
অধ্যাপক আইনুল ইসলাম

নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর পেরিয়ে গেছে ছয় মাস। এই সময়ে একদিকে রাষ্ট্রযন্ত্রে নতুন নীতিগত কাঠামোর রূপরেখা তৈরি, প্রশাসনিক পুনর্গঠন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বেশ কিছু উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়েছে। এরই মধ্যে ঘোষিত বিভিন্ন পরিকল্পনা অনুযায়ী সামাজিক সুরক্ষার আওতায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ এবং খেলাধুলা ও স্বাস্থ্য খাতে ‘স্পোর্টস কার্ড’ ও ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালুর কাজ শুরু হয়েছে।
অর্থনীতিতে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, মূল্যস্ফীতি ও রিজার্ভ নিয়ন্ত্রণ এবং বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করার পদক্ষেপে জোর দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া খাল খনন ও বৃক্ষরোপণের মতো পরিবেশবান্ধব কর্মসূচি এবং প্রশাসনিক ক্ষেত্রে মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী নীতি ও সময়ানুবর্তিতা অনুসরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি খাতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও ডিজিটাল ফ্রেমওয়ার্ক বাস্তবায়নের কথা বলা হলেও এসব প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক বাস্তবায়ন, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও আর্থিক বরাদ্দের কার্যকর প্রয়োগের ওপরই মূল সাফল্য ও চ্যালেঞ্জ নির্ভর করছে।
প্রথম ছয় মাসের বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, বাজারদর নিয়ন্ত্রণ, স্থবির অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরানো, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি এবং সর্বস্তরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত স্থায়িত্ব আনতে সরকারকে অত্যন্ত কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
একটি নবনির্বাচিত বা নতুন গঠিত সরকারের সামনে রাষ্ট্র পরিচালনার নানাবিধ সংকট ও চ্যালেঞ্জ এসে দাঁড়ায়। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের পথচলা নিছক রুটিন রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয় নয়; বরং এটি একই সঙ্গে রাজনৈতিক সমীকরণ সামলানো, গণআকাঙ্ক্ষা রক্ষা ও অর্থনৈতিক কাঠামোর ধ্বংসস্তূপ থেকে পুনরুত্থানের এক কঠিন পরীক্ষা। একটি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়ন নির্ভর করে সরকার কীভাবে তার প্রাথমিক চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করে এবং মোকাবিলা করে।
জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কার নিয়ে যে অভূতপূর্ব প্রত্যাশা ও ব্যাপক জনআকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা মেটানোই বর্তমান সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। জুলাইয়ের বিশেষ স্পিরিট বা ভাবধারাকে ধারণ করে যে ‘জুলাই সনদ’ ও সংস্কার ভাবনার উন্মেষ ঘটেছে, তার সঙ্গে সরকারের রাষ্ট্র পরিচালন নীতি ও বাস্তবায়নের একটি স্পষ্ট সমন্বয় ঘটাতে হবে।
বিরোধী দলও ক্রমাগত জুলাইয়ের স্পিরিট ও জনআকাঙ্ক্ষার কথা বলছে এবং এটাকে রাজনীতির প্রধান ইস্যু হিসেবে জিইয়ে রাখছে। সরকার অবশ্য বলছে যে তারা অক্ষরে অক্ষরে এসব বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু মুখের অঙ্গীকার ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে যদি কোনো ব্যবধান তৈরি হয়, তবে তা রাজনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে।
নির্বাচনের সময়ও আমরা দেখেছি, কোনো দলই জুলাইয়ের এই স্পিরিটকে হাতছাড়া করতে চায়নি। আগামী চার থেকে সাড়ে চার বছর বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটি একটি অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে থাকবে। কারণ বাংলাদেশের রাজনীতি সর্বদাই ইস্যুভিত্তিক। ফলে সরকার কোনোভাবেই জুলাইয়ের চেতনাকে হালকাভাবে দেখছে— এমন কোনো ইতিবাচক বা নেতিবাচক ভাবমূর্তি ছড়াতে দিতে পারে না।
