
এম গোলাম মোস্তফা ভুইয়া

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে প্রথম কাতারের একজন ছিলেন মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট স্বাধীন হওয়ার আগেই পাকিস্তান নামক নতুন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা কী হবে, তা নিয়ে দেশের শিক্ষিত সমাজ ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণির একটি ক্ষুদ্র অংশ যে নীরব প্রশ্নের সম্মুখীন হন, তারই বহির্প্রকাশ ঘটে ১৯৪৮ সালে ছাত্র ও যুবসমাজের মধ্যে। পাকিস্তানের ৫৬ শতাংশ মানুষের মুখের ভাষা বাংলাকে অগ্রাহ্য করে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার শাসকগোষ্ঠীর প্রস্তাবের প্রতিবাদে গর্জে উঠে বাংলার সচেতন ছাত্র ও যুবসমাজ।
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান স্বাধীনতা লাভের দিন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী আসামে কারারুদ্ধ ছিলেন। নভেম্বরে মুক্তি পেয়ে তিনি পূর্ব বাংলায় ফিরে আসেন। ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে দক্ষিণ টাঙ্গাইলের একটি আসন থেকে তিনি মুসলিম লীগ প্রার্থী হিসেবে পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন।
এরই মধ্যে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার দাবি উঠতে থাকে বিভিন্ন মহল থেকে। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকায় হরতাল পালিত হয়। হরতাল চলাকালে পুলিশি নির্যাতনে মানুষ হতাহতের পাশাপাশি শামসুল হক, শেখ মুজিব, অলি আহাদসহ প্রায় ৬৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এর আগে ২৯ ফেব্রুয়ারিতেও অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। প্রতিবাদে ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া প্রাদেশিক ব্যবস্থাপক সভার বাজেট অধিবেশনে উত্তপ্ত আলোচনা হয়। অধিবেশনে ভাষার প্রসঙ্গে আলোচনা করেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, মওলানা ভাসানী, খাজা নাজিমউদ্দিন, ড. প্রতাপচন্দ্র গুহ রায়, প্রভাসচন্দ্র লাহিড়ী, মনোরঞ্জন ধর, ডা. এ এম মালিক, আবু তায়েব মাজহারুল হক, মফিজউদ্দিন আহমদ, শামসুদ্দিন আহমদ, মাহমুদ আলী, মহিউদ্দিন আহমদ, আনোয়ারা খাতুন, এ কে ফজলুল হক, মোহাম্মদ রুকুনুদ্দিনসহ অন্যরা।
আন্দোলনের শুরুটা সীমাবদ্ধ ছিল ছাত্র ও যুবসমাজের মধ্যেই। ভাষা আন্দোলনের বিষয়টি রাজনৈতিক নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয় অনেকটা সময় পরে। অনেক রাজনৈতিক নেতা ভাষা আন্দোলনের শুরুতে যুক্ত ছিলেন।
ভাষা বিষয়ে ছাত্রদের দাবি সর্ম্পকে নাজিমউদ্দিন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়ে ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি ঢাকার পল্টন ময়দানে এক জনসভায় বলেন, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। প্রদেশের ভাষা কী হবে, তা প্রদেশবাসীই স্থির করবেন, কিন্তু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু।’
ওই সভায় তিনি মওলানা ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে আক্রমণ করে বক্তব্য রাখেন। মওলানা ভাসানী সম্পর্কে তিনি যা বলেন তার অর্থ— মওলানা ভাসানীর সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ রয়েছে এবং তিনি একজন ‘ভারতের চর’।
খাজা নাজিমউদ্দিনের এ অভিযোগের প্রতিবাদে দুই নেতাই পত্রপত্রিকায় বিবৃতি দেন। মওলানা ভাসানী তার দীর্ঘ বিবৃতিতে বলেন, ‘যেভাবে আজ দেশের সমস্ত জনসাধারণ মুসলিম লীগ শাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হইয়া এবং যখন পায়ের নিচ হতে ক্রমেই মাটি সরে পড়ছে তখন খাজা নাজিমউদ্দিনের পক্ষেই বেসামাল হয়ে আমার এবং সোহরাওয়ার্দীর বিরুদ্ধে আবোল তাবোল অভিযোগ আনয়ন করা কিছুমাত্র আশ্চার্যের ব্যাপার নহে। তথাকথিত মুসলিম লীগওয়ালাদের বিগত চার বছরের কুশাসনে দেশ চরম দুর্ভিক্ষ ও দারিদ্র্যের নিম্নস্তরে নামিয়া গিয়াছে। খাজা নাজিমউদ্দিন তাহাদের সব দোষত্রুটি ঢাকিবার জন্য বৃথাই আমাদের প্রতি গালিগালাজ বর্ষণ করিবার অপচেষ্টা করিয়াছেন।’
