মিস উগান্ডার গাউনে সিজারিয়ানের ৭ স্তর— মানবশিশুর পৃথিবীতে আসার গল্প

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯: ৫৬
মিস ওয়ার্ল্ড উগান্ডা এল মুহোজার পোশাকে সি-সেকশন তথা সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারে প্রসূতির শরীরের সাত স্তর কাটার প্রতীকী রূপ। ছবি: সংগৃহীত

মঞ্চে হাঁটছিলেন তিনি। ঝলমলে আলো, ক্যামেরার ঝলকানি, চারপাশে সৌন্দর্যের প্রতিযোগিতা। কিন্তু সেদিন মিস ওয়ার্ল্ড উগান্ডা এল মুহোজার পোশাকের গল্পটা ছিল সৌন্দর্যের চেয়েও অনেক গভীর।

দূর থেকে দেখলে সেটি হয়তো আর দশটি কৌচার গাউনের মতোই মনে হতে পারে। সাদা, হলুদ, গোলাপি ও লাল রঙের পরতে পরতে তৈরি পোশাকটি ছিল দৃষ্টিনন্দন। কিন্তু এর প্রতিটি স্তরের পেছনে রয়েছে একটি আলাদা গল্প— একটি শিশুর পৃথিবীতে আসার গল্প, একজন মায়ের শরীরের ভেতর দিয়ে জীবনের জন্ম নেওয়ার গল্প।

মিস উগান্ডা তার গাউনের নাম দিয়েছেন ‘The Layers of Life’। আর এর নকশার অনুপ্রেরণা এসেছে সিজারিয়ান বা সি-সেকশন অস্ত্রোপচার থেকে, যেখানে চিকিৎসককে একজন প্রসূতির শরীরের সাত সাতটি স্তর অতিক্রম করতে হয়।

গত ২৭ আগস্ট ভিয়েতনামে মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে আয়োজিত ‘ভিয়েতনাম বিউটি ফ্যাশন ফেস্টে’র ১৭তম আসর ‘সোল অব হেরিটেজে’ এই বিশেষ পোশাক পরে মঞ্চে ওঠেন এল মুহোজা। নকশাটি তৈরি করেছেন ডিজাইনার কিশা আবদুল্লাহ।

সি-সেকশন তথা সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারে প্রসূতির শরীরের যে সাত স্তর কাটা হয়। ছবি: পোশাকের নকশাকার আব্দুল্লাহর ইনস্টাগ্রাম থেকে
সি-সেকশন তথা সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারে প্রসূতির শরীরের যে সাত স্তর কাটা হয়। ছবি: পোশাকের নকশাকার আব্দুল্লাহর ইনস্টাগ্রাম থেকে

পোশাকের ৭ স্তরে মানবজন্মের গল্প

সি-সেকশন সম্পর্কে একটি চিত্র থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছিলেন আবদুল্লাহ। সেই চিত্রে দেখানো সাতটি স্তরকে তিনি গাউনের নকশায় রূপ দিয়েছেন। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, সি-সেকশন অস্ত্রোপচারের সময় প্রসূতির পেট যখন কেটে ফেলা হয়, তখন সাতটি স্তর কাটতে হয় চিকিৎসককে।

সেগুলো হলো— ত্বক, চর্বি, ফ্যাসিয়া, রেক্টাস পেশি, পেরিটোনিয়াম, জরায়ুর পেশি এবং অ্যামনিওটিক স্যাক।

প্রতিটি স্তরকে পোশাকে আলাদা রং, কাপড় ও টেক্সচারের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সাদা, হলুদ, গোলাপি ও লাল কাপড় একটির ওপর আরেকটি স্তর তৈরি করেছে। ফলে পোশাকটি শুধু একটি নকশা নয়, যেন শরীরের ভেতর দিয়ে জীবনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটি দৃশ্যমান যাত্রা।

ডিজাইনার কিশা আবদুল্লাহ নিজের ইনস্টাগ্রাম পোস্টে লিখেছেন, এই ধারণাটি এসেছে সি-সেকশনের সময় অতিক্রম করা স্তরগুলো এবং আরও বিস্তৃত অর্থে পৃথিবীতে নতুন জীবন নিয়ে আসার ‘অসাধারণ যাত্রা’ থেকে।

তার ভাষায়, পোশাকটির প্রতিটি রং ও স্তর সেই গল্পের একটি পর্যায়, একটি টেক্সচার কিংবা একটি পরিবর্তনকে তুলে ধরার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে— কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা গোষ্ঠীকে বোঝানোর জন্য নয়। আর সে কারণেই পোশাকটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘দ্য লেয়ারস অব লাইফ’ বা ‘জীবনের স্তর’।