এর আগে জুলাইয়ের আলোকেই বেশ কিছু অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে, যার কিছু কার্যকর হয়েছে এবং বড় অংশটি সংসদ স্টাডি করে ধাপে ধাপে পাস করবে বলে জানানো হচ্ছে। ফলে গণআকাঙ্ক্ষা রক্ষা ও নীতি সমন্বয়ের এই রাজনৈতিক পরীক্ষা সরকারকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে।
সংসদীয় গণতন্ত্রে সংসদকে সচল ও কার্যকর রাখা সরকারের অন্যতম প্রাথমিক দায়িত্ব। তবে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিরোধী দল যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সংগঠিত, সুসংগঠিত ও শক্তিশালী। অতীতে আমরা দেখেছি, বিরোধীরা বহু ক্ষেত্রে সংসদ বয়কট করত বা ছেড়ে দিত। ফলে সরকার এককভাবে বা নিজেদের মতো করে সংসদ চালিয়ে নিতে পারত। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন।
বর্তমান বিরোধী দল কিন্তু কোনো অবস্থাতেই সংসদ ছেড়ে যাবে না। তারা সার্বক্ষণিকভাবে সংসদে অবস্থান করবে, রাষ্ট্রের প্রতিটি নীতি, সিদ্ধান্ত ও গণদাবি নিয়ে সোচ্চার থাকবে এবং সরকারকে প্রতিনিয়ত যুক্তি ও সমালোচনার মুখোমুখি দাঁড় করাবে। বিরোধী দল যদি সবসময় সংসদে উপস্থিত থেকে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে চাপ তৈরি করে, সেটিই হবে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। সংসদ উত্তপ্ত হবে, নতুন নতুন আইন ও অর্ডিন্যান্স পাসের সময় জোরালো বিতর্ক হবে।
এ অবস্থায় সংসদের ভেতরে প্রতিটি মন্ত্রী ও সরকারি পক্ষকে নিজস্ব জায়গা থেকে পূর্ণ জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে এবং সংসদীয় বিতর্ক ও গণতন্ত্রকে সচল রাখতে হবে। আগামী চার-সাড়ে চার বছর সংসদ সামলানো সরকারের অন্যতম বড় রাজনৈতিক কৌশল হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটগুলো কেবল নিছক গাণিতিক কোনো সমস্যা নয়, এগুলো মূলত ‘রাজনৈতিক অর্থনীতি’ বা পলিটিক্যাল ইকোনমির অন্তর্ভুক্ত। অর্থনৈতিক কাঠামোর চরম অবনতি সরাসরি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর আঘাত হানে। সরকারের জন্য ঘাটতি বাজেট সামাল দেওয়া, বড় বড় উন্নয়ন ও সেবামূলক প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সংস্থান করা এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।
ব্যাংকিং খাত ও ম্যাক্রো-ইকোনমিক কাঠামোকে জরুরি ভিত্তিতে পুনরুদ্ধার ও সচল করতে হবে। ব্যাংকিং খাত যদি পুনর্গঠিত ও সুশাসনে না ফেরে তবে শেয়ারবাজারও কোনোদিন ঘুরে দাঁড়াবে না, বরং ঢাল হয়ে পড়ে থাকবে। আর শেয়ারবাজারে মন্দা থাকলে তার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত প্রতিটি অর্থনৈতিক খাত, বিশেষ করে রিয়েল এস্টেট খাত থেকে শুরু করে উৎপাদনশীল শিল্প খাত— সব ঢাল ও গতিহীন হয়ে পড়বে।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো— এসব খাতগুলোই দেশে বড় ধরনের কর্মসংস্থান তৈরি করে থাকে। শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা নামলে কর্মসংস্থান তো নতুন করে তৈরি হবেই না, বরং বিদ্যমান চাকরি হারানোর ঝুঁকি তীব্র রূপ নেবে। দেশের বিদ্যুৎ ও তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে এরই মধ্যেই টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক (গার্মেন্টস) খাতের বহু কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে বা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে করে ব্যাপক কর্মসংস্থান সংকট ও সামাজিক অসন্তোষ দেখা দিতে পারে।
অর্থনৈতিক কাঠামো যদি দ্রুত পুনরুদ্ধার করা না যায়, তবে এই অর্থনৈতিক সংকটগুলোই সরকারের রাজনৈতিক অস্তিত্বের সংকট বা চ্যালেঞ্জ হিসেবে প্রকাশ পাবে।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট বর্তমান অর্থনীতির পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিমণ্ডলেও এক বিশাল নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। দেশীয় অবকাঠামোগত ঘাটতি ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে দেশ জুড়ে যে ব্যাপক লোডশেডিং ও জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে, তা খুব দ্রুত রাজনৈতিক সমস্যায় রূপ নেবে।
