ব্যঙ্গ রচনা

বাংলাদেশের রাজনীতি ও চাঁদাবাজি: একজন ভোটারের উক্তি

এ এম কামরুল ইসলাম

এই যে বাংলার জনগণ, আপনারা ধৈর্য ধরে আমার কিছু কথা শোনেন। আমি একজন সাধারণ ভোটার। খুবই সাধারণ। এমনকি ভোটের পর আমার গুরুত্বও সাধারণের চেয়ে কম হয়ে যায়। তবে নির্বাচন এলেই আমি হঠাৎ খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠি, যেন আমি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করব!

কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ নির্ধারণের আগেই শুরু হয় এক মহাযজ্ঞ— নাম তার ‘চাঁদা সংগ্রহ অভিযান’।

ভোটের শুরুতেই এলাকার রাজনৈতিক ভাই আসেন আমার দোকানে। বলেন—

‘ভাই, নেতা আসতেছে আগামী শুক্রবার। একটা সফল জনসভা করতে হবে। আপনি এলাকার মানুষ, একটু সহায়তা করেন।’

আমি বুঝি— ‘সহায়তা’ মানে চাঁদা, আর ‘সফল জনসভা’ মানে আমার টাকা দিয়ে অন্যের মাইক বাজবে।

তাই আমি হাসিমুখে বলি, ‘ঠিক আছে ভাই, কত লাগবে?’

তিনি বলেন, ‘যত মন চায় দেন, তবে কম দিলে মন খারাপ হয়।’

আমি ৫০০ টাকা দিই, তিনি ৫ সেকেন্ডে খুশি হন।

দেখে বুঝলাম, চাঁদাবাজি আসলে মানসিক প্রশান্তির এক প্রাচীন পদ্ধতি।

নেতার আগমন ও জনসভা

শুক্রবার জনসভা হলো। রাস্তায় মানুষের চেয়ে ব্যানার বেশি, পোস্টারের চেয়ে প্রতিশ্রুতি বেশি। নেতা মঞ্চে উঠে বললেন— ‘আমরা জনগণের টাকায় উন্নয়ন করব!’

আমি পাশে দাঁড়িয়ে ভাবছি— ‘আমারই টাকায় তো আপনার চেয়ার এসেছে, ভাই!’

তারপর মঞ্চে নাচ-গান, স্লোগান, মাইক— সব মিলিয়ে মনে হলো, জনসভা নয়, মেলা বসেছে।

চাঁদাবাজির নতুন রূপ: ডিজিটাল উন্নয়ন

একসময় চাঁদা তোলা হতো হাতে হাতে। এখন যুগ পালটেছে। একদিন দেখি, আমার ফোনে মেসেজ— ‘বিকাশে ২০০ টাকা পাঠান, দেশ গড়ার কাজে লাগবে।’

আমি অবাক হয়ে ভাবলাম— আগে চাঁদা তুলত মানুষ, এখন তোলে প্রযুক্তি!

মনে হয় একদিন ‘চাঁদা তোলার অ্যাপ’ বের হবে, নাম হবে ‘চাঁদাPay— আপনার দেশপ্রেম, এক ট্যাপে!’

রাজনীতি ও চাঁদাবাজি: মিষ্টি সম্পর্ক

রাজনীতি আর চাঁদাবাজি একে অন্যের এত ঘনিষ্ঠ যে বোঝা যায় না কে কাকে ভালোবাসে বেশি। রাজনীতিবিদরা বলেন— ‘চাঁদা না দিলে মিটিং হয় না।’

আর চাঁদাবাজরা বলেন— ‘রাজনীতি না করলে চাঁদা ওঠে না।’

একেবারে পারিবারিক সম্পর্ক! যেমন ডিম আগে না মুরগি— এই প্রশ্নের মতো— রাজনীতি আগে, না চাঁদাবাজি?

একজন উন্নয়নকর্মীর সাক্ষাৎকার

একদিন এক চাঁদাবাজ ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম— ‘ভাই, এত চাঁদা তোলেন কেন?’

