জাতীয় সংগীতের প্রতি সম্মান: সংসদীয় ও রাষ্ট্রীয় রীতি ভঙ্গের প্রশ্নে জাতির ভাবনা

আপডেট : ১৫ মার্চ ২০২৬, ০৯: ৪৯

১.

২০২৬ সালের ১২ মার্চ বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের অধিবেশনের প্রথম দিনটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয়। সংবিধান অনুযায়ী সংসদের নতুন অধিবেশন শুরু হলে রাষ্ট্রপতি সংসদে ভাষণ দেন এবং সেই ভাষণের আগে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। জাতীয় সংগীত বাজানোর সময় সাধারণত সংসদের সব সদস্য দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করেন— এটি একটি দীর্ঘদিনের সংসদীয় ও স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠিত রীতি এবং জাতীয় সংস্কৃতির অংশ।

কিন্তু এ বছরের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশনের প্রথম দিনের সেই মুহূর্তে কিছু সংসদ সদস্যের আচরণ নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী ও ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) কয়েকজন সদস্য জাতীয় সংগীত শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়াননি— এমন অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

২.

বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ কেবল একটি গান নয়; এটি জাতির স্বাধীনতা, আত্মত্যাগ ও জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে এ সংগীত গভীরভাবে সম্পৃক্ত। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা দেশের বাইরে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায়, বিশেষ করে রাষ্ট্রপতির উপস্থিতি বা প্রস্থানকালে জাতীয় সংগীত বাজানোর সময় দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করা একটি স্বীকৃত সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় আচরণ।

সংসদ ভবনের মতো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইনসভায় এ রীতির গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ সেখানে উপস্থিত সংসদ সদস্যরা জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং রাষ্ট্রের প্রতি তাদের আনুগত্য ও দায়বদ্ধতার প্রতীকী প্রকাশও এই আচরণের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়।

৩.

এ ঘটনার পর অনেক নাগরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সামাজিক মাধ্যমে প্রশ্ন তুলেছেন— জাতীয় সংগীতের সময় যথাযথ সম্মান প্রদর্শন না করা কি কেবল একটি সংসদীয় আচরণগত ত্রুটি, নাকি এর মধ্যে আরও গভীর রাজনৈতিক বার্তা নিহিত আছে?

আবার অন্য একটি মত হলো, সংসদে বিরোধী দল বা কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে রাষ্ট্রপতির ভাষণের প্রতিবাদ জানাতে বয়কট, ওয়াকআউট বা বক্তব্য না শোনার মতো গণতান্ত্রিক পদ্ধতি গ্রহণ করা একজন সংসদ সদস্য বা নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। তবে জাতীয় সংগীতের মুহূর্তটি রাজনৈতিক বা মতাদর্শগত বিভেদের ঊর্ধ্বে থাকা উচিত। কারণ রাষ্ট্রপতির ভাষণ ও জাতীয় সংগীত দুটি ভিন্ন বিষয়, একটি রাজনৈতিক বা নীতিগত আলোচনার অংশ, অন্যটি পুরো জাতির ঐক্য, স্বাধীনতার চেতনা এবং সার্বভৌমত্বের প্রতীক।

৪.

বাংলাদেশের সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় রীতিনীতির আলোকে জাতীয় প্রতীকগুলোর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা নাগরিকদের একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত। জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত ও জাতীয় স্মৃতিসৌধ— এসব প্রতীক দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস ও আত্মত্যাগের স্মারক বহন করে।

বিশ্বের অনেক দেশেই জাতীয় সংগীত বা পতাকার অবমাননা নিয়ে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নজির রয়েছে। তবে বাংলাদেশে সাধারণত এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিতর্কই বেশি দেখা যায়। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ঘটনার প্রকৃতি, উদ্দেশ্য এবং প্রেক্ষাপট বিবেচনা করেই এ বিষয়ে আইনি পদক্ষেপের প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে।

৫.

এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংসদ সদস্যদের ভূমিকা এবং রাষ্ট্রের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা ও আন্তরিকতা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই মনে করেন, সংসদ সদস্যরা কেবল একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি নন, তারা পুরো দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। ফলে সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে তাদের আচরণ সাধারণ জনগণের কাছে একটি প্রতীকী বার্তা বহন করে।

বিশেষ করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, জাতীয় ঐক্য ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের আলোকে জাতীয় প্রতীকগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের বিষয়টি নতুন প্রজন্মের কাছে আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ এটি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের সংসদ, এবং সেখানে উপস্থিত সদস্যরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি।

৬.

অতএব গত ১২ মার্চ সংসদের প্রথম দিনের এ ঘটনাটি কেবল একটি ক্ষণিক বিতর্ক নয়; এটি জাতীয় মূল্যবোধ, সংসদীয় আচরণ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রশ্নকেও সামনে এনেছে।

গণতন্ত্রে মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু জাতীয় ঐক্যের প্রতীকগুলোর প্রতি সম্মিলিত শ্রদ্ধাবোধ থাকা প্রয়োজন— এমন প্রত্যাশা অনেক নাগরিকের। রাষ্ট্র ও সংসদ এই বিষয়টিকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে এবং ভবিষ্যতে সংসদীয় রীতিনীতি আরও সুস্পষ্টভাবে অনুসরণ করা নিশ্চিত করবে সেটিই এখন জনমনে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতি তাই এ বিষয়ে দায়িত্বশীল ব্যাখ্যা ও স্পষ্ট অবস্থানের প্রত্যাশায় রয়েছে।

লেখক: ডেপুটি ডিরেক্টর (ফ্যাকাল্টি এইচআর), নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি; সাবেক সহসভাপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (ডুজা)

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জিং বাজেট

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে সরকার ৫ লাখ কর্মসংস্থান, ৬ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি, ৭ শতাংশ মূল্যস্ফীতি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, জ্ঞানভিত্তিক সৃজনশীল অর্থনীতির পথে এগিয়ে যেতে চায়। দুর্নীতি ও অপচয় পরিহার, শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি ও এনবিআরের সম্পদ সংগ্রহে গতি সঞ্চারের মাধ্য

৭ দিন আগে

হাম বিতর্কে মায়ের ওপর দায় চাপানো বন্ধ করুন

কিছুসংখ‍্যক মানুষ গত কয়েকদিন ধরে এই কথা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছেন যে, মায়েরা তাদের শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না, তাই হামের সংক্রমণ বাড়ছে! শিশুরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে। আর ‘কান নিয়েছে চিলে’— সেই কানের খোঁজ না করেই কিছু মূলধারার সংবাদমাধ্যম লিখেছে, মায়েরা শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না বলেই হামের

৮ দিন আগে

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলকে হটিয়ে বিজেপি— নির্বাচনি ফলাফলের কাটাছেঁড়া

তৃণমূল নেতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভোট ব্যাংক ছিল মূলত সংখ্যালঘু ও নারী ভোট। ফলাফলে দেখা গেছে, যে তৃণমূলের ৮০ জন জয়ী প্রার্থীর মধ্যে ৩২ জন মুসলিম, যা ঠিক ঠিক ৪০ শতাংশ। এ ছাড়া অন্যান্য দলের আরও ছয়টি আসনে মুসলিম প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। তাহলে কংগ্রেস, সিপিএম ও বিশেষত নওসাদ সিদ্দিকির ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট

৯ দিন আগে

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বেজে উঠেছে পুরোদস্তুর এক মহাযুদ্ধের দামামা

চলমান এই স্নায়ুযুদ্ধ যদি সত্যি সত্যি আগামী সপ্তাহে পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়, তবে তার মাশুল শুধু মধ্যপ্রাচ্যকে নয়, বরং পুরো বিশ্বকে দিতে হবে। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ আর পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই সংঘাত কূটনৈতিক টেবিলে সমাধান হবে, নাকি বিশ্বকে এক নতুন অর্থনৈতিক মন্দা ও তৃতীয়

১১ দিন আগে