশ্বকাপ। সেই মুহূর্তে যেন তার ক্যারিয়ারের সব অপূর্ণতা একসঙ্গে পূর্ণতা পেল।
যে প্রশ্নটি বছরের পর বছর তাড়া করেছে— ‘মেসি কি দেশের হয়ে বিশ্বকাপ জিততে পারবেন?’— তার উত্তর তখন আর মুখে দিতে হয়নি। বিশ্বকাপ ট্রফিই উত্তর হয়ে দাঁড়িয়েছিল তার পক্ষে।
শুধু ট্রফি নয়, বদলে দিয়েছেন একটি প্রজন্ম
মেসির গুরুত্ব শুধু তার গোল, অ্যাসিস্ট কিংবা ট্রফির সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। তিনি একটি প্রজন্মের ফুটবল-চিন্তাকে বদলে দিয়েছেন।
শিশুরা তার মতো বাঁ পায়ে বল নিতে শিখেছে। তরুণরা তার ড্রিবলিং অনুকরণ করেছে। অসংখ্য ফুটবলার তার খেলা দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছে। আর আর্জেন্টিনার মানুষ তার মধ্যে খুঁজে পেয়েছে এমন একজনকে, যিনি তাদের ফুটবল-স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন।
দিয়াগো ম্যারাডোনা ছিলেন আর্জেন্টিনার এক কিংবদন্তি। মেসি সেই কিংবদন্তির উত্তরাধিকার বহন করেছেন নিজের মতো করে। দুজনের খেলার ধরন আলাদা, সময় আলাদা, ফুটবলের বাস্তবতাও আলাদা। কিন্তু দুজনের মধ্যে একটি জায়গায় মিল— আর্জেন্টিনার মানুষের আবেগের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক।

শেষ জার্সি, শেষ বাঁশি
মেসির বিদায়ী ম্যাচে সবচেয়ে বেশি চোখ থাকবে তার ১০ নম্বর জার্সির দিকে। এই জার্সি পরে তিনি আর্জেন্টিনার হয়ে অসংখ্য গোল করেছেন। সতীর্থদের গোল করিয়েছেন। রেকর্ড ভেঙেছেন। ব্যর্থ হয়েছেন। আবার উঠে দাঁড়িয়েছেন।
শেষ ম্যাচে হয়তো তিনি গোল করবেন। হয়তো করবেন না। হয়তো পুরো ৯০ মিনিট খেলবেন। হয়তো কোচ তাকে আগেই তুলে নেবেন। কিন্তু এসবের কোনোটিই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে না।
গুরুত্বপূর্ণ হবে— শেষবারের মতো তিনি যখন মাঠে দাঁড়াবেন, তখন তার দিকে তাকিয়ে থাকবে একটি পুরো দেশ। হাজার হাজার মানুষ হয়তো তাঁর নাম ধরে চিৎকার করবে— ‘মেসি, মেসি, মেসি…’।
পাশে পুরনো বন্ধুরা
এই বিদায়ের রাতে মেসির পাশে থাকবেন তার দীর্ঘদিনের সতীর্থরা, যারা তার সঙ্গে থেকে ব্যর্থতার দিন দেখেছেন, যারা তার সঙ্গে শিরোপা জিতেছেন, যারা কাতারের সেই ঐতিহাসিক রাতের সাক্ষী। কারও সঙ্গে হয়তো তার জাতীয় দলের যাত্রা শুরু হয়েছিল। কারও সঙ্গে শেষ হচ্ছে।
এ কারণেই বিদায়ের মুহূর্তটি শুধু মেসির জন্য নয়, তার পুরো প্রজন্মের জন্য আবেগঘন। এটি এমন এক দলের বিদায়, যারা বহু বছর ধরে আর্জেন্টিনার ফুটবলকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

