সাহিত্য

যুদ্ধবিরোধী ১০টি কালজয়ী কবিতা

অরুণাভ বিশ্বাস

যুদ্ধ কেবল রণক্ষেত্রেই ঘটে না, তার বিস্তার ঘটে মানুষের হৃদয়ে, স্মৃতিতে, আর সাহিত্যে। যুদ্ধবিরোধী কাব্যসাহিত্য সেই সব কবিতার সমষ্টি, যেগুলো কেবল বারুদের গন্ধে ভরা যুদ্ধক্ষেত্রের নৃশংসতাকে তুলে ধরে না, বরং মানুষের বেদনা, ব্যর্থতা, প্রতিরোধ ও মানবিকতাকে এক অবিস্মরণীয় ভাষায় প্রকাশ করে। কবিতার মাধ্যমে যুদ্ধবিরোধী বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার শক্তি অসাধারণ। কারণ কবিতা সংক্ষিপ্ত হলেও তার ভাবগভীরতা, শব্দের ইঙ্গিত ও চিত্রকল্পে এক অনন্য প্রতিবাদ গড়ে তোলে।

বিশ্ব সাহিত্যে যুদ্ধবিরোধী অনেক কবিতা আছে যেগুলো কালজয়ী হয়ে উঠেছে তাদের সাহস, শৈলী ও অনুভবের গভীরতার কারণে। যেমন উইলফ্রেড ওয়েন-এর ডালচে এৎ ডেকোরাম এস্ত (Dulce et Decorum Est) কবিতাটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বর্বর বাস্তবতাকে যে নিষ্ঠুর নগ্নতায় তুলে ধরেছে, তা পাঠকের হৃদয় ভেঙে দেয়। সৈনিকের কাশির শব্দ, গ্যাস হামলার আতঙ্ক, আর এক মৃত্যুপথযাত্রীর ছটফটানি—এসব এমনভাবে বর্ণিত যে পাঠক এক মুহূর্তে যুদ্ধের মধ্যেই নিজেকে কল্পনা করে ফেলে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্য অধ্যাপক ড. এলেন ম্যাকডোনাল্ড বলেন, “ওয়েনের কবিতাগুলো যুদ্ধের বিপরীতে দাঁড়ানো এক নির্লজ্জ সত্যের মুখোমুখি করে, যা কোনো রাজনৈতিক ভাষণ কখনো পারে না।”

আবার আরও এক বিখ্যাত কবি সিগফ্রিড সাসুন, যিনি নিজেও একজন সৈনিক ছিলেন, তাঁর বেস ডিটেইলস (Base Details) বা দে (They) কবিতাগুলোর মাধ্যমে যুদ্ধের পেছনে থাকা শ্রেণিগত ভণ্ডামি ও রাজনীতিকদের দ্বিচারিতা তুলে ধরেন। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা দূরে বসে যুদ্ধের রক্তক্ষয় উপভোগ করে, অথচ মরতে হয় তরুণ সৈনিকদের। হালের প্রখ্যাত ব্রিটিশ সাহিত্য গবেষক অ্যান্ড্রু রথওয়েল এই প্রসঙ্গে বলেন, “সাসুনের ভাষা ক্ষিপ্র ও দগ্ধ, যেন প্রতিটি শব্দে একটা বিষণ্ণ চিৎকার লুকিয়ে আছে।”

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকান কবি ক্যার্ল স্যান্ডবার্গ তাঁর গ্রাস (Grass) কবিতায় ইতিহাসের বিখ্যাত যুদ্ধক্ষেত্রগুলোর কথা বলেন—ওয়াটারলু, গেটিসবার্গ, ভারডান। কিন্তু কবিতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে ঘাস, যে ঘাস সব মৃতদেহ ঢেকে দেয়। মৃত্যুর সংখ্যা, জাতি, ইতিহাস—সব ভুলে যায় পৃথিবী, শুধু ঘাস বেড়ে ওঠে। ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর অধ্যাপক মেলানিয়া রিভস এই কবিতার বিষয়ে বলেন, “এটি প্রকৃতির এক নির্বাক প্রতিবাদ—যুদ্ধের স্মৃতি মানুষ ভুলে গেলেও প্রকৃতি তা ঢেকে রাখে, যেন এক সতর্ক বার্তা।”