বাংলাদেশে ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ট্রেন্ড ছিল যে নির্বাচনগুলো সাধারণত শীতকালে আয়োজন করা হতো, যেন বিদ্যুতের চাহিদা ও লোডশেডিং কম থাকে এবং রাজনৈতিক ক্ষোভ তৈরি না হয়। কিন্তু বর্তমানে লোডশেডিং ও শিল্পকারখানায় গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকা দেশের উৎপাদন ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। বিরোধী দল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের মতো সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে সংসদ উত্তপ্ত করে তুলবে। সরকারের কাছে স্পষ্ট রোডম্যাপ ও প্ল্যান চাওয়া হবে।
সরকার যদি বলে, দুই বছরের মধ্যে এ সংকট সমাধান সম্ভব নয়, তবে প্রশ্ন উঠবে— ততদিন দেশীয় শিল্প চলবে কীভাবে? শিল্প না চললে কর্মসংস্থান কীভাবে টিকবে? আর শিল্প উৎপাদিত না হলে বিশাল অঙ্কের রাজস্ব আদায় হবে কোত্থেকে? ফলে রাজস্ব আয় ছাড়া ঘাটতি বাজেট মেটানো বা রাষ্ট্র চালানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাই জ্বালানি সংকটের সমাধান করা প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
পররাষ্ট্রনীতি ও আঞ্চলিক রাজনীতির ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখা নতুন সরকারের জন্য এক অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জটিল রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভারত বাংলাদেশের তিন দিক দিয়ে বেষ্টিত। ফলে দুই দেশের সম্পর্কটি শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; আমাদের প্রতিদিনের বাজার, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিও ভারতের অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত।
সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের সম্পর্কে এক ধরনের ‘আপস অ্যান্ড ডাউন’ বা টানাপোড়েন পরিলক্ষিত হচ্ছে। সম্পর্ক সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হলেই তার প্রভাব দুপক্ষেরই অর্থনীতিতে পড়ে। যেমন— সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ থেকে ভারতে পর্যটন বা চিকিৎসার যাতায়াত কমে যাওয়ায় কলকাতার স্থানীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। আবার বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, কৌশলগত ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর।
সরকারের সামনে দ্বিবিধ চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান— একদিকে শেখ হাসিনাসহ অন্যান্য পলাতকদের ফিরিয়ে আনার মতো অত্যন্ত রাজনৈতিক ও স্পর্শকাতর ইস্যু সামলানো, অন্যদিকে জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখে দ্বিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক-কৌশলগত স্থিতিশীলতা ধরে রাখা।
ব্রিকস বা বিমসটেকের মতো বহুপাক্ষিক ফোরামগুলোর বৈঠক ও নেতৃত্ব নিয়েও উভয় সংকট ও সুরক্ষার প্রশ্ন উঠে আসছে। এমনকি আমাদের সরকারের প্রতিনিধি বা উপদেষ্টাদের সফরের ক্ষেত্রে যে অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতা বা প্রবেশে বাধার মতো স্পর্শকাতর ঘটনা ঘটেছে, তা সম্পর্কের সংবেদনশীলতা তুলে ধরে। আগামী সাড়ে চার বছরে ভারতকে কেন্দ্র করে এক স্পষ্ট, ভারসাম্যপূর্ণ ও জাতীয় স্বার্থভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি ডিটারমিন বা নির্ধারণ করা সরকারের অন্যতম বড় কাজ।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পুনরুদ্ধার এবং বেসামরিক প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীকে সচল করা ছাড়া কোনো সরকারের পক্ষেই স্বাভাবিক শাসন পরিচালনা করা সম্ভব নয়। জুলাই আন্দোলনের সময় এবং আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে দেশের পুলিশ বাহিনী এক অভূতপূর্ব ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি ও মনস্তাত্ত্বিক পতনের (মোরাল ডিক্লাইন) মুখোমুখি হয়েছে। আন্দোলনকারী ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ উভয়ের হামলা ও অস্থিতিশীলতায় পুলিশ ব্যবস্থা বলতে গেলে তছনছ ও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল।
পুলিশের পুনর্গঠনে প্রধান বাধা তিনটি—
আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক করতে হলে পুলিশকে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাদের কর্মদক্ষতা ও সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা ফেরাতে হবে। এটি চার-পাঁচ বছরের একটি ধারাবাহিক ও কঠিন চ্যালেঞ্জ।
কোনো সরকারের সামনের পথই সহজ হয় না, বিএনপি সরকারের সামনের পথটিও কোনোভাবেই কুসুমাস্তীর্ণ নয়। রাজনৈতিক স্পিরিট রক্ষা, অত্যন্ত শক্তিশালী বিরোধী দলকে সংসদে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সামলানো, ধ্বংসপ্রায় অর্থনৈতিক ও ব্যাংকিং খাত সচল করা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট কাটানো, ভারতের সঙ্গে স্বাতন্ত্র্য ও ভারসাম্যমূলক কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা এবং পুলিশ-প্রশাসনকে মনস্তাত্ত্বিক ও কার্যকরভাবে পুনর্গঠন করা— এই ছয়টি মূল স্তম্ভের ওপরই নির্ভর করছে আগামী চার থেকে সাড়ে চার বছর সরকারের সফল রাষ্ট্র পরিচালনা।
অর্থনীতি ও রাজনীতির সমন্বিত ও দূরদর্শী কৌশল গ্রহণ করতে পারলেই কেবল সরকার এই পর্বতসম চ্যালেঞ্জগুলো সফলভাবে অতিক্রম করতে পারবে।
লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর পেরিয়ে গেছে ছয় মাস। এই সময়ে একদিকে রাষ্ট্রযন্ত্রে নতুন নীতিগত কাঠামোর রূপরেখা তৈরি, প্রশাসনিক পুনর্গঠন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বেশ কিছু উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়েছে। এরই মধ্যে ঘোষিত বিভিন্ন পরিকল্পনা অনুযায়ী সামাজিক সুরক্ষার আওতায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ এবং খেলাধুলা ও স্বাস্থ্য খাতে ‘স্পোর্টস কার্ড’ ও ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালুর কাজ শুরু হয়েছে।
অর্থনীতিতে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, মূল্যস্ফীতি ও রিজার্ভ নিয়ন্ত্রণ এবং বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করার পদক্ষেপে জোর দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া খাল খনন ও বৃক্ষরোপণের মতো পরিবেশবান্ধব কর্মসূচি এবং প্রশাসনিক ক্ষেত্রে মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী নীতি ও সময়ানুবর্তিতা অনুসরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি খাতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও ডিজিটাল ফ্রেমওয়ার্ক বাস্তবায়নের কথা বলা হলেও এসব প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক বাস্তবায়ন, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও আর্থিক বরাদ্দের কার্যকর প্রয়োগের ওপরই মূল সাফল্য ও চ্যালেঞ্জ নির্ভর করছে।
প্রথম ছয় মাসের বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, বাজারদর নিয়ন্ত্রণ, স্থবির অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরানো, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি এবং সর্বস্তরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত স্থায়িত্ব আনতে সরকারকে অত্যন্ত কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
একটি নবনির্বাচিত বা নতুন গঠিত সরকারের সামনে রাষ্ট্র পরিচালনার নানাবিধ সংকট ও চ্যালেঞ্জ এসে দাঁড়ায়। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের পথচলা নিছক রুটিন রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয় নয়; বরং এটি একই সঙ্গে রাজনৈতিক সমীকরণ সামলানো, গণআকাঙ্ক্ষা রক্ষা ও অর্থনৈতিক কাঠামোর ধ্বংসস্তূপ থেকে পুনরুত্থানের এক কঠিন পরীক্ষা। একটি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়ন নির্ভর করে সরকার কীভাবে তার প্রাথমিক চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করে এবং মোকাবিলা করে।
জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কার নিয়ে যে অভূতপূর্ব প্রত্যাশা ও ব্যাপক জনআকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা মেটানোই বর্তমান সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। জুলাইয়ের বিশেষ স্পিরিট বা ভাবধারাকে ধারণ করে যে ‘জুলাই সনদ’ ও সংস্কার ভাবনার উন্মেষ ঘটেছে, তার সঙ্গে সরকারের রাষ্ট্র পরিচালন নীতি ও বাস্তবায়নের একটি স্পষ্ট সমন্বয় ঘটাতে হবে।