ভাসানী বিবৃতিতে আরও বলেন, ‘আমি বর্তমান মুসলিম লীগওয়ালাদের মতো মনে করি না যে ভারতের মুসলমানদের প্রতি আমাদের কোনো দায়িত্ব নাই। পাকিস্তানের প্রতি আমাদের দেশপ্রেমের জন্য খাজা নাজিমউদ্দীনের সার্টিফিকেটের প্রয়োজন পড়ে না। এ দেশের জনসাধারণ ভালো করিয়াই জানেন, বিগত ১৯৪৬ সালে যখন পাকিস্তান ইস্যুর ওপর নির্বাচন হয় তখন আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি থাকিয়াও যখন জাতির সেই ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের নির্বাচনে জয়লাভ করিবার জন্য উত্তরবঙ্গে আমি প্রাণপণে কাজ চালাইয়া যাইতেছিলাম, খাজা নাজিমউদ্দিনের তখন সুদূর আমেরিকায় এবং তাহার বর্তমান অনুচরবর্গের অনেকেই তখন হয়তো কংগ্রেস নতুবা ব্রিটিশের অধীনে চাকরিরত।’
ভাষা আন্দোলনে করণীয় নির্ধারণে বায়ান্নর ৩১ জানুয়ারি ঢাকার বার লাইব্রেরিতে সর্বস্তরের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের এক সাধারণ সভায় ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন হয়। এ সভায় মওলানা ভাসানীকে প্রধান করে যে ৪০ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয় সেখানে ছিলেন— আবুল হাশিম, আতাউর রহমান খান, কামরুদ্দীন আহমেদ, খয়রাত হোসেন, আনোয়ারা খাতুন, শামসুল হক, আবুল কাশেম, আবদুল গফুর, মোহাম্মদ তোয়াহা, অলি আহাদ, মীর্জা গোলাম হাফিজ, আবদুল মতিন, কাজী গোলাম মাহবুব, শামসুল হক চৌধুরী, খালেক নেওয়াজ খান, সৈয়দ আবদুর রহিমের মতো উল্লেখযোগ্য নেতারা।
সেই সভাতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রাভাষা কমিটির পূর্বঘোষিত ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র ধর্মঘট এবং ওই দিনের সভা ও শোভাযাত্রার প্রতি সমর্থন জানানো হয়। ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক অলি আহাদ লিখেছেন, ‘৬ ফেব্রুয়ারি পূর্ববঙ্গ কর্মী শিবির অফিস ১৫০ মোগলটুলিতে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সভাপতিত্বে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। সরকার যদি ১৪৪ ধারা ইত্যাদি নিষেধাজ্ঞা জারি করে, তাহা হইলে আইন ভঙ্গ করা হইবে কি হইবে না তাহাও আলোচিত হয়।’
অলি আহাদ লিখেছেন, ‘বেশির ভাগ উপস্থিত সদস্যই আইনভঙ্গের বিপক্ষে মত দেন। কিন্তু আমি ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে দৃঢ় মত প্রকাশ করি। বৃদ্ধ মওলানা ভাসানী আসন হইতে আমার বক্তব্যের সমর্থনে জোরালো ভাষায় ঘোষণা করিয়া বলেন, সরকার আমাদের নিয়মতান্ত্রিক শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলনকে ইচ্ছাকৃতভাবে বানচাল করিবার জন্য অন্যায়ভাবে আইনের আশ্রয় গ্রহণ করে। সে সরকার কর্তৃক জারিকৃত নিষেধাজ্ঞাকে মাথা নত করিয়া গ্রহণ করিবার অর্থ স্বৈরাচারের নিকট আত্মসমর্পণ। যা হোক, কোনোরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা ব্যতীতই সেই দিনকার সভা মূলতবী করা হয়।’ (জাতীয় রাজনীতি-৪৭-৭৫)
ভাষা সৈনিক অলি আহাদের ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে দেওয়া বক্তব্যকে মওলানা ভাসানীর সমর্থন ভাষা আন্দোলনের গতিমুখ নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। তার এই দৃঢ় অবস্থানের ফলে আন্দোলন জোরদার হয়ে ওঠে। পরে ২১ ফেব্রুয়ারি সর্বাত্মক ধর্মঘট কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। পালটা ব্যবস্থা হিসেবে সরকার ২০ ফেব্রুয়ারি রাত থেকে এক মাসের জন্য সব মিছিল-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করে।
২১ ফেব্রুয়ারির হরতাল সফল করতে ৪ ফেব্রুয়ারি থেকেই প্রস্তুতি শুরু হয়। এর মধ্যে শাসকগোষ্ঠীর এক মাসের জন্য ঢাকার সর্বত্র জারি করা ১৪৪ ধারা সব মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। ওই রাতেই সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের জরুরি সভা বসে হয়। ওই সময়টা মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী মফস্বল সফরে ছিলেন। তার অনুপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সভায় সরকারের জারি করা ১৪৪ ভঙ্গের ব্যাপারে সংগ্রাম পরিষদের সদস্যদের মধ্যে তুমুল বাগ্বিতণ্ডা হয়।
অলি আহাদ পরিস্থিতি ব্যাপক ও সুস্পষ্ট বিশ্লেষণ করে দেখিয়ে দিয়েছিলেন, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে আন্দোলনের অগ্রসর না হলে ভাষা আন্দোলনের এখানেই অনিবার্য মৃত্যু ঘটবে। আর সরকারি দমননীতির কাছে বশ্যতা স্বীকার করা হবে ও জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সংগ্রাম চেতনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে। শেষ পর্যন্ত সভায় ১১-৪ ভোটে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার সিদ্ধান্ত হয়। ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন অলি আহাদ, আবদুল মতিন (ভাষা মতিন), শামসুল হক ও গোলাম মাওলা।
