আমরা সবাই যখন লুটেরা— একটি আত্মসমালোচনার সময়

এম ডি মাসুদ খান

বাংলাদেশ আজ উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি ও সম্ভাবনার এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। অবকাঠামো, প্রযুক্তি, শিল্প— সব ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান অগ্রগতি আমাদের আশাবাদী করে। কিন্তু এই অগ্রগতির ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক গভীর সংকট— নৈতিকতার অবক্ষয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক স্তরে বিস্তৃত এক ধরনের ‘লুটের সংস্কৃতি’। এটি কেবল অর্থনৈতিক দুর্নীতির প্রশ্ন নয়, বরং এটি আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যক্তিসত্তার গভীরে প্রোথিত একটি কাঠামোগত সমস্যা।

প্রথমত, আমাদের অর্থনৈতিক কাঠামোর দিকে তাকালে দেখা যায়— ব্যাংকিং খাত থেকে শুরু করে বড় বড় আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতার ঘাটতি স্পষ্ট। খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে একটি অঘোষিত স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়েছে। এতে একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয় সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে সৎ উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। অর্থনীতিতে একটি ‘মোরাল হ্যাজার্ড’ তৈরি হয়েছে, যেখানে অনিয়ম করেও পার পেয়ে যাওয়ার প্রবণতা আরও অনিয়মকে উৎসাহিত করছে।

দ্বিতীয়ত, প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় যে অনিয়ম চলছে, তা কেবল পরিবেশগত ক্ষতিই নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার হরণের সামিল। বন উজাড়, পাহাড় ধ্বংস, নদী দখল— এসব কার্যক্রম অনেক সময় ক্ষমতার ছত্রছায়ায় পরিচালিত হয়। উন্নয়নের নামে এই ধ্বংসযজ্ঞ আসলে একটি স্বল্পমেয়াদি লাভের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির পথ তৈরি করছে। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ একটি দেশে এটি আত্মঘাতী প্রবণতা ছাড়া কিছুই নয়।

শিক্ষা খাতে সংকটটি আরও সূক্ষ্ম, কিন্তু গভীরতর। এখানে জ্ঞান নয়, বরং সার্টিফিকেটকেন্দ্রিক এক প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস, নিয়োগ বাণিজ্য, কোচিংনির্ভরতা— সব মিলিয়ে একটি অসুস্থ ইকোসিস্টেম গড়ে উঠেছে। এর ফলে আমরা এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করছি, যারা হয়তো ডিগ্রিধারী, কিন্তু দক্ষতা, নৈতিকতা ও সৃজনশীলতায় পিছিয়ে। দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।

স্বাস্থ্য খাতেও একই রকম কাঠামোগত বৈষম্য লক্ষ্য করা যায়। স্বাস্থ্য সেবা একটি মৌলিক অধিকার হলেও বাস্তবে এটি অনেক ক্ষেত্রে পণ্যে পরিণত হয়েছে। সরকারি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও বেসরকারি খাতের উচ্চ ব্যয়— এই দুইয়ের মাঝে সাধারণ মানুষ এক ধরনের ‘ডাবল বার্ডেনে’র শিকার। নকল ওষুধ, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা, অতিরিক্ত বিল— এসব কেবল অর্থনৈতিক শোষণ নয়, মানবিকতারও পরাজয়।

বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রে আস্থার সংকট একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়গুলোর একটি। বিচার পেতে দীর্ঘ সময়, প্রভাবের অভিযোগ, ও অর্থের প্রভাব— এসব কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ধারণা তৈরি হচ্ছে যে ন্যায়বিচার সবার জন্য সমান নয়। এই ধারণা যদি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, তবে তা আইনের শাসনের ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়।

গণপরিবহন, শ্রমবাজার, কৃষি— প্রতিটি ক্ষেত্রেই মধ্যস্বত্বভোগী ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার কারণে প্রকৃত উৎপাদক বা ভোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কৃষক ন্যায্যমূল্য পান না, শ্রমিক তার পরিশ্রমের সঠিক মূল্য পান না, কিন্তু মধ্যবর্তী একটি শ্রেণি অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে লাভবান হয়। এটি একটি অসম অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রতিফলন।

