রবীন্দ্রনাথ-ভিক্টোরিয়ার স্মৃতিতে ২৫ জুলাই শিল্পকলায় ‘রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় বিজয়া’

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
‘রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় বিজয়া’ নাটকের দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনের এক অনন্য অধ্যায় তার ১৯২৪ সালের আর্জেন্টিনা সফর। সেই সফরে আর্জেন্টিনার সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিসেবী ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর আতিথ্যে কাটানো দুই মাসের স্মৃতি, অনুভূতি, নীরবতা ও অন্তর্জগতের আবেগকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে ম্যাড থেটারের দ্বিতীয় প্রযোজনা ‘রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় বিজয়া’। শনিবার (২৫ জুলাই) সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিটে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে নাটকটির একাদশ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে।

১৯২৪ সালে দক্ষিণ আমেরিকা সফরে গিয়ে অসুস্থ হয়ে আর্জেন্টিনার ছোট্ট শহর সান ইসিদ্রোর মিরালরিও ভিলায় প্রায় দুই মাস অবস্থান করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রিও দে লা প্লাটা নদীর তীরে অবস্থিত সেই বাড়ির ব্যালকনিতে বসে তিনি দীর্ঘ সময় কাটাতেন। দক্ষিণ গোলার্ধের বসন্ত তখন ধীরে ধীরে গ্রীষ্মে রূপ নিচ্ছিল। প্রকৃতির সেই রূপান্তরের সঙ্গে মিশে ছিল কবির নিভৃত চিন্তা, একাকিত্ব, অনুভূতি এবং সৃষ্টিশীলতার এক নতুন অধ্যায়।

এই সময়েই তার পরিচয় হয় আর্জেন্টিনার প্রখ্যাত লেখক ও বুদ্ধিজীবী ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সঙ্গে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বৌদ্ধিক বিনিময় এবং মানবিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে তাদের যে বন্ধন গড়ে ওঠে, তা বাংলা সাহিত্য ও বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। ওকাম্পোই পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথকে ‘বিজয়া’ নামে সম্বোধনের অনুপ্রেরণা দেন। তাদের সম্পর্ক নিয়ে দেশে-বিদেশে অসংখ্য গবেষণা, বই এবং নাট্যকর্মও রচিত হয়েছে।

‘রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় বিজয়া’ নাটকের দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত
‘রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় বিজয়া’ নাটকের দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

ম্যাড থেটারের এই প্রযোজনা সেই ইতিহাসকে সরাসরি পুনর্নির্মাণ না করে বরং রবীন্দ্রনাথের অন্তর্জগতের আবেগ, নিঃসঙ্গতা, সৃষ্টিশীলতা এবং ওকাম্পোর উপস্থিতিতে তার মানসিক জগতে যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল, তারই নাট্যরূপ তুলে ধরেছে। নাটকটি দর্শকের সামনে কয়েকটি প্রশ্নও উত্থাপন করে— দক্ষিণ আমেরিকার সেই নির্জন দিনগুলোতে কবির মনে কী চলছিল? কোন আকর্ষণ, কোন সুর কিংবা কোন অদৃশ্য টান তাঁকে নতুনভাবে জীবন ও সৃষ্টিকে অনুভব করতে সাহায্য করেছিল?

রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সাক্ষাতের শতবর্ষ ইতোমধ্যে অতিক্রম করেছে। ম্যাড থেটারের মতে, এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে নাট্যমঞ্চে স্মরণ করার ক্ষেত্রে তাদের এই প্রযোজনা একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ।

নাটকটির রচনা, পরিকল্পনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন ম্যাড থেটারের প্রধান পরিচালক আসাদুল ইসলাম। মাত্র দুটি চরিত্র নিয়ে নির্মিত এ নাটকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভূমিকায় অভিনয় করছেন আসাদুল ইসলাম এবং ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর চরিত্রে অভিনয় করছেন সোনিয়া হাসান।

নাটকের আলোক প্রক্ষেপণে রয়েছেন আশরাফুল ইসলাম সায়ান এবং আবহসঙ্গীত নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন পৃথুলা।

ম্যাড থেটারের আশা, ইতিহাস, সাহিত্য ও নাট্যকলার সংমিশ্রণে নির্মিত এই প্রযোজনা রবীন্দ্রপ্রেমী, নাট্যপ্রেমী এবং গবেষকদের কাছে বিশেষ আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে।

নাটকের কাহিনি

১৯২৪ সাল। পেরুর স্বাধীনতার শতবর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল পেরু সরকার। সেই আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে তিনি শ্রীলঙ্কার কলম্বো বন্দর থেকে জাহাজে যাত্রা শুরু করেন। কিন্তু টানা প্রায় দুই মাসের সমুদ্রযাত্রার ক্লান্তিতে তার শরীর ভেঙে পড়ে। ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হয়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন।

পেরুতে পৌঁছানোর আগেই আর্জেন্টিনায় তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়। চিকিৎসকদের পরামর্শে বাধ্য হয়ে তাঁকে যাত্রা স্থগিত করে বিশ্রাম নিতে হয়। প্লাজা হোটেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একদিন তার এক পাঠিকা দেখা করতে আসেন। সেই পাঠিকার আমন্ত্রণে তিনি শহরের বাইরে সান ইসিদ্রোর মিরালরিও ভিলা নামে একটি ভাড়া বাড়িতে গিয়ে বিশ্রাম নিতে শুরু করেন।