আরও এক অনন্য কবিতা হলো প্যাবলো নেরুদার আই’ম এক্সপ্লেইনিং আ ফিউ থিংস (I'm Explaining a Few Things)। এই কবিতায় তিনি স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের ভয়াবহতা আর ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সাধারণ মানুষের বেদনা ও ঘৃণাকে শব্দে রূপ দেন। তাঁর ভাষা রুক্ষ, অথচ হৃদয়গ্রাহী। তিনি লেখেন—“অ্যান্ড ওয়ান মর্নিং অল দ্যাট ওয়াজ বার্নিং, ওয়ান মর্নিং দ্য বনফায়ারস লেপ্ট আউট অব দ্য আর্থ।” এই পঙক্তিতে যেন প্রতিটি স্প্যানিয়ার্ডের আর্তনাদ জড়িয়ে আছে। চিলির সাহিত্যানুরাগী অধ্যাপক মার্সেলা গুয়েতো বলেন, “নেরুদা কেবল ইতিহাস বলেননি, তিনি সেই জ্বলন্ত সময়কেই কবিতার ভাষায় জীবন্ত করে তুলেছেন।”

যুদ্ধবিরোধী কাব্যের আলোচনায় টি. এস. এলিয়ট বা ডাব্লিউ. এইচ. অডেনের মতো আধুনিক কবিদের কথাও উঠে আসে। অডেনের সেপ্টেম্বর ওয়ান, নাইনটিন থার্টি নাইন (September 1, 1939) কবিতাটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার দিন লেখা। নিউ ইয়র্কের এক বার থেকে বসে তিনি যেন গোটা পৃথিবীর বিপন্নতার ছবি আঁকেন। কবিতার শেষ দিকে তিনি লেখেন—“উই মাস্ট লাভ ওয়ান অ্যানাদার অর ডাই”—যা হয়ে ওঠে যুদ্ধবিরোধী এক অনন্ত মানবিক স্লোগান। এ বিষয়ে আমেরিকার কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লরা ব্লেক বলেন, “অডেনের এই পঙক্তিটি বহু মানুষকে শান্তির পথ বেছে নিতে উদ্বুদ্ধ করেছে, যদিও পরে অডেন নিজেই তা সংশোধন করেন, তবুও তার প্রভাব অমোচনীয়।”

রাশিয়ান কবি আনা আখমাতোভা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও স্তালিনি দমননীতির পটভূমিতে রেকুইয়েম (Requiem) নামক একটি দীর্ঘ কবিতা রচনা করেন। এটি কোনো নির্দিষ্ট যুদ্ধ নয়, বরং শাসকের দমননীতির বিরুদ্ধে মায়ের আর্তি, যিনি তার ছেলের মুক্তির অপেক্ষায় দিন গোনেন। কবিতার প্রতি পঙক্তিতে অশ্রু জমে, আর পাঠক বুঝে যান—যুদ্ধ শুধু বারুদের গন্ধে নয়, নীরব কারাগারেও ঘটে।

ভিয়েতনাম যুদ্ধকালীন সময়ে আমেরিকান কবি ডেনিস লেহেন তাঁর দ্য রিফিউজিং টু কিল পোয়েমস (The Refusing to Kill Poems) সিরিজের মধ্যে যুদ্ধ-বিরোধী যে অবস্থান নেন, তা পাঠকের বিবেককে তীব্রভাবে নাড়া দেয়। তিনি বলেন, "যুদ্ধ আমার হাতে দিইনি আমি; তা এসেছে পুরনো, অবিবেচক পুরুষদের গলা থেকে।" এই কবিতার প্রতিবাদ সরাসরি, কিন্তু মানবিকতায় পূর্ণ।