রাজনৈতিক নেতাদের দ্যোদুল্যমানতা সত্ত্বেও ছাত্র-যুবসমাজের আপসহীন প্রচেষ্টায় বায়ান্নর ২১ ফেব্রুয়ারি রচিত হলো এ দেশের সংগ্রামের ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। ১৪৪ ধারা ভঙ্গের মাধ্যমেই সূচনা হয় ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত অধ্যায়। সে অধ্যায়ে সালাম, বরকত, রফিকসহ আরও শহিদের রক্তে লেখা হয় ইতিহাস। সৃষ্টি হয় অমরে একুশে ফেব্রুয়ারি।
ব্যাপক রক্তপাতের কথা শুনেই মজলুম জননেতা ভাসানী ছুটে আসেন ঢাকায়। সরকার এতটা হিংস্র হতে পারে, সে আশঙ্কা আগে কেউ করেনি। পরদিন ভাষা শহিদদের স্মরণে মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত গায়েবানা জানাজায় উপস্থিত ছিলেন মওলানা ভাসানী।
এ সম্পর্কে ভাষাসৈনিক মোহাম্মদ সুলতান বলেছেন, ‘মওলানা ভাসানী গায়েবি জানাজা পরিচালনা করেন।’ ভাষাসৈনিক গাজীউল হক বলেন, ‘শহিদদের গায়েবি জানাজা হলো। মোনাজাত করলেন মওলানা ভাসানী।’ ভাষা আন্দোলনের মুখপত্র সাপ্তাহিক সৈনিক লিখেছে, ‘মেডিকেল কলেজের সম্মুখে তিনি (মওলানা ভাসানী) লক্ষ লোকের একটি গায়েবি জানাজার নেতৃত্ব করেন।’
২১ ফেব্রুয়ারির ভয়াবহ ও বর্বরোচিত ঘটনা সম্পর্কে মওলানা ভাসানী এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ঢাকায় যাহা ঘটিয়াছে তাহাকে নিন্দা করার ভাষা আমার নাই। কোনো সভ্য সরকার এরূপ বর্বরোচিত কাণ্ড করিতে পারে, আমি দুনিয়ার ইতিহাসে তার নজির খুঁজিয়া পাই না। বেশি কথা বলার সময় এটা নয়। আমি দাবি করি, অবিলম্বে ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার করা হোক।’
বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশি গুলির তদন্ত করার জন্য হাইকোর্ট জজ ও জনপ্রতিনিধি নিয়া গঠিত কমিশন নিযুক্ত করা হোক। আমি অপরাধীদের প্রকাশ্যে বিচার দাবি করিতেছি। এই ব্যাপারে যাদের গ্রেফতার করা হইয়াছে তাদের মুক্তি দেওয়া এবং যাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হইয়াছে অবিলম্বে তাহা প্রত্যাহার করা হোক। সর্বোপরি শহিদদের পরিবার পরিজনকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হোক।’
আন্দোলনকে স্তিমিত করতে শাসকগোষ্ঠী রাজনৈতিক নেতাকর্মী, সংস্কৃতিকর্মীসহ অসংখ্য ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছিল সরকার। তাদের মধ্যে অন্যতম— মওলানা ভাসানী, আবুল হাসিম, মাওলানা তর্কবাগীশ, শামসুল হক, মোহাম্মদ তোয়াহা, অলি আহাদ, আবদুল মতিন, কাজী গোলাম মাহবুব, খয়রাত হোসেন, খান সাহেব ওসমান আলী, খন্দকার মোশতাক আহমেদ, মোজাফ্ফর আহমেদ চৌধুরী, অজিত গুহ, খালেক নেওয়াজ খান, মির্জা গোলাম হাফিজ, সরদার ফজলুল করিম।
বন্দিজীবন সম্পর্কে ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সিপাহসালার অলি আহাদ লিখেছেন, ‘৫ নম্বর ওয়ার্ডে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, আবুল হাসিম, শামসুল হক ও আমি একত্রে বাস করিতাম। সর্বপ্রকার আশা-নিরাশার আলো-ছায়ার খেলায় বৃদ্ধ মওলানা ভাসানী সকলের নিকট পিতৃতুল্য স্নেহ, মায়া মমতা এবং সাহস, উৎসাহ ও দৃঢ়তার মূর্ত প্রতীক ছিলেন। আমাদের খাওয়া-দাওয়া ও ঔষুধপত্রের যাহাতে অসুবিধা না হয় তাহার জন্য তিনি জেল কর্তৃপক্ষের মন সুকৌশলে জয় করিয়া রাখিতেন। মোদ্দাকথা তাহার অপত্যস্নেহ ও নির্ভীক মন সেই সময়ে দুর্লভ প্রেরণার উৎস ছিল।’ (জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫-৭৫)
সেই সময়কার ভাষা আন্দোলনকারীসহ বিভিন্ন কারাগারে বন্দি কমিউনিস্ট নেতা ও বামপন্থি কর্মীদের মুক্তির জন্য বিদ্রোহ করেন মওলানা ভাসানী। এ প্রসঙ্গে অলি আহাদ তার ‘জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫-৭৫’ বইয়ে লিখেছেন, ‘রাজবন্দির মুক্তির ও অন্য দাবিতে মওলানা ভাসানী লেবুর রস পানে রোজা রাখিবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। আমরাও বন্দিমুক্তি ও কতিপয় দাবির ভিত্তিতে পূর্ণ অনশন ধর্মঘটের পরিবর্তে মওলানা ভাসানী পরামর্শমতো ৩৫ দিন অনুরূপ রোজা রাখি।’
মওলানা ভাসানী ১৯৫৩ সালের ১৮ এপ্রিল থেকে কেন্দ্রীয় কারাগারে আর রোজার মতো নয়, সম্পূর্ণ ‘আমরণ অনশন ধর্মঘট’ শুরু করেন। তাতে সরকার বিচলিত হয়। কারণ তার অনশনের সংবাদ পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে। এমনিতেই কারাবারণের সময় তার শারীরিক অবস্থা ক্রমান্বয়ে অবনতি ঘটতে থাকে।