রিও দে লা প্লাটা নদীর তীরে অবস্থিত মিরালরিও ভিলার ব্যালকনিতে রাখা একটি চেয়ারে বসে তিনি নদীর দিকে তাকিয়ে থাকতেন, ভাবনায় ডুবে যেতেন এবং কবিতা লিখতেন। সেখানেই তার সঙ্গে গড়ে ওঠে পাঠিকা ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর গভীর সখ্য। ওকাম্পোর আন্তরিক সেবা-শুশ্রূষা ও সান্নিধ্যে রবীন্দ্রনাথ ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন।

প্রথমে মাত্র এক সপ্তাহ থাকার পরিকল্পনা থাকলেও অজান্তেই সেই সময় গড়িয়ে যায়। ১৯২৪ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বর—দুই মাস তিনি কাটিয়ে দেন মিরালরিও ভিলায়। এরপর দেশে ফেরার সময় ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রবীন্দ্রনাথকে উপহার দেন একটি চেয়ার—যে চেয়ারে বসে তিনি লিখতেন কিংবা নদীর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ সময় কাটাতেন।

ওকাম্পোর দেওয়া সেই চেয়ার সঙ্গে নিয়েই তিনি শান্তিনিকেতনে ফিরে আসেন। মিরালরিও ভিলায় অজানা ভাষার দেশে কাটানো দিনগুলোতে লেখা কবিতাগুলো নিয়েই পরবর্তীতে প্রকাশিত হয় তার কাব্যগ্রন্থ ‘পূরবী’। সেই গ্রন্থ তিনি উৎসর্গ করেন ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোকে।

জীবনের বাকি সময় যক্ষের ধনের মতো তিনি আগলে রেখেছিলেন ওকাম্পোর দেওয়া সেই চেয়ার। জীবনের শেষপ্রান্তেও তিনি ভুলে যাননি সেই উপহার, ভুলে যাননি স্মৃতিময় সান ইসিদ্রোর দিনগুলোকেও। শান্তিনিকেতনের বারান্দায় রাখা সেই চেয়ারে বসে তিনি আপন মনে উচ্চারণ করতেন— ‘আমি যাব, আমি যাব, কোথায় সে, কোন দেশ।’

জীবনের শেষ সময়ে যখন অবলুপ্ত চেতনা থেকে ক্ষণিকের জন্য ফিরে আসতেন, তখন চেতন-অবচেতনের সেই সীমারেখায় ভেসে উঠত প্রিয় চেয়ারটির প্রতিকৃতি—যার কোলে বিছানো রয়েছে বিদেশের আদরের বাণী। সান ইসিদ্রো থেকে শান্তিনিকেতন, ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সান্নিধ্যে থাকা এবং না-থাকার মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সেই সময়কে অন্য এক সময় থেকে ফিরে দেখার অসামান্য উদ্ভাবনই ‘রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় বিজয়া’।

মানুষের সঙ্গে মানুষের প্রেম এবং প্রেমের ক্ল্যাসিক কাহিনিগুলোই পারে যুদ্ধবিধ্বস্ত, ক্লান্ত পৃথিবীকে নবধারার জলে স্নাত করতে। বিদ্বেষশূন্য, প্রেমময় পৃথিবীর প্রত্যাশা ও প্রতিদিনের প্রচেষ্টার প্রতীক হিসেবেই নির্মিত হয়েছে ‘রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় বিজয়া’ —একটি নির্মল গোলাপ।

ad
ad

সাত-পাঁচ থেকে আরও পড়ুন

বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ পপ তারকা টেলর সুইফট ও এনএফএল তারকা ট্রাভিস কেলসি

মার্কিন পপ তারকা টেলর সুইফট ও এনএফএল তারকা ট্রাভিস কেলসি আনুষ্ঠানিকভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। শুক্রবার নিউইয়র্কে জাঁকজমকপূর্ণ এক আয়োজনে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। বহুল আলোচিত এই বিয়েকে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের ‘রাজকীয় বিয়ে’ হিসেবে অভিহিত করছেন।

১৯ দিন আগে

সালমান শাহর মরদেহ কবর থেকে উত্তোলনের সিদ্ধান্ত বাতিল

দীর্ঘ ৩০ বছর পর মরদেহের কোনো অবশেষ পাওয়ার ক্ষীণ সম্ভাবনা এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগার আশঙ্কায় মামলার বাদী ও সালমান শাহর পরিবার এই আবেদনটি করেছিলেন।

২৩ জুন ২০২৬

সৌদিতে শুটিংয়ে গিয়ে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত ব্রেকিং ব্যাডের ‘গাস ফ্রিং’

এসপোসিতোর নামাজ পড়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, একটি মসজিদের ভেতরে প্রযোজনা দলের কয়েকজন সদস্য নামাজে অংশ নিচ্ছেন। তাদের মধ্যেও রয়েছেন ব্রেকিং ব্যাড সিরিজের এ তারকা।

২১ জুন ২০২৬

কলকাতায় হেনস্তার অভিযোগ— মোশাররফ করিম বললেন ‘তেমন কিছুই ঘটেনি’

বাংলাদেশের জনপ্রিয় অভিনেতা মোশাররফ করিমকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া হেনস্তার অভিযোগের বিষয়ে অবশেষে মুখ খুলেছেন তিনি। কলকাতায় অবস্থানকালে তার সঙ্গে অপ্রীতিকর আচরণের চেষ্টা করা হয়েছে— এমন দাবিকে নাকচ করে অভিনেতা বলেছেন, বাস্তবে তেমন কোনো ঘটনা ঘটেনি।

১৬ জুন ২০২৬