আবদুল্লাহর ব্যাখ্যায়, জীবন কোনো একটি জাতি, দেশ কিংবা একটি নির্দিষ্ট রঙের সম্পত্তি নয়। জীবন সর্বজনীন। তার ভাষায়— জীবনের আলাদা কোনো রং নেই, জীবন সর্বজনীন।

মাতৃত্ব থেকে অনুপ্রেরণা

এই পোশাকের গল্পের সঙ্গে ডিজাইনারের নিজের জীবনও জড়িয়ে আছে। অন্য একটি পোস্টে আবদুল্লাহ জানান, নতুন মা হওয়ার নিজের অভিজ্ঞতাও তাকে এই নকশা তৈরিতে অনুপ্রাণিত করেছে।

সন্তান জন্মের অভিজ্ঞতা একজন নারীর কাছে একই সঙ্গে শারীরিক, মানসিক ও আবেগের। বিশেষ করে সি-সেকশন শুধু একটি অস্ত্রোপচার নয়— এর সঙ্গে যুক্ত থাকে শরীরের পরিবর্তন, ব্যথা, অপেক্ষা, ভয়, স্বস্তি এবং শেষ পর্যন্ত নতুন একটি প্রাণকে পৃথিবীতে স্বাগত জানানোর অভিজ্ঞতা।

সেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে আব্দুল্লাহ সরাসরি পোশাকে তুলে ধরেননি; বরং সেটিকে একটি শিল্পরূপ দিয়েছেন। এ কারণেই গাউনটি কেবল ‘সি-সেকশনের পোশাক’ হয়ে থাকেনি, এর নামের মধ্যেই রয়েছে বৃহত্তর অর্থ— জীবনের স্তর, মাতৃত্বের অভিজ্ঞতা এবং মানবদেহের অসাধারণ সক্ষমতার প্রতি শ্রদ্ধা।

ডিজাইনারের ভাষায়, পোশাকটি তৈরি করা হয়েছে নারীত্ব, মানবদেহ ও জীবনের অলৌকিকতার উদ্‌যাপনের জন্য— যে বিষয়গুলো আমাদের সবাইকে একসূত্রে যুক্ত করে।

সৌন্দর্যের মঞ্চে অন্যরকম এক বার্তা

মিস ওয়ার্ল্ডের মতো প্রতিযোগিতায় পোশাক সাধারণত সৌন্দর্য, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য কিংবা ব্যক্তিত্ব প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সেখানে ‘দ্য লেয়ারস অব লাইফ’ অন্যরকম একটি বিষয়কে সামনে এনেছে— মাতৃত্ব ও সন্তান জন্ম দেওয়ার শারীরিক বাস্তবতা।

সি-সেকশন একটি পরিচিত চিকিৎসা পদ্ধতি হলেও এর ভেতরের শারীরিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে অনেকেরই বিস্তারিত ধারণা নেই। সাতটি স্তর অতিক্রম করে চিকিৎসক কীভাবে শিশুর কাছে পৌঁছান, সেই জটিল প্রক্রিয়াকে একটি কৌচার গাউনের মাধ্যমে দৃশ্যমান করে তুলেছেন আবদুল্লাহ। ফলে মঞ্চের পোশাকটি একই সঙ্গে ফ্যাশন, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং মাতৃত্বের গল্প বলেছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়— এটি মাতৃত্বকে কোনো নির্দিষ্ট দেশের বা সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখায়নি। বরং জীবনকে একটি সর্বজনীন অভিজ্ঞতা হিসেবে তুলে ধরেছে।

‘আমি নিজেকে দেখতে পেয়েছি’

পোশাকটির ছবি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছেন ডিজাইনার কিশা আবদুল্লাহ। একজন মন্তব্য করেছেন, সন্তান জন্মদানের গভীর বাস্তবতাকে এভাবে পোশাকের মাধ্যমে শিল্পে রূপ দেওয়ার বিষয়টি তাকে মুগ্ধ করেছে। তার মতে, সি-সেকশনের শারীরিক ও আবেগের স্তরগুলোকে আক্ষরিক অর্থেই শিল্পে পরিণত করা হয়েছে।

আরেকজন লিখেছেন, পোশাকটির শক্তি ও সৌন্দর্য প্রকাশ করার মতো শব্দ খুঁজে পাওয়া কঠিন।

তবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্যগুলোর একটি এসেছে এমন একজন নারীর কাছ থেকে, যিনি নিজেই দুবার সি-সেকশনের মধ্য দিয়ে গেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘একজন নারী হিসেবে, যিনি দুটি সি-সেকশনের মধ্য দিয়ে গেছেন, এই পোশাক আমাকে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে দিয়েছে।’