ফুটবল থেকে এখনই বিদায় নয়
জাতীয় দলের অধ্যায় শেষ হলেও মেসির ফুটবলযাত্রা এখানেই থামছে না। ক্লাব ফুটবলে তাকে আরও কিছুদিন দেখা যাবে। কিন্তু জাতীয় দলের মেসিকে আর দেখা যাবে না— এই বাস্তবতাই ভক্তদের সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেবে। কারণ এতদিন আর্জেন্টিনার ম্যাচ মানেই ছিল একটি প্রশ্ন— মেসি কেমন খেলবেন?
ফ্রিকিক হলে গ্যালারিতে প্রত্যাশা তৈরি হতো। বল তার পায়ে গেলে প্রতিপক্ষের রক্ষণে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ত। শেষ মুহূর্তে আর্জেন্টিনা যখন গোলের খোঁজে থাকত, তখনো সমর্থকদের মনে বিশ্বাস থাকত— মেসি আছেন, কিছু একটা ঘটতেই পারে।
এখন সেই বিশ্বাসের জায়গায় থাকবে স্মৃতি।
শেষ হওয়ার নয় যে গল্প
একজন ফুটবলারের ক্যারিয়ার শেষ হয়। কিন্তু কিংবদন্তির গল্প শেষ হয় না। মেসির ক্ষেত্রেও তাই হবে।
ভবিষ্যতের কোনো একদিন হয়তো কোনো শিশু আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সি পরে মাঠে নামবে। হয়তো সে মেসির মতো বাঁ পায়ে বল চালাবে। হয়তো কেউ তাকে বলবে, ‘তুমি কি মেসির খেলা দেখেছ?’
তখন নতুন প্রজন্ম হয়তো ভিডিওতে দেখবে সেই ছোট্ট মানুষটিকে, যিনি কয়েকজন প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে গোল করছেন, অবিশ্বাস্য পাস দিচ্ছেন, ফ্রিকিক থেকে গোল করছেন কিংবা বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন।
আর তখন বোঝা যাবে, মেসি শুধু একটি সময়ের ফুটবলার ছিলেন না। তিনি ছিলেন একটি যুগের নাম।
বিশ্বকাপের ইতিহাসেও মেসি গড়েছেন অনন্য রেকর্ড। ২০০৬ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে তিনি খেলেছেন ৩৪ ম্যাচ। বিশ্বকাপের ইতিহাসে আর কোনো ফুটবলার এত ম্যাচ খেলেননি।
বিশ্বকাপে মেসির গোলসংখ্যা ২১। এই তালিকায় তিনি দ্বিতীয়। সবার ওপরে আছেন ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে, যিনি করেছেন ২২ গোল। তবে বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে মেসিই সবার ওপরে।
বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের কাছে হারের ছয় সপ্তাহ পর, গত ৩১ আগস্ট জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন মেসি। বলেন, তার আর দেওয়ার মতো কিছু নেই।

বিদায়, লিও
শেষ বাঁশি বাজার পর মেসি হয়তো কিছুক্ষণ মাঠের দিকে তাকিয়ে থাকবেন। হয়তো গ্যালারির দিকে হাত নাড়বেন। হয়তো সতীর্থদের আলিঙ্গন করবেন। হয়তো চোখের কোণে জমবে জল।
সেই মুহূর্তে তাঁর মনে কী চলবে, তা আমরা জানব না। কিন্তু গ্যালারির মানুষের মনে থাকবে হাজারও স্মৃতি।
থাকবে ২০১৪-এর কান্না, ২০১৬-এর হতাশা, ২০২১-এর প্রথম বড় জয়, ২০২২-এর বিশ্বকাপ, ২০২৪-এর আরেকটি কোপা আমেরিকা। সবশেষে ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের কাছে হার।
মেসির সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো তার হাতে থাকা ট্রফিগুলো নয়। তার সবচেয়ে বড় অর্জন হলো— তিনি প্রমাণ করেছেন, প্রতিভার চেয়েও বড় শক্তি হলো অধ্যবসায়, আর ব্যর্থতার পর ফিরে আসার সাহস।
নীল-সাদা জার্সিতে তার শেষ ম্যাচ তাই কেবল বিদায়ের ম্যাচ নয়। এটি একটি মহাকাব্যের শেষ অধ্যায়। যে মহাকাব্যের নায়ক একজন ছোটখাটো মানুষ, কিন্তু যার ফুটবল জাদু ছুঁয়ে গেছে পুরো পৃথিবীকে।
বিদায়, লিওনেল মেসি।
জাতীয় দলের জার্সিতে তোমার গল্প শেষ হতে পারে, কিন্তু ফুটবল ইতিহাসে তোমার গল্প কখনো শেষ হবে না।













-837ed9-256x144.webp)