১৯৫৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে মওলানা ভাসানীকে চিকিৎসার জন্য কয়েক দিন ঢাকা মেডিকেলে রাখা হয়েছিল। সেই সময় ২১ ফেব্রুয়ারির প্রথম বর্ষপূর্তিতে মহান ভাষা আন্দোলনের শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে জেলখানায় এক দিনের অনশন করেন তিনি। সেদিন তিনি এক ফোঁটা পানিও মুখে দেননি। অনশন ধর্মঘট শুরুর পর তার অবস্থার অবনতি ঘটলে এবং ব্যাপক জনমতের চাপে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ২১ এপ্রিল কারাগার থেকে মওলানা ভাসানীকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।
১৯৪৯ থেকে ১৯৫১ সালের মধ্যে ক্রমে জোরাল হয়ে উঠে বাংলা ভাষার মর্যাদা আদায়ের দাবি। ১৯৫২ সালে একুশে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ‘রাষ্ট্রভাষা দিবস’ ও সাধারণ ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত হয়। পাকিস্তান সরকার আন্দোলন দমন করার জন্য ১৪৪ ধারা জারির মাধ্যমে জনসমাগম, জনসভা ও মিছিল নিষিদ্ধ করে দেয়। ছাত্ররা সংগঠিতভাবে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করলে পুলিশ গুলি চালায়। শহিদ হন সালাম, রফিক, জব্বার, বরকতসহ আরও কয়েকজন।
পরদিন সারা রাত জেগে শহিদদের স্মরণে গড়া হয় শহিদ মিনার। পুলিশ তা ভেঙে ফেললে আবারও গড়ে ওঠে শহিদ মিনার। ভাষা আন্দোলনের ভেতর দিয়ে বাঙালি জাতিসত্তায় জন্ম নিয়েছিল একুশের চেতনা। এই চেতনা আমাদের জাতীয় জীবনে আত্মত্যাগের বীজমন্ত্র।
১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ব্যাপক জয়লাভের পর ১৯৫৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মওলানা ভাসানী, মুখ্যমন্ত্রী আবু হোসেন সরকার ও শহিদ বরকতের মা কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ১৯৫৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানের ২১৪ (১) অনুচ্ছেদে বাংলা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পায়। এরপর ১৯৬২ সালের সংবিধানে বলা হয়, পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা হবে বাংলা ও উর্দু। স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে বলা হয়, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। ২০০০ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
এভাবেই বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার সংগ্রামে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছিলেন মওলানা ভাসানী। ওই সময়ের অনেক নেতাও প্রাথমিক পর্যায়ে ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের সবাইকে শেষ পর্যন্ত আন্দোলনে পাওয়া যায়নি। তখনকার অন্যতম ছাত্রনেতা গাজীউল হক লিখেছেন, মওলানা ভাসানীসহ যে ৪২ নেতা এ আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন, তাদের প্রভাবশালী কয়েকজন মন্ত্রিত্ব ও রাষ্ট্রদূতের পদ নিয়ে আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করেন।
মওলানা ভাসানীর দূরদর্শী নেতৃত্ব ও বাংলার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা ভাষা আন্দোলনকে বেগবান করেছিল, যা পরে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মওলানা ভাসানীর যে অবদান তা আজ আর জাতিকে জানতে দিতে চায় না সামাজ্র্যবাদী শক্তির দালালরা। বরং তাকে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র অব্যাহত রয়েছে।
রাজনৈতিক কারণে মওলানা ভাসানীর নামটা ব্যবহার করলেও তাকে যথাযথ মূল্যায়ন করেনি ৫৫ বছরের কোনো সরকারই। নতুন সরকারের কাছে আমাদের আশা ও প্রত্যাশা— স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে যথাযথ সম্মানে অধিষ্ঠিত করতে কার্যকর কর্মসূচি এই সরকার গ্রহণ করবে।
লেখক: রাজনীতিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে প্রথম কাতারের একজন ছিলেন মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট স্বাধীন হওয়ার আগেই পাকিস্তান নামক নতুন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা কী হবে, তা নিয়ে দেশের শিক্ষিত সমাজ ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণির একটি ক্ষুদ্র অংশ যে নীরব প্রশ্নের সম্মুখীন হন, তারই বহির্প্রকাশ ঘটে ১৯৪৮ সালে ছাত্র ও যুবসমাজের মধ্যে। পাকিস্তানের ৫৬ শতাংশ মানুষের মুখের ভাষা বাংলাকে অগ্রাহ্য করে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার শাসকগোষ্ঠীর প্রস্তাবের প্রতিবাদে গর্জে উঠে বাংলার সচেতন ছাত্র ও যুবসমাজ।