সাম্প্রতিক সময়েও যুদ্ধবিরোধী কাব্যচর্চা থেমে নেই। সিরিয়ার কবি আদোনিস তাঁর কবিতায় যুদ্ধের অদৃশ্য ক্ষত, নির্বাসনের বেদনা আর বিশ্ব রাজনীতির সহিংসতা নিয়ে কথা বলেন। তাঁর কবিতা আ গ্রেভ ফর নিউ ইয়র্ক (A Grave for New York) বিশ্বকে মনে করিয়ে দেয়, আধুনিক শহরগুলো শুধু বাণিজ্যের নয়, নীরব সহিংসতারও নায়ক। আমেরিকান সাহিত্য গবেষক রেবেকা সাইডার মন্তব্য করেন, “আদোনিস যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান প্রকৃতির ভাষায়, যা পশ্চিমা রাজনীতির জটিল ভাষাকে ছাড়িয়ে যায়।”

এই কবিতাগুলোর প্রতিটিই একটি কালজয়ী প্রতিবাদপত্র। কেউ বলেন রক্তের গল্প, কেউ বলেন মায়ের কান্না, কেউ বলেন শহরের ধ্বংসস্তূপ। কিন্তু সব কিছুর গভীরে থাকে এক মানবিক আহ্বান—যুদ্ধ নয়, ভালোবাসা চাই। যুদ্ধ নয়, ঘাস, কবিতা আর জীবনের জয়গান চাই। যুদ্ধবিরোধী কবিতা কেবল সাহিত্য নয়, তা ইতিহাস, তা প্রতিবাদ, তা সহানুভূতির পাঠ। আর এ কারণেই তারা যুগ পেরিয়েও আজও নতুন করে পড়ে শোনার দাবি রাখে।

ad
ad

সাত-পাঁচ থেকে আরও পড়ুন

কানের শীর্ষ পুরস্কার জিতল ‘ফিয়র্ড’

‘ফিয়র্ড’ সিনেমাটিতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন সেবাস্টিয়ান স্ট্যান ও রেনেট রেইনসভে। এটি পরিচালক মুঙ্গিউয়ের ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় পালম ডি'অর। এর আগে ২০০৭ সালে তার বিখ্যাত ছবি ‘ফোর মান্থস, থ্রি উইকস, অ্যান্ড টু ডেজ’-এর জন্য তিনি প্রথমবার এই শীর্ষ পুরস্কার পেয়েছিলেন।

২৪ মে ২০২৬

এবার বাংলাদেশি দর্শকের জন্য ‘চকোলেট’

এর আগে, ২০১৭ সালে জসীম আহমেদের চলচ্চিত্র ‘দাগ’ আমেরিকার মূলধারার টেলিভিশনে প্রদর্শনের মাধ্যমে শর্টস ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে তার যাত্রা শুরু হয়। পরে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে নির্মিত তার প্রামাণ্যচিত্র ‘অ্যা পেয়ার অব স্যান্ডেলস’ একই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী প্রদর্শিত হয় এবং তুরস্কে সেরা পরিচালকের পুর

২২ মে ২০২৬

তায়েব সালিহর উপন্যাস ‘উত্তরে অভিবাসনের মওসুম’ নিয়ে আলোচনা

কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীরের ভাষান্তরে আধুনিক আরবি সাহিত্যের দিকপাল তায়েব সালিহর সাড়া জাগানো উপন্যাস ‘উত্তরে অভিবাসনের মওসুম’ বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠান ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল বুধবার বিকেল ৪টায় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বেঙ্গলবুকসের উদ্যোগে রাজধানীর পুরানা পল্টনের জামান টাওয়ারে এ

২১ মে ২০২৬

কারিনার পর হেপাটাইটিস ‘এ’ ভাইরাসে আক্রান্ত ডিজে সনিকা

দেশের জনপ্রিয় ডিজে ও সংগীতশিল্পী সনিকা হেপাটাইটিস ‘এ’ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। বর্তমানে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তিনি।

১৯ মে ২০২৬