প্রযুক্তি ও ডিজিটাল সেবার ক্ষেত্রেও একটি দ্বৈত বাস্তবতা রয়েছে। একদিকে ডিজিটাল রূপান্তরের অগ্রগতি, অন্যদিকে উচ্চ ব্যয়, নিম্নমানের সেবা ও তথ্যপ্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা। ফলে প্রযুক্তি যে সমতা ও সুযোগ তৈরি করার কথা, তা অনেক ক্ষেত্রে নতুন বৈষম্য তৈরি করছে।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো— এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী কে? শুধু কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী? নাকি আমাদের সামগ্রিক সামাজিক মানসিকতা? বাস্তবতা হলো— এই লুটের সংস্কৃতি টিকে আছে, কারণ আমরা অনেকেই সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এর সঙ্গে জড়িত। আমরা কখনো সুবিধাভোগী, কখনো নীরব দর্শক, আবার কখনো পরিস্থিতির চাপে আপসকারী।

এ প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন একটি সামগ্রিক আত্মসমালোচনা। নীতিনির্ধারকদের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী জবাবদিহিতা কাঠামো, স্বচ্ছতা ও আইনের সমান প্রয়োগ। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পাশাপাশি সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষার ওপরও জোর দিতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিকতা ও নাগরিক সচেতনতা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।

একই সঙ্গে নাগরিক হিসেবেও আমাদের ভূমিকা কম নয়। অন্যায়কে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ না করা, নিজের অবস্থান থেকে সততা বজায় রাখা এবং সচেতন নাগরিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা— এসবই পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ ও তরুণ প্রজন্ম এই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত ‘আমরা সবাই লুটেরা’— এই বাক্যটি যদি কেবল অভিযোগ না হয়ে আত্মসমালোচনার সূচনা হয়, তবে তাতেই রয়েছে আশার আলো। কারণ সমস্যাটি যদি আমরা সবাই মিলে তৈরি করে থাকি, তবে সমাধানটিও আমাদের সম্মিলিত চেষ্টাতেই সম্ভব।

একটি ন্যায়ভিত্তিক, স্বচ্ছ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার সময় এখনই— এখনই সময় নিজেদের দিকে ফিরে তাকানোর।

লেখক: ব‍্যবসায়ী ও কলামিস্ট

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জিং বাজেট

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে সরকার ৫ লাখ কর্মসংস্থান, ৬ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি, ৭ শতাংশ মূল্যস্ফীতি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, জ্ঞানভিত্তিক সৃজনশীল অর্থনীতির পথে এগিয়ে যেতে চায়। দুর্নীতি ও অপচয় পরিহার, শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি ও এনবিআরের সম্পদ সংগ্রহে গতি সঞ্চারের মাধ্য

৭ দিন আগে

হাম বিতর্কে মায়ের ওপর দায় চাপানো বন্ধ করুন

কিছুসংখ‍্যক মানুষ গত কয়েকদিন ধরে এই কথা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছেন যে, মায়েরা তাদের শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না, তাই হামের সংক্রমণ বাড়ছে! শিশুরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে। আর ‘কান নিয়েছে চিলে’— সেই কানের খোঁজ না করেই কিছু মূলধারার সংবাদমাধ্যম লিখেছে, মায়েরা শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না বলেই হামের

৮ দিন আগে

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলকে হটিয়ে বিজেপি— নির্বাচনি ফলাফলের কাটাছেঁড়া

তৃণমূল নেতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভোট ব্যাংক ছিল মূলত সংখ্যালঘু ও নারী ভোট। ফলাফলে দেখা গেছে, যে তৃণমূলের ৮০ জন জয়ী প্রার্থীর মধ্যে ৩২ জন মুসলিম, যা ঠিক ঠিক ৪০ শতাংশ। এ ছাড়া অন্যান্য দলের আরও ছয়টি আসনে মুসলিম প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। তাহলে কংগ্রেস, সিপিএম ও বিশেষত নওসাদ সিদ্দিকির ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট

৯ দিন আগে

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বেজে উঠেছে পুরোদস্তুর এক মহাযুদ্ধের দামামা

চলমান এই স্নায়ুযুদ্ধ যদি সত্যি সত্যি আগামী সপ্তাহে পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়, তবে তার মাশুল শুধু মধ্যপ্রাচ্যকে নয়, বরং পুরো বিশ্বকে দিতে হবে। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ আর পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই সংঘাত কূটনৈতিক টেবিলে সমাধান হবে, নাকি বিশ্বকে এক নতুন অর্থনৈতিক মন্দা ও তৃতীয়

১১ দিন আগে