তিনি গম্ভীর মুখে বললেন— ‘ভাই, দেশ গড়ার কাজ করছি। সরকার একা পারবে না।’

আমি ভাবলাম— এ কেমন দেশ গঠন? আমার দোকানের বালতি গেল, আর দেশ গড়ল!

ভোটের দিন: চাঁদার প্রতিফলন

ভোটের দিন এলে আমাকে বিশেষভাবে সম্মান করা হয়। গাড়িতে করে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে যায়। বলে— ‘ভাই, আপনি আমাদের ভরসা।’

আমি ভোট দিই, আর ভাবি—হয়তো এবার কিছু বদলাবে।

কিন্তু ভোটের পর আবার আগের দৃশ্য— চাঁদা, সভা, পোস্টার, বক্তৃতা।

বদলায় শুধু স্লোগান, চাঁদাবাজি থাকে আগের মতোই তরতাজা।

জনগণের ভূমিকা: হাসির পাত্র ও দাতব্য সংস্থা

আমরা জনগণ খুবই সহনশীল। চাঁদা দিই, আবার বক্তৃতা শুনি। মনে মনে ভাবি— ‘এই দেশকে কেউ ঠেকাতে পারবে না। উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে যাবে দেশ।’

আসলে ঠিকই— ঠেকাতে পারবে না। কারণ যে জাতি প্রতিদিন চাঁদা দিয়েও হাসে, তাকে কেউ ‘দাবিয়ে রাখতে পারবে না’!

শেষ কথা: ভোটারের দর্শন

আমি বুঝেছি, বাংলাদেশে রাজনীতি হলো নাটক, আর চাঁদাবাজি হলো সেই নাটকের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক।

এই সুরে সবাই নাচে— নেতা, কর্মী, জনগণ, এমনকি আমিও!

চাঁদা না দিলে রাগ হয়, দিলে শান্তি আসে। এ যেন আধুনিক যুগের রাজনৈতিক আচার— ‘চাঁদা দাও, দেশ বাঁচাও।’

বাংলাদেশে রাজনীতি মানে প্রতিশ্রুতির মেলা, চাঁদাবাজি মানে সেই মেলার টিকিট বিক্রি। আমি এখন বুঝেছি— ‘যত চাঁদা, তত উন্নয়ন; যত বক্তৃতা, তত বিদ্যুৎ চলে যায়!’

শেষমেশ বলি— রাজনীতি থাকুক, চাঁদা থাকুক, হাসিও থাকুক। কারণ আমরা হাসতে শিখেছি, এমনকি চাঁদা দিয়েও! অতএব, এই জাতিকে ঠেকায় কে?

লেখক: সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠাতা, সোনামুখ পরিবার ও সোনামুখ স্মার্ট একাডেমি

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

এলপিজি সিন্ডিকেটের কারসাজিতে অসহায় সরকার ও জনগণ

প্রশ্ন জাগে— তাদের দাবি কী? সব দাবিই কি কেবল এই ব্যবসায়ীদের? ভোক্তা বা দেশের নাগরিকদের কি কোনো দাবি থাকতে পারে না? জনগণকে জিম্মি করে এভাবে দাবি আদায়ের নামে যারা আন্দোলন করে, তারা কি আসলেই ব্যবসায়ী, নাকি লুটেরা?

৭ দিন আগে

তথাকথিত আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সাম্রাজ্যবাদের মুখোশ উন্মোচন

৭ দিন আগে

গণভোট ২০২৬: কী ও কেন?

‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ দীর্ঘ আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রণীত একটি রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল, যাতে দেশে বিদ্যমান সক্রিয় প্রায় সব দল সই করেছে। যেহেতু সংবিধান হলো ‘উইল অব দ্য পিপল’ বা জনগণের চরম অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তি, তাই জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত প্রস্তাবগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে জনগণের সম্মতি বা গণভোট আয়ো

৮ দিন আগে

বিশ্ব রাজনীতিতে শক্তি ও নৈতিকতা

ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগে যুক্ত থেকেও নিজেদের রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বাধীনতা রক্ষায় সচেতন অবস্থান নিয়েছে (European Council on Foreign Relations, ২০২৩)। এ অভিজ্ঞতা দেখায়, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা কতটা জরুরি।

৮ দিন আগে