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান স্বাধীনতা লাভের দিন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী আসামে কারারুদ্ধ ছিলেন। নভেম্বরে মুক্তি পেয়ে তিনি পূর্ব বাংলায় ফিরে আসেন। ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে দক্ষিণ টাঙ্গাইলের একটি আসন থেকে তিনি মুসলিম লীগ প্রার্থী হিসেবে পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন।
এরই মধ্যে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার দাবি উঠতে থাকে বিভিন্ন মহল থেকে। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকায় হরতাল পালিত হয়। হরতাল চলাকালে পুলিশি নির্যাতনে মানুষ হতাহতের পাশাপাশি শামসুল হক, শেখ মুজিব, অলি আহাদসহ প্রায় ৬৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এর আগে ২৯ ফেব্রুয়ারিতেও অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। প্রতিবাদে ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া প্রাদেশিক ব্যবস্থাপক সভার বাজেট অধিবেশনে উত্তপ্ত আলোচনা হয়। অধিবেশনে ভাষার প্রসঙ্গে আলোচনা করেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, মওলানা ভাসানী, খাজা নাজিমউদ্দিন, ড. প্রতাপচন্দ্র গুহ রায়, প্রভাসচন্দ্র লাহিড়ী, মনোরঞ্জন ধর, ডা. এ এম মালিক, আবু তায়েব মাজহারুল হক, মফিজউদ্দিন আহমদ, শামসুদ্দিন আহমদ, মাহমুদ আলী, মহিউদ্দিন আহমদ, আনোয়ারা খাতুন, এ কে ফজলুল হক, মোহাম্মদ রুকুনুদ্দিনসহ অন্যরা।
আন্দোলনের শুরুটা সীমাবদ্ধ ছিল ছাত্র ও যুবসমাজের মধ্যেই। ভাষা আন্দোলনের বিষয়টি রাজনৈতিক নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয় অনেকটা সময় পরে। অনেক রাজনৈতিক নেতা ভাষা আন্দোলনের শুরুতে যুক্ত ছিলেন।
ভাষা বিষয়ে ছাত্রদের দাবি সর্ম্পকে নাজিমউদ্দিন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়ে ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি ঢাকার পল্টন ময়দানে এক জনসভায় বলেন, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। প্রদেশের ভাষা কী হবে, তা প্রদেশবাসীই স্থির করবেন, কিন্তু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু।’
ওই সভায় তিনি মওলানা ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে আক্রমণ করে বক্তব্য রাখেন। মওলানা ভাসানী সম্পর্কে তিনি যা বলেন তার অর্থ— মওলানা ভাসানীর সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ রয়েছে এবং তিনি একজন ‘ভারতের চর’।
খাজা নাজিমউদ্দিনের এ অভিযোগের প্রতিবাদে দুই নেতাই পত্রপত্রিকায় বিবৃতি দেন। মওলানা ভাসানী তার দীর্ঘ বিবৃতিতে বলেন, ‘যেভাবে আজ দেশের সমস্ত জনসাধারণ মুসলিম লীগ শাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হইয়া এবং যখন পায়ের নিচ হতে ক্রমেই মাটি সরে পড়ছে তখন খাজা নাজিমউদ্দিনের পক্ষেই বেসামাল হয়ে আমার এবং সোহরাওয়ার্দীর বিরুদ্ধে আবোল তাবোল অভিযোগ আনয়ন করা কিছুমাত্র আশ্চার্যের ব্যাপার নহে। তথাকথিত মুসলিম লীগওয়ালাদের বিগত চার বছরের কুশাসনে দেশ চরম দুর্ভিক্ষ ও দারিদ্র্যের নিম্নস্তরে নামিয়া গিয়াছে। খাজা নাজিমউদ্দিন তাহাদের সব দোষত্রুটি ঢাকিবার জন্য বৃথাই আমাদের প্রতি গালিগালাজ বর্ষণ করিবার অপচেষ্টা করিয়াছেন।’
ভাসানী বিবৃতিতে আরও বলেন, ‘আমি বর্তমান মুসলিম লীগওয়ালাদের মতো মনে করি না যে ভারতের মুসলমানদের প্রতি আমাদের কোনো দায়িত্ব নাই। পাকিস্তানের প্রতি আমাদের দেশপ্রেমের জন্য খাজা নাজিমউদ্দীনের সার্টিফিকেটের প্রয়োজন পড়ে না। এ দেশের জনসাধারণ ভালো করিয়াই জানেন, বিগত ১৯৪৬ সালে যখন পাকিস্তান ইস্যুর ওপর নির্বাচন হয় তখন আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি থাকিয়াও যখন জাতির সেই ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের নির্বাচনে জয়লাভ করিবার জন্য উত্তরবঙ্গে আমি প্রাণপণে কাজ চালাইয়া যাইতেছিলাম, খাজা নাজিমউদ্দিনের তখন সুদূর আমেরিকায় এবং তাহার বর্তমান অনুচরবর্গের অনেকেই তখন হয়তো কংগ্রেস নতুবা ব্রিটিশের অধীনে চাকরিরত।’
ভাষা আন্দোলনে করণীয় নির্ধারণে বায়ান্নর ৩১ জানুয়ারি ঢাকার বার লাইব্রেরিতে সর্বস্তরের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের এক সাধারণ সভায় ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন হয়। এ সভায় মওলানা ভাসানীকে প্রধান করে যে ৪০ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয় সেখানে ছিলেন— আবুল হাশিম, আতাউর রহমান খান, কামরুদ্দীন আহমেদ, খয়রাত হোসেন, আনোয়ারা খাতুন, শামসুল হক, আবুল কাশেম, আবদুল গফুর, মোহাম্মদ তোয়াহা, অলি আহাদ, মীর্জা গোলাম হাফিজ, আবদুল মতিন, কাজী গোলাম মাহবুব, শামসুল হক চৌধুরী, খালেক নেওয়াজ খান, সৈয়দ আবদুর রহিমের মতো উল্লেখযোগ্য নেতারা।