বিরোধী দলও ক্রমাগত জুলাইয়ের স্পিরিট ও জনআকাঙ্ক্ষার কথা বলছে এবং এটাকে রাজনীতির প্রধান ইস্যু হিসেবে জিইয়ে রাখছে। সরকার অবশ্য বলছে যে তারা অক্ষরে অক্ষরে এসব বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু মুখের অঙ্গীকার ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে যদি কোনো ব্যবধান তৈরি হয়, তবে তা রাজনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে।
নির্বাচনের সময়ও আমরা দেখেছি, কোনো দলই জুলাইয়ের এই স্পিরিটকে হাতছাড়া করতে চায়নি। আগামী চার থেকে সাড়ে চার বছর বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটি একটি অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে থাকবে। কারণ বাংলাদেশের রাজনীতি সর্বদাই ইস্যুভিত্তিক। ফলে সরকার কোনোভাবেই জুলাইয়ের চেতনাকে হালকাভাবে দেখছে— এমন কোনো ইতিবাচক বা নেতিবাচক ভাবমূর্তি ছড়াতে দিতে পারে না।
এর আগে জুলাইয়ের আলোকেই বেশ কিছু অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে, যার কিছু কার্যকর হয়েছে এবং বড় অংশটি সংসদ স্টাডি করে ধাপে ধাপে পাস করবে বলে জানানো হচ্ছে। ফলে গণআকাঙ্ক্ষা রক্ষা ও নীতি সমন্বয়ের এই রাজনৈতিক পরীক্ষা সরকারকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে।
সংসদীয় গণতন্ত্রে সংসদকে সচল ও কার্যকর রাখা সরকারের অন্যতম প্রাথমিক দায়িত্ব। তবে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিরোধী দল যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সংগঠিত, সুসংগঠিত ও শক্তিশালী। অতীতে আমরা দেখেছি, বিরোধীরা বহু ক্ষেত্রে সংসদ বয়কট করত বা ছেড়ে দিত। ফলে সরকার এককভাবে বা নিজেদের মতো করে সংসদ চালিয়ে নিতে পারত। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন।
বর্তমান বিরোধী দল কিন্তু কোনো অবস্থাতেই সংসদ ছেড়ে যাবে না। তারা সার্বক্ষণিকভাবে সংসদে অবস্থান করবে, রাষ্ট্রের প্রতিটি নীতি, সিদ্ধান্ত ও গণদাবি নিয়ে সোচ্চার থাকবে এবং সরকারকে প্রতিনিয়ত যুক্তি ও সমালোচনার মুখোমুখি দাঁড় করাবে। বিরোধী দল যদি সবসময় সংসদে উপস্থিত থেকে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে চাপ তৈরি করে, সেটিই হবে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। সংসদ উত্তপ্ত হবে, নতুন নতুন আইন ও অর্ডিন্যান্স পাসের সময় জোরালো বিতর্ক হবে।
এ অবস্থায় সংসদের ভেতরে প্রতিটি মন্ত্রী ও সরকারি পক্ষকে নিজস্ব জায়গা থেকে পূর্ণ জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে এবং সংসদীয় বিতর্ক ও গণতন্ত্রকে সচল রাখতে হবে। আগামী চার-সাড়ে চার বছর সংসদ সামলানো সরকারের অন্যতম বড় রাজনৈতিক কৌশল হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটগুলো কেবল নিছক গাণিতিক কোনো সমস্যা নয়, এগুলো মূলত ‘রাজনৈতিক অর্থনীতি’ বা পলিটিক্যাল ইকোনমির অন্তর্ভুক্ত। অর্থনৈতিক কাঠামোর চরম অবনতি সরাসরি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর আঘাত হানে। সরকারের জন্য ঘাটতি বাজেট সামাল দেওয়া, বড় বড় উন্নয়ন ও সেবামূলক প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সংস্থান করা এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।
ব্যাংকিং খাত ও ম্যাক্রো-ইকোনমিক কাঠামোকে জরুরি ভিত্তিতে পুনরুদ্ধার ও সচল করতে হবে। ব্যাংকিং খাত যদি পুনর্গঠিত ও সুশাসনে না ফেরে তবে শেয়ারবাজারও কোনোদিন ঘুরে দাঁড়াবে না, বরং ঢাল হয়ে পড়ে থাকবে। আর শেয়ারবাজারে মন্দা থাকলে তার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত প্রতিটি অর্থনৈতিক খাত, বিশেষ করে রিয়েল এস্টেট খাত থেকে শুরু করে উৎপাদনশীল শিল্প খাত— সব ঢাল ও গতিহীন হয়ে পড়বে।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো— এসব খাতগুলোই দেশে বড় ধরনের কর্মসংস্থান তৈরি করে থাকে। শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা নামলে কর্মসংস্থান তো নতুন করে তৈরি হবেই না, বরং বিদ্যমান চাকরি হারানোর ঝুঁকি তীব্র রূপ নেবে। দেশের বিদ্যুৎ ও তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে এরই মধ্যেই টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক (গার্মেন্টস) খাতের বহু কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে বা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে করে ব্যাপক কর্মসংস্থান সংকট ও সামাজিক অসন্তোষ দেখা দিতে পারে।
