বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে কেন বাড়ছে দূরত্ব?

আল-জাজিরা
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হয়েছে

সম্প্রতি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনে হামলার ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন ইস্যুতে উত্তেজনা বাড়ছে, যা দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছে। আল জাজিরা অবলম্বনে অনুবাদ করেছেন শাহরিয়ার শরীফ

গত আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর তিনি ভারতে আশ্রয় নেন। সেই থেকে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক খারাপ হতে শুরু করে। ভারতে অবস্থান নিয়ে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও এর প্রধান নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূসের কঠোর সমালোচনা করেছেন। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

আলী রিয়াজের বিশ্লেষণ

যুক্তরাষ্টের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আলী রিয়াজ মনে করেন, “ভারতের শেখ হাসিনার প্রতি উষ্ণ অভ্যর্থনা" অভূতপূর্ব ছিল। তিনি বলেন, “২০০৯ সাল থেকে ভারত শেখ হাসিনার সরকারকে নি:শর্ত সমর্থন দিয়েছেন। এই সমর্থন তাকে দিন দিন স্বৈরাচারী শাসকে পরিণত করেছে এবং দুই দেশের মধ্যে এক অসম সম্পর্ক তৈরি করেছে। ভারত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করেছে এবং আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে হাসিনার শাসনকে ঢাল হিসেবে কাজ করেছে।”

তবে ভারতীয় কূটনীতিক অনিল ত্রিগুনাইত এই ধারণাকে ভিত্তিহীন হিসেবে অভিহিত করে বলেন, “শেখ হাসিনার প্রতি ভারতের সমর্থন নিয়ে একটি ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে। ভারত বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের উপকারের জন্য অনেক বড় অপ্রত্যাশিত সহায়তা দিয়েছে। কিন্তু এখন ভারতকে সমালোচনার লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে, যেখানে বহিরাগত শক্তিরাও ইন্ধন জুগিয়ে চলেছে।”

রিয়াজ মনে করেন, ভারতের জন্য এখন সম্পর্ক উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। তিনি বলেন, “ভারত সরকারের উচিত একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া যে তারা নীতিতে পরিবর্তন আনতে প্রস্তুত এবং বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ও জনগণের সঙ্গে কাজ করতে চায়। পাশাপাশি, ভারতের ভূমি যেন হাসিনা বা অন্য কেউ বাংলাদেশের ভেতরে অস্থিরতা ও সহিংসতা তৈরি করতে ব্যবহার না করে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।”

গত সপ্তাহে বাংলাদেশে হিন্দু ধর্মীয় নেতা চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়, যা দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দেয়। ভারতে এর প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু হয় এবং শেষ পর্যন্ত আগরতলায় বাংলাদেশের মিশনে হামলা চালানো হয়। এ ঘটনায় বাংলাদেশ কড়া প্রতিক্রিয়া জানায় এবং ভারতের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে তদন্ত দাবি করে।

ভারত এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে এটিকে “দুঃখজনক” বলে মন্তব্য করেছে। হামলার ঘটনায় সাতজনকে গ্রেপ্তার এবং তিনজন পুলিশ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। কিন্তু মূল সমস্যাগুলো এখনও সমাধান হয়নি। আগরতলার এই হামলা শুধু দুই দেশের মধ্যকার উত্তেজনা বাড়িয়েছে তাই নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা স্থিতিশীল সম্পর্ককেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

নরওয়ের ইউনিভার্সিটি অব অসলোর পোস্টডক্টরাল গবেষক মুবাশার হাসান মনে করেন, এই হামলা দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়াবে। তিনি বলেন, “এই হামলা দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান আস্থার সংকটকে গভীর করবে এবং বাণিজ্য সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এটি সময়ের সাথে বোঝা যাবে।”

শেখ হাসিনার আমলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে, যার ফলে বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সহযোগিতায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছিল। ২০২৩-২৪ সালে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে এই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

সম্পর্ক উন্নয়নের সম্ভাবনা

ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা জানান, দুই দেশের সম্পর্ক একক কোনো এজেন্ডার উপর নির্ভরশীল নয়। তিনি বলেন, “ভারত ও বাংলাদেশ যৌথভাবে শান্তি, নিরাপত্তা এবং উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করতে আগ্রহী।”