সেই সভাতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রাভাষা কমিটির পূর্বঘোষিত ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র ধর্মঘট এবং ওই দিনের সভা ও শোভাযাত্রার প্রতি সমর্থন জানানো হয়। ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক অলি আহাদ লিখেছেন, ‘৬ ফেব্রুয়ারি পূর্ববঙ্গ কর্মী শিবির অফিস ১৫০ মোগলটুলিতে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সভাপতিত্বে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। সরকার যদি ১৪৪ ধারা ইত্যাদি নিষেধাজ্ঞা জারি করে, তাহা হইলে আইন ভঙ্গ করা হইবে কি হইবে না তাহাও আলোচিত হয়।’
অলি আহাদ লিখেছেন, ‘বেশির ভাগ উপস্থিত সদস্যই আইনভঙ্গের বিপক্ষে মত দেন। কিন্তু আমি ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে দৃঢ় মত প্রকাশ করি। বৃদ্ধ মওলানা ভাসানী আসন হইতে আমার বক্তব্যের সমর্থনে জোরালো ভাষায় ঘোষণা করিয়া বলেন, সরকার আমাদের নিয়মতান্ত্রিক শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলনকে ইচ্ছাকৃতভাবে বানচাল করিবার জন্য অন্যায়ভাবে আইনের আশ্রয় গ্রহণ করে। সে সরকার কর্তৃক জারিকৃত নিষেধাজ্ঞাকে মাথা নত করিয়া গ্রহণ করিবার অর্থ স্বৈরাচারের নিকট আত্মসমর্পণ। যা হোক, কোনোরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা ব্যতীতই সেই দিনকার সভা মূলতবী করা হয়।’ (জাতীয় রাজনীতি-৪৭-৭৫)
ভাষা সৈনিক অলি আহাদের ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে দেওয়া বক্তব্যকে মওলানা ভাসানীর সমর্থন ভাষা আন্দোলনের গতিমুখ নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। তার এই দৃঢ় অবস্থানের ফলে আন্দোলন জোরদার হয়ে ওঠে। পরে ২১ ফেব্রুয়ারি সর্বাত্মক ধর্মঘট কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। পালটা ব্যবস্থা হিসেবে সরকার ২০ ফেব্রুয়ারি রাত থেকে এক মাসের জন্য সব মিছিল-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করে।
২১ ফেব্রুয়ারির হরতাল সফল করতে ৪ ফেব্রুয়ারি থেকেই প্রস্তুতি শুরু হয়। এর মধ্যে শাসকগোষ্ঠীর এক মাসের জন্য ঢাকার সর্বত্র জারি করা ১৪৪ ধারা সব মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। ওই রাতেই সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের জরুরি সভা বসে হয়। ওই সময়টা মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী মফস্বল সফরে ছিলেন। তার অনুপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সভায় সরকারের জারি করা ১৪৪ ভঙ্গের ব্যাপারে সংগ্রাম পরিষদের সদস্যদের মধ্যে তুমুল বাগ্বিতণ্ডা হয়।
অলি আহাদ পরিস্থিতি ব্যাপক ও সুস্পষ্ট বিশ্লেষণ করে দেখিয়ে দিয়েছিলেন, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে আন্দোলনের অগ্রসর না হলে ভাষা আন্দোলনের এখানেই অনিবার্য মৃত্যু ঘটবে। আর সরকারি দমননীতির কাছে বশ্যতা স্বীকার করা হবে ও জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সংগ্রাম চেতনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে। শেষ পর্যন্ত সভায় ১১-৪ ভোটে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার সিদ্ধান্ত হয়। ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন অলি আহাদ, আবদুল মতিন (ভাষা মতিন), শামসুল হক ও গোলাম মাওলা।
রাজনৈতিক নেতাদের দ্যোদুল্যমানতা সত্ত্বেও ছাত্র-যুবসমাজের আপসহীন প্রচেষ্টায় বায়ান্নর ২১ ফেব্রুয়ারি রচিত হলো এ দেশের সংগ্রামের ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। ১৪৪ ধারা ভঙ্গের মাধ্যমেই সূচনা হয় ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত অধ্যায়। সে অধ্যায়ে সালাম, বরকত, রফিকসহ আরও শহিদের রক্তে লেখা হয় ইতিহাস। সৃষ্টি হয় অমরে একুশে ফেব্রুয়ারি।
ব্যাপক রক্তপাতের কথা শুনেই মজলুম জননেতা ভাসানী ছুটে আসেন ঢাকায়। সরকার এতটা হিংস্র হতে পারে, সে আশঙ্কা আগে কেউ করেনি। পরদিন ভাষা শহিদদের স্মরণে মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত গায়েবানা জানাজায় উপস্থিত ছিলেন মওলানা ভাসানী।