অর্থনৈতিক কাঠামো যদি দ্রুত পুনরুদ্ধার করা না যায়, তবে এই অর্থনৈতিক সংকটগুলোই সরকারের রাজনৈতিক অস্তিত্বের সংকট বা চ্যালেঞ্জ হিসেবে প্রকাশ পাবে।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট বর্তমান অর্থনীতির পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিমণ্ডলেও এক বিশাল নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। দেশীয় অবকাঠামোগত ঘাটতি ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে দেশ জুড়ে যে ব্যাপক লোডশেডিং ও জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে, তা খুব দ্রুত রাজনৈতিক সমস্যায় রূপ নেবে।
বাংলাদেশে ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ট্রেন্ড ছিল যে নির্বাচনগুলো সাধারণত শীতকালে আয়োজন করা হতো, যেন বিদ্যুতের চাহিদা ও লোডশেডিং কম থাকে এবং রাজনৈতিক ক্ষোভ তৈরি না হয়। কিন্তু বর্তমানে লোডশেডিং ও শিল্পকারখানায় গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকা দেশের উৎপাদন ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। বিরোধী দল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের মতো সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে সংসদ উত্তপ্ত করে তুলবে। সরকারের কাছে স্পষ্ট রোডম্যাপ ও প্ল্যান চাওয়া হবে।
সরকার যদি বলে, দুই বছরের মধ্যে এ সংকট সমাধান সম্ভব নয়, তবে প্রশ্ন উঠবে— ততদিন দেশীয় শিল্প চলবে কীভাবে? শিল্প না চললে কর্মসংস্থান কীভাবে টিকবে? আর শিল্প উৎপাদিত না হলে বিশাল অঙ্কের রাজস্ব আদায় হবে কোত্থেকে? ফলে রাজস্ব আয় ছাড়া ঘাটতি বাজেট মেটানো বা রাষ্ট্র চালানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাই জ্বালানি সংকটের সমাধান করা প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
পররাষ্ট্রনীতি ও আঞ্চলিক রাজনীতির ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখা নতুন সরকারের জন্য এক অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জটিল রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভারত বাংলাদেশের তিন দিক দিয়ে বেষ্টিত। ফলে দুই দেশের সম্পর্কটি শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; আমাদের প্রতিদিনের বাজার, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিও ভারতের অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত।
সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের সম্পর্কে এক ধরনের ‘আপস অ্যান্ড ডাউন’ বা টানাপোড়েন পরিলক্ষিত হচ্ছে। সম্পর্ক সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হলেই তার প্রভাব দুপক্ষেরই অর্থনীতিতে পড়ে। যেমন— সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ থেকে ভারতে পর্যটন বা চিকিৎসার যাতায়াত কমে যাওয়ায় কলকাতার স্থানীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। আবার বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, কৌশলগত ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর।
সরকারের সামনে দ্বিবিধ চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান— একদিকে শেখ হাসিনাসহ অন্যান্য পলাতকদের ফিরিয়ে আনার মতো অত্যন্ত রাজনৈতিক ও স্পর্শকাতর ইস্যু সামলানো, অন্যদিকে জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখে দ্বিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক-কৌশলগত স্থিতিশীলতা ধরে রাখা।