ভারতের সাবেক কূটনীতিক অনিল ত্রিগুনাইত মনে করেন, পরিস্থিতি শান্ত হলে সম্পর্ক আবার উন্নত হতে পারে। তবে তিনি বলেন, “ভারতের উচিত আরও কার্যকর যোগাযোগ কৌশল ও জনসংযোগ নীতি গ্রহণ করা। এ ছাড়া একটি সম্ভাব্য কূটনৈতিক সফরের মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক সমস্যাগুলো সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।”

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান মুহাম্মদ ইউনূস বিশ্বাস করেন, দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অপরিহার্য। তিনি বলেন, “আমাদের স্বার্থের জন্য যেমন ভারত প্রয়োজন, ভারতের স্বার্থেও বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সবকিছু ব্যবহার করে এই সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করতে হবে।”

চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ২০০৯ সাল থেকে ভারত শেখ হাসিনার সরকারকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছে, যা দুই দেশের মধ্যে অসম সম্পর্ক তৈরি করেছে। তবে ভারতীয় কূটনীতিকরা এই ধারণাকে ভিত্তিহীন বলে মন্তব্য করেছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের হিন্দু সংখ্যালঘুদের উপর হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সংকট সমাধানে ভারত ও বাংলাদেশকে নিজেরাই সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, উভয় দেশের উচিত কূটনৈতিক চ্যানেলগুলো উন্মুক্ত রাখা এবং পারস্পরিক স্বার্থে কাজ করা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখতে পারে, যা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনার পাশাপাশি দুই দেশের সম্পর্ক মজবুত করতে সাহায্য করবে।

ভবিষ্যৎ কোথায় যাচ্ছে?

বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে এই দূরত্ব শুধু রাজনৈতিক নয়, সামাজিক ও কূটনৈতিক স্তরেও গভীর হচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও বর্তমান উত্তেজনা এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না করা হলে, ভবিষ্যতে এই সংকট আরও জটিল রূপ নিতে পারে।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক দীর্ঘদিনের এবং এটি শুধুমাত্র ভূরাজনীতি, অর্থনীতি বা সংস্কৃতির ওপর নির্ভরশীল নয়। যদিও সাম্প্রতিক হামলা সম্পর্ককে নাজুক করেছে, তবে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ ও আলোচনার চ্যানেল খোলা রয়েছে। সঠিক কৌশল এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে এই উত্তেজনা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

জয় নয়, ক্ষয়— ইরান যুদ্ধের একমাত্র ফল

যুদ্ধকালীন অবস্থার চেয়ে যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি সবসময়ই ভয়াবহ হয়ে ওঠে। কেবল যুদ্ধে জড়ানো দেশের জন্যই নয়, সারা বিশ্বের জন্যই এ বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সভ্যতার সংকট সৃষ্টিতে বড় ভূমিকা রাখে যুদ্ধ, হয়ে ওঠে নীরব আততায়ী। ইরান যুদ্ধও এর থেকে আলাদা কোনো বিষয় নয়।

৯ দিন আগে

হঠাৎ জ্বরের প্রকোপ, কোভিডের ঝুঁকি মাথায় রেখেই চিকিৎসার পরামর্শ

কখনো ঠান্ডা, কখনো গরম— এমন পরিস্থিতির পালাবদলে নারী, পুরুষ, শিশু ও তরুণদের অনেকেই আক্রান্ত হচ্ছেন সাধারণ ‘সর্দি জ্বরে’। এর মধ্যেই আবার দেখা দিয়েছে ‘ভাইরাসজনিত ইনফ্লুয়েঞ্জা জ্বর’ও। শিশুরা ভুগছে নানান ভাইরাসের সংক্রমণে ‘শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহজনিত জ্বরে’।

১০ দিন আগে

ভুয়া সনদে নিয়োগ বাতিলে শুদ্ধি অভিযান জরুরি

মেধার পক্ষে দাঁড়ানো মানে শুধু পরীক্ষার্থীর পক্ষে দাঁড়ানো নয়; এটি বাংলাদেশের প্রশাসনিক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ ও নৈতিক মর্যাদার পক্ষে দাঁড়ানো। এখন সাহসী সিদ্ধান্তের সময়— রাষ্ট্রকে মেধার পক্ষে দাঁড়াতে হবে।

১০ দিন আগে

রাজপথ থেকে ‘গিরিপথে’ জ্বালানি সংকটে বন্দি জনজীবন— সমাধান কোথায়?

সম্ভবত সেই দিক বিবেচনায় আজ শনিবার তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা ইমরানুল হাসান স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সরকার চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক বাজার হতে প্রয়োজনীয় তেল ক্রয় করছে। ফলে দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ঘাটতির কোনো সম্ভাবনা নেই। দ

১২ দিন আগে