এ সম্পর্কে ভাষাসৈনিক মোহাম্মদ সুলতান বলেছেন, ‘মওলানা ভাসানী গায়েবি জানাজা পরিচালনা করেন।’ ভাষাসৈনিক গাজীউল হক বলেন, ‘শহিদদের গায়েবি জানাজা হলো। মোনাজাত করলেন মওলানা ভাসানী।’ ভাষা আন্দোলনের মুখপত্র সাপ্তাহিক সৈনিক লিখেছে, ‘মেডিকেল কলেজের সম্মুখে তিনি (মওলানা ভাসানী) লক্ষ লোকের একটি গায়েবি জানাজার নেতৃত্ব করেন।’
২১ ফেব্রুয়ারির ভয়াবহ ও বর্বরোচিত ঘটনা সম্পর্কে মওলানা ভাসানী এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ঢাকায় যাহা ঘটিয়াছে তাহাকে নিন্দা করার ভাষা আমার নাই। কোনো সভ্য সরকার এরূপ বর্বরোচিত কাণ্ড করিতে পারে, আমি দুনিয়ার ইতিহাসে তার নজির খুঁজিয়া পাই না। বেশি কথা বলার সময় এটা নয়। আমি দাবি করি, অবিলম্বে ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার করা হোক।’
বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশি গুলির তদন্ত করার জন্য হাইকোর্ট জজ ও জনপ্রতিনিধি নিয়া গঠিত কমিশন নিযুক্ত করা হোক। আমি অপরাধীদের প্রকাশ্যে বিচার দাবি করিতেছি। এই ব্যাপারে যাদের গ্রেফতার করা হইয়াছে তাদের মুক্তি দেওয়া এবং যাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হইয়াছে অবিলম্বে তাহা প্রত্যাহার করা হোক। সর্বোপরি শহিদদের পরিবার পরিজনকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হোক।’
আন্দোলনকে স্তিমিত করতে শাসকগোষ্ঠী রাজনৈতিক নেতাকর্মী, সংস্কৃতিকর্মীসহ অসংখ্য ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছিল সরকার। তাদের মধ্যে অন্যতম— মওলানা ভাসানী, আবুল হাসিম, মাওলানা তর্কবাগীশ, শামসুল হক, মোহাম্মদ তোয়াহা, অলি আহাদ, আবদুল মতিন, কাজী গোলাম মাহবুব, খয়রাত হোসেন, খান সাহেব ওসমান আলী, খন্দকার মোশতাক আহমেদ, মোজাফ্ফর আহমেদ চৌধুরী, অজিত গুহ, খালেক নেওয়াজ খান, মির্জা গোলাম হাফিজ, সরদার ফজলুল করিম।
বন্দিজীবন সম্পর্কে ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সিপাহসালার অলি আহাদ লিখেছেন, ‘৫ নম্বর ওয়ার্ডে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, আবুল হাসিম, শামসুল হক ও আমি একত্রে বাস করিতাম। সর্বপ্রকার আশা-নিরাশার আলো-ছায়ার খেলায় বৃদ্ধ মওলানা ভাসানী সকলের নিকট পিতৃতুল্য স্নেহ, মায়া মমতা এবং সাহস, উৎসাহ ও দৃঢ়তার মূর্ত প্রতীক ছিলেন। আমাদের খাওয়া-দাওয়া ও ঔষুধপত্রের যাহাতে অসুবিধা না হয় তাহার জন্য তিনি জেল কর্তৃপক্ষের মন সুকৌশলে জয় করিয়া রাখিতেন। মোদ্দাকথা তাহার অপত্যস্নেহ ও নির্ভীক মন সেই সময়ে দুর্লভ প্রেরণার উৎস ছিল।’ (জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫-৭৫)
সেই সময়কার ভাষা আন্দোলনকারীসহ বিভিন্ন কারাগারে বন্দি কমিউনিস্ট নেতা ও বামপন্থি কর্মীদের মুক্তির জন্য বিদ্রোহ করেন মওলানা ভাসানী। এ প্রসঙ্গে অলি আহাদ তার ‘জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫-৭৫’ বইয়ে লিখেছেন, ‘রাজবন্দির মুক্তির ও অন্য দাবিতে মওলানা ভাসানী লেবুর রস পানে রোজা রাখিবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। আমরাও বন্দিমুক্তি ও কতিপয় দাবির ভিত্তিতে পূর্ণ অনশন ধর্মঘটের পরিবর্তে মওলানা ভাসানী পরামর্শমতো ৩৫ দিন অনুরূপ রোজা রাখি।’
মওলানা ভাসানী ১৯৫৩ সালের ১৮ এপ্রিল থেকে কেন্দ্রীয় কারাগারে আর রোজার মতো নয়, সম্পূর্ণ ‘আমরণ অনশন ধর্মঘট’ শুরু করেন। তাতে সরকার বিচলিত হয়। কারণ তার অনশনের সংবাদ পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে। এমনিতেই কারাবারণের সময় তার শারীরিক অবস্থা ক্রমান্বয়ে অবনতি ঘটতে থাকে।
১৯৫৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে মওলানা ভাসানীকে চিকিৎসার জন্য কয়েক দিন ঢাকা মেডিকেলে রাখা হয়েছিল। সেই সময় ২১ ফেব্রুয়ারির প্রথম বর্ষপূর্তিতে মহান ভাষা আন্দোলনের শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে জেলখানায় এক দিনের অনশন করেন তিনি। সেদিন তিনি এক ফোঁটা পানিও মুখে দেননি। অনশন ধর্মঘট শুরুর পর তার অবস্থার অবনতি ঘটলে এবং ব্যাপক জনমতের চাপে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ২১ এপ্রিল কারাগার থেকে মওলানা ভাসানীকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।