ব্রিকস বা বিমসটেকের মতো বহুপাক্ষিক ফোরামগুলোর বৈঠক ও নেতৃত্ব নিয়েও উভয় সংকট ও সুরক্ষার প্রশ্ন উঠে আসছে। এমনকি আমাদের সরকারের প্রতিনিধি বা উপদেষ্টাদের সফরের ক্ষেত্রে যে অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতা বা প্রবেশে বাধার মতো স্পর্শকাতর ঘটনা ঘটেছে, তা সম্পর্কের সংবেদনশীলতা তুলে ধরে। আগামী সাড়ে চার বছরে ভারতকে কেন্দ্র করে এক স্পষ্ট, ভারসাম্যপূর্ণ ও জাতীয় স্বার্থভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি ডিটারমিন বা নির্ধারণ করা সরকারের অন্যতম বড় কাজ।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পুনরুদ্ধার এবং বেসামরিক প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীকে সচল করা ছাড়া কোনো সরকারের পক্ষেই স্বাভাবিক শাসন পরিচালনা করা সম্ভব নয়। জুলাই আন্দোলনের সময় এবং আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে দেশের পুলিশ বাহিনী এক অভূতপূর্ব ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি ও মনস্তাত্ত্বিক পতনের (মোরাল ডিক্লাইন) মুখোমুখি হয়েছে। আন্দোলনকারী ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ উভয়ের হামলা ও অস্থিতিশীলতায় পুলিশ ব্যবস্থা বলতে গেলে তছনছ ও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল।
পুলিশের পুনর্গঠনে প্রধান বাধা তিনটি—
আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক করতে হলে পুলিশকে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাদের কর্মদক্ষতা ও সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা ফেরাতে হবে। এটি চার-পাঁচ বছরের একটি ধারাবাহিক ও কঠিন চ্যালেঞ্জ।
কোনো সরকারের সামনের পথই সহজ হয় না, বিএনপি সরকারের সামনের পথটিও কোনোভাবেই কুসুমাস্তীর্ণ নয়। রাজনৈতিক স্পিরিট রক্ষা, অত্যন্ত শক্তিশালী বিরোধী দলকে সংসদে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সামলানো, ধ্বংসপ্রায় অর্থনৈতিক ও ব্যাংকিং খাত সচল করা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট কাটানো, ভারতের সঙ্গে স্বাতন্ত্র্য ও ভারসাম্যমূলক কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা এবং পুলিশ-প্রশাসনকে মনস্তাত্ত্বিক ও কার্যকরভাবে পুনর্গঠন করা— এই ছয়টি মূল স্তম্ভের ওপরই নির্ভর করছে আগামী চার থেকে সাড়ে চার বছর সরকারের সফল রাষ্ট্র পরিচালনা।
অর্থনীতি ও রাজনীতির সমন্বিত ও দূরদর্শী কৌশল গ্রহণ করতে পারলেই কেবল সরকার এই পর্বতসম চ্যালেঞ্জগুলো সফলভাবে অতিক্রম করতে পারবে।
লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

পশ্চিমা অর্থনীতিবিদদের তৈরি করা এই ‘স্টেয়ারকেস মডেল’ থেকে যে ধারণার জন্ম, চীনের বিরুদ্ধে মূলত সেই ধারণাটিই প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু এই ধারাবাহিকতাকেই কেন অর্থনীতির চূড়ান্ত নিয়ম হিসেবে মেনে নিতে হবে? প্রতিটি দেশেরই অধিকার আছে, তার সম্পদভিত্তি, শ্রমশক্তি, পুঁজিবাজার ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা যে উন্নয়নপথকে ধরে
১০ দিন আগে
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে বাণিজ্যিক ব্যবসা হিসেবে না দেখে পুনরায় 'সেবা খাত' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। বিগত দিনে এ খাতে অপরাধের মাধ্যমে যে লুণ্ঠনের সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে, তার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল সরকার সংকট মোকাবিলায় কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জন করতে পারবে।
১১ দিন আগে
অর্থনৈতিক সফলতার দরজা খুললেও সামনে বহুমাত্রিক ‘কিন্তু’ ও চ্যালেঞ্জ ঝুলছে। এই ছয় মাসের প্রাথমিক সাফল্য দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী হবে কি না, তা নির্ভর করবে সরকার কীভাবে এসব ভূ-রাজনৈতিক সংকট মোকাবেলা করে, কীভাবে রাজস্ব বাড়ায় এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকিগুলোর সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনা করতে পারে তার ওপর। দক্ষ ব্যবস্থাপনা
১১ দিন আগে
দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বিশৃঙ্খলা বা বঞ্চনা রাতারাতি কাটিয়ে ওঠা কঠিন। তবে সরকার শিক্ষাকে অগ্রাধিকারের জায়গায় ফেরানোর যে সদিচ্ছা দেখিয়েছে, তাকে স্বাগত জানাই। এখন প্রয়োজন নীতিগত ঘোষণার দ্রুত দৃশ্যমান বাস্তবায়ন, দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অবিলম্বে একটি স্থায়ী ও নিরপেক্ষ শিক্ষা কমিশ
১১ দিন আগে