উপজেলা নির্বাচন : বর্জন ও অর্জন

শাহরিয়ার শরীফ

গত কয়েকটি জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা কারো অর্জন এবং কারো বর্জনে পরিণত হয়েছে। নির্বাচন দেখলেই পিছু হটছে বিরোধীরা। সরকারি দলের নেতাদের পকেটে চলে যাচ্ছে জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনের পদগুলো।

রাজনীতির এই পরিস্থিতিকে কেউই স্বাভাবিক বলে মনে করছেন না। কিন্তু ভাবনা যার যা থাকুক না কেনো, নির্বাচন তো হয়ে যাচ্ছে। দৃশ্যত লাভবান হচ্ছে সরকারি দল।

তৃণমূল নেতাকর্মীদের চাঙা রাখতে স্থানীয় নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সংঘবদ্ধ করতেই উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পক্ষে বিএনপির একটি অংশ। কিন্তু দলের সিদ্ধান্তের বাইরে সেটি করতে গেলে বহিষ্কারের সম্ভাবনা রয়েছে। তারপরও বিএনপি নেতাদের কেউ কেউ নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় দলীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে গণসংযোগ করছেন। শেষ পর্যন্ত তারা নির্বাচনে অংশ নেবেন কি না, তা দেখার জন্য কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

আগামী ৮ মে থেকে দেশজুড়ে অনুষ্ঠিতব্য উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং তার মিত্ররা। প্রথম ধাপে ১৫০টি উপজেলা পরিষদে আগামী ৮ মে নির্বাচনের জন্য ১৫ এপ্রিল ছিলো মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন। ওইদিন ঢাকার নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানান, আওয়ামী লীগের অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার দলীয় সিদ্ধান্ত বহাল রয়েছে। তার মানে জাতীয় নির্বাচনের মতো বিএনপি উপজেলা নির্বাচনও বয়কট করবে।

যদিও আগে থেকে ধারণা ছিল যে, বিরোধীরা এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। ১৫ এপ্রিলের পর এ নিয়ে আর কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব রইল না। সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির মধ্যে নির্বাচনে যাওয়ার বিষয় নিয়ে কিছু আলোচনা হয়েছিল। সেখানে নির্বাচনে যাওয়া না যাওয়া নিয়ে নানা আলোচনা হয়। তবে দলের সিদ্ধান্তে কোনও পরিবর্তন আসেনি।

বিএনপি ছাড়াও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেওয়া দলগুলো এই সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না। তাদের এই বর্জনের মাধ্যমে সরকারি দল আওয়ামী লীগ প্রায় ৫০০ উপজেলার সবকটি অর্জন করবে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ শরিকদের কিছু আসনে ছাড় দিলেও উপজেলা নির্বাচনে সেই সম্ভাবনা নেই। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এটা সম্ভবও নয়। তাই আওয়ামী লীগের শরীক দলগুলো স্থানীয় নির্বাচনের মাঠ থেকে একরকম হারিয়ে যাওয়ার অবস্থায় রয়েছে।

দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ অধিকাংশ বিরোধী দলের বয়কটের মধ্যে ৭ জানুয়ারির দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক দেখাতে দলীয় ‘ডামি’ প্রার্থীদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা উন্মুক্ত করে দিয়েছিল আওয়ামী লীগ।

অতীতের ধারাবাহিকতায় এবারের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও বিএনপি অংশ নেবে না-এমন আগাম ধারণা থেকে আওয়ামী লীগ গত ফেব্রুয়ারি মাসে ঘোষণা দেয় যে, উপজেলা নির্বাচনে সরকারি দল কোনো প্রার্থীকে মনোনয়ন দেবে না এবং কেউ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতীক ‘নৌকা’ পাবে না।

স্থানীয় পর্যায়ে এ বছরই প্রথমবারের মতো নির্বাচন কমিশন (ইসি) শুধু অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা নিয়েছে। ৮ মে অনুষ্ঠিতব্য প্রথম ধাপের ১৫০টি উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে মোট ৬৯৫ জন মনোনয়নপ্রত্যাশী অনলাইনের মাধ্যমে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। ভাইস চেয়ারম্যান পদে মোট ৭২৪ জন এবং সংরক্ষিত মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৪৭০ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ১৫২টি উপজেলায় ৮ মে, দ্বিতীয় ধাপে ২৩ মে, তৃতীয় ধাপে ২৯ মে এবং চতুর্থ ধাপে ৫ জুন ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এসব নির্বাচন হয়তো হয়ে যাবে, কোথাও শান্তিপূর্ণ হবে, কোথাও গোলযোগপূর্ণ হবে। কিন্তু দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা এমন এক অবস্থায় চলে গেছে যে, এর বিশ্বাসযোগ্যতা এবং এটা নিয়ে আস্থা অর্জন করা বিশাল চ্যালেঞ্জের ব্যাপার হয়ে গেছে। একপক্ষ ভোট বর্জন করবে, আরেকপক্ষ অর্জন করতে থাকবে এবং এর মাধ্যমে সুষ্ঠু জনমতের প্রতিফলন যেমন ঘটবে না, তেমনি নির্বাচনী ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা তলানিতেই থেকে যাবে।

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

হাম বিতর্কে মায়ের ওপর দায় চাপানো বন্ধ করুন

কিছুসংখ‍্যক মানুষ গত কয়েকদিন ধরে এই কথা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছেন যে, মায়েরা তাদের শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না, তাই হামের সংক্রমণ বাড়ছে! শিশুরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে। আর ‘কান নিয়েছে চিলে’— সেই কানের খোঁজ না করেই কিছু মূলধারার সংবাদমাধ্যম লিখেছে, মায়েরা শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না বলেই হামের

৫ দিন আগে

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলকে হটিয়ে বিজেপি— নির্বাচনি ফলাফলের কাটাছেঁড়া

তৃণমূল নেতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভোট ব্যাংক ছিল মূলত সংখ্যালঘু ও নারী ভোট। ফলাফলে দেখা গেছে, যে তৃণমূলের ৮০ জন জয়ী প্রার্থীর মধ্যে ৩২ জন মুসলিম, যা ঠিক ঠিক ৪০ শতাংশ। এ ছাড়া অন্যান্য দলের আরও ছয়টি আসনে মুসলিম প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। তাহলে কংগ্রেস, সিপিএম ও বিশেষত নওসাদ সিদ্দিকির ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট

৫ দিন আগে

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বেজে উঠেছে পুরোদস্তুর এক মহাযুদ্ধের দামামা

চলমান এই স্নায়ুযুদ্ধ যদি সত্যি সত্যি আগামী সপ্তাহে পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়, তবে তার মাশুল শুধু মধ্যপ্রাচ্যকে নয়, বরং পুরো বিশ্বকে দিতে হবে। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ আর পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই সংঘাত কূটনৈতিক টেবিলে সমাধান হবে, নাকি বিশ্বকে এক নতুন অর্থনৈতিক মন্দা ও তৃতীয়

৮ দিন আগে

বাংলাদেশ-ভারতের স্বার্থে ফারাক্কা ভেঙে দেওয়া প্রয়োজন

ফারাক্কা বাঁধ চালুর ৫২ বছর পর আজ স্বয়ং ভারতীয় রাজনীতিবিদরা যখন এটি ভেঙে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন, তখন ফারাক্কা বাঁধ যে কতটা ক্ষতিকর প্রকল্প তা বুঝতে আর কারও বাকি থাকার কথা নয়। ভারতীয় রাজনীতিবিদদের এই দাবির প্রেক্ষিতে ফারাক্কা বাঁধের অপ্রয়োজনীয়তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

৯ দিন আগে