১৯৪৯ থেকে ১৯৫১ সালের মধ্যে ক্রমে জোরাল হয়ে উঠে বাংলা ভাষার মর্যাদা আদায়ের দাবি। ১৯৫২ সালে একুশে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ‘রাষ্ট্রভাষা দিবস’ ও সাধারণ ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত হয়। পাকিস্তান সরকার আন্দোলন দমন করার জন্য ১৪৪ ধারা জারির মাধ্যমে জনসমাগম, জনসভা ও মিছিল নিষিদ্ধ করে দেয়। ছাত্ররা সংগঠিতভাবে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করলে পুলিশ গুলি চালায়। শহিদ হন সালাম, রফিক, জব্বার, বরকতসহ আরও কয়েকজন।
পরদিন সারা রাত জেগে শহিদদের স্মরণে গড়া হয় শহিদ মিনার। পুলিশ তা ভেঙে ফেললে আবারও গড়ে ওঠে শহিদ মিনার। ভাষা আন্দোলনের ভেতর দিয়ে বাঙালি জাতিসত্তায় জন্ম নিয়েছিল একুশের চেতনা। এই চেতনা আমাদের জাতীয় জীবনে আত্মত্যাগের বীজমন্ত্র।
১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ব্যাপক জয়লাভের পর ১৯৫৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মওলানা ভাসানী, মুখ্যমন্ত্রী আবু হোসেন সরকার ও শহিদ বরকতের মা কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ১৯৫৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানের ২১৪ (১) অনুচ্ছেদে বাংলা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পায়। এরপর ১৯৬২ সালের সংবিধানে বলা হয়, পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা হবে বাংলা ও উর্দু। স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে বলা হয়, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। ২০০০ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
এভাবেই বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার সংগ্রামে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছিলেন মওলানা ভাসানী। ওই সময়ের অনেক নেতাও প্রাথমিক পর্যায়ে ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের সবাইকে শেষ পর্যন্ত আন্দোলনে পাওয়া যায়নি। তখনকার অন্যতম ছাত্রনেতা গাজীউল হক লিখেছেন, মওলানা ভাসানীসহ যে ৪২ নেতা এ আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন, তাদের প্রভাবশালী কয়েকজন মন্ত্রিত্ব ও রাষ্ট্রদূতের পদ নিয়ে আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করেন।
মওলানা ভাসানীর দূরদর্শী নেতৃত্ব ও বাংলার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা ভাষা আন্দোলনকে বেগবান করেছিল, যা পরে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মওলানা ভাসানীর যে অবদান তা আজ আর জাতিকে জানতে দিতে চায় না সামাজ্র্যবাদী শক্তির দালালরা। বরং তাকে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র অব্যাহত রয়েছে।
রাজনৈতিক কারণে মওলানা ভাসানীর নামটা ব্যবহার করলেও তাকে যথাযথ মূল্যায়ন করেনি ৫৫ বছরের কোনো সরকারই। নতুন সরকারের কাছে আমাদের আশা ও প্রত্যাশা— স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে যথাযথ সম্মানে অধিষ্ঠিত করতে কার্যকর কর্মসূচি এই সরকার গ্রহণ করবে।
লেখক: রাজনীতিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে অতি লোভনীয় উদীয়মান অর্থনীতির এই দেশ কি বহির্শক্তির খেলার মাঠে পরিণত হবে, নাকি বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনায় একাট্টা হয়ে নিজেদের গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রতিকার নিজেরাই করবে— তা নিয়ে ভাবনার সময় এসেছে।
৮ দিন আগে
আমি যে নারী নির্যাতন মামলার ভিকটিম, সেই কোর্টের পাবলিক প্রসিকিউটর আমার বাবা— তাকেও শুনতে হয়েছে, ‘এত কিছুর পর মেয়েকে কেন রাজনীতি করতে দেয়!’ ৫ আগস্টের পর ভেবেছিলাম আমার লড়াই শেষ। কিন্তু তারপর অনলাইনে কিছু আইডির এমন হ্যারাসমেন্ট ও স্লাট-শেমিং আমি স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারিনি।
৯ দিন আগে
এভাবেই লাখ লাখ ভোটারকে একত্রিত করতে সক্ষম একটি নির্বাচন দলীয় কর্মী বাহিনীর একত্রিতকরণের একটি অপারেশনে পরিণত হয়। ফলে শুধু ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনাতেই কয়েক লাখ সংগঠিত কর্মী মাঠে নামাতে হয়। এই মানুষগুলো স্বেচ্ছাসেবী নন, তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হয় অর্থ, প্রভাব ও সুবিধার আশ্বাস দিয়ে।
১০ দিন আগে
বিপরীতভাবে, ইতিহাস যখন বিকৃত হয়— ইচ্ছাকৃতভাবে কিংবা অবহেলার কারণে— তখন একটি জাতি ধীরে ধীরে তার শেকড় হারাতে শুরু করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইতিহাস বিকৃতির বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই একটি গভীর ও বহুমাত্রিক সংকট হিসেবে বিদ্যমান।
১০ দিন আগে