এই প্রতিক্রিয়াটিই সম্ভবত পোশাকটির সবচেয়ে বড় সাফল্য। কারণ, একটি ফ্যাশন ডিজাইন তখনই তার মঞ্চের সীমা ছাড়িয়ে যায়, যখন কোনো মানুষ নিজের জীবনের গল্প তার মধ্যে খুঁজে পান।

‘দ্য লেয়ারস অব লাইফ’ গাউনে মিস ওয়ার্ল্ড উগান্ডা এল মুহোজা। ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে
‘দ্য লেয়ারস অব লাইফ’ গাউনে মিস ওয়ার্ল্ড উগান্ডা এল মুহোজা। ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে

ফ্যাশনের পরতে পরতে জীবন

‘দ্য লেয়ারস অব লাইফ’ তাই শুধু সাতটি শারীরিক স্তরের নকশা নয়। এটি একজন নারীর শরীরকে নতুন করে দেখার একটি প্রচেষ্টা। যে শরীরের ভেতরে একটি শিশু বেড়ে ওঠে, যে শরীর সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যায়, যে শরীরের ওপর সেই অভিজ্ঞতার দাগ থেকে যায়, সেই শরীরকেই এখানে সৌন্দর্যের বিষয় করে তোলা হয়েছে।

মিস ওয়ার্ল্ড উগান্ডার গায়ে সেই পোশাক যখন মঞ্চের আলোয় ধরা দিয়েছে, তখন সেটি নিছক ফ্যাশনের প্রদর্শনী থাকেনি। হয়ে উঠেছে জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর এক নীরব ভাষা।

সাদা থেকে হলুদ, গোলাপি থেকে লাল— একটির পর একটি স্তর যেন মনে করিয়ে দিয়েছে, পৃথিবীতে একটি নতুন জীবন আসার পথ কখনোই এক স্তরের নয়। তার পেছনে থাকে শরীর, সাহস, অপেক্ষা, ব্যথা এবং শেষ পর্যন্ত— জীবন।

আর সে কারণেই ‘দ্য লেয়ারস অব লাইফে’র গল্পটি শুধু একটি পোশাকের গল্প নয়, এটি সেই অভিজ্ঞতার গল্প, যা পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষকে কোনো না কোনোভাবে স্পর্শ করে— একজন নারীর শরীরের ভেতর দিয়ে আরেকটি জীবনের পৃথিবীতে আসার গল্প।

পিপল ম্যাগাজিন অবলম্বনে

Ad
Ad
ad
ad
ad

সাত-পাঁচ থেকে আরও পড়ুন

বাংলা নাটকের রূপকার সেলিম আল দীনের ৭৭তম জন্মবার্ষিকী আজ

১৯৪৯ সালের এ দিনে সোনাগাজী উপজেলার সেনেরখিল গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পিতা মফিজ উদ্দিন আহমেদ ছিলেন ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট অব কাস্টমস এবং মা মরহুম ফিরোজা খাতুন।

১৮ দিন আগে

পান মসলার বিজ্ঞাপনে অভিনয়, শাহরুখ-অজয়-টাইগারকে আইনি নোটিশ

ভারতীয় সংবাদ সংস্থা আইএএনএস জানিয়েছে, অভিনেতাদের পৃথক ঠিকানায় নোটিশগুলো পাঠানো হয়েছে। অজয় দেবগনের জুহুর বাসভবন ও শাহরুখ খানের বান্দ্রার বাসভবন ‘মান্নাত’-এ নোটিশ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। টাইগার শ্রফকে তার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘টাইগার শ্রফ প্রোডাকশনস’-এর মাধ্যমে নোটিশ পাঠানো হয়েছে।

১৯ দিন আগে

কলকাতায় আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত নাট্যকার আসাদুল ইসলাম

বাংলা থিয়েটারে মৌলিক নাটকের দুষ্প্রাপ্যতার প্রেক্ষাপটে প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব মনোজ মিত্র এই প্রতিযোগিতা চালু করেছিলেন। মনোজ মিত্র প্রকল্পিত পার্থপ্রতিম স্মরণে সুন্দরম আয়োজিত এ প্রতিযোগিতার এটি ছিল ৩৩তম আসর।

২০ দিন আগে

প্রেক্ষাগৃহের পর এবার ওটিটিতে ‘মালিক’

গত ৬ আগস্ট রাত ১২টা থেকে দর্শকদের জন্য সিনেমাটি উন্মুক্ত করা হয়েছে। সাইফ চন্দন পরিচালিত অ্যাকশন-থ্রিলারধর্মী সিনেমাটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পর দর্শকমহলে বেশ সাড়া ফেলেছিল।

০৮ আগস্ট ২০২৬
Advertisement